অস্তিত্বের লড়াইয়ে ভারতের কৃষক

 মামুন ফরাজী 
২১ ডিসেম্বর ২০২০, ০৮:৩৭ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

কেন্দ্রীয় সরকারের তিন কৃষি আইন বাতিলের দাবিতে দিল্লি সীমানার বিভিন্ন সড়কে অবস্থান নিয়ে প্রায় চার সপ্তাহ ধরে অবস্থান কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছেন ভারতের কৃষকরা। জলকামান, টিয়ারশেল ব্যবহার করেও তাদের ওঠানো যায়নি। প্রচণ্ড শীতের মধ্যে তাঁবু টাঙিয়ে, ট্রাক্টর ও অন্যান্য কৃষি যন্ত্রপাতি সড়কে রেখে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।

দফায় দফায় কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে কৃষকদের আলোচনা হয়েছে, কিন্তু কোনো সমাধান মেলেনি। এমন পরিস্থিতিতে কৃষকরা সরকারের ওপর চাপ বাড়াতে নানা পার্শ্ব কর্মসূচি পালন করে চলেছেন। ২৩ ডিসেম্বর ‘কৃষক দিবসে’ সারা দেশের কৃষকদের একবেলা না খেয়ে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন আন্দোলনের সংগঠকরা। এছাড়া ঘটি-বাটি-থালা বাজিয়ে ২৭ ডিসেম্বর নরেন্দ্র মোদির ‘মন কি বাত’ অনুষ্ঠানের প্রতিবাদ জানাবেন তারা।

ভারতের কৃষকদের এ আন্দোলন বিশ্ব মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ডয়েচে ভেলে, আল-জাজিরাসহ বেশ কয়েকটি টিভি চ্যানেল ছাড়াও বিশ্বের প্রভাবশালী প্রিন্ট ও অনলাইন মিডিয়া গুরুত্বের সঙ্গে আন্দোলনের খবর প্রচার করছে। এ আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়েছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রীসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের অধিকার সচেতন গণতন্ত্রকামী মানুষ। কৃষকদের ওপর পুলিশের হামলার নিন্দা জানিয়েছেন অনেকে।

আন্দোলনরত কৃষকদের বক্তব্য- এ আইনের ফলে কৃষিপণ্যের দাম নির্ধারণের নিয়ন্ত্রণ বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর হাতে চলে যাবে। দেশের কৃষি ধ্বংস হয়ে যাবে। এ আইন বাতিল না হওয়া পর্যন্ত তারা ঘরে ফিরে যাবেন না।

কিন্তু কৃষকদের দাবি মানতে রাজি নয় মোদি সরকার। তবে আলোচনার নামে তাদের নাটক কিন্তু চলছে। এরই মধ্যে তারা তলে তলে নিজেদের (বিজেপি-আরএসএস) কৃষক সংগঠনকে আন্দোলনের বিরুদ্ধে নামিয়ে দেয়ার প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে।

দিল্লিমুখী রাস্তা অবরোধে মূলত পাঞ্জাব ও হরিয়ানার কৃষকরা অংশ নিচ্ছেন। এছাড়া আরও কয়েকটি রাজ্য থেকে কৃষকরা সেখানে গেছেন। এদিকে এ আন্দোলনের সমর্থনে সভা-সমাবেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন হচ্ছে বিভিন্ন রাজ্যে। কৃষকদের ডাকে ৮ ডিসেম্বর ভারতজুড়ে ধর্মঘট পালিত হয়েছে। এতে কর্যত গোটা দেশ থমকে যায়। আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে কংগ্রেস, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)সিপিএম, সিপিআইসহ ২৪টি রাজনৈতিক দল।

কৃষকদের ন্যায্য দাবি মেনে নিতে এসব দলের পক্ষ থেকে ১০ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দকে স্মারকলিপি দেয়া হয়েছে। এ সময় কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী, সিপিএম নেতা সিতারাম ইয়েচুরি, সিপিআইয়ের ডি রাজা, এনসিপি নেতা শারদ পাওয়ার, ডিএমকের ইলানগোভানক উপস্থিত ছিলেন।

তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিনিধির স্মারকলিপি প্রদান অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার  কথা থাকলেও তিনি উপস্থিত হননি। অনেকে মনে করছেন, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য নির্বাচন সামনে থাকায় কংগ্রেস-সিপিএমের সঙ্গে একমঞ্চে যেতে চাইছে না তৃণমূল। কারণ আগামী রাজ্য নির্বাচনে তৃণমূলের বিরুদ্ধে জোট হয়ে লড়বে কংগ্রেস ও সিপিএম।

রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি দিয়ে বেরিয়ে রাহুল গান্ধী সাংবাদিকদের বলেন, কৃষকরাই ভারত। তাদের কেউ পিছু হটাতে পারবে না। কারণ তারা বুঝতে পেরেছেন, যদি এ আইন মেনে নেয়া হয় তাহলে তাদের ভবিষৎ অন্ধকার।’ তিনি আরও বলেন, আমি কৃষকদের বলছি, যদি আজ আপনারা দৃঢ় হয়ে না দাঁড়ান, তাহলে আর কখনও সুযোগ পাবেন না। আমরা সবাই আপনাদের সঙ্গে আছি।

সীতারাম ইয়েচুরি বলেন, অগণতান্ত্রিকভাবে কারও সঙ্গে ঠিকমতো আলোচনা না-করে কৃষি বিল পাস করিয়েছে সরকার। যে আন্দোলন চলছে, তা ঐতিহাসিক এবং ক্রমশ আরও তীব্র হবে। ডি রাজা বলেন, কৃষকদের সঙ্গে যে অন্যায় হচ্ছে, তাতে কোনো রাজনৈতিক দল মুখবুজে থাকতে পারে না।

কৃষি আইনের বিরোধিতা সংক্রান্ত যে স্মারকলিপিটি বিরোধীদের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতিকে দেয়া হয়েছে, তাতে অগণতান্ত্রিকভাবে সংসদে কৃষিবিল পাস করানোর অভিযোগটি রয়েছে। বলা হয়েছে- এ আইন দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করবে। দেশে কৃষি ব্যবস্থা ও কৃষকদের ধ্বংস করবে। ন্যূনতম সহায়ক মূল্য বলে আর কিছু থাকবে না এবং এ আইনের ফলে কৃষি ব্যবস্থাকে কার্যত কর্পোরেটদের হাতে বন্ধক হিসেবে তুলে দেয়া হয়েছে।

ভারতজুড়ে সর্বাত্মক ধর্মঘট: কৃষক সংগঠনগুলোর পাশাপাশি কংগ্রেস, বিভিন্ন বামপস্থী দল, সমাজবাদী পার্টিসহ অনেকেই ৮ ডিসেম্বরের ‘ভারত বনধ’কে সমর্থন জানিয়ে মাঠে নামে। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালেরও ধর্মঘটে যোগ দেয়ার কথা ছিল কিন্তু আগের দিন থেকেই তাকে গৃহবন্দি করে রাখা হয়।

এদিন গুজরাটে যান চলাচল বন্ধ করে দেন কৃষকরা। তারা রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন। তেলেঙ্গানায় পরিবহন কর্মীরাই বিভিন্ন সড়ক অবরোধ করেন। উড়িষ্যার ভুবনেশ্বর স্টেশনে রেল অবরোধ করেন বিভিন্ন বামপন্থী দলের কর্মী-সমর্থকরা। কৃষকদের আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে দিল্লিতে ট্যাক্সি চালানো বন্ধ রাখে ড্রাইভার্স অ্যাসোসিয়েশন। অল ইন্ডিয়া মোটর ট্রান্সপোর্ট কংগ্রেসও দেশজুড়ে কর্মবিরতি পালন করে। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন সড়ক অবরোধ করেন বামপন্থী শ্রমিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

কৃষকদের দাবি-দাওয়া নিয়ে ৯ ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রীদের সঙ্গে কৃষক সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের দ্বিতীয় দফা বৈঠক হয়। কিন্তু ওই বৈঠকও ব্যর্থ হয়। ১৪ ডিসেম্বর থেকে ভারতের বিভিন্ন স্থানে অনশনে বসেছেন কৃষকরা।

কেন এ আন্দোলন: নতুন আইনে কৃষিবাজারের (মান্ডি) ওপর রাজ্যের একচেটিয়া অধিকার আর থাকবে না। বেসরকারি বহুজাতিক সংস্থাও তাদের পছন্দমতো ‘মান্ডি’ (বাজার) তৈরি করতে পারবে। চুক্তিভিত্তিক চাষও করা যাবে। সবচেয়ে বড় কথা, কোন দামে চাষী তার পণ্য বেচবেন, তা বাজারই ঠিক করে দেবে। কৃষক বিক্ষোভের বড় কারণগুলোর মধ্যে এটা অন্যতম।

তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ ন্যূনতম সহায়ক মূল্য বা মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইস (এমএসপি) নিয়ে। দেশটির কৃষি ব্যবস্থায় এমএসপি প্রথা চালু রয়েছে বহু দশক ধরে। ক্ষতির হাত থেকে চাষীকে বাঁচিয়ে ন্যায্যমূল্য দিতে সরকার প্রতি বছর বিভিন্ন ফসলের এমএসপি ঠিক করে দেয়। এটাই এ দেশের কৃষকের প্রধান রাজনৈতিক হাতিয়ার। সেই দামের নিচে সরকার ফসল কিনতে পারে না। এ ব্যবস্থা চাষীর কাছে একটা বড় নিরাপত্তাও। নতুন আইনে কিন্তু এ প্রথা বাধ্যতামূলক রাখা হয়নি। কৃষক সংগঠন ও বিরোধীরা চাইছে, এমএসপি প্রথাকে নতুন আইনের আওতায় এনে সবার জন্য বাধ্যতামূলক করতে, যাতে  দেশি বেসরকারি সংস্থা ও বহুজাতিক সংস্থা কম দামে ফসল বিক্রিতে কৃষককে বাধ্য করতে না পারে।

শীর্ষ আদালতে কৃষকরা: কৃষি আইনের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছে প্রতিবাদরত কৃষক সংগঠনগুলোর বড় অংশীদার ভারতীয় কিষান ইউনিয়ন। ১১ ডিসেম্বর শীর্ষ আদালতের কাছে তাদের দাবি, এ আইন বড় কর্পোরেটের সামনে কৃষকদের দুর্বল করে তুলবে। তিনটি আইন নিয়েই তাদের বিরোধিতার কথা আদালতে জানিয়েছে সংগঠনটি। গত সেপ্টেম্বরে ভারতের কৃষি খাত সংস্কারের লক্ষ্যে তিনটি কৃষি আইন পাস হয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জানিয়েছেন, নতুন আইনের মাধ্যমে মধ্যস্বত্বভোগীদের অত্যাচার থেকে মুক্তি পাবে কৃষকরা। তবে কৃষকরা মনে করছেন, নতুন এ আইনের ফলে তাদের লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি। এ আইনের কারণে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোই লাভবান হবে।

অনড় মোদি সরকার: নরেন্দ্র মোদি সরকারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেছেন, কৃষি আইন নিয়ে পিছিয়ে আসার কোনো প্রশ্নই আসে না। মোদির কথায় সুর মিলিয়ে তিনি এ বার্তা দেন যে, এ আইন কৃষিবিরোধী নয়। তাদের সুবিধার্থেই আইন সংস্কার করা হয়েছে। তার কথায়, কৃষিক্ষেত্রকে পিছিয়ে দেয়ার মতো কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। যে আইন করা হয়েছে তাতে কৃষকের স্বার্থই রক্ষা হবে।

রিলে অনশন শুরু: ২১ ডিসেম্বর থেকে ২৪ ঘণ্টার রিলে অনশন শুরু করেছেন কৃষকরা। দিল্লি সীমানায় সব প্রতিবাদ স্থলেই এ অনশন চলবে। একসঙ্গে কমপক্ষে ১১ জন থাকবেন অনশনে। অনশনের পাশাপাশি বিভিন্ন কর্মসূচিও নেয়া হয়েছে কৃষক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে। প্রতি বছর ২৩ ডিসেম্বর ভারতে পালিত হয় কৃষক দিবস। ওই দিন দেশের সব কৃষককে দুপুরের খাবার না খাওয়ার জন্য অনুরোধ করেছে সংগঠনগুলো। এ নিয়ে ভারতীয় কিষান ইউনিয়নের নেতা রাকেশ তিকাইত বলেছেন, কিষান দিবসে দেশের সব কৃষককে একবেলা খাবার না খাওয়ার জন্য অনুরোধ করছি। যারা জাতিকে খাবারের জোগান দেন তারা ক্ষুধার্ত থাকেন। কারণ সরকারের কৃষক বিরোধী পদক্ষেপ। আমি সকলকে অনুরোধ করছি ওই দিন রান্না না করতে এবং কৃষকদের সঙ্গে যোগ দিতে।

উল্লেখ্য, পুলিশি বাধা উপেক্ষা করে ২৭ নভেম্বর হাজার হাজার কৃষক দিল্লি প্রবেশ করতে চাইলে পুলিশ ব্যারিকেড দেয়। বাধা অতিক্রম করে কৃষকরা রাজধানীতে ঢুকতে চাইলে তাদের ওপর লাঠিচার্জ এবং জলকামান ব্যবহার করা হয়। এ সময় পুলিশের সঙ্গে কৃষকদের সংঘর্ষ হয়।

একপর্যায় তারা ট্রাক্টরসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণ নিয়ে সিংঘু, তিরকি, ইউপি গেট এবং চিল্লা সীমান্তে অবস্থান নেন। প্রবল শৈত্যপ্রবাহকে অগ্রাহ্য করেই চলছে তাদের আন্দোলন। ২১ ডিসেম্বর আন্দোলন ২৬তম দিনে পড়ে। এই ২৫ দিনে অন্তত ২৪ জন কৃষকের মৃত্যু হয়েছে।

মামুন ফরাজী: সাংবাদিক
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন