যুক্তরাষ্ট্রে নতুন ইতিহাস গড়তে চেয়েছিলেন যে কৃষ্ণাঙ্গ নারী

 অনলাইন ডেস্ক 
১৪ ডিসেম্বর ২০২০, ০৩:২৪ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন ইতিহাস রচনা করতে চেয়েছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ নারী শার্লি চিসম।

১৯৭২ সালে তিনি প্রথমবারের মতো নারী প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন চেয়েছিলেন। তার প্রত্যাশা ছিল– দলীয় মনোনয়ন পেলে দেশটির প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে নতুন এক ইতিহাস গড়বেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ইতিহাসে তিনিই প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী, যিনি কোনো প্রধান রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন জেতার লড়াইয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। খবর বিবিসির।

১৯৭২ সালে নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে এক ব্যাপ্টিস্ট চার্চে তার সমর্থকদের সামনে এসে দাঁড়ালেন ওই কৃষ্ণাঙ্গ নারী। কংগ্রেস সদস্য শার্লি চিসম সেদিন এমন এক ঘোষণা দিলেন, যাতে চমকে গেলেন যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ।

সমর্থকদের তুমুল করতালিতে ঢাকা পড়ে যাচ্ছিল শার্লি চিসমের ঘোষণা। তিনি বলেন, আজ আমি এখানে আপনাদের সামনে দাঁড়িয়েছি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মনোনয়ন চাইতে।

শার্লি চিসম তার ঘোষণায় বলেন, আমি কালো আমেরিকানদের প্রার্থী হওয়ার জন্য ভোটে দাঁড়াইনি, যদিও আমি একজন কৃষ্ণাঙ্গ এবং সে জন্য আমি গর্বিত।

আমি এ দেশের নারী আন্দোলনের প্রার্থী নই, যদিও আমি একজন নারী এবং সেটি নিয়েও আমি সমানভাবে গর্বিত। আমি কোনো রাজনৈতিক প্রভু কিংবা ধনীদের বা বিশেষ রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর হয়েও নির্বাচনে দাঁড়াইনি। আমি হচ্ছি– আমেরিকার জনগণের প্রার্থী। আজকে আপনাদের সামনে আমার উপস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন যুগের প্রতীক হতে যাচ্ছে।

শার্লি চিসম প্রার্থী হতে চান বলে ঘোষণা দেয়ার পর রীতিমতো হইচই পড়ে গিয়েছিল। এই ঐতিহাসিক ঘটনা ও শার্লি চিসমের আরও অনেক ঘটনার সাক্ষী ছিলেন সাবেক মার্কিন কংগ্রেসম্যান চার্লস র‌্যাংগেল।

তিনি বলেন, শার্লি চিসম যেন ছিলেন একটা আগুনের গোলা, এক অসাধারণ নারী। তিনি ছিলেন প্রথম আফ্রিকান-আমেরিকান, যিনি বহু তাক লাগানো রাজনৈতিক সাফল্য অর্জন করেছিলেন।

চার্লস র‌্যাংগেল প্রথম শার্লি চিসমকে দেখেছিলেন ১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি। তখন চার্লস র‌্যাংগেল নিউইয়র্ক রাজ্যসভায় সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।

তার সঙ্গে একান্তে দেখা করা কঠিন ছিল। যখনই তার সঙ্গে দেখা হতো, তাকে ঘিরে থাকতেন অনেক মানুষ। তিনি ছিলেন খুবই গতিশীল, খুবই বাকপটু। আমি যখন প্রথম তার সাক্ষাৎ পাই, ততদিনে তিনি জাতীয় পর্যায়ে সুপরিচিত এক ব্যক্তিত্ব।

শার্লি চিসম ছিলেন কংগ্রেসে নির্বাচিত প্রথম আফ্রিকান-আমেরিকান নারী। ১৯৬৮ সালে তিনি কংগ্রেস সদস্য নির্বাচিত হন। রাজনীতিতে নামার আগে তিনি ছিলেন শিক্ষক। তার মা ও বাবা- দুজনেই ছিলেন ক্যারিবিয়ান। একবার এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেই জানিয়েছেন দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে তার বেড়ে ওঠার কাহিনি।

চার্লস র‌্যাংগেল বলেন, যে অবস্থান থেকে উঠে এসে শার্লি চিসম প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হতে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামলেন, তার চেয়ে প্রতিকূল অবস্থা আর কিছু হতে পারে না। কারণ একদিকে তিনি কৃষ্ণাঙ্গ, আরেক দিকে তিনি নারী। শার্লি চিসম তার প্রচারাভিযানে দরিদ্র মানুষ, সংখ্যালঘু মানুষ, সমকামী ও নারীদের এবং যুক্তরাষ্ট্রের অন্য প্রান্তিক মানুষের স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

চার্লস র‌্যাংগেল বলেন, শার্লি চিসমের ব্যক্তিত্বের একটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল– তার অদম্য প্রাণশক্তি। তিনি কখনও হাল ছেড়ে দেননি। যারা মনে করতেন সফল হতে পারবে না; তিনি তাদের জন্য প্রজ্বলিত মশাল হাতে এগিয়ে গেছেন।

নিজের দুর্ভোগ নিয়ে তিনি কখনও অভিযোগ করেননি। সব প্রতিকূলতার মধ্যেও মুখের হাসি ধরে রেখেছেন। তিনি ছিলেন যে কোনো মানুষের জন্য অনুপ্রেরণা। তিনি ছিলেন শারীরিকভাবে ছোটখাটো এক নারী, কিন্তু তিনি তার কাঁধে আর পিঠে গর্বের সঙ্গে বহন করছিলেন বিরাট এক দায়িত্ব। তিনি দেখতে যতই ছোটখাটো হোন না কেন, তিনি ছিলেন অসম্ভব শক্তিশালী ও খুবই গর্বিত এক নারী।

এর পর শ্বেতাঙ্গ এবং কৃষ্ণাঙ্গ- উভয়ের তরফ থেকে বিরোধিতার মুখে পড়লেন। প্রচারাভিযানে নেমে শার্লি চিসম উপলব্ধি করলেন, তার পেছনে মোটেই সমর্থন নেই।

তিনি এবং চার্লস র‌্যাংগেল- তারা দুজনেই ছিলেন কংগ্রেসের কৃষ্ণাঙ্গ সদস্যদের এক ককাস বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। কিন্তু এই ককাসের বেশিরভাগ সদস্য সমর্থন দিলেন শার্লি চিসমের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের।

চার্লস র‌্যাংগেল জানান, কংগ্রেস সদস্যদের সঙ্গে তার সমস্যা তৈরি হয়েছিল। তিনি যখন এসব কংগ্রেস সদস্যের এলাকায় যাচ্ছিলেন, তখন এরা তাকে সেভাবে স্বাগত জানাচ্ছিলেন না। শার্লি চিসমের মনে হয়েছিল, তাকে এরা শ্রদ্ধা করছে না।

কংগ্রেসের কৃষ্ণাঙ্গ সদস্যদের ককাসও শার্লি চিসমকে সমর্থন দেয়নি।

চার্লস র‌্যাংগেল বলেন, আমাদের কোনো ধারণাই ছিল না যে, শার্লি চিসম যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করবেন। আমরা যখন বিভিন্ন প্রার্থীকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়ে ফেলেছি, তার পর আমরা শার্লি চিসমের কথা জানতে পারি। একই সঙ্গে একজন কৃষ্ণাঙ্গ এবং নারী হওয়াটা নিশ্চয়ই এক বিরাট সুবিধা, কিন্তু সব নারী বা সব কৃষ্ণাঙ্গ কিন্তু তাকে ভোট দেননি।

শার্লি চিসম কিছু রাজ্যের প্রাইমারিতে বেশ জোরালো সমর্থনই পেয়েছিলেন। মোট ১৫১ ডেলিগেটের সমর্থন পান তিনি। ফলে তিনি ১৯৭২ সালে মিয়ামিতে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির জাতীয় সম্মেলনের মঞ্চ থেকে বক্তৃতা দেয়ার সুযোগ পান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মনোনয়ন তিনি পাননি।

শার্লি চিসম পরে বলেছিলেন, জেতার কোনো আশা নেই, এ কথা জানার পরও যে, তিনি প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন। তিনি কতটা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সেটি দেখাতে এবং বিদ্যমান ব্যবস্থা যে তিনি মানেন না, সেটি জানাতে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন-২০২০