খায়রুলের ফ্লিট বাংলাদেশে এখন পাঁচ শতাধিক কর্মী

রাজশাহী হাইটেক পার্কে বাড়ছে কর্মসংস্থান

 যুগান্তর রিপোর্ট 
০৩ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
রাজশাহী হাইটেক পার্কে কাজ করছে তরুণ-তরুণীরা
রাজশাহী হাইটেক পার্কে কাজ করছে তরুণ-তরুণীরা

রাজশাহীর শেখ কামাল আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন ভবনে ফ্লিট বাংলাদেশ নামে একটি তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, যেখানে কাজ করছেন রাজশাহীর পাঁচ শতাধিক তরুণ-তরুণী। ফ্লিটের কার্যক্রম দেখে এবং তাদের অফিস ভিজিট করে তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক ও বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হোসনে আরা বেগম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হাইটেক পার্কেও ইতোমধ্যে জায়গা দেয়ার ব্যাপারে সম্মতি জানিয়েছেন। যাতে করে ৫০০ ছেলে মেয়ে এক সঙ্গে এক ছাদের নিচে কাজ করতে পারেন। আরও বেশি কর্মসংস্থান হতে পারে। তারও আগে ছিলেন সাধারণ এক তরুণ, যার বিশেষ কোনো পরিচয় ছিল না। ক্রমান্বয়ে সাধারণ থেকে অনন্য এবং কর্মী থেকে কর্মদাতা হয়ে উঠেছেন তিনি। সম্প্রতি সে গল্পই শুনিয়েছেন। আজ আমরা সেই তরুণ উদ্যোক্তার গল্প শুনবো। আজকের আইটি বিশ্বের আয়োজনে ফ্লিট বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা সেই তরুণ উদ্যোক্তা খায়রুল আলমের সাফল্যের গল্প।

যেভাবে শুরু

খায়রুল আলম কাজ করতেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। ভালো চাকরি। বেতনও ভালো। সবকিছু ঠিকঠাক ছিল। তবে হুট করে একদিন কী মনে হলো, চাকরি ছেড়ে দিয়ে নিজেই আউটসোর্সিংয়ের প্রতিষ্ঠান খুলে বসলেন। নাম দিলেন ফ্লিট বাংলাদেশ। তরুণদের আহ্বান জানালেন যোগ দেওয়ার। সে আহ্বানে সাড়া দিয়ে যোগ দিলেন ১০ জন তরুণ। তখন থেকেই খায়রুলের পথ চলা শুরু।

যে কাজ করেন

রাজশাহীতে ১০ জন তরুণ নিয়ে যাত্রা শুরু করে খায়রুলের ফ্লিট বাংলাদেশ । এরপর থেকে কর্মীসংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলেছে, স্থায়ী কর্মীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চুক্তিভিত্তিক কর্মীও। নিজ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বর্তমানে অ্যামাজন, ওয়ালমার্ট ও ই-বের মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি তিন শতাধিক প্রতিষ্ঠানে গ্রাহকসেবা দিয়ে থাকেন খায়রুল আলম। সেবাগুলোর মধ্যে রয়েছে অ্যামাজন ভেন্ডার ব্যবস্থাপনা, ফুলফিলমেন্ট বাই অ্যামাজন, অ্যামাজন প্রাইভেট লেভেল প্রোডাক্ট, ওয়ালমার্ট স্টোর ব্যবস্থাপনা ও ই-বে স্টোর ব্যবস্থাপনা। তা ছাড়া ফনেক্স গ্রুপ, অ্যাশলি ফার্নিচারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সরাসরি গ্রাহকসেবা দিয়ে থাকে তার প্রতিষ্ঠান। আর ফ্লিট বাংলাদেশের গ্রাহকদের জন্য রয়েছে নিজস্ব ইনভেনটরি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম।

যেভাবে ফ্রিল্যান্সার হিসেবে যাত্রা

২০০৫ সালে বিটিভির এক অনুষ্ঠানে খায়রুল দেখেছিলেন কীভাবে সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠানে কর্মীরা কাজ করেন। আগ্রহের শুরু তখন থেকেই। ২০০৭ সালে এইচএসসি পাস করেন খায়রুল। এরপর থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি খণ্ডকালীন চাকরি খুঁজতে থাকেন। কিন্তু তেমন কোনো কাজের সুযোগ হয়ে ওঠেনি সে সময়। ঢাকায় এসে ভর্তি হন ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটির ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগে। টিউশনি করতেন আর বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার গবেষণাগারে বসে বসে খুঁজতেন কীভাবে অনলাইনে কাজ করে আয় করা যায়। শুরুতে ফ্রিল্যান্সার ডটকমের খোঁজ পেয়েছিলেন। সেই থেকে কাজ শুরু। দরকার ছিল নিজের কম্পিউটারের। কিছু টাকা জোগাড় করে পুরনো একটি কম্পিউটার কেনেন খায়রুল। কিন্তু অনলাইনে কাজ পাওয়া তো আর সহজ না। অনেকের কাছেই সহযোগিতা চান। খায়রুল বলেন, ‘২৫ দিনের মাথায় ফিলিপাইনের এক ব্যক্তির কাছ থেকে প্রথম ২০০ ডলারের কাজ পেয়েছিলাম। কিন্তু কাজ শেষ হওয়ার পর সে আমাকে ব্লক করে দেয়। এমন ঘটনার পর হতবুদ্ধি হয়ে গিয়েছিলাম। এরপর ওডেস্কে (বর্তমানে আপওয়ার্ক) কাজ শুরু করি।’ আপওয়ার্কে ডেটাবেইজের একটি কাজ পেয়ে প্রথম ১৪ হাজার টাকা আয় করেন খায়রুল। তার পরপরই আরেকটি প্রকল্প থেকে পান প্রায় ৩০ হাজার টাকার মতো। গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রশংসা পেয়েছিলেন। প্রোফাইলে যোগ হলো ভালো পর্যালোচনা। বাড়ল আত্মবিশ্বাস। দুই বন্ধুকে নিয়ে ২০০৯ সালে এ কিউব নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। ক্যাসপারস্কির কাছ থেকে একটি কাজ পেয়েছিলেন সে সময়। এদিকে শেষ হলো স্নাতক। অনলাইনে কাজের স্বীকৃতি কেউ তেমন না দেওয়ায় খায়রুল একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন। চাকরি বদল করলেও চালিয়ে যান অনলাইনের কাজ। নয়টা-ছয়টা অফিস শেষে রাতে শুরু হতো ফ্রিল্যান্সিং। ক্যাসপারস্কির সঙ্গে চুক্তি শেষ হলো, দুই বন্ধুও যোগ দেন নতুন কাজে। এ কিউবের সেখানেই সমাপ্তি।

শুরু হল ফ্লিট বাংলাদেশ

এরপর রাজশাহী থেকে পরিচিত ব্যক্তিদের একটু একটু করে কাজ শেখানো শুরু করেন খায়রুল আলম। ২০১৮তে ছেড়ে দেন চাকরি। প্রতিষ্ঠা করেন ফ্লিট বাংলাদেশ। খায়রুল বলেন, ‘চাকরি ছেড়ে দেওয়ায় অনেকে উপহাস করেছিল। ফ্লিট বাংলাদেশ চালু করলে শুরুতে আমাকে কর্মীসংকটে ভুগতে হয়েছে, কারণ অনলাইনে কাজ করে অর্থ আয়ের বিষয়টি আমাদের সমাজে অতটা প্রতিষ্ঠিত না। কিছুদিন আগেও আমার প্রতিষ্ঠানে কর্মীসংখ্যা ছিল ১০৫। এদের মধ্যে ২০ জন স্থায়ী, বাকি কর্মীরা চুক্তিভিত্তিক। তবে সংখ্যাটা এখন বাড়ছে। বর্তমানে কর্মীসংখ্যা এখন ৫০০ ছাড়িয়েছে। কিছুদিন আগে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এক গ্রাহক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আমাদের রাজশাহী অফিস ঘুরে গেছেন।’

করোনাকালে ফ্লিট বাংলাদেশ

খায়রুল আলম বলেন, করোনার মধ্যেও আমরা ফ্লিট বাংলাদেশে (http://fleetbd.com/) কর্মী নিয়োগ দিয়েছি। নতুন অফিসও নিতে হয়েছে আরও ৭৫ জনের কর্মসংস্থান হয়েছে। এই মহামারির মধ্যেও আমরা আমাদের প্রতিটি কর্মীকে যথা সময়ে তাদের বেতন বোনাস দিয়েছি। যুক্তরাষ্ট্রেও আমাদের অফিস রয়েছে যেখানে ৬ জন মার্কেটিংয়ের কাজ করে। রাজশাহী শহর থেকে দুরের কর্মীদেরকে আনা নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তিনি বলেন, রাজশাহীতে আমরা কর্মীবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলেছি। যেখানে প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে শুরু করে, মেডিকেল, বাৎসরিক বোনাস, টার্গেট বোনাসসহ নানান ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়। রাজশাহীতে এখন তিনি ৩ হাজার স্কয়ার ফিটের বড় স্পেস অফিস করছেন। আগামী জানুয়ারি থেকেই ঢাকাতে কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে। যেখানে আরও প্রায় ১০০ জনের কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে বলে তিনি জানান।

ফ্লিট বাংলাদেশে তরুণ তরুণীদের যে সুবিধা পায়

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী সাজিদা পারভিন বলেন, ‘আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগ থেকে পাস করে এদিক-সেদিক চাকরির জন্য ঘুরতে হয়েছে। কিন্তু আমার রাজশাহীতে এত ভালো পরিবেশে কাজ করতে পারবো ভাবতে পারিনি। আমি এখানেই খুব ভালো আছি। সুযোগ-সুবিধা আছে অনেক। আর সবচেয়ে বড় কথা নিজ শহরে আছি, নিজের বাড়ি থাকি ভালো বেতনের চাকরি করি।

রাজশাহীকে আউটসোর্সিং জোন ঘোষণার প্রস্তাবনা

ফ্লিট বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) খায়রুল আলম বলেন, শিক্ষা নগরী রাজশাহীতে শিক্ষিত তরুণ-তরুণীর সংখ্যা অনেক বেশি। এখানে কর্মসংস্থান অনেক কম। আমি চেষ্টা করছি রাজশাহীকে ডিজিটাল রাজশাহী হিসাবে পরিচয় করিয়ে দিতে। সরকার থেকে আমরা আরও কিছু সুযোগ-সুবিধা পেলে ৫০০ জনের পরিবর্তে পাঁচ হাজার জনের কর্মসংস্থান করতে পারবো। এই শহরে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য তিনি রাজশাহীকে আউটসোর্সিং জোন ঘোষণার প্রস্তাবনা দেন।

রাজশাহী হাইটেক পার্কে বাড়ছে কর্মসংস্থান: জুনাইদ আহমেদ পলক

ঢাকার বাইরে বিভাগীয় শহর রাজশাহীতেও আন্তর্জাতিক মানের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে নানান প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করতে কাজ করছে রাজশাহীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হাইটেক পার্ক। যেখানে খায়রুল আলমের ফ্লিট বাংলাদেশ একটি উদাহরণ মাত্র।

কর্মসংস্থানের বিষয়ে তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, রাজশাহীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হাই-টেক পার্ক পুরোপুরি চালু হলে সম্ভাব্যতা সমীক্ষার প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রায় ১৪ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। দুই লাখ বর্গফুটের জয় সিলিকন টাওয়ারসহ ৭টি প্লটে বিভিন্ন বিনিয়োগকারীদের অনুকূলে বরাদ্দ প্রদানের সংস্থান রয়েছে। শেখ কামাল আইটি ট্রেনিং এন্ড ইনকিউবেশন ভবনে ইতোমধ্যে ১০টি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে স্পেস বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ফ্লিট বাংলাদেশসহ ৩টি প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করেছে। সম্প্রতি স্টার্টআপ প্রতিযোগিতার জন্য বিজ্ঞাপন প্রকাশ করা হয়েছে এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার বরাবর পত্র প্রেরণ করা হয়েছে।

ঢাকার বাইরে বিভাগীয় শহর রাজশাহীতেও আন্তর্জাতিক মানের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে নানান প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করতে কাজ করছে রাজশাহীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হাইটেক পার্ক। যেখানে খায়রুল আলমের ফ্লিট বাংলাদেশ একটি উদাহরণ মাত্র।

রাজশাহীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হাই-টেক পার্ক পুরোপুরি চালু হলে সম্ভাব্যতা সমীক্ষার প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রায় ১৪ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

দুই লাখ বর্গফুটের জয় সিলিকন টাওয়ারসহ ৭টি প্লটে বিভিন্ন বিনিয়োগকারীদের অনুকূলে বরাদ্দ প্রদানের সংস্থান রয়েছে। 

শেখ কামাল আইটি ট্রেনিং এন্ড ইনকিউবেশন ভবনে ইতোমধ্যে ১০টি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে স্পেস বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে। 

ইতোমধ্যে ফ্লিট বাংলাদেশসহ ৩টি প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করেছে। সম্প্রতি স্টার্টআপ প্রতিযোগিতার জন্য বিজ্ঞাপন প্রকাশ করা হয়েছে এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার বরাবর পত্র প্রেরণ করা হয়েছে। 

জয় সিলিকন টাওয়ারে প্রায় দুই হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন