নিস্তব্ধ শহরে শান্তির গরিলা

 কাজী জহিরুল ইসলাম 
২৯ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বদলে গেছে আমাদের পৃথিবী। বাধ্যবাধকতা নেই যদিও, সপ্তাহে একদিন আমি অফিসে যাই। একা একটি ভুতুড়ে অফিসে মুখোশ পরে ঢুকি, দিনের শেষে মুখোশ পরে বের হই। লিফটে লোক নেই, রিসেপশনে একমাত্র নিরাপত্তা প্রহরীর ব্যস্ততা নেই।

ম্যানহাটনের প্রথম ও দ্বিতীয় এভিনিউর মাঝখানে যে ফোর্টি সেভেন স্ট্রিট, যার অন্য নাম দাগ হ্যামারশোল্ড প্লাজা, যার একপাশে সবুজ ক্যাথেরিন হ্যাপবার্ন পার্ক, সেখানে এখন খাঁখাঁ শূন্যতা। অথচ এ জায়গাটি সারাক্ষণ মুখর থাকত নানা দেশের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের দৃপ্ত পদচারণায়।

পৃথিবীর কোথাও কোনো রাষ্ট্রীয় অনিয়ম-অত্যাচারের ঘটনা ঘটলেই সেই দেশের, সেই ভূখণ্ডের মানুষ এখানে এসে জড়ো হতো, ভিড় জমাত, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাত। দাগ হ্যামারশোল্ড প্লাজার মুখেই জাতিসংঘ সদর দফতর। ম্যাচবক্সের মতো এক চিলতে দালান, বিশ্ব শান্তি ও ন্যায়বিচার সংরক্ষণের তীর্থ। এ দালানটিই সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মুষ্টিবদ্ধ উত্তোলিত হাতের লক্ষ্য।

গা ছমছম করা নিস্তব্ধ অফিস-ফ্লোর থেকে দুপুর সাড়ে ১২টায় বের হয়ে আসি। উদ্দেশ্য, প্রিয় দাগ হ্যামারশোল্ড প্লাজায় গিয়ে কিছুক্ষণ পায়চারি করা। উগান্ডা হাউস পেরিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী মিশনের সামনে এসে দাঁড়াতেই চোখে পড়ে ক’জন উত্তেজিত কালো মানুষ। ওরা ফোর্টি ফাইভ স্ট্রিট আর ফার্স্ট এভিনিউর সংযোগস্থলে ক্রমেই একটি ছোটখাটো জটলা তৈরি করার চেষ্টা করছে। ফুটপাতে দাঁড় করিয়ে রাখা পাথরের স্তম্ভগুলোয় ঠেস দিয়ে কিছু প্ল্যাকার্ড, ব্যানার, পোস্টার সেঁটে দিয়েছে।

ওগুলোতে হত্যাকাণ্ডের বীভৎস ছবি, হেইশিয়ান সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের স্লোগান এবং আমেরিকাকে দোষারোপ করে নানা কথা লেখা। আগেও লক্ষ করেছি, হেইশিয়ানরা প্রায়ই নানা দাবি-দাওয়ার মিছিল, প্ল্যাকার্ড, ফেস্টুন নিয়ে ঠিক এ জায়গাটিতেই এসে জড়ো হয়। অন্য সবাই দাগ হ্যামারশোল্ড প্লাজায় জড়ো হলেও হেইশিয়ানরা সবসময় এ জায়গাটিকেই আন্দোলনের জন্য বেছে নেয়। হয়তো ওরা মার্কিন মিশনের দরজাটিকেই লক্ষ্যবস্তু হিসেবে নির্ধারণ করে, যেটি ওখান থেকে মাত্র ২৫ ফুট দূরে।

আর ফার্স্ট এভিনিউর ওপারেই জাতিসংঘ ভবন। ইউএন ও ইউএস দুটো শক্তিশালী লক্ষ্যবস্তুর সবচেয়ে কাছের স্পট এটি। আরও লক্ষ করেছি, ওদের আন্দোলনে কখনই পাঁচ-সাতজনের বেশি লোক থাকে না, তবে প্রত্যেকের হাতে হাতেই আন্দোলন সংশ্লিষ্ট ব্যানার, পোস্টার- কিছু না কিছু থাকেই। আর এ ক’জন মানুষই গলা ফাটিয়ে গগনবিদারী চিৎকার দিয়ে স্লোগান ধরে। পথচারীরা সেই চিৎকারে থমকে দাঁড়ায়, কেউ কেউ এগিয়ে এসে নিজেদের সেলফোন ক্যামেরায় ছবি তোলে।

হেইতির সমস্যা নতুন কিছু নয়। ১৮০৪ সালের ১ জানুয়ারি দেশটি ফ্রান্সের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। হেইতিই পৃথিবীর প্রথম ক্রীতদাসদের স্বাধীন দেশ। কালো মানুষের স্বাধীন ভূখণ্ড। এত আগে স্বাধীনতা লাভ করলেও মানুষের প্রকৃত মুক্তি কখনই ঘটেনি। সবসময়ই মার্কিন মদদপুষ্ট সরকার ক্ষমতায় এসেছে, হেইশিয়ানদের অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে কোনো সরকারই আন্তরিক কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।

হতদরিদ্র এ দেশটিতে এখনও প্রিমেটিভ যুগের মতো মানুষ খাদ্যাভাবে মৃত্যুবরণ করে। সম্প্রতি হেইতির প্রেসিডেন্ট জোভেনেল মইস ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি গঠনের ঘোষণা দিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন। প্রতিদিনই রাজপথে ভিন্নমতাবলম্বীরা পুলিশের, মিলিটারির গুলিতে নিহত হচ্ছে। আজকের আন্দোলনকারীরা আমেরিকাকে সরাসরি অভিযোগ করে বলছে, হেইশিয়ানদের হত্যা করার জন্য অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করো।

আন্দোলনরত হেইশিয়ানদের কিছু ছবি তুলে এগিয়ে যাই ফোর্টি সেভেন স্ট্রিটের দিকে। ম্যানহাটনের মানুষের জীবনের মূল্য কি একটু বেশি? নাকি এ শহরের মানুষ মৃত্যুভয়ে অধিক ভীত? কদাচিৎ পথচারীর দেখা মিলছে এবং সবাই মুখোশ পরে অতি সতর্কতার সঙ্গে হাঁটছে, প্রত্যেকের চোখে মৃত্যুর আতঙ্ক। ছুটে চলা গাড়িগুলোতে চালক ছাড়া আর কেউ নেই এবং একলা একটি গাড়িতে বসে থেকেও লোকগুলো মুখোশ পরে আছে।

যেন করোনা নামক এক ভয়ানক দানব ওদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। সেই দানবের মুখনিঃসৃত আগুনে ওদের নাক-মুখ ঝলসে যাবে, তাই সারাক্ষণ নাক-মুখ ঢেকে রাখছে। আমি তো খোলা আকাশের নিচে মুখোশ পরি না, যখন একা গাড়ি চালাই তখন মুখোশ পরি না। আমার জীবনের মূল্য কি ওদের চেয়ে কম, নাকি আমি বোকা? আমাদের কি আরও অনেকদিন মুখ ঢেকে এমনি করে বাইরে বেরোতে হবে? মুখ কি গোপনাঙ্গ হয়ে গেল, যা কাউকে দেখানো যাবে না? এ নতুন স্বাভাবিকতায় কি আমাদের অভ্যস্ত হয়ে উঠতেই হবে?

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ এরই মধ্যে বেশ ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত পৃথিবীতে করোনায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা সাড়ে সাত কোটি, মৃতের সংখ্যা ১৬ লাখ ৬৪ হাজার। এপ্রিলের শুরু থেকে মে মাসের শেষ পর্যন্ত এ দুই মাস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে করোনায় মৃতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ছিল। জুন থেকে এর প্রকোপ কমতে শুরু করে। ধারণা করা হয় আবহাওয়া উষ্ণ হয়ে ওঠার কারণে ভাইরাসটি দুর্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু নভেম্বরে আবার মৃতের সংখ্যা বাড়তে থাকে। এ সময়টাকেই দ্বিতীয় ঢেউ বলা হচ্ছে। এদেশের মানুষ সরকারের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ বিভাগ (সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন) কর্তৃক ঘোষিত সংবাদের ওপর চোখ রাখে এবং তা মেনে চলে।

প্রত্যেকের মোবাইল ফোনে যে কোনো সতর্কবার্তা চলে আসে। আবহাওয়া যদি বিপজ্জনক পর্যায়ের খারাপ হয়, সেই খবর আগাম জানিয়ে দেয় সেলফোনে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়ে এবং এটি খুব বিরল ঘটনা যে, এ আগাম সংবাদ ভুল হয়েছে। তাই এসব আগাম সংবাদের ওপর জনগণের পূর্ণ আস্থা আছে। আমরা বাঙালিরা অনেক সময় এসব খবর আমলে নিই না। নিই না এজন্য যে, এটি আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, এ ধরনের সংবাদ যে শতভাগ ঠিক হয় এদেশে, তা আমাদের বুঝতে অনেকদিন লেগে যায়।

নভেম্বরের মাঝামাঝি একদিন বিকালে রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে দেখি গতকালের চেয়ে আজ রাস্তায় মানুষ অনেক কম। যারা আছে তারাও কেউ মুখোশ খুলছে না। তখনই মনে পড়ল সতর্কবার্তার কথা। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি এখন, ঠাণ্ডাটা জেঁকে বসেছে। যেহেতু মানুষ জেনেছে কোভিড-১৯ ভাইরাস ঠাণ্ডায় শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তাই ঠাণ্ডা বাড়লেই সবাই ভয় পেয়ে যাচ্ছে। মানুষের পায়ে পায়ে আতঙ্ক। এপ্রিল, মে মাসের মতো আবারও এ শহরে মধ্যরাতে অন্তরাত্মা কাঁপিয়ে ছুটতে শুরু করেছে অ্যাম্বুলেন্স।

সুনসান ফোর্টি সেভেন স্ট্রিট, তা সত্ত্বেও পুলিশের লোহার ব্যারিকেড বারগুলো ঠিকই দাগ হ্যামারশোল্ড প্লাজার মুখে পাতা আছে। ব্যারিকেড পেরিয়ে ভেতরে ঢুকেই একটি ধাক্কা খাই। এ ঠাণ্ডার মধ্যে এক গৃহহীন মানুষ রাস্তায় ঘুমিয়ে আছে। দৃশ্যটি বেশ কষ্ট দেয়। মানুষটির গায়ের রং ও লিঙ্গ বোঝার জন্য কিছুটা দ্বিধা নিয়ে কাছে যাই।

শুধু মাথার কিছু অংশের আভাস দেখা যাচ্ছে, কাছে না গেলে কিছুই বোঝা যাবে না। কাছে গিয়ে দেখি সোনালি চুলের এক নারী স্লিপিং ব্যাগের ভেতরে সেঁধিয়ে আছে। গৃহহীনদের জন্য সরকারের খুব ভালো কর্মসূচি আছে। এমনকি ওদের কখনও কখনও খুব ভালো হোটেলেও রাখা হয়, তবু একদল বোহেমিয়ান মানুষ আছে যারা কোনো বন্ধনেই আটকে থাকতে চায় না, ছুটে বেড়াতে চায় ইচ্ছামতো, রাত্রি হলে শুয়ে পড়ে স্লিপিং ব্যাগের ভেতর, কখনও গাছতলায়, কখনও কোনো রেলস্টেশনের প্লাটফর্মে।

হাঁটতে হাঁটতে দাগ হ্যামারশোল্ড প্লাজার অন্য প্রান্তে, সেকেন্ড এভিনিউর কাছে চলে আসি। প্রশস্ত প্লাজায় হাজার হাজার পায়রার মুখর পদচারণা। আজকের তাপমাত্রা হিমাঙ্কের কাছাকাছি, অর্থাৎ শূন্য ডিগ্রির সামান্য উপরে। এ ঠাণ্ডার মধ্যেও সারি সারি পায়রা বসে আছে, ডানার ভেতরে মুখ গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে প্লাজার ইট-বিছানো পথের ওপর। আগেও এখানে পায়রা দেখেছি, তখন সংখ্যায় ওরা কম ছিল এবং খুব ভীত ছিল, মানুষ দেখলেই উড়ে পালাত।

এখন পায়রাদের সাহস বেড়েছে, ছবি তোলার জন্য আমি প্রায় ওদের গায়ের ওপর উঠে যাচ্ছিলাম, তবুও কেউ উড়ে পালিয়ে যাচ্ছে না। নদীর একূল ভেঙে ওকূল গড়ার মতো মানুষের সাহস ভেঙে প্রকৃতি পায়রাদের নির্ভয় করে তুলেছে। আজকের ফোর্টি সেভেন স্ট্রিট দেখে মনে হচ্ছে এটি পায়রাদেরই স্ট্রিট। তবে ওদের শান্ত ও নির্ভয় অবস্থান বলে দিচ্ছে, জাতিসংঘের কাছে ওরা মানুষের মতো কোনো দাবি-দাওয়া নিয়ে আসেনি।

দাগ হ্যামারশোল্ড প্লাজায় নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য নগর কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে বিভিন্ন দেশ ও প্রতিষ্ঠান ভাস্কর্য স্থাপন করে। দু’বছর আগে একটি প্রতিষ্ঠান মুকুট পরা ব্যাঙের ভাস্কর্য স্থাপন করেছিল। আমি প্রায়ই সেটির পাশে গিয়ে বসে থাকতাম। ছেলেবেলায় পড়া রূপকথার ব্যাঙ-রাজকন্যার কথা খুব মনে পড়ত।

আজই প্রথম চোখে পড়ল একটি নতুন ভাস্কর্য। প্লাজার ঠিক মাঝখানে মাঝারি আকৃতির একটি গরিলার প্রতিকৃতি শোভা পাচ্ছে। ওরা এর নাম দিয়েছে ‘পিস গরিলা’। নিচে নানা ভাষায় শান্তি ও সৌহার্দ্যরে কথা লেখা। সালাম, শালোম, পিস, তমোদাচি, হ্যালো, আরও অনেক ভাষায় লেখা শান্তি বা বন্ধুত্বের কথা। গরিলার সঙ্গে শান্তির কী সম্পর্ক? শিল্পী কি বোঝাতে চাইছেন শান্তি শক্তিশালী হোক, গরিলার মতো?

কাজী জহিরুল ইসলাম : নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত কবি, কথাসাহিত্যিক

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন