ভেঙে পড়েছে মাটির স্বাস্থ্য, উত্তরণের উপায় জৈবসারের ব্যবহার বৃদ্ধি

 মো. আশরাফুল আলম 
১৭ ডিসেম্বর ২০২০, ১০:২৪ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
ভেঙে পড়েছে মাটির স্বাস্থ্য, উত্তরণের উপায় জৈবসারের ব্যবহার বৃদ্ধি
মো. আশরাফুল আলম।

দেশে জৈবপদার্থের ঘাটতি রয়েছে ১ কোটি ১৬ লাখ ৪০ হাজার হেক্টর জমিতে। মাটিতে অন্ততপক্ষে ২ শতাংশ জৈবপদার্থের উপস্থিত থাকলে সেটা মোটামুটি মানের মাটি বলে ধরা হয়। তবে ন্যূনতম ৫ শতাংশ হলে সেটাকে আদর্শ মাটি বলা হয়ে থাকে। তবে অধিকাংশ জমিতে কমবেশি মাত্র ১ ভাগ জৈবপদার্থের উপস্থিত রয়েছে।

মৃত্তিকা সম্পদ ও উন্নয়ন ইন্সটিটিউট (এসআরডিআই) “ল্যান্ড ডিগ্রেডেশন ইন বাংলাদেশ” নামে একটি সমীক্ষা চালিয়েছে। সেখানে  দেশের মাটিতে জৈবপদার্থে ঘাটতি ও নানান ধরনের পুষ্টিকণাসহ অম্লমাটির পরিমাণ বৃদ্ধিসহ নানান বিষয় ফুটে উঠেছে। এটা নি:সন্দেহে দেশের কৃষি ও কৃষকদের জন্য অশনিসঙ্কেত।

দেশের কৃষিকে এই আশু বিপর্যয় থেকে একমাত্র রক্ষা করতে পারে রাসায়নিক সারের পাশাপাশি জৈবসারের ব্যবহার। ছয় দশক আগে যখন রাসায়নিক সারের ব্যবহার শুরু হয় তখন হেক্টরপ্রতি এর মাত্রা ছিল ৮ দশমিক ৮ কেজি। বর্তমানে ৭৫ গুণ বেড়ে হেক্টরপ্রতি প্রায় ৬৬০ কেজি রাসায়নিক সার ব্যবহার হচ্ছে। রাসায়নিক সারের এ বিপুল ব্যবহার কখনও কখনও স্থানীয় সার বিক্রেতার পরামর্শে কিংবা নিজ উদ্যোগেই বাড়ানো হয়েছে। এতে সাময়িকভাবে বিপুল পরিমাণ খাদ্য উৎপাদন বেড়ে গেলেও অপপ্রয়োগের ফলে জমির স্বাস্থ্য ও উর্বরতা শক্তি হ্রাস পেয়েছে বহুগুণ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো থেকে ফসলি জমির ঊর্বরতার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, দেশে ৩০টি কৃষি অর্থনৈতিক অঞ্চলের জৈবপদার্থের পরিমাণ অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে। একটা সময় ছিল যখন পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ এবং মানব স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয় গুণগতমানকে খুব কম বিবেচনা করে মাটির উৎপাদনশীলতায় অবদান রাখে এমন গুণগতমানের বৈশিষ্ট্যাবলী রক্ষায় কাজ করা হতো। কিন্তু সেই ধারণা ছিল ভুল। সামগ্রিক ইকোসিস্টেম ঠিক রাখতে মাটি অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। নিরপদ মাটি নিরাপদ এবং পুষ্টিকর খাদ্যোৎপাদন করার পাশাপাশি নানা ধরনের পরিবেশ দূষণ থেকে রক্ষা করে আসছে।

বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক সারের ব্যবহার এবং কম পরিমাণ জৈবসার ব্যবহারে মাটির অবক্ষয় হয়। এতে করে ফসলের ফলন হ্রাস, পুষ্টিমাণ হ্রাস এবং উপকরণ ব্যবহারের দক্ষতা হ্রাসের মাধ্যমে খাদ্য সুরক্ষাকে সরাসরি প্রভাবিত করে। মানুষের খনিজ সরবরাহের প্রধান উৎস হল ফসল। আর সেটা আসে গাছ তদোপুরি মাটি থেকে। এ পর্যন্ত  ৪৯টি পুষ্টি উপাদান মানুষের শরীরবৃত্তীয় কার্যক্রম সম্পাদন করতে পারে বলে চিহ্নিত করা গেছে। মাটি থেকে যে খনিজগুলো শোষণ করে, মানুষ সরাসরি তা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে বা প্রাণীকে খাওয়ানো হয়; যা পরে মানুষের খাদ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। 

আবার মানুষের অন্ত্রে নানান ধরনের অনুজীব রয়েছে। এসব অনুজীবসমূহ নিদিষ্ট ধরনের অনুপুষ্টিনির্ভর করে। সেইসব অনুজীবসমূহ যথাযথ পুষ্টি না পেলে তাদের কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এতে দীর্ঘমেয়াদে শরীরবৃত্তীয় কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয় এবং পর্যায়ক্রমে ব্যাপক ঘাটতি দেখা দিলে তা রোগ আকারে প্রকাশ পায়। তাই বিজ্ঞানীরা মাটির স্বাস্থ্যের সাথে মানুষের স্বাস্থ্যের যে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে সেটা সুনিপুণভাবে চিহ্নিত করতে পেরেছেন।

দেশে জৈব উৎসের সার কোথায় পাওয়া যাবে বা কৃষকদের পক্ষে আদৌ এটা গ্রহণ করা সম্ভব হবে কিনা- সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে জৈবসারের উৎসসমূহের যথার্থতা যাচাই করা হয়। এতে দেখা গেছে যে, শহরাঞ্চলের জৈব বর্জ্য, গবাদিপশুর বর্জ্য, গৃহস্থালির আবর্জনা, কাঁচাবাজারের বর্জ্য, চিনিকলের জৈবসার উৎপাদন সম্ভব।

জৈবসার উৎপাদনের প্রক্রিয়া এখনও প্রাচীন, অর্থাৎ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কোনোরকম যত্ন ছাড়াই খোলা জায়গায় স্তূপাকারে ফেলে রেখে এদের কম্পোস্ট করা হয়, এর ফলে জৈবসারের থাকা পুষ্টি উপাদান কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থকে। পাশাপাশি সঠিকভাবে কম্পোস্ট না করে প্রয়োগ করলে মাটি ও ফসলের ক্ষতি হতে পারে। তবে আশার কথা হল- সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি ছোট-বড় কোম্পানি বাণিজ্যিকভাবে জৈবসার উৎপাদন করছে, এদের সংখ্যা প্রায় ৫০টি। এর মধ্য এসিআই লিমিটেডের মতো দেশীয় বৃহত্তম কোম্পানিও জৈবসার উৎপাদন করছে। তবে উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের জটিলতার কারণে বর্তমানে প্রায় ১৫টি কোম্পানি তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এমনকি এ খাতে বিনিয়োগ করার জন্য নতুন নতুন উদ্যোক্তাও এগিয়ে আসছে।

তবে একসাথে এই বিপুল পরিমাণ জৈবসার উৎপাদন ও ব্যবহারের সক্ষমতা হয়ত রাতারাতি হবে না। এ প্রক্রিয়াটি উৎসাহিত করার জন্য এ মুহূর্তে প্রয়োজন কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ। পাশাপাশি এর উৎপাদন, সরবরাহ ও ব্যবহার বিষয়ক একটি সুষম কাঠামো তৈরি করা দরকার; যা দীর্ঘমেয়াদি ও ভবিষ্যতে জৈবসারের ব্যবহার স্থিতিশীল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

রাসায়নিক সারের উৎপাদনের জন্য বড় বড় শিল্প-কারখানা বিশাল বিনিয়োগ করে স্থাপন করা হলেও জৈবসার উৎপাদন ও বিপণনের কোনো স্থায়ী কাঠামো নেই। যদিও দেশে ইতোমধ্যে এসিআই ফার্টিলাইজারসহ বেশ কয়েকটি বৃহৎ কোম্পানি এ ব্যবসায় সম্পৃক্ত হয়েছে, এরা বছরে প্রায় পঞ্চাশ হাজার টন জৈবসার জোগান দিতে সক্ষম। এদের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য উৎপাদন পর্যায়ে যেমন- মিউনিসিপ্যালিটিস কর্তৃক বিনামূল্যে জৈব-বর্জ্য সরবরাহ, সরকারি ফান্ড হতে ঋণ, কর মওকুফ, বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার প্রকল্প, উৎপাদন প্লান্ট তৈরিতে সহজ লিজ ব্যবস্থা ও বিপণনে প্রণোদনা দেয়া যেতে পারে। দেশে বেশ কিছু মাঝারি ধরনের বিনিয়োগকারী থাকলেও এদের কারিগরি জ্ঞানের অভাব রয়েছে। এদের শক্তিকে কাজে লাগিয়েও সক্ষমতা বাড়িয়ে জৈবসার ব্যবহার ব্যাপকভাবে বাড়ানো যাবে।

জৈবসার মাটিতে জৈবপদার্থের ঘাটতি পূরণ করার পাশাপাশি গাছকে সহজে পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করতে সহযোগিতা করে। রাসায়নিক সারের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে; ফলে ২৫ ভাগ রাসায়নিক সার কম লাগে। এছাড়াও মাটিতে পানির ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি করে সেচ খরচ কমায়। এসিআই ফার্টিলাইজারসহ দেশের অনেক জৈবসার উৎপাদনকারী এখন জৈবসার উৎপাদনে ট্রাইকোডার্মা ব্যবহার করছে। এতে ফসলে মাটিবাহিত রোগ কম হয়। প্রয়োজনের তুলনায় জৈবসারের কাঁচামাল কম, তবে প্রণোদনার আওতায় আনা হলে কাঁচামালের জোগান আরও বেড়ে যাবে। কারণ পশুপালন, মৎস্য চাষ, আগাছা বা সামুদ্রিক আগাছা সংগ্রহে নতুন নতুন উদ্যোক্তা আসবে। এটা একটা ক্ষুদ্র শিল্পে পরিণত হবে।

লেখক: মো. আশরাফুল আলম, পরিবেশ কর্মী ও সভাপতি, আর্থকেয়ার ক্লাব।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন