মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রী

লন্ডন ফেরতদের ১৪ দিনের কোয়ারেন্টিন বাধ্যতামূলক

হজ-ওমরায় অনিয়মে বাতিল হবে এজেন্সির লাইসেন্স * অনুমতি ছাড়া মহাসড়কে বিলবোর্ড-তোরণ নয় * মোংলা বন্দর পরিচালনায় প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেয়া যাবে
 যুগান্তর রিপোর্ট 
২৯ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

যুক্তরাজ্য থেকে দেশে ফিরলেই তাকে বাধ্যতামূলক ১৪ দিনের কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে। বিশেষ করে লন্ডন থেকে যারা আসবেন তাদের স্ট্রংলি কোয়ারেন্টিনে রাখতে হবে।

দেশটি থেকে আসা যাত্রীর কাছে যদি পূর্বদিনের নেগেটিভ রিপোর্টও থাকে, তারপরও তাকে বাধ্যতামূলক ১৪ দিনের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে।

সোমবার মন্ত্রিসভার ভার্চুয়াল বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী এই অনুশাসন দিয়েছেন বলে জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম।

তিনি বলেন, বৈঠকে হজ ও ওমরা ব্যবস্থাপনা আইন, মহাসড়ক আইন, মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ আইন, সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের মহাসড়ক ল্যান্ডস্কেপিং নীতিমালার খসড়া অনুমোদন দেয়া হয়।

গণভবন থেকে প্রধানমন্ত্রী ও সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে মন্ত্রীরা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বৈঠকে যোগ দেন। বৈঠক শেষে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন।

তিনি বলেন, দুটি অপশন ছিল-একটি লন্ডন থেকে আগত যাত্রীদের প্রবেশ বন্ধ করা আর দ্বিতীয়টি স্ট্রং কোয়ারেন্টিন।

সিদ্ধান্ত হয় স্ট্রং কোয়ারেন্টিনে নেয়া হবে। আজ (সোমবার) রাতে আমরা একটা মিটিং দিয়েছি, সেখানে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। মিটিংয়ে টেকনিক্যাল লোকজন থাকবে। উনি (প্রধানমন্ত্রী) আমাদের দায়িত্ব দিয়েছেন।

খন্দকার আনোয়ারুল বলেন, দিয়াবাড়ি ও হজ ক্যাম্পে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিন আছে, সেখানে থাকবে ১৪ দিন। কিছু হোটেলের ব্যবস্থা রাখতে হবে।

কোন তারিখের পর লন্ডন থেকে আগতদের কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে, তা আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করা হবে। মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে হোটেলে যেভাবে থাকে সেভাবেই কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, কেউ (লন্ডন থেকে) সিলেটে এলে তাকে সিলেটে, কেউ চট্টগ্রামে এলে চট্টগ্রামে কোয়ারেন্টিনে রাখা হবে। কোয়ারেন্টিনে থাকার খরচ ওই ব্যক্তিকেই বহন করতে হবে।

যুক্তরাজ্যে করোনার নতুন একটি ধরন সম্প্রতি শনাক্ত হওয়ার পর বিভিন্ন দেশ তাদের সঙ্গে বিমান যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। দেশের মধ্যে দাবি উঠলেও সরকার এখনও লন্ডনের ফ্লাইট বন্ধ করেনি।

লন্ডন থেকে যারা আসছেন, তাদের নিয়ে দেরিতে সিদ্ধান্ত নেয়ায় বাংলাদেশেও করোনাভাইরাসের নতুন ধরন ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা তৈরি হচ্ছে কি না-এমন প্রশ্নে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, আমরা প্রটোকল মানার চেষ্টা করছি।

কোয়ারেন্টিন কার্যকর ১ জানুয়ারি : লন্ডন থেকে আসা বিমানযাত্রীদের ১৪ দিনের বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টিন ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে।

রাতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনলাইন সভায় এ সিদ্ধান্ত হয় বলে এক তথ্য বিবরণীতে জানানো হয়েছে।

সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সরকার নির্ধারিত হোটেলগুলোয় লন্ডন ফেরত যাত্রীরা নিজ খরচে থাকবেন। অন্যান্য দেশ থেকে আসা বিমানযাত্রীদের ক্ষেত্রে কোভিড সনদ আনার বাধ্যতামূলক যে ব্যবস্থা এখন চালু রয়েছে, তা বহাল থাকছে।

হজ ও ওমরা ব্যবস্থাপনা আইন : সুষ্ঠুভাবে হজ ও ওমরা ব্যবস্থাপনা করতে নতুন আইন করতে যাচ্ছে সরকার। এ আইন পাস হলে কোনো হজ ও ওমরা এজেন্সি সৌদি আরব গিয়ে অপরাধ করলেও বাংলাদেশে সেই অপরাধের বিচার করা হবে।

হজ এবং ওমরা এজেন্সিগুলো অনিয়ম করলে তাদের নিবন্ধন বাতিলের পাশাপাশি সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা জরিমানা করা হবে। এ প্রসঙ্গে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, এতদিন হজ ব্যবস্থাপনা চলত একটা নীতিমালার মাধ্যমে।

২০১১ সাল থেকে সৌদ আরব হজ ব্যবস্থাপনাকে পরিবর্তন করে ফেলেছে। পাকিস্তান, ভারত, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া আইন করে ফেলেছে। ২০১২ সালে মন্ত্রিসভার নির্দেশনা ছিল নীতিমালার পরিবর্তে আইন করার।

নতুন আইনে হজ ও ওমরা ব্যবস্থাপনার সার্বিক দায়িত্ব সরকারের ওপর ন্যস্ত থাকবে। সরকার হজ ও ওমরা ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে সৌদি সরকারের সঙ্গে চুক্তি ও সমঝোতার ভিত্তিতে সে দেশের যে কোনো স্থানে হজ অফিস স্থাপনসহ সার্বিক কার্যক্রম নিতে পারবে।

আইনের অধীন নিবন্ধন ছাড়া কাউকে ওমরা বা হজে কেউ পাঠাতে পারবে না। যদি কেউ এ বিষয়ে কোনো অনিয়ম করে, তাহলে নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ উপযুক্ত তদন্ত ও শুনানির সুযোগ দিয়ে সংশ্লিষ্ট এজেন্সির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবে।

হজের চুক্তি এখানে হওয়ার পর কেউ সৌদিতে গিয়ে ঠকালে তবে ওই অপরাধ এই দেশে (বাংলাদেশে) হয়েছে বলে গণ্য করে এই আইন অনুযায়ী বিচার করা হবে।

ওমরা এজেন্সি অনিয়ম করলে তারা নিবন্ধন খোয়ানোর সঙ্গে সর্বোচ্চ ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার মুখে পড়বে। অনিয়মের জন্য পরপর দু’বছর ওয়ার্নিং দেয়া হলে দু’বছরের জন্য লাইসেন্স বাতিল হবে।

মহাসড়ক আইন : মহাসড়ক নির্মাণ, উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা এবং সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ যান চলাচলের জন্য নতুন আইন হচ্ছে।

এই আইন পাস হলে অনুমতি ছাড়া মহাসড়কে বিলবোর্ড, সাইনবোর্ড বা তোরণ টাঙালে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা গুনতে হবে।

মহাসড়কের সংরক্ষণ রেখার মধ্যে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করলে দু’বছরের কারাদণ্ডের সঙ্গে সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা করা হবে।

এ প্রসঙ্গে মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, ১৯২৫ সালের হাইওয়ে অ্যাক্ট রহিত করে মহাসড়ক, নির্মাণ, উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা এবং অবাধ, সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ যান চলাচলের জন্য নতুন আইন হচ্ছে।

মহাসড়কে মাঝে মাঝে আন্ডারপাস করা হবে। সেখান দিয়ে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রসহ সিএনজি, রিকশা চলাচল করতে পারবে। মহাসড়কের নির্দিষ্ট দূরত্বে ফুয়েল স্টেশন ও বিশ্রামাগার রাখতে নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী।

গতিসীমার বিষয়ে খন্দকার আনোয়ার বলেন, হাইওয়ে করলে ৮৫ কিলোমিটার গতি নিশ্চিত করতে হবে। মহাসড়কে ছোট যানবাহন চলতে পারবে না। পাশের সার্ভিস লেনে সেসব যানবাহন চলবে।

তবে মহাসড়কে মোটরসাইকেল চলতে পারবে। মহাসড়কের পাশে অবকাঠামো নির্মাণ করলে ফসল, খড় বা পণ্য শুকালে, ক্রসিং এরিয়া বাদে অন্য জায়গা দিয়ে হাঁটলে এক থেকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে।

মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ আইন : মোংলা বন্দরের স্থাপনা ও সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেয়ার বিধান রেখে ‘মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ আইন-২০২০’-এর খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।

এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, সামরিক সরকারের সময়ে প্রণীত মোংলা পোর্ট অথরিটি অর্ডিন্যান্স, ১৯৭৬-এর পরিবর্তে এই নতুন আইন হচ্ছে। এটা অনেকটা পায়রা বন্দর আইনের মতো।

মহাসড়ক ল্যান্ডস্কেপিং নীতিমালা : ‘সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের মহাসড়ক ল্যান্ডস্কেপিং নীতিমালা-২০২০’-এর খসড়া অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।

এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, মহাসড়কের পাশে যে জমি থাকবে, তা কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হবে, পরিকল্পনা অনুযায়ী বৃক্ষরোপণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব হ্রাসে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে এই নীতিমালা।

রাস্তার মধ্যে যদি এমন কিছু পড়ে যেটা আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত, তাহলে যথাসম্ভব সেটা সেভ করতে হবে। বনাঞ্চলে মহাসড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংখ্যক বৃক্ষ অপসারণের বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে।

এমনকি বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় এনিমেল পাসের (প্রাণী চলাচল) সুবিধা রাখতে হবে। সড়কের পাশে একটা গাছ কাটলে পাঁচটি গাছ রোপণ করতে হবে।
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন