স্বদেশ ভাবনা

লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত হবে কি?

 আবদুল লতিফ মন্ডল 
২৩ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন, ২০০৯ এবং স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) নির্বাচন বিধিমালা, ২০১০ অনুযায়ী দেশের তিনশ’রও বেশি পৌরসভার মধ্যে ১৯৪টি আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যে নির্বাচন উপযোগী হয়েছে। নির্বাচন কমিশন এসব পৌরসভায় চার ধাপে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

কমিশন এ পর্যন্ত প্রথম ধাপে ২৫টি, দ্বিতীয় ধাপে ৬১টি এবং তৃতীয় ধাপে ৬৪টি পৌরসভা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী প্রথম ধাপে মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষদিন ১ ডিসেম্বর, মনোনয়নপত্র যাচাইয়ের দিন ৩ ডিসেম্বর, প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষদিন ১০ ডিসেম্বর এবং প্রতীক বরাদ্দের দিন ১১ ডিসেম্বর নির্ধারিত হয়েছে। ভোটগ্রহণ হবে ২৮ ডিসেম্বর।

দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র দাখিল, যাচাই, প্রার্থিতা প্রত্যাহারের তারিখ নির্ধারিত হয়েছে যথাক্রমে ২০, ২২ ও ২৯ ডিসেম্বর। ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে আগামী বছরের ১৬ জানুয়ারি।

আর তৃতীয় ধাপের ৬৪টি পৌরসভার নির্বাচন ৩০ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে। এসব পৌরসভায় মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ তারিখ আগামী ৩১ ডিসেম্বর। মনোনয়নপত্র বাছাই আগামী বছরের ৩ জানুয়ারি। প্রার্থিতা প্রত্যাহার আগামী ১০ জানুয়ারি। কমিশন সূত্রের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, চতুর্থ ধাপের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে মধ্য ফেব্রুয়ারিতে।

গত কয়েক বছরে অনুষ্ঠিত জাতীয় ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচনের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিলে আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব দলের জন্য একটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু, তা আলোচনা করাই এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশের রাজত্বকালে লর্ড রিপনের শাসনামলে ১৮৮৪ সালে বেঙ্গল মিউনিসিপ্যাল অ্যাক্ট পাসের মাধ্যমে বাংলায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান মিউনিসিপালিটি বা পৌরসভার সৃষ্টি হয়। গঠিত পৌরসভায় সে সময় কমিশনারের সংখ্যা সর্বনিু ৯ এবং সর্বোচ্চ ৩০ নির্ধারণ করে দেয়া হয়।

কমিশনারদের দুই-তৃতীয়াংশ নির্বাচিত এবং এক-তৃতীয়াংশ সরকার কর্তৃক মনোনীত হতেন। কমিশনাররা নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে চেয়ারম্যান ও একজনকে ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচন করতেন। সরকারের পূর্ব অনুমোদন নিয়ে পৌরসভা বিভিন্ন ধরনের কর, ফি, টোল ও পৌরকর আরোপ করতে পারত।

সময়ের বিবর্তনে পৌরসভার কাঠামো এবং নির্বাচিত ব্যক্তিদের পদ ও পদবিতে পরিবর্তন এলেও ২০১৫ সালের আগে দেশে পৌরসভার প্রধান নির্বাহী পদে নির্দলীয়ভাবে নির্বাচনে কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। ২০১৫ সালে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান যেমন- ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভা আইনে সংশোধনী এনে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী পদে নির্বাচনে প্রার্থীকে কোনো রাজনৈতিক দল কর্তৃক মনোনয়নের বিধান করা হয়।

তবে স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বি^তা করার বিধানও রাখা হয়। এ সংশোধনীর ফলে পৌরসভার প্রধান নির্বাহী মেয়র পদে নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য কোনো ব্যক্তিকে রাজনৈতিক দল কর্তৃক মনোনীত বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে হবে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান নির্বাহী পদে রাজনৈতিক দল কর্তৃক মনোনয়নের বিধানটির প্রবর্তন সে সময় মাঠের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট, অন্যান্য বিরোধী দল এবং দেশের বিশিষ্টজনের কঠোর সমালোচনার সম্মুখীন হয়।

নির্বাচন কমিশন নিবন্ধিত কমবেশি ৪০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে তিন বড় দল- ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, মাঠের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে অংশগ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে। তবে এ তিনটি দলের সহযোগী দলগুলোর পৌর নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়টি এখন পর্যন্ত স্পষ্ট নয়।

প্রথম ধাপের পৌর নির্বাচনে সহযোগী দলগুলো থেকে কাউকে মেয়র পদে প্রার্থী মনোনয়ন দেয়া সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এদিকে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে এককভাবে ভোটের লড়াইয়ে অংশ নেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় পার্টি। এর মাধ্যমে দলকে তৃণমূল পর্যায়ে শক্তিশালী করার পাশাপাশি প্রার্থীদের মাঠপর্যায়ে জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করতে চায় দলটি।

এখন আসন্ন পৌর নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির বিষয়ে আলোচনা করা যাক। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বলতে সহজ অর্থে যা বোঝায় তা হল- কোনো নির্বাচনে, তা জাতীয় বা স্থানীয় যে পর্যায়ে অনুষ্ঠিত হোক, সব দল ও প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ তৈরি করা। এ দায়িত্বটি মূলত নির্বাচন কমিশনের। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, গত কয়েক বছরে অনুষ্ঠিত জাতীয় ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের অধীনে ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত অনেকটা অংশগ্রহণহীন দশম জাতীয় নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ আবার সরকার গঠন করে।

এ নির্বাচন বর্জনকারী প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটকে নির্বাচনে নিয়ে আসার কোনো উদ্যোগ নেয়নি নির্বাচন কমিশন। কেএম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় নির্বাচন বহুদলীয় অংশগ্রহণমূলক হলেও এ নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির কোনো চেষ্টা করেনি নির্বাচন কমিশন।

নির্বাচন-পরবর্তী টিআইবির এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, একমাত্র ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নির্বাচনী প্রচারণায় তৎপর ছিল। নির্বাচন-পূর্ববর্তী সময়ের মিডিয়া রিপোর্ট থেকে জানা যায়, শাসক দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য বিরোধী দলগুলোর, বিশেষ করে বিএনপি প্রার্থীরা কোনো নির্বাচনী প্রচারণায় তৎপর হওয়ার সুযোগ পায়নি।

তাছাড়া বিএনপির লাখ লাখ নেতাকর্মীর নামে মামলা দিয়ে তাদের অন্তরীণ রাখার ব্যবস্থা করা হয়। মামলার বোঝা মাথায় নিয়ে দলটির অনেক নেতাকর্মীকে পালিয়ে বেড়াতে হয়। নির্বাচনী তফসিল জারির পরও এ অবস্থা চলতে থাকে। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশন কোনো প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেয়নি। এ নির্বাচনে নজিরবিহীন অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। নির্বাচনে জয়ী হয়ে শাসক দল আওয়ামী লীগ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে চতুর্থবার সরকার গঠন করে।

দশম ও একাদশ জাতীয় নির্বাচনের মাঝখানে এবং একাদশ জাতীয় নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচনেও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত হয়নি। দশম জাতীয় নির্বাচনের প্রভাব পড়ে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচনের ওপর।

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান যেমন- উপজেলা পরিষদ নির্বাচন ২০১৪, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন ২০১৫, পৌরসভা নির্বাচন ২০১৫ এবং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ২০১৬-এ ভোটকেন্দ্র দখল, ব্যালট ছিনতাই, ভোটকেন্দ্র থেকে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর এজেন্টদের তাড়িয়ে দেয়া ইত্যাদি অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।

শাসক দল আওয়ামী লীগ মনোনীত/সমর্থিত প্রার্থীদের একচেটিয়া জয় হয়। কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে নীরব দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে অনুষ্ঠিত খুলনা, গাজীপুর, বরিশাল ও রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনেও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

এসব নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা হয়নি। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড না থাকায় চলতি বছরে অনুষ্ঠিত ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ না হওয়ায় জনগণ সব ধরনের নির্বাচন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। ২০২০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি নির্বাচনে ভোট পড়ে যথাক্রমে ২৫ দশমিক ৩ ও ৩০ শতাংশ।

মিডিয়ার খবর অনুযায়ী, চলতি বছরে অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনগুলোর মধ্যে ঢাকা-১০, ঢাকা-৫, ঢাকা-১৮ আসনে ভোট পড়েছে যথাক্রমে ৫ দশমিক ২৮, ১০ দশমিক ৪৩ এবং ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ। এমন উদাহরণ আরও দেয়া যেতে পারে। এটা দেশে গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত।

আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে এখন পর্যন্ত লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। ১৮ ডিসেম্বর যুগান্তরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলার সংখ্যা বেশি। দলটির বেশির ভাগ প্রার্থীর বিরুদ্ধেই মামলা আছে। অপরদিকে দু’-চারজন ছাড়া আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের নামে কোনো মামলা নেই।’

মামলার বোঝা মাথায় নিয়ে বিএনপি প্রার্থীদের পক্ষে নির্বাচনী কার্যক্রম চালানো সম্ভব হবে না। এর আগে ১৮ অক্টোবর দ্য ডেইলি স্টারে এক সাক্ষাৎকারে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান, বিএনপির প্রায় ৩৫ লাখ কর্মীর নামে লক্ষাধিক মামলা রয়েছে।

আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব দলের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরিতে বিরোধী দলগুলোকে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে। এক্ষেত্রে জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টিকে বিশেষ ভূমিকা পালন করতে হবে। এতে জাতীয় পার্টি সংসদের ভেতরে ও বাইরে সত্যিকারের বিরোধী দলের ভূমিকা পালনে সক্ষম হবে। দলটির প্রতি জনগণের আস্থা বাড়বে। ফলে আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে দলটির ভালো করার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হবে।

সবশেষে বলতে চাই, বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ আছে ১৩ মাস। আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনসহ আগামী ১৩ মাসে অনুষ্ঠেয় সব ধরনের নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির মাধ্যমে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্পন্ন করে কমিশন তাদের দুর্নাম অনেকটা কমিয়ে আনতে পারে। কথায় আছে-শেষ ভালো যার, সব ভালো তার। দেশে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলের মতো অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন ফিরে আসুক।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

latifm43@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন