খোলা জানালা

কেমন হবে ২০২১ সালের বিশ্ব রাজনীতি

 তারেক শামসুর রেহমান 
২৭ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ডিসেম্বরের শেষভাগে এসে করোনাভাইরাসের নতুন ধরন নিয়ে সারা বিশ্ব যখন উদ্বিগ্ন, তখন সঙ্গত কারণেই একটা প্রশ্ন উঠেছে- কেমন হবে ২০২১ সালের বিশ্ব রাজনীতি? কোভিড-১৯-এর নতুন ধরন, সব মানুষের ভ্যাকসিন প্রাপ্তির নিশ্চয়তা, ভ্যাকসিন কূটনীতি যে ২০২১ সালের বিশ্ব রাজনীতিতে এক নম্বর আলোচিত বিষয় হয়ে থাকবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিশ্লেষকরা ২০২১ সালে ১০টি ‘রিস্ক ফ্যাক্টরের’ কথা উল্লেখ করেছেন, যা ২০২১ সালের বিশ্ব রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলবে। এসব ‘রিস্ক ফ্যাক্টরের’ শীর্ষে রয়েছে কোভিড-১৯-এর নতুন ধরন ও একে মোকাবেলা করা। ‘রিস্ক ফ্যাক্টর’ বলতে বোঝানো হচ্ছে অন্যতম একটি ইস্যু, যা বিশ্বে উত্তেজনা ছড়াবে, সংকট সৃষ্টি করবে এবং বিশ্ব নেতৃবৃন্দ এ ‘সমস্যা’টিকে অগ্রাধিকার তালিকার শীর্ষে রাখবেন। অন্য ‘রিস্ক ফ্যাক্টরগুলো’ হচ্ছে পর্যায়ক্রমে যুক্তরাষ্ট্রের নয়া প্রেসিডেন্ট হিসেবে জো বাইডেনের দায়িত্ব গ্রহণ এবং যুক্তরাষ্ট্রকে আগের অবস্থানে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া, কোভিড-১৯জনিত কারণে বিশ্বব্যাপী বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকট ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঋণ পরিশোধের ব্যর্থতা, পশ্চিমা দেশগুলোর অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের চেষ্টা, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি ও কোরীয় উপদ্বীপে পুনরায় উত্তেজনা, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক ও দু’দেশের মাঝে উত্তেজনা বৃদ্ধি, তাইওয়ান প্রশ্নে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের অবনতি, বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকট, বিশ্বব্যাপী যে মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান ঘটেছিল তাতে ধস নামা, এবং তুরস্কের নেতৃত্বে ‘নয়া অটোমান সাম্রাজ্যের’ উত্থান। মূলত এ ১০টি প্রধান সমস্যাকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা কিনা ২০২১ সালে নতুন সংকটের জন্ম দেবে এবং বিশ্বে উত্তেজনা বাড়াবে।

একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশেষজ্ঞরা বেশ কয়েকটি বিষয়ের কথা উল্লেখ করেছেন, যা ২০২১ সালে অন্যতম আলোচিত বিষয় হিসেবে বিবেচিত হবে। নিঃসন্দেহে করোনাভাইরাস ও এর নয়া রূপ থাকবে আলোচনার কেন্দ্রে। দ্বিতীয় যে বিষয়টি গুরুত্ব পাবে তা হচ্ছে, জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রে জো বাইডেনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ। এ দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ট্রাম্প-পরবর্তী নতুন এক যুগে প্রবেশ করবে। জো বাইডেনের ‘বিশ্ব ব্যবস্থা’ ট্রাম্প থেকে কতটুকু ভিন্ন হবে, তিনি কতটুকু আস্থাশীল একটি বিশ্ব গড়ে তুলতে পারবেন, প্রশ্ন সেখানেই। সেই সঙ্গে আছে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের বিষয়টি, জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক অর্থনীতিকে করোনা-পরবর্তী সময়ে সচল করা ইত্যাদি।

২০২০ সাল প্রত্যক্ষ করেছে এক মহামারী, যার নাম কোভিড-১৯। এই মহামারী ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনের উহানে ছড়িয়ে পড়লেও পুরো ২০২০ সালে বিশ্বকে দাঁপিয়ে বেড়িয়েছে। এর রেশ ২০২১ সালেও থেকে যাবে। বলা হচ্ছে, ভ্যাকসিন হচ্ছে এর প্রতিষেধক। কিন্তু এ ভ্যাকসিন প্রাপ্তি নতুন এক সংকটের জন্ম দেবে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ‘মাই নেশন্স ফার্স্ট’ ধারণায় উদ্দীপ্ত হয়ে ভ্যাকসিনটি বাজারে আসার আগেই প্রি-অর্ডারের মাধ্যমে এর কোটি কোটি ডোজের প্রাপ্তি নিশ্চিত করেছেন। আর এভাবেই জন্ম হয়েছে ‘ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদ’। এর মূল কথা হচ্ছে, অন্য কোনো দেশ ভ্যাকসিন পাক বা না পাক, নিজ দেশে ভ্যাকসিন প্রাপ্তি নিশ্চিত করা। ২০২১ সালে এ ভ্যাকসিনের বিষয়টিকে কেন্দ্র করে জন্ম হবে এক ধরনের বৈষম্যের। বিংশ শতাব্দীতে ধনী ও গরিব দেশগুলোর মাঝে আর্থিক প্রশ্নে এক ধরনের বৈষম্যের জন্ম হয়েছিল। ধনী দেশ আরও ধনী হয়েছে, আর গরিব দেশ আরও গরিব হয়েছে। কিন্তু একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকে বিশ্ব প্রত্যক্ষ করতে যাচ্ছে ভ্যাকসিন নিয়ে নতুন ধরনের বৈষম্য। অনেক গরিব দেশের পক্ষেই কোভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন ক্রয় করা (প্রতি ব্যক্তির জন্য দুই ডোজ) সম্ভব হয়ে উঠবে না। একটি পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝাতে চেষ্টা করছি ধনী দেশগুলো কীভাবে ভ্যাকসিন নিয়ে এ বৈষম্য সৃষ্টি করেছে। কোন দেশ কী পরিমাণ ভ্যাকসিন কিনেছে, তা নিচের পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যাবে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ১৫৮ কোটি ৫০ লাখ ডোজ (বিশ্বের ভ্যাকসিন ক্রয়ের শতকরা ২১.৮ ভাগ), ভারত ১৫০ কোটি ডোজ (২০.৬৯ ভাগ), যুক্তরাষ্ট্র ১০১ কোটি ডোজ (১৩.৯৩ ভাগ), কোভাস্ক (যারা বিশ্বে বিনামূল্যে সরবরাহ করবে) ৭০ কোটি ডোজ (৯.৬৬ ভাগ), কানাডা ৩৫ কোটি ৮০ লাখ ডোজ (৪.৯৪ ভাগ), যুক্তরাজ্য ৩৫ কোটি ৭০ লাখ ডোজ (৪.৯২ ভাগ)। উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে- ইন্দোনেশিয়া ৩৩.৮০ কোটি (৪.৬৬ ভাগ) ও ব্রাজিল ১৯.৫০ কোটি (২.৭০ ভাগ)। বাংলাদেশের পরিমাণ ৩ কোটি ১ লাখ, যা বিশ্বের ০.৪২ ভাগ (Visual Capitalist, ১৮ ডিসেম্বর)। প্রাপ্ত তথ্যমতে ৭.২৫ বিলিয়ন ডোজ ভ্যাকসিনের প্রি-অর্ডার হয়ে গেছে। কী পরিমাণ অর্থ দেশগুলো ব্যয় করছে, তারও একটা হিসাব আমরা দিতে পারব। অর্থের পরিমাণটা অনেকটা এরকম : ইউরোপীয় ইউনিয়ন ১.৬ বিলিয়ন ডলার, যুক্তরাষ্ট্র ১ বিলিয়ন ডলার, কানাডা ৩৫৮ মিলিয়ন, জাপান ২৯০ মিলিয়ন, যুক্তরাজ্য ৩৫৭ মিলিয়ন, ইন্দোনেশিয়া ৩৩৮ মিলিয়ন, ব্রাজিল ১৯৬ মিলিয়ন। ভারতের জনসংখ্যা বেশি, তারা ব্যয় করেছে ১.৫ বিলিয়ন, আর কোভাস্ক ব্যয় করেছে ৭০০ মিলিয়ন ডলার।

ভ্যাকসিন এখনও সরবরাহ হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২১ সালের মাঝামাঝি তা পাওয়া যাবে। এখন সীমিত পরিসরে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে এ ভ্যাকসিনটি প্রয়োগ করা হচ্ছে। সুতরাং ভ্যাকসিনের প্রাপ্তি ও সরবরাহ যে অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে উঠবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এখানে ভ্যাকসিন নিয়েও কথা আছে। চারটি ভ্যাকসিন চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে বা পাওয়ার পথে। এর মাঝে ফাইজার/বায়োএনটেক উৎপাদিত ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে একটা সমস্যা রয়েছে। ভ্যাকসিনটি মাইনাস ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ফ্রিজে রাখতে হবে। ফলে অনেক গরিব দেশ এ ভ্যাকসিন সংরক্ষণ করতে পারবে না। পরিবহন করাও একটা ঝামেলা। মডার্নার তৈরি ভ্যাকসিন রাখতে হবে মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায়। বাকি দুটো- অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়/অ্যাস্ট্রাজেনেকা ও গামালিয়ার (স্পুটনিক-ভি) তৈরি ভ্যাকসিন- সাধারণ তাপমাত্রায় রাখা যাবে। ভ্যাকসিনের এ প্রতিযোগিতায় চীনা ভ্যাকসিন হারিয়ে গেছে। যদিও এটা ঠিক, বিশাল জনগোষ্ঠীর দেশ চীনে বিপুল পরিমাণ ভ্যাকসিন দরকার। এক সময় বলা হয়েছিল, চীন বিনামূল্যে উন্নয়নশীল বিশ্বে ভ্যাকসিন সরবরাহ করবে। কিন্তু এখন এ ব্যাপারে তেমন কিছু শোনা যায় না। তবে নিঃসন্দেহে ২০২১ সালে বিষয়গুলো আলোচিত হবে বারবার।

২০২১ সালে সারা বিশ্বের দৃষ্টি থাকবে জো বাইডেনের দিকে। ট্রাম্পের একগুঁয়েমি ও স্বৈরাচারী মনোভাব, তার বিচ্ছিন্নতাবাদ, আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে অস্বীকার করা (হু, ইউনেস্কো, প্যারিস চুক্তি) যুক্তরাষ্ট্রকে একঘরে করে ফেলেছিল। সেখান থেকে জো বাইডেন কীভাবে বেরিয়ে আসবেন, তা একটা প্রশ্ন। চীনের সঙ্গে কোন পর্যায়ে ও কতটুকু সম্পর্ক উন্নত হবে, সেটা একটা ‘ওয়ান মিলিয়ন ডলারের’ প্রশ্ন। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মাঝে এক ধরনের ‘বাণিজ্যযুদ্ধ’ চলছে। কোভিড-১৯ মোকাবেলা এবং বিশ্বে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার স্বার্থে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা ও ঐক্য প্রয়োজন। ট্রাম্পের আমলে এ সমঝোতা ভেঙে গিয়েছিল। শুধু তাই নয়, এশিয়ায় মার্কিন সেনা উপস্থিতি বাড়ানো, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনবিরোধী অবস্থান শক্তিশালী করা, ভারতের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক বৃদ্ধি করা- ট্রাম্প প্রশাসনের এসব সিদ্ধান্ত চীনবিরোধী এক ধরনের ‘কনটেনমেন্ট পলিসির’ জন্ম দিয়েছিল। বাইডেন প্রশাসন কি সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে? পেন্টাগন কি চাইবে চীনবিরোধী এই ‘অবস্থান’ থেকে একটি ‘প্রো-চীন’ নীতি গ্রহণ করতে? জো বাইডেন প্রশাসনের দিকে তাই তাকিয়ে থাকবে সারা বিশ্ব। ট্রাম্প প্রশাসনের আমলে মধ্যপ্রাচ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে- ইসরাইলের সঙ্গে কয়েকটি আরব দেশের (বাহরাইন, আরব আমিরাত, সুদান, মরক্কো) কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে। সৌদি আরবের সঙ্গেও পরোক্ষ সম্পর্ক স্থাপন করেছে ইসরাইল। সৌদি নিরাপত্তার এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করে ইসরাইল। এ ব্যাপারে বড় উদ্যোগ ছিল ট্রাম্প প্রশাসনের। জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তর হয়েছে ট্রাম্পের শাসনামলেই। কিন্তু এতে করে ফিলিস্তিন সমস্যা চাপা পড়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিন সংকটের সমাধানে যে মধ্যস্থতা করে আসছিল, ট্রাম্পের শাসনামলে তা অনেকটাই পরিত্যক্ত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রো-ইসরাইলি অবস্থান থেকে জো বাইডেন যুক্তরাষ্ট্রকে কতটুকু বের করে আনতে পারবেন, আদৌ পারবেন কিনা, সেটা একটা মৌলিক প্রশ্ন।

ট্রাম্প প্রশাসনের আমলে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত ‘সম্পর্ক’ ছিল বহুল আলোচিত। ট্রাম্প-কিম জং উন শীর্ষ বৈঠক (তিন তিনবার) নিয়ে মিডিয়ায় আলোচনার ঝড় বইলেও প্রত্যাশিত পারমাণবিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়নি। উপরন্তু নতুন করে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ প্রমাণ করেছে দেশটি কোনো পারমাণবিক আলোচনায় উৎসাহী নয়। ফলে জো বাইডেনের জন্য একটা চ্যালেঞ্জ হবে তিনি কীভাবে উত্তর কোরিয়াকে মোকাবেলা করবেন। জো বাইডেন ঘোষণা করেছেন, তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে যাবেন, প্যারিস জলবায়ু আলোচনায় আবার যোগ দেবেন। তার এ সিদ্ধান্ত ভালো, যৌক্তিক ও প্রশংসিত হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আবার বিশ্বকে নেতৃত্ব দেয়ার অবস্থায় ফিরে যাবে।

তবে বাইডেনের সামনে সমস্যা আছে অনেক। এক. বিশ্ব অর্থনৈতিক অবস্থায় স্থিতিশীলতা আনা। কোভিড-১৯জনিত কারণে উন্নয়নশীল বিশ্বের ঋণের পরিমাণ বেড়েছে। এর পরিমাণ ২০২০ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ১৫ ট্রিলিয়ন ডলারে। এ দেশগুলো এখন আর ঋণ পরিশোধ করতে পারছে না। ৮১টি দেশ আইএমএফের কাছে আবেদন করেছে অর্থ ছাড়ের। ২০২১ সালের শেষের দিকে এদের প্রয়োজন হবে অতিরিক্ত আরও ৭ ট্রিলিয়ন ডলার। ২০২০ সালেই জাম্বিয়া ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে দেউলিয়া হয়ে গেছে। জি-২০ভুক্ত দেশগুলো এ ব্যাপারে একটি 'Common Framework' রচনা করলেও মার্কিন কংগ্রসের সমর্থন তাতে পাওয়া যায়নি। সঙ্গত কারণে জো বাইডেন প্রশাসনের ভূমিকা এখানে হবে বড় (Atlantic Council, December 16. 2020) দুই. যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম ইউরোপ বড় ধরনের আর্থিক দুরবস্থার মধ্যে পড়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। বেকার সমস্যা বেড়েছে। একমাত্র চীনে কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও OECDভুক্ত প্রতিটি দেশের অর্থনীতি বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। এ থেকে উদ্ধার পেতে বাইডেন প্রশাসনকে একটি বড় ভূমিকা নিতে হবে। তিন. হংকংয়ের গণতান্ত্রিক আন্দোলন, তাইওয়ানে অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র বিক্রি এবং দক্ষিণ চীন সাগর এলাকায় মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতি বৃদ্ধি- এ তিনটি বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অনুসৃত নীতি যদি বাইডেন অনুসরণ করেন, তাহলে তা Ripple Effect (ঢেউ সৃষ্টি হয়ে তা ছড়িয়ে পড়া)-এর মতো বিশ্বের অন্যত্র ছড়িয়ে পড়বে এবং নতুন করে স্নায়ুযুদ্ধ-২-এর যে সম্ভাবনা (চীন বনাম যুক্তরাষ্ট্র), তা বৃদ্ধি পাবে। চার. কোভিড-১৯জনিত কারণে বিশ্ব বড় ধরনের খাদ্য সংকটে পড়তে যাচ্ছে। এতে করে ইয়েমেন, দক্ষিণ সুদান, নাইজেরিয়া, এমনকি ইথিওপিয়ার মতো দেশ এক ধরনের দুর্ভিক্ষের সম্মুখীন। খাদ্যদ্রব্যের অতিরিক্ত মূল্য, খাদ্য ঘাটতি এ সংকটকে আরও ঘনীভূত করবে। খোদ যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি পাঁচ পরিবারের একটি এক ধরনের খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।

যুক্তরাষ্ট্রে অনেক শিশু এখন অভুক্ত থাকছে (Brookings, May 6, 2020)। পাঁচ. লাতিন আমেরিকায় দারিদ্র্য শুধু সেখানকারই রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বড় সংকট সৃষ্টি করবে না, বরং তা খোদ যুক্তরাষ্ট্রে শরণার্থী সংকট সৃষ্টি, মানুষ আসার ঢল বৃদ্ধি করতে পারে। লাতিন আমেরিকায় ২০২০ সালে ৫২ মিলিয়ন মানুষ দরিদ্র হয়েছে, ২০২১ সালে বিশ্বব্যাংকের মতে তাতে আরও যোগ হবে ১৫০ মিলিয়ন মানুষ। সুতরাং চিন্তার কারণ রয়েছে যথেষ্ট। ছয়. তুরস্কের ‘নব্য অটোমান সাম্রাজ্যের’ তথাকথিত উত্থান জো বাইডেন প্রশাসনের জন্য আরেক চিন্তার কারণ। ন্যাটোতে থেকেও তুরস্ক রাশিয়ার এস-৪০০ মিসাইল ব্যবস্থা ক্রয় করেছে। ফলে সীমিত অর্থনৈতিক অবরোধের মুখে পড়েছে তুরস্ক। তুরস্ক সোমালিয়া, কাতার, লিবিয়া, ইরাক, সিরিয়া ও বলকান এলাকায় সেনা মোতায়েন করেছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের এসব অঞ্চলে যে কর্তৃত্ব রয়েছে তাতে চ্যালেঞ্জ করার শামিল।

বিশ্ব রাজনীতির এক কঠিন সংকটের সময় জো বাইডেন আগামী ২০ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করবেন। আগামী চার বছর তার জন্য যে সুখের হবে, তা মনে করার কোনো কারণ নেই।

ড. তারেক শামসুর রেহমান : প্রফেসর ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

tsrahmanbd@yahoo.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন