রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পের কেন এ হাল

 মুঈদ রহমান 
২৭ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

যে কোনো পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে ব্যক্তি খাতের প্রাধান্য থাকলেও রাষ্ট্রায়ত্ত খাত বিলুপ্ত হয়ে যায় না। সেখানে ব্যক্তি খাতের প্রভাব বাড়ে সম্প্রসারণের মাধ্যমে। আমাদের দেশে বরাবরই চেষ্টা করা হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের বিলোপসাধন করে ব্যক্তি খাতের পরিধি বাড়ানোর। আর রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বন্ধের ক্ষেত্রে একটিই অজুহাত দেখানো হয় এবং তা হল লোকসান। কেন লোকসান, কতটা লোকসান বা সেই লোকসান থেকে উত্তরণের কোনো পথ খোঁজার চেষ্টা না করে সরাসরি বন্ধ করে দেয়ার ফরমান জারি করা হয়। করোনা মহামারীর মধ্যে যেখানে শ্রমিকদের আর্থিক অবস্থা চরমে পৌঁছে গেছে, সেখানে ২ জুলাই সারা দেশে একযোগে ২৫টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

ফলে ২৫ হাজার স্থায়ী এবং ২৫ হাজার অস্থায়ী শ্রমিকের রুটিরুজির পথ বন্ধ হয়ে গেছে। এই ৫০ হাজার শ্রমিক মানে পরিবার হিসেবে প্রায় ২ লাখ মানুষ। বন্ধ করার কারণ একটাই- লোকসান। সরকারি ভাষ্যমতে, বিগত ৪৮ বছরের মধ্যে ৪৪ বছরই নাকি মিলগুলো লোকসান গুনেছে। তাই এগুলোকে ব্যক্তি মালিকানায় ছেড়ে দিতে হবে। কোথাও লাভের আশা না থাকলে তো ব্যক্তি খাত এগোয় না? তাহলে নিশ্চয়ই এখানে লাভের আশা আছে। তা-ই যদি থাকে, তাহলে তো সরকারই লোকসানের কারণগুলো খুঁজে মিলগুলো চালু রাখতে পারত। কিন্তু তা হওয়ার নয়। কারণ পাটকলগুলো বিপুল সম্পদের অধিকারী। সেগুলোকে নামমাত্র দামে কিনতে পারলে ব্যক্তিগত লাভের পরিমাণ হবে পাহাড় সমান।

সহজসরল শ্রমিকদের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল কর্মের সুযোগ দেয়ার। কিন্তু ৬ মাস পেরিয়ে গেলেও কর্ম রয়ে গেছে অধরা। অথচ স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সচেতন বিশ্বে পাটের বহুমাত্রিক ব্যবহারের চাহিদা দিনকে দিন বাড়ছে। বন্ধ করার ক্ষেত্রে যেসব দোহাই দেয়া হয়েছে, যেমন- আধুনিকায়ন, ডাইভারসিফিকেশন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, মেশিনারিজ ব্রেকডাউন, মেশিনের দক্ষতা হ্রাস ইত্যাদি সবকিছুর সমাধান কি সরকারের অধীনে করা যেত না? আর দুর্নীতি ও অনিয়মের কথা বলা হলে বলতেই হয় যে এসব অপকর্মের সঙ্গে সাধারণ শ্রমিকদের কোনো সম্পর্ক নেই। একেবারে যদি সাধারণ হিসাবে আসি তাহলে বলা যায়, গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের নামে যে ৫০০০ কোটি টাকা প্রদানের সিদ্ধান্ত হয়, তার পরিবর্তে মাত্র ১০০০ কোটি থেকে ১২০০ কোটি টাকা খরচ করলে মিলগুলোকে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় চালু রাখা যেত।

পাটকলের পর এবারের টার্গেট চিনিকল। কারণটা আগের মতোই- লোকসান। রাষ্ট্রায়ত্ত ১৫টি চিনিকলের মধ্যে এ মাসে ছয়টি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প কর্পোরেশনের নির্দেশে বন্ধ হয়ে যাওয়া মিলগুলো হল- শ্যামপুর, পাবনা, রংপুর, পঞ্চগড়, কুষ্টিয়া ও সেতাবগঞ্জ চিনিকল। এই ছয় মিলে কর্মরত ছিলেন ২ হাজার ৮৮৪ জন শ্রমিক-কর্মকর্তা। অর্থাৎ প্রায় ৩ হাজার পরিবার এখন রাস্তায় বসে পড়েছে। পাটকল ও চিনিকলের সাম্প্রতিক অবস্থান নিয়ে ত্রৈমাসিক সর্বজন কথা একটি সরেজমিন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনটি চিনিকল নিয়ে বিকল্প ভাবনার সুযোগ করে দিয়েছে। সরকার লোকসানের অজুহাতে ঢালাওভাবে চিনিকলগুলো বন্ধ না করে এর কারণ অনুসন্ধান করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে সমাধানের একটা পথ খুঁজতে পারে।

সামগ্রিক চাহিদার কথা বিবেচনা করা হলে আমাদের চিনিশিল্পের এহেন নাজুক অবস্থা হওয়ার কথা নয়। প্রতিবছর গড়ে আমরা প্রায় ২২ লাখ টন অশোধিত চিনি আমদানি করে থাকি। তারপর আবার প্রতিবছরই প্রায় ১৫ শতাংশ চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর কারণ হল, বছর শেষে প্রায় ২০ লাখ মানুষ মধ্যবিত্তে প্রবেশ করে। সাধারণত ৩০ হাজার থেকে ৩৫ হাজার মাসিক আয়ের মানুষকে মধ্যবিত্ত ধরা হয়। অথচ আমাদের চিনিকলগুলোর মোট উৎপাদন ক্ষমতা মাত্র ২ লাখ টন হলেও প্রকৃত উৎপাদন ১ লাখ টনেরও কম। তারপরও হাজার হাজার টন উৎপাদিত চিনি অবিক্রীত অবস্থায় গুদামে পড়ে আছে। কিন্তু আমদানি বিকল্প হিসেবে এ শিল্পকে একটি যৌক্তিক স্তরে নিয়ে যাওয়া যেত।

আমাদের চিনি শিল্পের প্রধান ও অন্যতম সমস্যা হল উৎপাদন খরচ। প্রতি কেজি চিনি উৎপাদনের খরচ আকাশচুম্বী। ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণের সুদ এ খরচ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। রংপুর চিনিকলের ব্যাংক ঋণ আছে ১৫৮ কোটি টাকা। তাই সুদসহ প্রতি কেজি উৎপাদন খরচ পড়েছে ৩১১ টাকা ৯৭ পয়সা। সেই চিনি বিক্রি করা হয়েছে মাত্র ৫৩ টাকা ৩৫ পয়সা কেজি দরে। ভাবতে পারেন লোকসানের পরিমাণ! একইভাবে পঞ্চগড় মিলে কেজিপ্রতি উৎপাদন খরচ ৩০২ টাকা, কুষ্টিয়ায় ২৭৩ টাকা, শ্যামপুরে ২৬২ টাকা, সেতাবগঞ্জে ২৪৯ টাকা এবং পাবনায় ১৭৮ টাকা। উৎপাদন খরচের ২০ শতাংশ দাম নির্ধারণ করেও চিনি বিক্রি করা যাচ্ছে না, কারণ সে দামও খোলাবাজারের চেয়ে ১০ টাকা বেশি এবং খোলাবাজারের চিনি বাহ্যিকভাবে দেখতে সুন্দর। তাই বছরের পর বছর সরকারি মিলের গুদামে চিনি স্তূপীকৃত হচ্ছে।

কিন্তু এতটা খরচের কারণ কী? প্রথমত, মিলগুলো সারা বছর উৎপাদন কাজ পরিচালনা করতে না পারলেও তাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-বোনাস পরিশোধ করতে হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কুষ্টিয়া সুগার মিলে ২০০৬-২০০৭ অর্থবছরে মাড়াই দিবস ছিল ১৪২ দিন। আর ২০১৮-১৯ মৌসুমে তা নেমে এসে দাঁড়ায় মাত্র ৬৯ দিনে। এ অবস্থা সব মিলেই। আখের দাম নিয়মিত ও নিয়মমাফিক পরিশোধ না করায় কৃষক চিনিকলে আখ সরবরাহ করার চেয়ে তা গুড় প্রস্তুতকারকদের কাছে সরবরাহে উৎসাহবোধ করে বেশি। কর্মদিবস কমে যাওয়ার আরেকটি কারণ হল মিলগুলোয় পণ্য বহুমুখীকরণের সুযোগ নেই। চিনির পাশাপাশি অ্যালকোহল, স্যানিটাইজার, জীবাণুনাশক, বায়োগ্যাস, জৈব সার ইত্যাদি তৈরির কোনো আয়োজন নেই।

দ্বিতীয়ত, আখ থেকে আমরা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় চিনি আহরণ করতে পারছি না। প্রতি ১০০ কেজি আখ থেকে আমরা গড়ে ৪-৫ কেজি চিনি আহরণ করতে পারি। অথচ ভারত কিংবা ব্রাজিলে এই আহরণের পরিমাণ ১৫ কেজির কম নয়। কম আহরণের একটি কারণ হল আখ কাটার পর তা মাড়াই করতে বিলম্ব করা। যত বেশি বিলম্ব হবে, ততই রস কমতে থাকবে। দূরত্ব এবং মিলগেটে দিনের পর দিন পড়ে থাকাটা একটা কারণ। অন্য কারণটি হল ভালো জাতের আখ চাষ না করা এবং এ বিষয়ে কৃষকদের প্রশিক্ষণ না দেয়া। আর কৃষক ভালো জাতের আখচাষে উৎসাহী নন এ কারণে যে, সব আখেরই স্থির দাম নির্ধারণ করা আছে। আখের গুণভেদে দাম নির্ধারিত থাকলে সেদিকে হয়তো কৃষকের নজর পড়ত। আরেকটি কারণ হল মাড়াইকলের দক্ষতার অভাব। অনেক পুরনো হওয়ায় মেশিনের আহরণ ক্ষমতা কমে গেছে।

তৃতীয়ত, ঋণের সুদজনিত কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। ২০০৬-০৭ অর্থবছরে সুদের পরিমাণ ছিল মোট উৎপাদন খরচের মাত্র ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। সেই খরচ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭ শতাংশে। এটা গড় সুদ খরচ। পঞ্চগড় মিলে তা উৎপাদনের ৪৪ শতাংশ এবং সবচেয়ে কম হল কেরু অ্যান্ড কোম্পানিতে- ২১ শতাংশ। বিপণন ব্যবস্থাপনাটিও ভালো নয়। আমাদের চিনি দেখতে ভালো না হলেও গুণগত মানে তা বাজারের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের চিনির চেয়ে ভালো। কিন্তু ডিলারদের মাধ্যমে বিতরণ সুবিধা বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বাজারে দেশি চিনি সহজলভ্য নয়।

চিনিকলগুলোর সার্বিক অবস্থাকে আপনি সাদামাটা চোখে দেখলে সেগুলো বন্ধ করে দেয়ার পক্ষেই মত দেবেন। কিন্তু যারা নীতিনির্ধারক, তাদের তো সাদা চোখে দেখলে হবে না, তাদের অন্তর্দৃষ্টি থাকতে হবে। আমরা যেহেতু সমস্যা চিহ্নিত করতে পেরেছি, সেহেতু মিলগুলো বন্ধ না করেও তো এর সমাধান বের করতে পারি। তার বিপরীতে সরকারের যে সিদ্ধান্ত তা মোটেই যৌক্তিক নয়। যেমন সরকার বলছে, বেকার হয়ে যাওয়া কর্মীদের চালু মিলগুলোয় নিয়োগ দেয়া হবে। যে নয়টি মিল চালু আছে সেগুলোও তো লোকসানে আছে। সেখানে ধারণক্ষমতার একটা বিষয় আছে। এই অতিরিক্ত কর্মীর কারণে যদি মিলগুলোতে অধিকতর আর্থিক সমস্যা সৃষ্টি হয় তাহলে নতুনদের সঙ্গে পুরনোদের বিরোধ অনিবার্য। তাছাড়া ছয়টি মিল যে কারণে বন্ধ করে দেয়া হল, বাকি নয়টির অবস্থাও কমবেশি একইরকম। সুতরাং এটা কোনো সুচিন্তা নয়। তাছাড়া প্রতিটি সুগার মিলকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে স্থানীয় অর্থনীতি। গড়ে উঠেছে স্কুল-কলেজ, হাটবাজার। সেগুলোও এখন বিপাকে পড়বে। চাষীদের কথা যদি বলি, আখের দামটা থাকে পূর্বনির্ধারিত। ফলে চাষীদের অন্যান্য ফসলের দামের যে অনিশ্চয়তা থাকে, আখের বেলায় তা থাকে না। সেদিক থেকে আখচাষীদের বিপত্তি বাড়বে।

আমরা চাই না কোনো ধরনের প্রচেষ্টা কিংবা যৌক্তিক যাচাই-বাছাই ছাড়া আশাহত হয়ে কোনো রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হোক। চলমান অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতের প্রভাব থাকবে সন্দেহ নেই। কিন্তু সমাধানযোগ্য সমস্যাকে আমলে নিয়ে বিনাবাক্যে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিলুপ্তির সংস্কৃতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন