তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ে বাংলাদেশ

 সরোয়ার আলম, চিফ রিপোর্টার, আনাদোলু এজেন্সি, তুরস্ক 
২২ ডিসেম্বর ২০২০, ০৬:৩৩ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
বাংলাদেশ ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ফাইল ছবি
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন ও তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত চাভুসওগ্লু। ফাইল ছবি

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত চাভুসওগ্লুর বাংলাদেশ সফর নিয়ে বাংলাদেশী মিডিয়াগুলো অনেকটা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে।  প্রায় সব পত্রিকাই ফলাও করে ছাপিয়েছে তার ঢাকা আগমনের খবরটি।  আমি অবশ্য বিষয়টি কয়েকদিন আগেই আমার ফেসবুক পেজে লিখেছিলাম। 

প্রথেমই বলে রাখা ভালো যে চাভুসওগ্লুর এই সফরটি আসলে বিলম্বিত একটি সফর।  বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন গত সেপ্টেম্বরে আঙ্কারা সফরকালে চাভুসওগ্লুকে বাংলাদেশে ভ্রমণের আমন্ত্রণ জানান। 

তখন কাকতালীয়ভাবে তুরস্কের বাংলাদেশে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত মুস্তাফা ওসমান তুরানও আঙ্কারায় ছিলেন। রাষ্ট্রদূত তুরান আমাকে বলেছিলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তুরস্কে এসে যেমন বাংলাদেশী দূতাবাস ভবনের উদ্বোধন করেছেন, তিনিও চান তুরস্কের রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশে গিয়ে তাদের দূতাবাস ভবন উদ্ভধোন করুক। আঙ্কারায় আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেনের সঙ্গে সাক্ষাতেও তিনি আমাকে জানিয়েছিলেন যে চাভুসওগ্লু শীঘ্রই বাংলাদেশে যাবেন।  

সেই প্রচেষ্টারই অংশ হিসেবে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নভেম্বরের শুরুর দিকে বাংলাদেশে যাওয়ার কথা ছিল।  কিন্তু তখন আর্মেনিয়ার বিরুদ্ধে আজারবাইজানের যুদ্ধ বিজয়ে তিনি জরুরি ভিত্তিতে বাকুর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার জন্য অন্য সব সফর বাতিল করেন।  ফলশ্রুতিতে তার বাংলাদেশে যাওয়াও বাতিল হয়।   

এবারের সফর চাভুসওগ্লুর প্রথম ঢাকা সফর নয়। এর আগেও তিনি বাংলাদেশ সফর করেছেন। তবে পার্থক্য হলো আগের সবগুলো সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা। আর এবারের সফরের মূল উদ্দেশ্য দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়ন। 

২০১০ সালে বাংলাদেশ সফর করেন তুরস্কের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোগান। ফাইল ছবি

২০১০ সালের পরে এই প্রথম তুরস্কের কোনো উচ্চপদস্থ ব্যক্তি দ্বিপাক্ষিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার জন্য ঢাকায় গেলেন।  

সুতরাং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের দিক থেকে এবারের সফরটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ঢাকায় এবং আঙ্কারায় উভয় দেশের রাষ্ট্রদূতের কর্মব্যস্ততা আর আনুষ্ঠানিক বৈঠকের তালিকা দেখলেই বোঝা যায় উভয় পক্ষই সম্পর্ক উন্নয়নে বদ্ধপরিকর।    

এবারের সফরের আরেকটি বিষয় হচ্ছে সাধারণ মানুষের আবেগ। তুরস্কের প্রতি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের আবেগ এখন এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছে যে, একেবারে ঘোর এরদোগান বিরোধী পত্রিকাও পাঠকপ্রিয়তা ধরে রাখতে তুরস্ক সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোকে ফলাও করে ছাপাতেও পিছপা হয় না।  

এছাড়াও বাংলদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত কয়েক মাস ধরে তুরস্কের রাষ্ট্রপতি রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোগানের আগামী মার্চে সম্ভাব্য বাংলাদেশ সফর নিয়ে যে ঢাক ঢোল পিটাচ্ছে তাতেও মানুষের মাঝে তুরস্ক নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে। 

বৈঠকে যে সব বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে

ঢাকায় দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য এবং রোহিঙ্গা বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।  তুরস্ক রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তর নিয়ে এখনো কোনো উচ্চবাচ্য করেনি।  আব্দুল মোমেন, চাভুসওগ্লুকে এক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট তুলে ধরবেন এবং চাইবেন আঙ্কারা যেন এ বিষয়ে ঢাকার পাশে থাকে।  

এছাড়াও বাংলাদেশের ইপিজেডে তুর্কি ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ, বাংলাদেশে তুরস্কের হাসপাতাল তৈরির আগ্রহ, বাংলদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে তুরস্কের সক্রিয় অংশগ্রহণ, দু'দেশের ব্যবসায়ী সংগঠনের মধ্যে আরো বেশি সম্পর্ক স্থাপন, দু'দেশের সামরিক সম্পর্কের দ্রুত অগ্রগতি নিয়েও আলোচনা হওয়ার সম্ভবনা আছে।  

আর এরদোগানের সম্ভব্য বাংলাদেশ সফরের খুঁটিনাটি নিয়েও আলোচনা হতে পারে।  যদিও সফরের বিষয়টি এখনো নিশ্চিত না।  

চাভুসওগ্লু, আবদুল মোমেন ছাড়াও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথেও দেখা করবেন। 

প্রধানমন্ত্রী হাসিনা হয়তো চাভুসওগ্লুর মাধ্যমে এরদোগানকে বাংলাদেশ ভ্রমণের আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করবেন।

সফরটি দুইদিনের হলেও মূল বৈঠক এবং আনুষ্ঠানিকতা এক দিনেই সীমাবদ্ধ থাকবে। 

এই সফরে গুরুত্বপূর্ণ কোনো চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবে ভবিষ্যৎ সম্পর্কের দ্বার উন্মোচনে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

২০১২ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত চলা শীতল সম্পর্কের পর উভয় দেশই  যে সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহী বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আবদুল মোমেনের আঙ্কারা সফর এবং তুরস্কের পক্ষ থেকে চাভুসওগ্লুর ঢাকা সফর তার সাক্ষ্য বহন করে।  

এখন এরদোগান যদি আগামী এপ্রিলে বাংলাদেশ সফর করেন তাহলে শেখ হাসিনা হয়তো কয়েক মাসের মধ্যেই ফিরতি সফরে তুরস্ক আসবেন। উভয় দেশের কূটনৈতিক মহল দু'নেতার সফরের ব্যাপারে জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। 

দুই ভ্রাতৃপ্রতীম দেশের সুসম্পর্কে তখন হয়তো নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।

লেখক: সরোয়ার আলম, চিফ রিপোর্টার, এশিয়া-প্রশান্ত অঞ্চলীয় প্রধান, আনাদোলু এজেন্সি, আঙ্কারা, তুরস্ক

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন