আরব বসন্তের এক দশক

তিউনিসিয়ায় স্বৈরশাসক হটলেও থেকে গেছে প্রেতাত্মা

 যুগান্তর ডেস্ক 
১৭ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
একনায়কত্ব ও স্বৈরশাসনের জাঁতাকলে নিষ্পেষিত আরব যুবকদের অর্থনৈতিক মুক্তি, গণতন্ত্র ও নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার পথে স্বপ্ন দেখানো শুরু করে ‘আরব বসন্ত’ নামের এক আন্দোলন।
ছবি: সংগৃহীত

একনায়কত্ব ও স্বৈরশাসনের জাঁতাকলে নিষ্পেষিত আরব যুবকদের অর্থনৈতিক মুক্তি, গণতন্ত্র ও নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার পথে স্বপ্ন দেখানো শুরু করে ‘আরব বসন্ত’ নামের এক আন্দোলন।

২০১০ সালের ১৭ ডিসেম্বর জন্ম নেয়া এ আন্দোলন ২০১১ সালের শুরুতে ব্যাপক হয় তিউনিসিয়ায়। সেখান থেকে একের পর এক কর্তৃত্ববাদী শাসনের আরব দেশগুলোতে বিস্তার লাভ করে।

আরব যুবকদের মনে এ আন্দোলন নিয়ে আসে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, রাজনৈতিক সচেতনতা ও গণতন্ত্রের স্পৃহা। তবে তিউনিসিয়ায় স্বৈরশাসক জেইন আল আবেদিন বেন আলীকে সরিয়ে গণতন্ত্র এলেও বিপ্লব পূর্ণতা পায়নি।

তার প্রেতাত্মা তথা এক সময়ের সহযোগী পুলিশ কর্মকর্তারা এখনও আছে বহাল তবিয়তে। প্রত্যাশা মতো কর্মসংস্থান ও সুযোগ তৈরি হয়নি। গার্ডিয়ান, এএফপি।

আরব বসন্ত তিউনিসিয়ার ২৩ বছরের স্বৈরশাসক বেন আলীর মসনদ কেড়ে নেয়। দেশটির সদ্য স্নাতক যুবক মোহামেদ বুয়াজিজি কোনো চাকরি না পেয়ে সিদি বাওজিদ শহরের স্থানীয় বাজারে ফল বিক্রির ব্যবসা শুরু করেন।

১৭ ডিসেম্বর, ২০১০ সকালে পৌরসভার এক নারী পুলিশ এসে ঘুষের জন্য বাগড়া দেন বুয়াজিজির ভ্যানের কাছে। কিন্তু তিনি সেটি দিতে রাজি না হওয়ায় বাজেয়াপ্ত করা হয় তার ভ্যান ও পণ্য। অনেক অনুনয়-বিনয়েও কোনো কাজ হয়নি। উপায়ান্তর না দেখে সরকারি দফতরের সামনে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেন তিনি। ১৭ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে ৪ জানুয়ারি, ২০১১ মারা যান বুয়াজিজি।

তারপরই তিউনিসিয়াজুড়ে শুরু হয় স্বৈরশাসক বেন আলীবিরোধী আন্দোলন। ১০ দিনের মাথায় ক্ষমতা ছেলে সৌদি আরবে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। আরব বসন্তের জন্মভূমি হিসেবে আন্দোলনটি একমাত্র তিউনিসিয়াতেই সফলতা পেয়েছে। নির্বাচিত সরকার ও গণতন্ত্র এসেছে।

কিন্তু বেন আলীর সঙ্গে তার পরিবার ও ক্ষমতার সুযোগ নেয়া কিছু মানুষ সরে গেলেও তার ক্ষমতার বেশিরভাগ অংশীদারই রয়ে গেছে বহাল তবিয়তে। বিশেষত বেন আলীর স্বৈরশাসন টিকিয়ে রাখার মূলশক্তি পুলিশ প্রশাসনের বেশিরভাগ কর্মকর্তাই এখনও আছেন দায়িত্বে।

সামরিক বাহিনীতেও বলার মতো কোনো সংস্কার হয়নি। অর্থনীতিতে আগের মতো বড় ধরনের স্বজনপ্রীতি বিদ্যমান এখনও। এসব কারণে যে লক্ষ্যে তিউনিসিয়ার যুবকরা আরব বসন্তের বিপ্লবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, সেটি এখনও লক্ষ্য অর্জনের মতো সফলতা পায়নি।

তিউনসিয়ার ট্রুথ অ্যান্ড ডিগনিটি কমিশনের নেতৃত্ব দেয়া আউলা বেন নেজমা বলেন, ২০১১ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাত্র ৫৪ শতাংশ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তাদেরকে বিচারের মুখে নেয়া বা শাস্তি দেয়া হয়নি।

কিছু লোককে দুই বছর পর বরখাস্ত। বাকিরা তাদের চাকরি-ক্যারিয়ার চালিয়ে নিচ্ছেন। এমনকি বেন আলীর শাসনামলে অপরাধে অভিযুক্তরাও আছেন চাকরিরত।

তবে সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে- অর্থনৈতিক দুরবস্থা থেকে মুক্তির যে স্বপ্ন নিয়ে যুবকরা বিপ্লবে উদ্বেলিত হয়েছিলেন সেটি এখনও তাদের পীড়িত করছে। সিদি বাওজিদ শহরের বুয়াজিজির বন্ধুরা অর্থনৈতিক সমস্যায় এখনও জর্জরিত, হতাশ।

২৫ বছরের বয়সের রিমি বলেন, সিদি বাওজিদে ক্যাফে, হোটেল, নারী-পুরুষ মেলামেশা ও কথা বলার স্বাধীনতা কিছুটা এসেছে। কিন্তু উল্লেখযোগ্য চাকরি ও কর্মসংস্থান নেই।

তিউনিসিয়া ছাড়া মিসর, ইয়েমেন, বাহরাইন, লিবিয়া ও সিরিয়ায়ও আরব বসন্তের ঢেউ লাগে। এর মধ্যে বাহরাইন ও সিরিয়ায় ক্ষমতার পরিবর্তন আসেনি। বাকিগুলোতে পরিবর্তন এলেও মানুষের ভাগ্য রয়ে গেছে আগের মতোই। অর্থনৈতিক মুক্তি আসেনি।

সিরিয়া ও লিবিয়ায় এখনও চলছে আরব বসন্তের ঢেউ থেকে উদ্ভূত গৃহযুদ্ধ। ইরান ও সৌদি আরবে এর আঁচ লাগলেও তারা দ্রুত পরিস্থিতি সামলে ওঠে, দমন করে আন্দোলন।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন