মিঠে কড়া সংলাপ

‘হাউ ডেয়ার ইউ’!

 ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন 
২৬ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গ্রামের বাড়ি পাবনা আসার ক’দিন বাদেই আমার বাল্যবন্ধু মান্নান মাস্টারের মৃত্যু ঘটল। হঠাৎ স্ট্রোক করে সে মারা গেল। সারা দেশে কোভিড রোগ নিয়ে আমরা যখন দিনরাত চিন্তায় আছি, সে মুহূর্তে করোনা ছাড় দিলেও স্ট্রোক নামক ঘাতক ব্যাধিটি ঠিকই তাকে মৃত্যুর ঠিকানায় পৌঁছে দিল। আর সারা দেশে স্ট্রোকে করে মৃত্যুর ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। কয়েক মাস আগেও এ এলাকায় একই পরিবারের দুই ভাই অল্পদিনের ব্যবধানে স্ট্রোক করে মারা গেছেন। আবার গত বছরও এ রোগে দু’জনের মৃত্যু ঘটেছে, যার একজন সম্পর্কে আমার ভাতিজা। অর্থাৎ পাবনায় আমার বাড়ির আশপাশের এক কিলোমিটার এলাকার মধ্যেই গত এক বছরে পাঁচ ব্যক্তি স্ট্রোকে মারা গেছেন; যাদের চারজনেরই অকালমৃত্যু ঘটেছে। যদিও এ সময়ের মধ্যে এ এলাকায় করোনায় কেউ মারা যাননি। কথাটি এখানে এভাবে বলার উদ্দেশ্য হল, করোনার ডামাডোলে অন্যান্য মরণব্যাধির পরিসংখ্যানটি আমরা যেন ভুলতেই বসেছি!

স্ট্রোক ও অন্যান্য রোগে মৃত্যুর ঘটনা আগেও ছিল এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। তবে এসব রোগে মৃত্যুহার যেভাবে বেড়ে চলেছে, তাতে আতঙ্কিত না হয়ে পারা যায় না। বিশেষ করে যুবক শ্রেণির মানুষের এ রোগে মৃত্যুহার বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি ভেবে দেখা প্রয়োজন। বর্তমান অবস্থায় দেশের স্বাস্থ্য বিভাগ করোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকায় এসব বিষয়ে তেমন মনোযোগ দিতে পারছে না এ কথা যেমন সঠিক, তেমনই দিনের পর দিন স্ট্রোক করা রোগী আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলেছে, সে কথাটিও সত্য। সুতরাং এ বিষয়ে চোখ বুজে বসে থাকাও ঠিক হবে না। এ রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা এভাবে বেড়ে চলেছে কেন, সে বিষয়টি চিকিৎসা ক্ষেত্রে কর্মরত গবেষকদের ভেবে দেখা জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ অনেক পরিবারের যুব বয়সী ব্যক্তিরাও এ রোগে প্রাণ দিচ্ছেন, আর সেসব পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত ও নিঃস্ব হয়ে পড়ছে।

এ অবস্থায় আমাদের দেশের পরিবেশ দূষণ এক্ষেত্রে কতটুকু দায়ী, চিকিৎসা ক্ষেত্রে কর্মরত গবেষকরা বিষয়টি গুরুত্বসহকারে ভেবে দেখবেন বলে আশা করি। কারণ বর্তমান অবস্থায় সরকারের অনেক দফতরই কিছুটা হাত গুটিয়ে নেয়ায় বা মাঠে-ময়দানে যাদের কাজ করার কথা, তাদের অনেকেই ঘরে বসে কাজ করার নীতি গ্রহণ করায় এর সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির মানুষ পরিবেশের বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছে। অতি উচ্চৈঃশব্দে গাড়ির হর্ন বাজানোসহ কলকারখানা, ইটভাটার ধোঁয়া-বর্জ্য ইত্যাদি চারদিকের পরিবেশকে বিষাক্ত করে তুলছে, যার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। কারণ সাধারণ মানুষ এসবের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন থাকেন না অথবা আর্থসামাজিক বা পেশাগত কারণে সচেতনতার দিকটিতে গুরুত্ব দিতে পারেন না। আবার পরিবেশ দূষণের শিকার এই শ্রেণির মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়লে সঠিক চিকিৎসাও গ্রহণ করতে পারেন না। ফলে বিষয়টিকে নিয়তি বলেই তারা মেনে নেন। অতএব পরিবেশ দূষণের শিকার এসব মানুষকে রক্ষার জন্য শিক্ষিত সচেতন শ্রেণিকেই এগিয়ে আসতে হবে। পরিবেশ দূষণকারীদের বিরুদ্ধে জোর আন্দোলন গড়ে তুলে তাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। প্রয়োজনে সাধারণ মানুষ যারা পরিবেশ দূষণের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন নন, তাদের আন্দোলনে সম্পৃক্ত করে পরিবেশ দূষণকারীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।

বছরের প্রায় অর্ধেক সময় আমি আমার পাবনার বাড়িতে অবস্থান করি। আর পাবনা জেলা শহরের পশ্চিমাংশের ১৫ নম্বর ওয়ার্ড পৌর এলাকায় আমার বাড়ির সম্মুখের রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন শত শত ট্রাক চলাচল করায় আমাকে সেসব ট্রাক দ্বারা পরিবেশ দূষণের তাণ্ডব প্রত্যক্ষ করতে হয়! ইট-বালুসহ বিবিধ মালামাল নিয়ে চলাচলরত দানব আকৃতির ট্রাকগুলো যখন বিকট শব্দে একনাগাড়ে হর্ন বাজাতে থাকে, তখন কানের ভেতর আঙুল ঢুকিয়ে বন্ধ করে রাখি আর ভাবি, কালই ঢাকায় চলে যাব, যদিও তা হয়ে ওঠে না। বোকার মতো একবার এসব ট্রাকের বিরামহীন হাইড্রলিক হর্ন বাজানো বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণ করার উদ্দেশ্যে একটি দরখাস্ত লিখে নিয়ে পাবনার জেলা ও দায়রা জজের সঙ্গে দেখা করেছিলাম। উদ্দেশ্য ছিল, তিনি যদি হাইড্রলিক হর্ন ব্যবহারের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। কিন্তু অত্যন্ত সৌজন্য প্রদর্শন করে তিনি বলেছিলেন, ‘এটা তার এখতিয়ারবহির্ভূত, একমাত্র হাইকোর্ট এ ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন।’ এ বিষয়ে হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত আছে এবং সারা দেশেই তা বলবৎ করা উচিত ভেবে পরে সেই দরখাস্ত জেলা প্রশাসক এবং পৌর মেয়রের কাছে পাঠিয়েছিলাম। বলা বাহুল্য, তাতে কোনো লাভ হয়নি। কারণ তাদের আরওবড় বড় কাজ আছে! গাড়ির হর্নের শব্দ বা ধুলায় ধূসরিত পরিবেশ তাদের স্পর্শ করে বলে মনে হয় না। বিশেষ এলাকায় বাংলো ও অফিস হওয়ায় এক্ষেত্রে তারা ভুক্তভোগী নন।

পাবনা শহর এবং আশপাশের পরিবেশ দূষণের ভয়াবহতা বোঝাতেই উপরের কথাটুকু উল্লেখ করা হল। কারণ ট্রাকের হর্ন ও ধুলায় ধূসরিত পরিবেশ জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি না করলে আমি এসবের প্রতিকার প্রার্থনা করতে জজের কাছেও যেতাম না এবং ডিসির কাছেও দরখাস্ত পাঠাতাম না। সংশ্লিষ্ট সবার কাছে বিষয়টির গুরুত্ব অনুভব করানোর জন্যই ঘটনাটি এখানে উল্লেখ করা হল। কারণ আমার ধারণা, শুধু আমার এলাকা বা পাবনার অন্য এলাকায় নয়, সারা দেশের সর্বত্রই ট্রাক-বাসসহ বিভিন্ন যানবাহনে ব্যবহৃত হর্ন জনমানুষের কান-মাথা নষ্ট করে চলেছে, আর স্ট্রোকের রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার সেটাও একটা কারণ। আমাদের মনে রাখা উচিত, মানব শরীরের মস্তিষ্ক অতি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কোটি কোটি নিউরন দ্বারা গঠিত এবং একজন মানুষের মস্তিষ্কে ৮৬ বিলিয়ন নিউরন থাকে, উচ্চমাত্রার শব্দের কারণে যা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অর্থাৎ উচ্চমাত্রার হর্ন বা অন্য কোনো শব্দ আমাদের মস্তিষ্ক ও দেহ-মনের জন্য বিরাট হুমকি। সুতরাং এ ধরনের শব্দ থেকে আমরা রক্ষা না পেলে আমাদের মস্তিষ্কও রক্ষা পাবে না এবং স্ট্রোক ও অন্যান্য রোগেও মস্তিষ্ক আক্রান্ত হবে।

বস্তুত, শব্দদূষণসহ কলকারখানা, ইটভাটা ইত্যাদি থেকে নির্গত ধোঁয়া, যানবাহনে ব্যবহৃত তেল-মবিল পোড়ানোর গন্ধ ও গ্যাস উদ্গিরণ, রাস্তাঘাটের তুলনায় অত্যন্ত বেশিসংখ্যক যানবাহন চলাচলের ফলে সৃষ্ট ধুলাবালি ইত্যাদি কারণে সারা দেশের পরিবেশই মনুষ্য বসবাসের অনুপোযোগী হয়ে পড়েছে। ফলে মানুষের ফুসফুস, হৃদপিণ্ড, মস্তিষ্ক, চোখ, এমনকি গায়ের ত্বক পর্যন্ত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আর বেশির ভাগ মানুষই বিষয়টি বুঝে উঠতে পারছেন না। এ অবস্থায় দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী, যারা সাধারণ মানুষ বলে বিবেচিত, তাদের যদি বোঝানো যেত, বাস-ট্রাকের হাইড্রলিক হর্ন মানুষের কান, মাথা তথা শরীরের জন্য কতটা ক্ষতিকর, তাহলে তারা নিজেরাই হয়তো রাস্তায় দাঁড়িয়ে বাস-ট্রাক থেকে হাইড্রলিক হর্ন খুলে ফেলত। আর এক্ষেত্রে পুলিশকেও পরিশ্রম করতে হতো না। যদিও এ বিষয়ে পুলিশ কোনো কিছু করে বলে মনে হয় না। অন্যথায় বাস-ট্রাকের ড্রাইভাররা রাস্তাঘাটে সব সময় হর্নের উপর হাত চেপে বসে থাকতেন না।

অন্য রোগের পাশাপাশি দেশে স্ট্রোকের রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলেছে বলেই এ বিষয়ে আজকের লেখাটি শুরু করেছিলাম। আর স্ট্রোক নামক রোগটির সঙ্গে শব্দদূষণ ও পরিবেশ দূষণ ওতপ্রোতভাবে জড়িত বলে শব্দ ও পরিবেশ দূষণ নিয়ে কিছুটা আলোচনা করতে হল। আমাদের দেশে পরিবেশ অধিদফতর বলে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে কাজও করে থাকে। তাছাড়া বেসরকারি বিভিন্ন পরিবেশ সংগঠনকেও পরিবেশ নিয়ে কাজ করতে দেখা যায়। কিন্তু কাজের কাজ কতটুকু হয়েছে তা আমরা সবাই জানি। আমরা আরও জানি, শব্দদূষণকারী ড্রাইভাররা সরকারি-বেসরকারি সব সংস্থাকেই বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দিনরাত শব্দদূষণ সৃষ্টি করে চলেছেন। একশ্রেণির কলকারখানার মালিক, ইটভাটার মালিক দেশটিকে ধুলাবালি, ধোঁয়া দ্বারা আচ্ছাদিত করে চলেছেন, আলো-বাতাসকে বিষাক্ত করে চলেছেন! কিন্তু প্রশ্ন হল-এদের থামাবেন কে? এদের থামাতে কোথাও কি কেউ আছেন-এ প্রশ্নটিও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক বলেই মনে করি। নাকি সেই সুইডিশ বালিকা যিনি জাতিসংঘে দাঁড়িয়ে উন্নত বিশ্বের মোড়লদের উন্নয়নের নামে পরিবেশ দূষণের বিরুদ্ধে ধিক্কার জানিয়ে বলেছিলেন ‘হাউ ডেয়ার ইউ’, সেই গ্রেটা থানবার্গকে ডাকতে হবে? সেই বালিকাটির পরিবেশ দূষণ সংক্রান্ত চিন্তাচেতনা আমাদের মনকে কি কোনোভাবে প্রভাবিত করেছে বা করতে পেরেছে? সুইডেনের একটি শিশু, একজন বালিকা যিনি মহাকাশে কার্বন নিঃসরণ হবে, এ কারণে বিমান ভ্রমণে বিরত থেকে সাগরপথে পালতোলা ইয়েটে চেপে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে নিউইয়র্কে পৌঁছে পরিবেশ দূষণের বিরুদ্ধে তার বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘People are suffering, people are dying, entire ecosystems are collapsing, আমাদের দেশে তেমন কেউ কি আছেন, যিনি বা যারা পরিবেশ দূষণকারীদের উদ্দেশে বলবেন, ‘হাউ ডেয়ার ইউ’!

ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন