শেবামেক হাসপাতাল

স্বানাপ নেতার হাতে জিম্মি ৯৫০ নার্স

 আকতার ফারুক শাহিন, বরিশাল ব্যুরো 
২৭ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

স্বাধীনতা নার্সেস পরিষদের (স্বানাপ) সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (শেবামেক) ৯৫০ নার্সকে জিম্মি করার অভিযোগ উঠেছে। দায়িত্ব পাওয়ার পর মাত্র দেড় বছরের মধ্যে তিনি সব কিছু নিয়ন্ত্রণে নেন। এছাড়া তাকে বেআইনিভাবে নার্স সুপারভাইজারের দায়িত্ব দেয়ারও অভিযোগ উঠেছে। সিনিয়রিটি লঙ্ঘন করে তাকে পদোন্নতি দেয়ায় নার্সরা ভেতরে ভেতরে ক্ষোভে ফুসছেন।

অভিযোগ- সম্প্রতি সিনিয়রিটি লঙ্ঘন করে স্টাফ নার্স পদে (১০ম গ্রেড) চাকরি করা মোস্তাফিজুরকে নার্স সুপারভাইজারের দায়িত্ব দেয়া হয়। হাসপাতালের পরিচালক ডা. বাকির হোসেনের প্রশ্রয়ে নিয়মবহির্ভূত পদোন্নতির পাশাপাশি মোস্তাফিজ নিজেকে শেবামেকের একচ্ছত্র অধিপতিতে পরিণত করার সুযোগ পেয়েছেন। পরিচালকের আস্থাভাজন হওয়ায় তার বিরুদ্ধে কেউ কিছু বলার সাহস পায় না। তবে তার বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ পেয়ে নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদফতর নড়েচড়ে বসেছে। তার বিরুদ্ধে উঠা দুর্নীতির অভিযোগগুলোর কারণ দর্শাতে বলেছেন অধিদফতরের মহাপরিচালক। তবে মোস্তাফিজের দাবি- নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্বের কারণে তার বিরুদ্ধে এসব অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।

দেড় বছর আগে স্টাফ নার্স মোস্তাফিজ শেবামেক হাসপাতালের স্বানাপের সভাপতি হন। নির্বাচিত কমিটি থাকা সত্ত্বেও হঠাৎ করে মোস্তাফিজকে সভাপতি এবং শাহীনা আক্তারকে সাধারণ সম্পাদক করে কমিটি ঘোষণা করা হয়। অনেকের অভিযোগ- পরিচালক ডা. বাকির হোসেনের সরাসরি হস্তক্ষেপে কমিটি গঠিত করা হয়। মোস্তাফিজ অবশ্য তা স্বীকার করেননি। আগের কমিটির সভাপতি ও সম্পাদকসহ তিন নেতার বদলির কারণে শূন্যতার সৃষ্টি হলে সাধারণ নার্সদের দাবির মুখে সভাপতি হতে বাধ্য হন বলে দাবি তার। সভাপতির দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে তার আধিপত্য বিস্তারের খেলা শুরু হয়।

বেশ কয়েকজন নার্স বলেন, নার্সদের ব্যাপারে মোস্তাফিজ যা বলেন হাসপাতালের পরিচালক তাই করেন। তখন বোঝার কিছু বাকি থাকে না। একই কারণে মোস্তাফিজের ব্যাপারে কিছু বলার সাহস পাই না। এখান থেকে দুর্গম কোনো স্থানে বদলি করে দেয়ার আতঙ্ক থাকে। বদলি ও হয়রানির শিকার হওয়ার আতঙ্কে প্রকাশ্যে কিছু না বললেও বহু নার্স তাদের ওপর মোস্তাফিজের চালানো অত্যাচারের ফিরিস্তি দিয়েছেন।

নার্সদের দেয়া তথ্যানুযায়ী- দায়িত্ব পাওয়ার পর মোস্তাফিজ মাসিক বিল করে দেয়ার কথা বলে ৯১৮ নার্সের কাছ থেকে মাসে ৫০ টাকা করে আদায় শুরু করেন। এভাবে বেশ কয়েক মাস টাকা তোলার পর বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ সৃষ্টি হলে ৫০ টাকার পরিবর্তে ২০ টাকা নেয়া শুরু হয়। এখনও এভাবেই চলছে টাকা আদায়। কোনো নার্স বদলি হলে তার ফরোয়ার্ডিংয়ের দরকার হয়। এ ফরোয়ার্ডিং পেতে মোস্তাফিজকে ১০ হাজার করে টাকা দিতে হয়। তার ইশারা ছাড়া মেলে না ফরোয়ার্ডিংয়ের কাগজ। বিভিন্ন সময় নার্সদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। এ প্রশিক্ষণের তালিকায় জায়গা পেতেও মোস্তাফিজকে টাকা দিতে হয়। ৭ থেকে ২৮ দিন মেয়াদি প্রশিক্ষণের তালিকায় নাম উঠাতে ১ থেকে ৩ হাজার টাকা করে নেন তিনি। টাকা না দিলে প্রশিক্ষণের সুযোগ মেলে না। হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ২ বছর পরপর নার্সদের ভেতর থেকে ওয়ার্ড ইনচার্জ নিয়োগের বিধান থাকলেও তা পালন করা হয় না। অধিকাংশ নার্স তার বিপক্ষে হওয়ায় প্রতিপক্ষের লোকজনের হাতে ক্ষমতা চলে যাওয়ার ভয়ে প্রক্রিয়াটি বন্ধ রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ।

সভাপতি হওয়ার পর মোস্তাফিজ কাগজে-কলমে নাইট-ডিউটি করেছেন দেখানো হলেও বাস্তবে দেড় বছরে তিনি নাইট-ডিউটি করেননি। এছাড়া করোনাভাইরাসের চরম সময় মাথাপিছু ২ হাজার করে টাকা নিয়ে অনুগত নার্সদের করোনা ডিউটি থেকে নাম বাদ দিয়ে দিয়েছেন বলেও অভিযোগ।

নার্সিং সুপারভাইজারের দায়িত্ব পেতে মোস্তাফিজ বিধি-বিধানের পুরোটাই উল্টে দিয়েছেন বলে অভিযোগ। অভ্যন্তরীণ আদেশে সিনিয়র নার্সদের মধ্য থেকে সুপারভাইজার নিয়োগের জন্য আবেদন চাওয়া হলে ৩৫ জন আবেদন করেন। এ তালিকায় মোস্তাফিজের নাম ছিল ২৪ নম্বরে। প্রশ্নবিদ্ধ যাচাই-বাছাই শেষে সাতজনকে সুপারভাইজার পদে নিয়োগ দেয়া হয়। এ তালিকার ১ নম্বরে মোস্তাফিজের নাম রাখা হয়। অথচ ৩৫ জনের মধ্যে জ্যেষ্ঠতার ক্রমানুসারে তার অবস্থান অনেক নিচে। ১৯৯৩ সালে তার চাকরি হয়। অথচ ১৯৯০ সালে চাকরি হওয়া অনেকে সুপারভাইজারের দায়িত্ব পাননি।

সুপাভাইজারের দায়িত্ব পাওয়াসহ অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে ঢাকার নার্সিং মিডওয়াইফারি অধিদফতর থেকে মোস্তাফিজকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়। উপ-সচিব শোভা শাহনাজ স্বাক্ষরিত নোটিশে ৭ দিনের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়। নোটিশ পাওয়ার পরপরই সাধারণ নার্সদের কাছ থেকে সাদা কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে মোস্তাফিজের নিজের পক্ষে সাফাই গাওয়ার কাগজ তৈরির অভিযোগ উঠে। নোটিশের জবাবের সঙ্গে দেয়া বেশ কিছু কাগজপত্র নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তার জবাবে সুপারিশ করেছেন নার্সিং তত্ত্বাবধায়ক সেলিনা আক্তার। একইসঙ্গে তাকে ধোয়া তুলসী পাতার সার্টিফিকেট দিয়েছেন পরিচালক ডা. বাকির। নোটিশের জবাবের সঙ্গে এসব কাগজ দেয়ার পেছনে কি কারণ থাকতে পারে সেটাই প্রশ্ন সাধারণ নার্সদের। মোস্তাফিজ না টিকলে ক্ষমতায় টান পড়বে এ ভয়ে আগ বাড়িয়ে চারিত্রিক সনদপত্র দিয়েছেন পরিচালক।

এ বিষয়ে কথা বলতে পরিচালক ডা. বাকির হোসেনের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দেয়া হলেও তিনি ধরেননি।

সব অভিযোগ সম্পর্কে মোস্তাফিজ বলেন- এসব মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও বানোয়াট। আমার প্রতিপক্ষরা এসব অপপ্রচার চালাচ্ছে। আমি সভাপতি হতে চাইনি। সাধারণ নার্সরা আমাকে জোর করে সভাপতির দায়িত্ব দিয়েছেন। ২৮ বছর ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে চাকরি করার ফলে নার্সিং সুপারভাইজার হয়েছি। এখানে কোনো অনিয়ম হয়নি। আর্থিক দুর্নীতির যেসব অভিযোগ করা হয়েছে সেসবও সত্য নয়।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন