চসিক নির্বাচন

আ’লীগের বিদ্রোহীরা হুশিয়ারিতেও অনড়

 মজুমদার নাজিম উদ্দিন, চট্টগ্রাম 
২৭ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) নির্বাচন থেকে সরে যেতে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থীরা কেন্দ্রের হুশিয়ারি আমলে নিচ্ছেন না। নির্বাচনী মাঠে তারা অনড় অবস্থানে রয়েছেন। তাদের দাবি, অনেক ওয়ার্ডে ত্যাগী নেতাকে বাদ দিয়ে বিতর্কিত ও হাইব্রিড নেতাকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। দল সমর্থিত প্রার্থীর সঙ্গে লড়াই করেই তারা জয় ছিনিয়ে আনবেন। এ ব্যাপারে তারা আত্মবিশ্বাসী।

নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থী পরিবর্তন কিংবা পুনর্বিবেচনার জন্য কেন্দ্র থেকে প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেকমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তবে এ বিষয়ে মনোনয়ন প্রত্যাশী কিংবা বিদ্রোহী প্রার্থীদের কোনো আবেদন তিনি আমলে নিচ্ছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে।

১৯ ডিসেম্বর চট্টগ্রামে এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেন, চসিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর বাইরে যারা প্রার্থী হবেন এবং বিদ্রোহী প্রার্থীদের পক্ষে যারা কাজ করবেন তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। বিদ্রোহী প্রার্থীদের ব্যাপারে দলের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর। এমন হুশিয়ারির পরও নির্বাচনী লড়াই থেকে পিছু হটতে রাজি নন বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থীরা। তারা নিজেদের মতো করে নির্বাচনী প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছেন। আগামী ২৭ জানুয়ারি চসিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

দলীয় সূত্র জানায়, মেয়র পদে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী নেই। কিন্তু ৪১টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৩৫টিতে বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থী রয়েছেন। কোনো কোনো ওয়ার্ডে একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী আছেন। সংরক্ষিত নারী ওয়ার্ডের কয়েকটিতে বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। সব মিলিয়ে বিদ্রোহী প্রার্থীর সংখ্যা শতাধিক। বিদ্রোহী প্রার্থীদের মধ্যে ১১ জন সাবেক কাউন্সিলর আলোচনায় আছেন। এবার তারা দলের সমর্থন পাননি। দল সমর্থিত প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারেন তারা।

যারা এবার দলীয় সমর্থন পাননি তারা হলেন- ১১ নম্বর দক্ষিণ পাহাড়তলীর তৌফিক আহমদ চৌধুরী, ৯ নম্বর উত্তর পাহাড়তলীর জহুরুল আলম জসিম, ২ নম্বর জালালাবাদ ওয়ার্ডের সাহেদ ইকবাল বাবু, ১১ নম্বর দক্ষিণ কাট্টলী ওয়ার্ডের মোরশেদ আকতার চৌধুরী, ১২ নম্বর সরাইপাড়ার সাবের আহমেদ, ১৪ নম্বর লালখান বাজারের এফ কবীর মানিক, ২৫ নম্বর রামপুরা ওয়ার্ডের এসএম এরশাদ উল্যাহ, ২৭ নম্বর দক্ষিণ আগ্রাবাদ ওয়ার্ডের এইচএম সোহেল, ২৮ নম্বর পাঠানটুলি ওয়ার্ডের আবদুল কাদের, ৩৩ নম্বর ফিরিঙ্গি বাজার ওয়ার্ডের হাসান মুরাদ।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ৪ নম্বর চান্দগাঁও ওয়ার্ডে বর্তমান কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী সাইফুদ্দিন খালেদ সাইফুর বিরুদ্ধে ওয়ার্ড যুবলীগ নেতা আনিসুর রহমান, গিয়াস উদ্দিন জাহেদ ও নাসির উদ্দিন নির্বাচন করছেন। তাদের অভিযোগ, সাইফু এলাকায় বিতর্কিত। পাঁচ বছর কাউন্সিলর থাকাকালে তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ওঠে। তার কারণে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। এত কিছুর পরও তৃণমূলের মতামত উপেক্ষা করে তাকে দলীয় সমর্থন দেয়ায় স্থানীয় নেতাকর্মীরা বিস্মিত হয়েছেন। এ ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থী পুনর্বিবেচনার জন্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের কাছে অনেকে আবেদন জানালেও তিনি তাতে কর্ণপাত করছেন না। নগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নোমান আল মাহমুদ যুগান্তরকে বলেন, বেশির ভাগ ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। তারা মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের নিষ্ক্রিয় রাখার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

২ নম্বর জালালাবাদ ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা সাহেদ ইকবাল বাবু নির্বাচনী লড়াই থেকে সরবেন না বলে যুগান্তরকে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, দলের সমর্থন দেয়ার ক্ষেত্রে নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি। নেতাকর্মীদের বেশির ভাগ আমার পক্ষে। কেন আমাকে সমর্থন না দিয়ে অন্যজনকে সমর্থন দেয়া হয়েছে তা বোধগম্য নয়। আমি জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। আমাকে বসিয়ে দিলে কেন্দ্রে ভোটার যাবে না। এতে মেয়র প্রার্থীর ওপর প্রভাব পড়বে।

দলীয় সমর্থন না পাওয়ার কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না ১২ নম্বর সরাইপাড়া ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী আওয়ামী লীগ নেতা সাবের আহমেদ। তিনি বলেন, গতবার আমি আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে পাঁচ হাজার ভোট বেশি পেয়ে নির্বাচিত হয়েছি। এবার কেন দল সমর্থন দিল না, সেটাই প্রশ্ন। নির্বাচন করার সিদ্ধান্তে আমি অনড়। কারণ আমি মাঠে না থাকলে ১০ হাজার পরিবার ভোটকেন্দ্রে যাবে না।

৩৬ নম্বর গোসাইলডাঙ্গা ওয়ার্ডে বর্তমান কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী দলীয় সমর্থন পেয়েছেন। কিন্তু ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের ২ নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক সাইফুল আলম চৌধুরী ও ৩ নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক মোরশেদ আলী বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন। তাদের সরিয়ে দেয়ার ব্যাপারে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছেন না।

নির্বাচন থেকে পিছিয়ে আসার কোনো সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন ৩৩ নম্বর ফিরিঙ্গিবাজার ওয়ার্ডের প্রার্থী সাবেক কাউন্সিলর ও যুবলীগ নেতা হাসান মুরাদ বিপ্লব। তিনি বলেন, আমার দলীয় সমর্থন না পাওয়াটা ছিল একটি ষড়যন্ত্র। নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীনের সঙ্গে আমি রাজনীতি করি বলে আমাকে বঞ্চিত করা হয়েছে। করোনাকালে নেতাকর্মীদের দ্বারে দ্বারে গিয়েছি। নিজের পকেটের টাকায় অনেককে সাহায্য-সহযোগিতা করেছি। সপরিবারে করোনায় আক্রান্ত হয়েছি। এত ত্যাগ স্বীকারের পরও যদি বলা হয় নির্বাচন করতে পারবেন না, তা কি মেনে নেয়া সম্ভব?

১১ নম্বর দক্ষিণ কাট্টলী ওয়ার্ডে দল সমর্থিত প্রার্থীর সঙ্গে নির্বাচন করছেন আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক কাউন্সিলর মোরশেদ আকতার চৌধুরী। তিনি বলেন, নির্বাচন থেকে পিছপা হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এর আগে আমি দুইবার নির্বাচন করে জিতেছি। এবার মহানগর আওয়ামী লীগ থেকে কেন্দ্রে কোনো তালিকা পাঠানো হয়নি। এছাড়া কাউন্সিলর পর্যায়ের নির্বাচন সবার জন্য উন্মুক্ত। নির্বাচন করতে আমার ওপর এলাকাবসীর প্রবল চাপ আছে। দলের নেতাকর্মীরাও আমার সঙ্গে আছে। আমি জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন