একাদশ সংসদ নির্বাচনের বর্ষপূতি কাল

আ’লীগ-বিএনপির পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি

 যুগান্তর রিপোর্ট 
২৯ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি আগামীকাল ৩০ ডিসেম্বর। ২০১৮ সালের এইদিন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে টানা তৃতীয়বারের মতো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসে।

নির্বাচনে বিএনপির চরম ভরাডুবি হয়। কারচুপির অভিযোগ এনে ভোটের ফল বর্জন করে পুনরায় নির্বাচনের দাবি জানায় দলটি। দিনটিকে আওয়ামী লীগ ‘গণতন্ত্রের বিজয় দিবস’ ও বিএনপি ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে মাঠে থাকার ঘোষণা দিয়েছে। কয়েকটি বামপন্থী দলও ‘কালো দিবস’ হিসেবে পালন করবে।

দিনটিকে কেন্দ্র বড় দুই দলের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ঘোষণায় বছরের শেষদিকে রাজনৈতিক অঙ্গনে কিছুটা উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। তবে নির্বাচনের বর্ষপূর্তিকে কেন্দ্র করে রাজপথে কেউ যাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে সে ব্যাপারে সক্রিয় রাখা হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে।

নির্বাচনের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি ঘিরে ইতোমধ্যে আলোচনা সভা, আনন্দ র‌্যালি, বিজয় মিছিলসহ নানা কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে আওয়ামী লীগ। পাশাপাশি তাদের সহযোগী সংগঠনগুলোরও নানা কর্মসূচি নিয়ে মাঠে থাকার পরিকল্পনা আছে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এক বিবৃতিতে ‘গণতন্ত্রের বিজয় দিবস’ উপলক্ষে কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ ঘোষিত কর্মসূচি স্বাস্থ্যসুরক্ষা বিধি মেনে যথাযথভাবে পালনের জন্য দেশের সব জেলা, মহানগর, উপজেলা ও থানা আওয়ামী লীগসহ সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম যুগান্তরকে বলেন, প্রতিটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র সুসংহত হয়। গণতন্ত্র অব্যাহত রাখার এই ধরাকে আমরা জণগণ ও গণতন্ত্রের বিজয় হিসেবেই মনে করি। তাই দিনটিকে আমরা ‘গণতন্ত্রের বিজয় দিবস’ হিসেবে পালন করব। এ উপলক্ষে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কর্মসূচির পাশাপাশি সারা দেশে কর্মসূচি পালন করা হবে।

বুধবার সকাল ১১টায় রাজধানীর কৃষিবিদ ইন্সটিটিউশন মিলনায়তনে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগ আলোচনা সভার আয়োজন করবে। একইদিন বিকাল ৩টায় ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আলোচনা সভায় আয়োজন করবে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগ। এসব কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও মহানগর নেতারা উপস্থিত থাকবেন।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ৩০ ডিসেম্বর ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে অস্থায়ী মঞ্চ তৈরি করা হবে। সেখানে সকাল থেকে নেতাকর্মীরা জড়ো হবেন। বিকালে সেখানেই ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া ‘গণতন্ত্রের বিজয় দিবস’ পালন করার লক্ষ্যে রাজধানীর বিভিন্ন থানা, ওয়ার্ড ও পাড়া-মহল্লার নেতা-কর্মীদের বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগ ও দলের কেন্দ্রীয় নেতারা। ওইসব কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের সাফল্য, অর্জন ও উন্নয়নের কথা তুলে ধরে তৃণমূলে বিশেষ দিক-নির্দেশনামূলক বার্তা দেয়া হচ্ছে।

জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ বজলুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ৩০ ডিসেম্বর আমরা গণতন্ত্রের বিজয় দিবস পালন করব। দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম আশরাফ তালুকদার বলেন, ‘গণতন্ত্রের বিজয় দিবসে’ ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আ’লীগের সব থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিয়নের নেতাকর্মীদের পাড়া-মহল্লায় সতর্ক অবস্থানে থাকতে বলা হয়েছে। দিনটি উপলক্ষে রাজধানীর ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সামনে থেকে আনন্দ র‌্যালি করবে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।

ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য যুগান্তরকে বলেন, আমরা বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালন করব। ইতোমধ্যে ঢাকা মহানগরসহ সারা দেশের নেতাকর্মীদের এ উপলক্ষে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ‘গণতন্ত্রের বিজয় দিবসে’ শোভাযাত্রা করবে বাংলাদেশ কৃষকলীগ। কৃষকলীগের র‌্যালিটি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার হয়ে হাইকোর্ট ও জাতীয় প্রেস ক্লাব ঘুরে পল্টন হয়ে আবার আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে গিয়ে শেষ হবে। সারাদেশে মিছিল ও সমাবেশ করবে যুবলীগ। এছাড়া দলের অন্যান্য সহযোগী এবং সমমনা সংগঠনগুলো নানা কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এদিকে বর্ষপূর্তি পালনে জোটগতভাবে ১৪ দল এখন পর্যন্ত কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করেনি। জানতে জাইলে জাতীয় পার্টির (জেপি) মহাসচিব শেখ শহিদুল ইসলাম সোমবার সন্ধ্যায় যুগান্তরকে বলেন, বর্ষপূর্তি ঘিরে আমাদের দলের কোনো কর্মসূচি নেই। জোটগতভাবে ১৪ দলেরও এখন পর্যন্ত কোনো কর্মসূচির বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি।

অন্যদিকে বিএনপি দিনটিকে ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ হিসেবে পালনে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। ওইদিন ঢাকাসহ দেশের সব মহানগর ও জেলা শহরগুলোতে বিক্ষোভ সমাবেশের কর্মসূচি পালন করবে দলটি। কেন্দ্রীয়ভাবে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ও উত্তর যৌথভাবে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সকাল ১১টায় সমাবেশ করবে। এ দিন বিএনপি নেতাকর্মীরা কালো ব্যাজ ধারণ করবে। কেন্দ্রীয়সহ সারাদেশের দলীয় কার্যালয়গুলোতে উত্তোলন করা হবে কালো পতাকা। শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালনে নেতাকর্মীদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কোনো ফাঁদে পা না দিতে সবাইকে সতর্ক করা হয়েছে।

তবে অনুমতি ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সমাবেশ করতে দেবে কি না তা নিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে নানা শঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে। অনুমতির দোহাই দিয়ে কর্মসূচিতে বাধা এমনকি নেতাকর্মীদের আটক করা হতে পারে বলেও অনেকে আশঙ্কা করছেন। আগামীকাল ৩০ ডিসেম্বর গণতন্ত্র হত্যা দিবস হিসেবে পালন করবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি। ওইদিন ৩টায় দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।

জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ২০১৮ সালে ৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আগের রাতে ভোট ডাকাতির ও তথাকথিত একটি প্রহসনের কলঙ্কিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের মানুষ এই দিনটিকে ক্ষোভ ও ঘৃণার সঙ্গে স্মরণ করে। এই প্রহসনের নির্বাচনে বর্তমান অনির্বাচিত আওয়ামী লীগ সরকার, অযোগ্য নির্বাচন কমিশন ও রাষ্ট্রযন্ত্রের যোগসাজশে জনগণের ভোটের অধিকার হরণ করে ক্ষমতা দখল করে। ভোটাধিকারকে হরণ করে ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা গণতন্ত্রকে হত্যা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দেশে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন প্রয়োজন। নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে দ্রুত একটি নির্বাচনের দাবি আমরা করে আসছি। এ দাবিতে আমাদের চলমান কর্মসূচি অব্যাহত আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কাজী আবুল বাশার যুগান্তরকে বলেন, ৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কালো দিন। এ দিনে দেশের গণতন্ত্রকে হরণ করা হয়েছে। সেদিন কী ঘটেছিল তা দেশবাসীকে জানানোর জন্য আমরা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করব।

ওইদিন কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হব। এ কর্মসূচি সফল করতে মহানগরসহ সব স্তরের নেতাকর্মীদের অংশ নিতে আহ্বান জানিয়েছি। শান্তিপূর্ণ এ কর্মসূচিতে সরকার কোনো বাধার সৃষ্টি করবে না বলে আমরা আশা করছি।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন