প্রশাসনে বিভাগীয় মামলার পালে নতুন গতি

প্রথমবারের মতো গাইডলাইন তৈরি করছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর * চলমান ২৫টি মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ
 বিএম জাহাঙ্গীর 
২৯ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জনপ্রশাসনে বিভাগীয় মামলার পালে নতুন করে গতি পেয়েছে। বিশেষ করে প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যত মামলা পেন্ডিং আছে তা দ্রুত নিষ্পত্তির তাগিদ দেয়া হয়েছে। পৃথক সফটওয়ারের মাধ্যমে শৃঙ্খলা শাখাগুলোর সকল নথিপত্র অনলাইনে যুক্ত করার কাজ চলছে। আসছে বছর ৩১ জানুয়ারি মধ্যে গাইড লাইন চূড়ান্ত হবে এবং ফেব্রুয়ারি থেকে তা কার্যকর করা হতে পারে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

এদিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের হাতে বিভিন্ন পর্যায়ে অর্ধশতাধিক মামলা তদন্তাধীন রয়েছে। এর মধ্যে সর্বশেষ নভেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত এ সংক্রান্ত পর্যালোচনা সভায় ২৫টি বিভাগীয় মামলার অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হয়। তবে সেখানে বেশ কয়েকজন তদন্ত কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন না। মামলাগুলো যাতে দ্রুত নিষ্পত্তি করা যায় সেজন্য জনপ্রশাসন সচিব শেখ ইউসুফ হারুন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রতি কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা ও তদন্ত অনুবিভাগের প্রধান হিসেবে কর্মরত অতিরিক্ত সচিব এএফএম হায়াতুল্লাহ সোমবার যুগান্তরকে বলেন, ‘বিভাগীয় মামলা বিলম্বিত হলে কর্মকর্তাদের পদোন্নতিসহ প্রাপ্য অনেক কিছু পেন্ডিং থাকে। এছাড়া যারা তদন্তের দায়িত্বে থাকেন তাদের নিজ নিজ দফতরের দৈনন্দিন কাজও ব্যাহত হয়।

এজন্য আমাদের সচিব মহোদয় বিভাগীয় মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির তাগিদ দিয়েছেন। এছাড়া শুধু তাগিদ দিয়েই তিনি বসে নেই, প্রতিনিয়ত মনিটরিং করছেন। এজন্য ইতোমধ্যে বিভাগীয় মামলা নিষ্পত্তিতে যেটুকু অগ্রগতি হয়েছে তার সম্পূর্ণ কৃতিত্ব জনপ্রশাসন সচিবের।’

তিনি বলেন, ‘আশার কথা, বিভাগীয় মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে সুলিখিত ও বাস্তবসম্মত একটি গাইডলাইন প্রস্তুত করার কাজ চলছে, যা আগামী বছর ৩১ জানুয়ারির মধ্যে শেষ করার টার্গেট নিয়ে আমাদের কয়েক কর্মকর্তা ব্যস্ত সময় পার করছেন। এটি চূড়ান্ত হলে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে ওয়ার্কশপ করা হবে। তিনি মনে করেন, গাইডলাইন যথাযথভাবে কার্যকর হলে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সব কার্যক্রম খুব দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন হবে।

তাছাড়া কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য অনলাইনে যুক্ত করা হবে। একটি সফটওয়ারের মাধ্যমে নথির তথ্য সেখানে যুক্ত করা হচ্ছে। ফলে সময়মতো কারো নথি না পাওয়া কিংবা নথি নিয়ে টানাটানির ঝামেলা কমবে।’ হায়াতুল্লাহ জানান, তাদের এ গাইডলাইন সফল হলে পরবর্তীতে তা অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের বিভাগীয় মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য মডেল হিসেবে অনুকরণীয় হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ৫টি শাখা ও ২টি অধিশাখা মিলে বর্তমানে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে শৃঙ্খলা ও তদন্ত অনুবিভাগে চমৎকার একটি টিম কাজ করছে। যারা প্রত্যেকে খুবই দক্ষ এবং তাদের সততা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই।

২৫ বিভাগীয় মামলার সর্বশেষ অবস্থা : প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ওএসডি উপসিচব বেগম নাজমুন নাহার মান্নুর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া বিভাগীয় মামলাটি ১ বছর ৮ মাসের বেশি সময় ধরে পেন্ডিং। তবে তদন্ত কর্মকর্তা সভায় উপস্থিত ছিলেন না। একই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আরও একটি বিভাগীয় মামলা ২২ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়েছে। তবে ওই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাও সভায় উপস্থিত ছিলেন না। অতিরিক্ত সচিব ইফতেখারুল ইসলাম খানের মামলাটি ৭ মাস পেন্ডিং।

তার তদন্ত কর্মকর্তাও সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। সাময়িক বরখাস্তকৃত উপসচিব একেএম রেজাউল করিমের তদন্তকারী কর্মকর্তাও অনুপস্থিত। তার মামলাটি ২ মাস ধরে পেন্ডিং। পরবর্তী পদায়নের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত সাবেক ডিসি সুলতানা পারভীনের মামলাটি আগস্ট থেকে শুরু হয়েছে। উপসিচব পদমর্যাদার কর্মকর্তা আবু জাফর রাশেদের মামলাটির তদন্ত শুরু হয়েছে সেপ্টেম্বর থেকে। তদন্ত কর্মকর্তা দ্রুত প্রতিবেদন দেবেন বলে জানিয়েছেন।

নোয়াখালী জেলার ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেল ইকরামুল হক সরকারের মামলাটির তদন্ত শুরু হয়েছে আগস্ট থেকে। তদন্তকারী কর্মকর্তা দ্রুত রিপোর্ট দাখিলের কথা সভায় জানিয়েছেন। সিনিয়র সহকারী সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা নোয়াখালীর হাতিয়ার এসিল্যান্ড (অন্যত্র বদলির আদেশাধীন) মো. সারোয়ার সালাম এবং সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের সাবেক ইউএনও (বর্তমানে ওএসডি) আসিফ ইমতিয়াজের বিভাগীয় মামলা তদন্ত করছেন উপসচিব পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা।

সারোয়ার সালামের মামলাটি গত বছর ১৩ আগস্ট এবং আসিফ ইমতিয়াজের মামলা ২০১৯ সালের ১৩ নভেম্বর থেকে তদন্তাধীন রয়েছে। সভায় উপস্থিত তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন তিনি এ দু’টি মামলার তদন্ত কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করে প্রতিবেদন দাখিল করবেন।

বর্তমানে ইউএনও হিসেবে কর্মরত খালেদা খাতুন রেখার বিভাগীয় মামলাটি ২ মাসের বেশি সময় ধরে পেন্ডিং। দ্রুত রিপোর্ট দেয়ার কথা জানিয়েছেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার সাবেক এসিল্যান্ড সৈয়দ মাহবুবুল হকের বিভাগীয় মামলার প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। বরগুনার সাবেক সহকারী কমিশনার আবু জাফর সিদ্দিকী এবং দিনাজপুরের সাবেক এসিল্যান্ড আরিফুল ইসলামের বিভাগীয় মামলা তদন্ত করছেন উপসচিব পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা।

তিনি সভাকে জানিয়েছেন, একটি মামলার প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। শিগগির আরও একটি মামলার প্রতিবেদন জমা দিতে পারবেন। নীলফামারীর সাবেক এসিল্যান্ড মো. আরিফুজ্জামানের বিভাগীয় মামলা ৩ মাস ধরে তদন্তাধীন। তদন্তকারী কর্মকর্তা সাক্ষীর জবানবন্দি জুমঅ্যাপের নিতে পারবেন কিনা জানতে চাইলে সভা থেকে তাকে সরাসরি নিতে বলা হয়েছে।

কুড়িগ্রামের সাবেক সহকারী কমিশনার রিন্টু বিকাশ চাকমা, সাবেক সহকারী কমিশনার (এনডিসি) এসএম রাহাতুল ইসলাম এবং সাময়িক বরখাস্তকৃত সিনিয়র সহকারী কমিশনার নাজিম উদ্দিনের বিভাগীয় মামলা পেন্ডিং আছে ৩ মাস। মামলাগুলো পৃথকভাবে ৩ জন কর্মকর্তা তদন্ত করছেন। ইতোমধ্যে ৫০ জনের সাক্ষী নেয়া হয়েছে। শিগগির প্রতিবেদন দেয়ার কথা রয়েছে।

ওএসডি সিনিয়র সহকারী সচিব একেএম ইহসানুল হকের মামলা ১০ মাসের বেশি সময় ধরে চলমান আছে। তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন তিনি দ্রুত রিপোর্ট দিতে পারবেন। নওগাঁ জেলার সাবেক শিক্ষানবিস সহকারী কমিশনার বিএম তারিক-উজ-জামানের মামলা ৩ মাস ধরে তদন্ত চলছে। তবে তদন্তকারী কর্মকর্তা সভায় উপস্থিত ছিলেন না। ওএসডি সিনিয়র সহকারী সচিব মোহাম্মদ ফারুক আহম্মদের মামলাটির তদন্ত চলছে ৮ ধরে। তার তদন্ত কর্মকর্তাও সভায় অনুপস্থিত ছিলেন।

পিরোজপুরের সাবেক এডিসি বেগম ঝুমুর বালার মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা ইতোমধ্যে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। সাময়িক বরখাস্তকৃত কুড়িগ্রাম জেলার সাবেক সিনিয়র সহকারী কমিশনার নাজিম উদ্দিনের মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ পর্যায়ে। শিগগির রিপোর্ট দেয়া সম্ভব বলে জানিয়েছেন তদন্তকারী কর্মকর্তা।

বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জের সাবেক ইউএনও কাজী মো. আলিমউল্লাহের মামলা ১১ মাস যাবত চলমান আছে। তদন্তকারী কর্মকর্তা জানিয়েছেন সাক্ষ্যগ্রহণ দ্রুত শেষ করে তিনি প্রতিবেদন জমা দেবেন। এছাড়া সবশেষে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের সাবেক ইউএনও আবু জাফর রাশেদের মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন ইতোমধ্যে জমা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, প্রাথমিক তদন্তে সন্দেহাতীতভাবে অপরাধ প্রমাণিত হলে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়। বিভাগীয় মামলায় কাউকে দোষী সাব্যস্ত করলে অভিযোগ গঠনপূর্বক তখন মন্ত্রণালয়ের প্রধান হিসাবে জনপ্রশাসন সচিব কারণ দর্শানো নোটিশ জারি অথবা ব্যক্তিগত শুনানি গ্রহণ করেন। এরপর কাউকে শাস্তি প্রদান কিংবা অব্যাহতি দেয়া হয়। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বিভাগীয় মামলায় যাদেরকে দায়ী করা হয় তাদের ৯৫% ভাগ কর্মকর্তার যথাযথ শাস্তি হওয়ার প্রয়োজন।

কিন্তু অনেক সময় নানামুখী তদবিরের চাপে মানবিক বিবেচনায় কাউকে গুরুদণ্ড দেয়ার পরিবর্তে লঘুদণ্ড দেয়া হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ক্যাডার কর্মকর্তাদের বিভাগীয় মামলা পর্যালোচনা সংক্রান্ত সর্বশেষ সভার কার্যবিবরণীতে কর্মকর্তাদের সতর্ক করে বলা হয়েছে, প্রশাসনের সর্বস্তরে জনসেবার মান উন্নয়ন ও সুশাসন নিশ্চিত করতে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। সেটি বিবেচনায় রেখেই বিধিবিধান যথাযথ অনুসরণ করে বিভাগীয় মামলা নিষ্পত্তি করা হচ্ছে।

যেসব অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যাচ্ছে কেবল সেই সব ক্ষেত্রে বিভাগীয় মামলা রুজু করা হয়। তাই দুর্নীতি নির্মূল করতে অবশ্যই অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে যারা তদন্তের সঙ্গে যুক্ত আছেন তাদের খেয়াল রাখতে হবে, যেন অপরাধ করে কেউ ছাড়া না পায়, আবার নিরপরাধ কারো যেন শাস্তি না হয়। এছাড়া অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে কিনা সে বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তাদের তদন্ত প্রতিবেদনে অবশ্যই সুস্পষ্ট মতামত দিতে হবে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন