ধর্ষণ নিয়ে হইচই হয় বলাৎকারে নয়!

 শারমিন চৌধুরী 
২৬ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

‘রাঙ্গুনিয়ায় রুটিন করে মাদ্রাসাছাত্রদের প্রতিরাতে বলাৎকার করত শিক্ষক নাছির’, ‘ফরিদপুরে বলাৎকারের শিকার মাদ্রাসাছাত্রের মৃত্যু’, ‘ফেনীতে মাদ্রাসাছাত্রকে বলাৎকারের অভিযোগ’, ‘ময়মনসিংহে মাদ্রাসাছাত্রকে বলাৎকার’, ‘নায়ায়ণগঞ্জে মাদ্রাসাছাত্রকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে বলাৎকার করত শিক্ষক’-গণমাধ্যমে বলাৎকারের এমন সব খবর শিরোনাম হওয়া এখন নিয়মিত ব্যাপার এবং লক্ষ করে দেখবেন এর প্রায় সবই মাদ্রাসাকেন্দ্রিক। এমনকি সার্চ ইঞ্জিন গুগলে ‘বলাৎকার’ লিখে খোঁজ করলেও প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পাতার সব খবর বিভিন্ন মাদ্রাসার শিশু বলাৎকার প্রসঙ্গে এবং পরের পাতাগুলোর বলাৎকার সংক্রান্ত খবরের বলা চলে সিংহভাগই মাদ্রাসাকেন্দ্রিক। তাই বিশেষভাবে উদ্বেগ জাগে মাদ্রাসার মতো পবিত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কতটা নিরাপদ আমাদের শিশু-কিশোররা! বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ভয়ভীতি দেখিয়ে বা কখনও লোকলজ্জার ভয়ে বা আপসে চাপা পড়ে বলাৎকারের মতো বীভৎস অপরাধ। তনু ধর্ষণ ও হত্যা, নুসরাত হত্যা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ধর্ষণ, ফেনীর বেগমগঞ্জের নারী নির্যাতনের মতো ধর্ষণ বা নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের ঘটনায় অনেক প্রতিবাদ, বিক্ষোভ বা বিচারের দাবিতে আন্দোলন হলেও বলাৎকার নিয়ে তেমন আন্দোলন বা প্রতিবাদ চোখে পড়ে না। যদিও চাপা পড়া বলাৎকার ঘটনার মধ্যে যে কয়টি প্রকাশিত হয়, এর সংখ্যাটিও নেহায়েত কম নয়। গেল নভেম্বরেই বলাৎকারের শিকার হয়েছে ৪০ জন মাদ্রাসা শিক্ষার্থী, এর মধ্যে মারা গেছে তিনজন, আত্মহত্যা করেছে একজন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন খবরের বরাত দিয়ে এ সংখ্যাটি জানিয়েছে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ (ডিবিসি নিউজ, ৯ ডিসেম্বর)।

বলাৎকার শব্দের বাংলা আভিধানিক অর্থ ধর্ষণ বা বলপূর্বক অভিগমন বা সতীত্বনাশ। অর্থাৎ বাংলায় ধর্ষণ এবং বলাৎকার সমার্থক। কিন্তু ব্যবহারিক অর্থে ধর্ষণ এবং বলাৎকারের মধ্যে পার্থক্য হল ধর্ষণের শিকার হয় নারী বা কন্যাশিশু আর বলাৎকারের শিকার পুরুষ বা ছেলে শিশু। শুধু ব্যবহারিক অর্থেই নয়, আইনের চোখেও ধর্ষণ এবং বলাৎকার এক নয়। দণ্ডবিধির (১৮৬০) ৩৭৫ ধারায় ধর্ষণের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ‘কোনো পুরুষ ধর্ষণ করেছে বলে গণ্য হবে যদি সে নিুোক্ত কোনো পরিস্থিতিতে কোনো নারীর সঙ্গে যৌন সঙ্গম (Sexual intercourse) করে।

১. নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে

২. তার সম্মতি না নিয়ে

৩. ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে সম্মতি আদায় করে

৪. তার সম্মতিতে যখন পুরুষটি জানে যে, সে মহিলাটির স্বামী নয় এবং মহিলাটি তাকে স্বামী হিসেবে বিশ্বাস করে

৫. ১৪ বছরের নিচের কোনো নারীর সঙ্গে তার সম্মতি বা সম্মতি না নিয়েই যৌন সঙ্গম।

অর্থাৎ স্পষ্টতই ধর্ষণের সংজ্ঞায়, পুরুষ বা ছেলে শিশুর ক্ষেত্রে একই ধরনের নির্যাতন অন্তর্ভুক্ত নয়।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০-এ ধর্ষণের সংজ্ঞায়, দণ্ডবিধির ৩৭৫-এ উল্লিখিত সংজ্ঞাই প্রযোজ্য, তবে আইনটির (নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন) ৯(১) ধারায় নারী ও শিশু ধর্ষণের কথা বলা হয়েছে, যেখানে এ আইন অনুযায়ী ‘শিশু’ বলতে ১৬ বছরের নিচে যে কোনো লিঙ্গের ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে। যদি সেই ব্যাখ্যায় ১৬ বছরের কম কোনো ছেলে শিশুর বিরুদ্ধে সংঘটিত এমন অপরাধ ধর্ষণ হিসেবে সংজ্ঞায়িত হয়ে বিচার্য হয়ও; তবুও ১৬ বছরের ঊর্ধ্বে কিশোর বা পুরুষের বলাৎকারের বিচারের সুযোগ বাংলাদেশের আইনে নেই। আইনজ্ঞরা অনেকেই এমন অপরাধ দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারায় বিচারের আওতায় আনার কথা বলেন; যেই ধারার অধীনে অপরাধের নাম ‘অপ্রাকৃতিক অপরাধ’ (Unnatural Offences)। যেখানে অপরাধের সংজ্ঞায় শুরুতেই ‘Voluntarily’ বা ‘স্বেচ্ছায়’ শব্দটি উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ স্বেচ্ছায় অপ্রাকৃতিক বা অস্বাভাবিক যৌনতা এ ধারা অনুযায়ী অপরাধ; যার অধীনে পড়ে সমকামিতা। সমকামিতা আর জোরপূর্বক যৌন নির্যাতন নিশ্চয়ই এক নয়। আশ্চর্যের বিষয় হল, আমাদের আইনে স্বেচ্ছায় সমকামিতাকে অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হলেও তার শাস্তি স্পষ্ট করলেও পুরুষের জোরপূর্বক যৌন নির্যাতন অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতই হয়নি; তাই শাস্তিও নেই। অর্থাৎ ধরেই নেয়া হয়েছে একজন কিশোর বা পুরুষ যৌন নির্যাতনের শিকার হতে পারে না। সম্প্রতি, জনদাবির মুখে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি ‘মৃত্যুদণ্ড’ করা হলেও বলাৎকারের বিষয়টি এখনও উপেক্ষিত। যদিও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তির ওপর এর প্রভাব গুরুতর, যা শুধু শারীরিকই নয় বরং মানসিকও। বলাৎকারের শিকার হয়ে মৃত্যুর নজির রয়েছে, আছে অপমান সইতে না পেরে আত্মহত্যার নজিরও। আর যারা বেঁচে থাকে তাদের ট্রমা বইতে হয় সারা জীবন। কেউবা কখনই স্বাভাবিক হতে পারে না। আর আইন নীরব, বিচার হয় না, সামাজিকভাবেও সেই অর্থে ধিকৃত হতে হয় না বলে নির্যাতনের শিকার হয়ে এটিকে স্বাভাবিক ধরে নিয়ে কেউবা নিজেই হয়ে ওঠে বিকৃত রুচির যৌন নিপীড়ক, এমন বিশ্লেষণ অনেক মনস্তত্ত্ববিদের।

শুধু বাংলাদেশেই নয়, এমন অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে পৃথিবীজুড়েই। ভারতে একের পর এক ধর্মগুরুর এরকম যৌন কেলেঙ্ককারির খবর গণমাধ্যম সূত্রে আমাদের নজরে আসছে। ২০০২ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন আর্চডায়োসিজে (খ্রিস্টীয় প্রধান ধর্মযাজকের এলাকা) ২৪৯ জন যাজক যৌন নিপীড়নের দায়ে প্রকাশ্যে অভিযুক্ত হয়েছিলেন। চাপা পড়ে থাকা এসব নির্যাতনের তথ্য বেরিয়ে এসেছিল যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন গ্লোব পত্রিকার স্পটলাইট টিমের অনুসন্ধানে। এরপর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে খ্রিস্টান ধর্মযাজকদের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উদ্ঘাটিত হয়েছে। এ ঘটনার ভিত্তিতে নির্মিত হয়েছে অস্কারজয়ী সিনেমা ‘স্পটলাইট’।

আমাদের দেশেও স্পটলাইট পড়ুক বিভিন্ন মাদ্রাসায়, ধর্মীয় লেবাসের নিচে যেখানে চাপা পড়ে এমন সব বিকৃত অপরাধ। শুধু মাদ্রাসায়ই নয়, যেখানেই এমন অপরাধ, সেখানেই পড়ুক স্পটলাইট। সেখানেই হোক শক্ত প্রতিরোধ। প্রণয়ন করা হোক স্পষ্ট আইন, যার মাধ্যমে এমন অপরাধের যথোপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা যায়। উৎপীড়িতের ক্রন্দন রোল আকাশে-বাতাসে ধ্বনিত না হয়ে প্রতিকার পাক সব ভুক্তভোগী।

শারমিন চৌধুরী : সহকারী অধ্যাপক, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি; সাংবাদিক

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন