বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের রেকর্ড স্ফীতি ও বিবিধ প্রসঙ্গ

 এম এ খালেক 
২৮ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বব্যাপী ক্রমসম্প্রসারমান করোনাভাইরাস দ্বিতীয় ঢেউ বা সেকেন্ড ওয়েভ অতিক্রম করছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা আগেই বলেছিলেন, শীত মৌসুমে করোনাভাইরাসের সংক্রমণে নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে। তাদের সেই ভবিষ্যদ্বাণী সত্য বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। পশ্চিমা শীতপ্রধান দেশগুলোর কোনো কোনোটি নতুন করে লকডাউন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।

বিমান চলাচল এবং জনচলাচল সীমিত করেছে। করোনা সংক্রমণের ফার্স্ট ওয়েভ বা প্রথম ঢেউয়ের আঘাত এখনও বিশ্ব অর্থনীতি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এ অবস্থায় সেকেন্ড ওয়েভ শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যেই করোনা সংক্রমণের কারণে যে ক্ষতি হয়েছে, তা বিশ্ব অর্থনীতিকে অন্তত দশ বছর পিছিয়ে দিয়েছে।

এ অবস্থায় নতুন সংক্রমণের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, তা ভেবে অর্থনীতিবিদরা পেরেশান। করোনার কারণে বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতি সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছে। সরকার নানাভাবে করোনার ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে; কিন্তু এক্ষেত্রে অর্জন খুব একটা সুখকর নয়। অর্থনীতির অধিকাংশ সূচকেই নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে।

তবে করোনাকালীন অর্থনৈতিক বিপর্যয় সত্ত্বেও বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের বিস্ময়কর স্ফীতি লক্ষ করা যাচ্ছে। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪২ বিলিয়ন (চার হাজার দুইশত কোটি) মার্কিন ডলার।

বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের এ অস্বাভাবিক স্ফীতি নিয়ে কর্তৃপক্ষীয় পর্যায়ে নানা ধরনের সাফল্যের কাহিনী বয়ান করা হচ্ছে। কিন্তু আমাদের একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ স্থায়ী কিছু নয়। এটা অত্যন্ত ভঙ্গুর এবং যে কোনো সময় রিজার্ভের পরিমাণ হ্রাস পেতে পারে।

সরকার বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ থেকে ঋণ গ্রহণ করে উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন করার চিন্তাভাবনা করছে বলে জানা গেছে। কিন্তু যে কোনো উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নের বিষয়টি অত্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি একটি কার্যক্রম। চাইলেও হঠাৎ করেই উন্নয়ন প্রকল্প থেকে অর্থায়ন ফেরত আনা যাবে না। তাই এ ক্ষেত্রে অর্থায়নের বেলায় কিছুটা হলেও চিন্তাভাবনা করার দরকার আছে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, একটি দেশের ৩ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর মতো রিজার্ভ থাকলে তাকে সন্তোষজনক বলে মনে করা যেতে পারে। বাংলাদেশের বর্তমান রিজার্ভ দিয়ে ৮-৯ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। তাই বৈদেশিক মুদ্রা স্থবির আকারে জমিয়ে না রেখে তা বিনিয়োগ বা উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার করা যেতেই পারে।

কিন্তু সে ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কোনো কারণে বিপর্যয় দেখা দিলে পুরো অর্থনীতির ওপর তার দায়ভার চেপে বসতে পারে।

স্ফীত বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ নিয়ে সব সময় গর্ব করা যায় না। অকারণে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ স্ফীত হলে তাতে উল্লসিত হওয়ার পরিবর্তে শঙ্কিত হওয়াটাই স্বাভাবিক। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, কোনো দেশের অর্থনীতির সেটাই সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত অবস্থা- যেখানে পর্যাপ্ত পরিমাণে বিনিয়োগ হবে; বিশেষ করে ব্যক্তি খাতে এ বিনিয়োগ হতে হবে।

একই সঙ্গে স্ফীত রিজার্ভও সংরক্ষিত থাকবে। কারণ বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ একটি দেশের এক্সটার্নাল অ্যাসেট হিসেবে বিবেচিত হয়। বিদেশি উন্নয়ন সহযোগী এবং ঋণদানকারী সংস্থাগুলো একটি দেশে ঋণদানের ক্ষেত্রে সেই দেশের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের অবস্থা বিশেষভাবে বিবেচনায় রাখে। তারা দেখতে চায়, দেশটি তাদের দেয়া ঋণের অর্থ বা কিস্তি সঠিক সময়ে পরিশোধের সামর্থ্য রাখে কিনা।

তাই স্ফীত বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ থাকাটা খারাপ নয়। বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও কোনো দেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পর্যবেক্ষণ করে থাকে। স্ফীত বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পাশাপাশি যদি ব্যক্তি খাতে বিপুল পরিমাণে বিনিয়োগ হয়, তাহলে সেটাই একটি দেশের জন্য সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত অবস্থা বলে মনে করা যেতে পারে।

এমন কী তুলনামূলক স্বল্প রিজার্ভ ও পর্যাপ্ত বিনিয়োগও কাম্য হতে পারে। কারণ এ অবস্থায় দেশটির ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভাবনা লক্ষ করা যায়। কিন্তু বিনিয়োগবিহীন স্ফীত রিজার্ভ কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। এ অবস্থা একটি দেশের অর্থনীতির স্থবিরতারই লক্ষণ।

বাংলাদেশের বর্তমান স্ফীত বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভকে আমরা কী হিসেবে আখ্যায়িত করব? গত কয়েক বছর ধরেই ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ কার্যত স্থবির হয়ে আছে। বিনিয়োগকারীরা নতুন বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কেমন যেন দ্বিধান্বিত। তারা নতুন করে বিনিয়োগ করতে চাইছেন না। ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণের স্থবিরতা চলছে অনেক দিন ধরেই।

বাংলাদেশের মতো একটি পুঁজি সংকটপূর্ণ দেশের জন্য এ অবস্থা কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়। এখন প্রশ্ন হল, বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ এভাবে স্ফীত হচ্ছে কেন? আমরা যদি লক্ষ করি, তাহলে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ অস্বাভাবিকভাবে স্ফীত হওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ খুঁজে পাওয়া যাবে।

প্রথমত, করোনাকালেও প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রেরিত রেমিটেন্সের প্রবৃদ্ধি অব্যাহত আছে। অর্থবছরের প্রথম ৫ মাসে রেমিটেন্স প্রবৃদ্ধি হয়েছে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৪২ শতাংশ। প্রবাসী বাংলাদেশিদের অনেকেই স্থানীয়ভাবে কর্মচ্যুত হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন।

তারা বিদেশে সঞ্চিত অর্থ একযোগে দেশে নিয়ে এসেছেন। এছাড়া করোনার কারণে স্থানীয় বেনিফিশিয়ারিদের অর্থ চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে আগের তুলনায় তাদের বেশি অর্থ দেশে প্রেরণ করতে হচ্ছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক গত অর্থবছর থেকে প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রেরিত অর্থের ওপর ২ শতাংশ নগদ আর্থিক প্রণোদনা দিচ্ছে।

এ কারণে ব্যাংকবহির্র্ভূত চ্যানেলে রেমিটেন্স আসা অনেকটাই কমে গেছে। বেশি পারিমাণে রেমিটেন্স আসার কারণে সেই অর্থ বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভে যুক্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে সাধারণ ভোগ্য পণ্য ও নিত্য ব্যবহার্য পণ্য আমদানি অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে। শিল্পে ব্যবহার্য কাঁচামাল এবং ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আমদানিও সীমিত হয়ে পড়েছে।

এছাড়া করোনাকালীন বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান ছাড়করণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব কারণে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ এভাবে স্ফীত হচ্ছে।

বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার যে রিজার্ভ লক্ষ করা যাচ্ছে, তা স্বাভাবিক নয়। অর্থনীতি আবার পূর্ণমাত্রায় সচল হয়ে উঠলে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের ওপর চাপ বৃদ্ধি পাবে। জনশক্তি রফতানি খাত থেকে যে রেমিটেন্স আয় হচ্ছে, তা যে কোনো বিচারেই আমাদের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।

বর্তমানে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত হচ্ছে জনশক্তি রফতানি খাত। কিন্তু এক অর্থে এ খাত পণ্য রফতানি খাতের চেয়েও বেশি সম্ভাবনাময়। কারণ পণ্য রফতানি খাতে যে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়, তার প্রায় ৩৬ শতাংশই শিল্পে ব্যবহার্য কাঁচামাল ও ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আমদানি বাবদ দেশের বাইরে চলে যায়।

কিন্তু জনশক্তি রফতানি খাত থেকে যে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়, তার প্রায় শতভাগ স্থানীয় অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজন করে। এছাড়া এ খাত অন্তত ১ কোটি ২৫ লাখ বাংলাদেশির বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রেরিত কষ্টার্জিত রেমিটেন্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ স্ফীত করছে।

কিন্তু বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে স্থানীয় সুবিধাভোগীরা যে অর্থ হাতে পাচ্ছে, তা কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে; তা নিয়ে আমাদের তেমন কোনো চিন্তাভাবনা নেই।

আহরিত রেমিটেন্সের বেশিরভাগই স্থানীয় বেনিফিশিয়ারিরা জমি ক্রয়, বাড়ি নির্মাণ, আসবাবপত্র ক্রয় এবং অন্যান্য সাংসারিক ব্যয় নির্বাহের জন্য ব্যবহার করে থাকেন। এ অর্থ তারা যদি লাভজনক উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করতেন, তাহলে তা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজে লাগত। সৌন্দর্যমণ্ডিত সুগন্ধি ফুল দেখে মানুষ মুগ্ধ হয়। কিন্তু ফুলের আসল উদ্দেশ্য বা চূড়ান্ত লক্ষ্য থাকে বীজ উৎপাদনের মাধ্যমে বংশবিস্তার করা।

ঠিক একইভাবে আহরিত রেমিটেন্সের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত- এটাকে ব্যবহার করে কীভাবে নিজ সংসারের আয় বৃদ্ধি ও একই সঙ্গে জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখা যায়। স্থানীয় বেনিফিশিয়ারিদের রেমিটেন্স বিনিয়োগে বাধ্য করা যাবে না। আইন করেও তাদের বিনিয়োগ করতে বাধ্য করা যাবে না। এ জন্য দেশে কার্যকর বিনিয়োগ উপযোগী পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।

বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তাদের নানা ধরনের রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা যেতে পারে। দেশের বিভিন্ন স্থানে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। প্রয়োজনে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য প্রতি জেলায় অন্তত একটি করে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন করা যেতে পারে।

এম এ খালেক : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন