বড়দিন ঈশ্বরের ভালোবাসার প্রকাশ

 ড. ফাদার হেমন্ত পিউস রোজারিও 
২৫ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বড়দিন সমগ্র বিশ্বের খ্রিস্টবিশ্বাসীদের জন্য বড় আনন্দের দিন। অনেক সময় আমরা আনন্দ ও সুখ শব্দ দুটিকে একই অর্থে ব্যবহার করি।

কিন্তু আধ্যাত্মিক অর্থে আনন্দ শব্দটি একটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। কারণ, সুখের সঙ্গে জাগতিক অর্থ-সম্পদের বিষয়টি জড়িত থাকে অর্থাৎ জাগতিক অর্থ-সম্পদ দিয়েই আমরা সুখের মাপকাঠি নির্ধারণ করি।

কিন্তু আনন্দ শব্দটি একেবারেই ঐশ্বরিক। আমরা যখন ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভ করি, তার নিঃস্বার্থ ভালোবাসা উপলব্ধি করি, তখনই আনন্দিত হই। যিশুখ্রিস্ট বিশ্বের ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সব মানুষের মধ্যে এ আনন্দের বার্তা নিয়ে এসেছিলেন।

তিনি আমাদের ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভের পথপ্রদর্শন করেছেন এবং ঈশ্বরের ভালোবাসা আমাদের কাছে প্রকাশ করেছেন। এ জন্যই বড়দিনে আমরা ঈশ্বরের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার আশায় আনন্দে মেতে উঠি।

এবারের বড়দিনের আনন্দ একটু ব্যতিক্রম। সমগ্র বিশ্বের খ্রিস্টবিশ্বাসীদের যখন বড়দিনের আনন্দে মেতে ওঠার কথা, ঠিক তখন যেন এ উচ্ছল আনন্দে ছন্দপতন ঘটিয়েছে করোনাভাইরাসের প্রকোপ। সামান্য একটি ভাইরাসের কাছে মানুষ কত অসহায়, তা প্রমাণ করে দিয়েছে এ করোনাভাইরাস। এ অবস্থায় সমগ্র বিশ্ব যখন এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ধাবিত হচ্ছে, মানুষ যখন হতাশা আর অনিশ্চয়তায় নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে, তখনও বড়দিন আমাদের সামনে আশার আলোকবর্তিকা নিয়ে হাজির হয়। বড়দিন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় সৃষ্টিকর্তা আমাদের নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসেন, তিনি সবসময় আমাদের ভালোবাসেন এবং ক্ষমা করেন। সেই সত্যটিই যিশু আমাদের কাছে প্রচার করার জন্য এ ধরাধামে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তার অপর একটি নাম হল ‘ইম্মানুয়েল’, যার অর্থ ঈশ্বর আমাদের সঙ্গে।

বস্তুত, পৃথিবীতে যিশুখ্রিস্টের আবির্ভাব কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; বরং তার জন্মের সঙ্গে মানবসৃষ্টি তত্ত্বের আদি রহস্যের সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। বাইবেলের পুরনো নিয়মের শিক্ষানুসারে ঈশ্বর ছয় দিনে সমগ্র পৃথিবী ও প্রাণিকুল সৃষ্টি করার পর সেই পৃথিবীকে শাসন করার জন্য আদম ও হাওয়াকে সৃষ্টি করেন। তারা ছিলেন স্বর্গীয় ও অনন্ত জীবনের অধিকারী। কিন্তু ঈশ্বরের আদেশ অমান্য করে শয়তানের প্ররোচনায় নিষিদ্ধ ফল খাওয়ার ফলে আদম ও হাওয়া যে পাপ করেছিল, সেই পাপের শাস্তিস্বরূপ তারা ঈশ্বরের অভিশাপপ্রাপ্ত হয়ে যন্ত্রণা ও দুর্ভোগের জীবনপ্রাপ্ত হয়েছিল এবং মৃত্যুর সম্মুখীন হয়েছিল। বস্তুত পাপের ফল তিন ধরনের বিচ্ছিন্নতা তৈরি করে। প্রথমত, আত্মার মৃত্যু তথা মানুষের আত্মা ঈশ্বরের কাছ থেকে পৃথক হয়।

দ্বিতীয়ত, মানুষের আত্মা তার দেহ থেকে পৃথক হয় এবং তৃতীয়ত, চূড়ান্ত মৃত্যু অর্থাৎ মানুষের আত্মা তার দেহ ও মন থেকে পৃথক হয়ে এবং চিরকালের জন্য বিচ্ছিন্ন হয়ে আগুনে নিক্ষিপ্ত হয়। আদম ও হাওয়া তাদের পাপের মধ্য দিয়ে এ তিন ধরনের মৃত্যু তার মানবপরিবারে বয়ে এনেছিল। কিন্তু মানুষের প্রতি ঈশ্বরের ভালোবাসা ছিল অপরিমেয়। তাই শয়তান, পাপ ও মৃত্যুর হাত থেকে মানবজাতিকে রক্ষা করার জন্য ঈশ্বর এক মুক্তিদাতাকে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কুমারী মাতা মেরির গর্ভে যিশুর জন্মগ্রহণের মধ্য দিয়ে ঈশ্বরের সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়েছিল।

শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে আদম ঈশ্বরের অবাধ্য হয়ে ঈশ্বরের অগাধ ভালোবাসা ও সান্নিধ্য থেকে নিজেকে বঞ্চিত করে। ফলে সমগ্র মানবজাতি পাপের দাসত্ব শুরু করে। এ অবস্থায় যিশুখ্রিস্টের আগমন সমগ্র মানবজাতিকে সত্য, ন্যায়, ক্ষমা, দয়া আর ভালোবাসা প্রচারের মাধ্যমে পৃথিবীতে ঈশ্বরের রাজত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে। প্রথম আদম পাপ করে আমাদের পাপের মধ্য দিয়ে মৃত্যুর দিকে নিয়ে গেছেন। আর দ্বিতীয় আদম (যিশুখ্রিস্ট) আমাদের পাপ থেকে মুক্ত করে মুক্তির পথ দেখাতে এসেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমিই পুনরুত্থান ও জীবন, যে আমাকে বিশ্বাস করে সে মরিলেও বাঁচে’ (যোহন, ১১: ২৫)। যিশুর প্রকাশ্য জীবনের শুরুতে যখন বিশ্রামবারে সমাজগৃহে যান তখন প্রবক্তা যিশাইয়ার গ্রন্থ পাঠ করে নিজে আহ্বান আবিষ্কার করেন-‘প্রভুর আত্মা আমার ওপর আছেন।

কারণ, তিনিই আমাকে নিযুক্ত করেছেন যেন আমি গরিবের কাছে সুখবর প্রচার করি। তিনি আমাকে বন্দিদের কাছে স্বাধীনতার কথা, অন্ধদের কাছে দেখতে পাওয়ার কথা ঘোষণা করতে পাঠিয়েছেন। যাদের ওপর অত্যাচার হচ্ছে তিনি আমাদের তাদের মুক্ত করতে পাঠিয়েছেন। এ ছাড়া প্রভু আমাকে ঘোষণা করতে পাঠিয়েছেন, এখন তার দয়া দেখানোর সময় হয়েছে’ (লুক, ৪: ১৮-১৯)। বস্তুত অসহায়, নির্যাতিত, নিপীড়িত, শোষিত, বঞ্চিত, হতদরিদ্র মানুষের প্রতি দয়া দেখানোর জন্যই যিশুখ্রিস্টের আগমন ঘটেছিল।

পোপ ফ্রান্সিস এ করোনাকালীন বড়দিন উপলক্ষে তার দেয়া বাণীতে দয়ার কাজ এবং ঈশ্বরের সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য জাগ্রত থাকার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘যিশু প্রতিনিয়ত আমাদের জীবনে আসছেন। একমাত্র দয়ার কাজের মাধ্যমেই তার সঙ্গে মিলিত হওয়া যাবে। দয়ার কাজ একজন খ্রিস্টবিশ্বাসীর কাছে হৃদস্পন্দনের মতো। হৃদস্পন্দন ছাড়া যেমন কেউ বাঁচতে পারে না, তেমনি দয়ার কাজ ছাড়া একজন প্রকৃত খ্রিস্টবিশ্বাসী হওয়া যায় না।’ দয়ার কাজ মানব পরিত্রাণের জন্য এতই গুরুত্বপূর্ণ যে, শেষবিচারের দিনে এ দয়ার কাজের মানদণ্ডে সবাইকে বিচার করা হবে।

পবিত্র বাইবেলে বর্ণিত আছে: ‘এরপর রাজা (যিশু) তার ডানদিকের লোকদের বলবেন, তোমরা যারা আমার পিতার আশীর্বাদ পেয়েছ, এসো। জগতের আরম্ভে তোমাদের জন্য যে জগৎ প্রস্তুত রাখা হয়েছে তার অধিকারী হও। যখন আমার খিদে পেয়েছিল তখন তোমরা আমাকে খেতে দিয়েছিলে। যখন পিপাসা পেয়েছিল তখন জল দিয়েছিলে। যখন অতিথি হয়েছিলাম তখন আশ্রয় দিয়েছিলে। যখন খালি গায়ে ছিলাম তখন কাপড় দিয়েছিলে। যখন অসুস্থ হয়েছিলাম তখন আমার দেখাশোনা করেছিলে। আর যখন আমি জেলখানায় বন্দি ছিলাম তখন আমাকে দেখতে গিয়েছিলে। তখন সেসব লোক উত্তরে তাকে বলবে, প্রভু আপনার খিদে পেয়েছে দেখে তখন আপনাকে খেতে দিয়েছিলাম; বা পিপাসা পেয়েছে দেখে তখন আপনাকে জল দিয়েছিলাম। কখনোই বা আপনাকে অতিথি হিসেবে আশ্রয় দিয়েছিলাম; কিংবা খালি গায়ে দেখে কাপড় দিয়েছিলাম?

আর কখনোই বা আপনাকে অসুস্থ বা জেলখানায় আছেন জেনে আপনার কাছে গিয়েছিলাম? এর উত্তরে রাজা (যিশু) তখন তাদের বলবেন, ‘আমি তোমাদের সত্যি বলছি, আমার এ ভাইদের মধ্যে সামান্য কোনো একজনের জন্য যখন তা করেছিলে, তখন আমারই জন্য তা করেছিলে’ (মথি ২৫: ৩১-৪১)। বাইবেলের এ বর্ণনা থেকে সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায়, দয়ার কাজের মাধ্যমেই যিশুর ভালোবাসা লাভ করা যায়। তাই আমরা যখন বড়দিনের উৎসব পালন করি, তখন যেন দয়ার কাজের প্রতি মনোনিবেশ করি। বিশেষ করে এ করোনাকালীন একটি বৈশ্বিক দুর্যোগের সময় সমাজের প্রতিটি ধনী ব্যক্তির দায়িত্ব রয়েছে দরিদ্র ও অসহায়দের সাহায্য করার। মানুষ হিসেবে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর। প্রতিবেশীর খোঁজখবর রাখার। তাহলে বড়দিনের আনন্দ আরও উপভোগ্য হবে।

বড়দিন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় এ ইহজগতে মানবদেহ ধারণ করে যিশুর জন্মলাভের কথা। যিশু আমাদের মুক্তির জন্য জন্মেছিলেন।

তিনি ক্রুশীয় মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে কবরপ্রাপ্ত হলেন, তিন দিন পর মৃত্যুকে জয় করে কবর থেকে পুনরুত্থিত হয়ে প্রায়শ্চিত্ত সাধনের মধ্য দিয়ে আমাদের জন্য পরিত্রাণের সুযোগ করে দিলেন, যেন আমরা পাপ থেকে পরিত্রাণ লাভ করি। যোহন ১:২৯ পদে, ‘ওই দেখ ঈশ্বরের মেষ শাবক, যিনি জগতের পাপভার লইয়া যান।’

বড়দিনের বাণীতে পোপ ফ্রান্সিস যিশুর পুনরাগমনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে আমাদের সজাগ থাকার উপদেশ দিয়েছেন।

কারণ, আমরা যখন জাগতিক জীবন নিয়ে অতিরিক্ত ব্যস্ত হয়ে পড়ি তখন যিশু আসবেন; কিন্তু আমরা তাকে চিনতে পারব না।

যিশু আসবেন দীন বেশে, যিশু আসবেন আর্তপীড়িতের কাছে, যিশু আসবেন অসহায় মানুষের কাছে, যিশু আসবেন নির্যাতিত-নিপীড়িত, শোষিত-বঞ্চিত মানুষের কাছে। তিনি আসবেন অসুস্থ মানুষের পাশে।

তাই আমরা যদি আমাদের সব জাগতিকতা, স্বার্থপরতা, হিংসা, বিদ্বেষ, লোভ-লালসা ভুলে গিয়ে এসব দীন-দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি মনোযোগী হই এবং নিজ নিজ সামর্থ্য অনুসারে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিই, তবেই তাদের মাঝে যিশুর মুখ দেখতে পাব।

আমরা এ বড়দিন উৎসবকে সামনে রেখে যদি যিশুর আগমনের জন্য সজাগ থাকি, মানবসেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখার সংকল্প করি, তাহলেই বড়দিনের আনন্দ সার্থক হবে।

ড. ফাদার হেমন্ত পিউস রোজারিও, সিএসসি : অধ্যক্ষ, নটর ডেম কলেজ, ঢাকা

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন