যুগান্তরকে বিক্রম দোরাইস্বামী

একাত্তরের চেতনা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভিত্তি

দু’দেশ একত্রে করোনা টিকা উৎপাদনেও যেতে পারে * সীমান্ত এলাকাকে অপরাধশূন্য করতে হবে * ভবিষ্যতে শুধু বাণিজ্য নয়, যৌথ উদ্যোগে বিনিয়োগ হতে পারে
 মাসুদ করিম 
২৯ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
বিক্রম দোরাইস্বামী
বিক্রম দোরাইস্বামী । ফাইল ছবি

ভারতের হাইকমিশনার বিক্রম দোরাইস্বামী বলেছেন, ভারত ও বাংলাদেশ সম্পর্কের ভিত্তি হল ১৯৭১ সালের চেতনা। ওই চেতনায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখিয়ে গেছেন।

এই চেতনার ভিত্তিতে যাতে নতুন প্রজন্ম দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে সামনে এগিয়ে নিতে পারে, সেই লক্ষ্যে কাজ করতে হবে।

তিনি রোববার যুগান্তর কার্যালয় পরিদর্শনকালে একান্ত সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন। এ সময় তিনি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নানান দিক নিয়ে আলোকপাত করেন।

বিশেষ করে কোভিড-১৯ সহযোগিতা, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আসন্ন বাংলাদেশ সফর, সীমান্তহত্যা, ভারতের ঋণের বাস্তবায়ন, তিস্তা চুক্তি, ভিসা, অশুল্ক বাণিজ্য বাধা, রোহিঙ্গা সংকট, কানেকটিভিটি প্রভৃতি বিষয়ে তার অভিমত ব্যক্ত করেন।

এ ছাড়াও ভারতে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) এবং আসামে নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) নিয়েও প্রশ্নের জবাব দেন।

তিনি উল্লেখ করেন, আমাদের অংশীদারি এক ভিত্তি এবং দুই নির্দেশনার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এক ভিত্তি হল ১৯৭১ সালের চেতনার আলোকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে নীতি দিয়ে গেছেন, সেটা মেনে চলতে হবে।

সাধারণভাবে তিনি বিশ্বের দিকে এবং সুনির্দিষ্টভাবে ভারতের দিকে যে অ্যাপ্রোচ রেখে গেছেন, সেদিকে পরিচালিত হতে হবে।

এটাই হল আমাদের অংশীদারিত্বের ভিত্তি। সেই লক্ষ্য বঙ্গবন্ধু সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নীতি প্রণয়ন করছেন। সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে সবকিছু করতে হবে।

তার আওতায় একত্রে দুই দেশের বাণিজ্য, উন্নয়ন হবে একসঙ্গে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সাফল্য, জনগণ পর্যায়ে সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ ক্ষেত্র নির্ধারিত হবে। যেমন: তথ্যপ্রযুক্তি, যুবসমাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত ইস্যুসমূহ।

কারণ, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকে একাত্তরের চেতনায় অগ্রসর হতে হবে। কোভিড সহযোগিতা সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে ভারতের হাইকমিশনার বলেন, কোভিড বিষয়ে জনস্বাস্থ্য এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের আলোকে আমাদের পরস্পরের সঙ্গে সহযোগিতা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

তাই আমরা কোভিডের ওষুধ বিষয়ে সহযোগিতা করছি। টেস্টিং কিটস, যাই বাংলাদেশ আমাদের সঙ্গে সহযোগিতা করতে চায়, আমরা সেই সহযোগিতা করতে পারলে খুশি হব।

টিকা দেয়া, টিকা সংরক্ষণে কোল্ড চেইন করা-এগুলো ভারত ও বাংলাদেশ একসঙ্গে করতে পারে। প্রশিক্ষণ ও উভয় দিকের সেরা বিষয়গুলো চর্চা করাও একত্রে করতে হবে।

আরেকটা হল, টিকা উৎপাদন ও সরবরাহ ক্ষেত্রেও সহযোগিতা হতে হবে। এমনকি দুই দেশ একত্রে টিকা উৎপাদনেও যেতে পারে। শুধু সিরাম ইন্সটিটিউট নয়, আমরা অন্যান্য ক্ষেত্র থেকেও টিকার ব্যাপারে সহযোগিতা করতে পারি। ভারত কোভিডমুক্ত না হলে প্রতিবেশীও কোভিডমুক্ত হবে না।

কবে আসবে সিরামের টিকা-জানতে চাইলে বিক্রম দোরাইস্বামী বলেন, আশা করি, বাংলাদেশ শিগগির সিরাম ইন্সটিটিউটের টিকা পাবে।

তবে বাংলাদেশের নিজস্ব নিয়মকানুন নিয়ে কাজ চলছে। বাংলাদেশ সরকারকে এ টিকা ব্যবহারের অনুমতি দিতে হবে। এটা হল বাংলাদেশের নিজস্ব আইনি প্রক্রিয়া।

আমরা এই প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। উৎপাদনের কাজটা হল সহজ কাজ। টিকা শিগগির সরবরাহের জন্য প্রস্তুত হবে। কিন্তু এর জন্য আইনি ব্যবস্থা প্রস্তুত করতে হবে।

সরবরাহ ব্যবস্থা অবশ্যই প্রস্তুত করতে হবে। তিন কোটি টিকা দেয়ার জন্য প্রশিক্ষণ দরকার, কোল্ড চেইন দরকার, যারা টিকা পেয়েছে তারা ঠিক আছে-এমন পর্যালোচনা সক্ষমতাও প্রয়োজন।

এটা চিহ্নিত করার সবচেয়ে ভালো স্থান হল বাংলাদেশ সরকার। তবে আমাদের অংশের কাজ সম্পর্কে আমি নিশ্চিত যে, যখনই টিকা প্রস্তুত হবে, আমরা সেটা সরবরাহ করতে পারব।

আগামী মার্চে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপনের সময়ে মোদির সফর সম্পর্কে জানতে চাইলে ভারতের হাইকমিশনার বলেন, আমরা এমন সব কর্মসূচি প্রণয়ন করব, যা নিয়ে বাংলাদেশ স্বস্তিবোধ করবে।

এটা উভয়ে একসঙ্গে উদ্যাপন করব। এটা বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

আমরা বাংলাদেশের নেতৃত্বকে অনুসরণ করব। কিছু কিছু ভারত একাই করবে। কিছু বিষয় আমরা একত্রে করব। কিছু বিষয়ে আমরা উভয়ে একমতে পৌঁছে গেছি।

আমরা মহাত্মা গান্ধী ও বঙ্গবন্ধু উভয়ের জীবনের ওপর বিশেষ ডিজিটাল প্রদর্শনীর আয়োজন করব। তাদের জীবনের ইতিহাস-কীভাবে তারা জাতির পিতা হলেন।

আমরা আরও অনেক স্মরণীয় কর্মকাণ্ড করব। বঙ্গবন্ধুর ওপর একটি ফিল্ম শ্যাম ভেনেগার প্রস্তুত করছেন। এসবই আগামী বছর আমরা করব। অবশিষ্ট কর্মসূচির জন্য আমরা উভয়ে বসব।

আরও কী কী করা যায়, সেটা নির্ধারণ করব। আমরা অন্য দেশে যৌথভাবে অনুষ্ঠান করব। আমাদের দিক থেকে কথা হল, বাংলাদেশ যা চায় সেটাই করব।

অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য ক্ষেত্রে সহযোগিতার বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা গত দু’মাসে বড় দুটি ভার্চুয়াল বিজনেস ইভেন্ট করেছি।

একটি হল, শিপবিল্ডিংয়ে অংশীদারিত্ব এবং অপরটি হল খাদ্য প্রক্রিয়াকরণের যন্ত্রপাতির মাধ্যমে কৃষিক্ষেত্রে মূল্য সংযোজন। উভয় ইভেন্টে মন্ত্রী পর্যায়ে অংশগ্রহণ ছিল। ভবিষ্যৎ শুধু বাণিজ্য নয়, যৌথ উদ্যোগে বিনিয়োগ হতে পারে।

বাংলাদেশের দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিনিয়োগের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করেছে। ফলে ভারত-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়ন আরেক ধাপে উন্নীত হতে পারে। আমরা সামনের দিকে তাকিয়ে আছি।

আমরা অবকাঠামোর ভিত্তিতে অটোমোবাইল শিল্প, গার্মেন্ট ও টেক্সটাইল, পরিবহন ও লজিস্টিক শিল্পে সহযোগিতার জন্য সামনে তাকিয়ে আছি। আগামী ৩ ও ৪ মাস ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষেত্রে অনেক কিছু করব।

সীমান্তহত্যা নিয়ে সৃষ্ট উদ্বেগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের জনগণের মধ্যে রাতের বেলা অবৈধ চলাচল বন্ধ করতে হবে। উভয় দিকের সীমান্তবর্তী লোকেরা চোরাচালানের সঙ্গে যুক্ত থাকে।

তাই আমরা উভয়ে সীমান্তরক্ষী বাহিনী এবং জেলা প্রশাসনকে স্থানীয় জনগণকে এ ব্যাপারে উৎসাহ জোগাতে হবে যে, এভাবে চলাচল বিপজ্জনক।

গোড়ায় সমস্যার সমাধান করতে হবে। কাঁটাতারের বেড়া কেটে ফেলা, অবৈধ সামগ্রীর পাচার, অবৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড-এগুলো নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।

এসব অবৈধ কর্মকাণ্ড পরিচালনায় উভয় দিকের জনগণই ডেসপারেট। তারা সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। সীমান্তরক্ষী বাহিনী তখন গুলিবর্ষণ করে।

আমরা এমন ঘটনা শূন্যে নামাতে চাই। এটা করতে হলে সীমান্ত এলাকাকে অপরাধশূন্য করতে হবে। অপরাধশূন্য সীমান্ত তখনই হতে পারে যখন উভয় দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী একত্রে কাজ করে।

তারা সব সময় শুভেচ্ছা বিনিময় করছেন। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের সমন্বয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, রাতের বেলা যৌথ টহল-এসব যদি আমরা করতে পারি, তবে আমরা সীমান্তে হত্যার মতো ঘটনা বন্ধ করতে পারব।

ভারতের প্রতিশ্রুত ঋণের বাস্তবায়নে বাংলাদেশের অসন্তোষের কথা সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে ভারতের হাইকমিশনার বলেন, আমরা একইভাবে ঋণের বাস্তবায়ন গতি ধীর হওয়ায় অসন্তুষ্ট। বাংলাদেশের নিজস্ব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি।

এখন ইআরডির সক্রিয় নেতৃত্বকে ধন্যবাদ জানাই। এখন প্রক্রিয়ায় অনেক গতি লাভ করেছে। প্রকল্প ডিপিপি পর্যায়ে না আনা পর্যন্ত আমরা তহবিল দিতে পারি না।

প্রকল্প প্রস্তুত হলেই শুধু আমরা তহবিল দিতে পারি। অনেক প্রকল্প চিহ্নিত হয়েছে। কিন্তু প্রস্তুত করা হয়নি। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুত হলেই তা সামনে যেতে পারবে। এটা বাংলাদেশের সমস্যা।

আমরা প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রস্তুত হলেই শুধু অর্থছাড় করতে পারি। কিছু কিছু প্রকল্পে পরিবর্তন প্রয়োজন। খুলনা-মোংলা রেললাইনে কতিপয় লাইন বিভিন্ন কারণে পরিবর্তন করতে হবে।

আমাদের বছর শেষ করার জন্য অপেক্ষা করছি। আমরা এসব হতাশার কথা শেয়ার করেছি। ফলে বিষয়গুলো দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে। আমাদের প্রকল্পগুলোকে ঘোষণার পর্যায় থেকে সরবরাহের পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। এখন নতুন কর্মপরিকল্পনা আনতে হবে।

নতুন কর্মপরিকল্পনায় ভারত থেকে প্রকল্পের ৭৫ শতাংশ ভারত থেকে আনার শর্ত শিথিল হবে কি না-জানতে চাইলে তিনি বলেন, কাঁচামালের ৭৫ শতাংশ ভারত থেকে আমদানির শর্ত অনেক কারণে রাখা হয়েছে।

দাম কমসহ অনেক কারণ। আমরা অবশ্য এসব শর্তের ব্যাপারে নমনীয়তা দেখাচ্ছি।

সুনির্দিষ্ট প্রকল্পের ব্যাপারে ভারত থেকে কাঁচামাল আমদানির পরিমাণ আবারও কমাতে পারি। তবে বাংলাদেশের তরফে এ ব্যাপারে সুপারিশ থাকতে হবে। এটা করা সম্ভব। প্রকল্পের অগ্রগতি না হওয়ার জন্য-এটা কারণ নয়।

প্রকল্পে অগ্রগতি না হওয়ার কারণ হল বাংলাদেশের নিজস্ব প্রকল্প তহবিলের পর্যায়ে প্রস্তুত না করা।

নতুন প্রক্রিয়ায় ইআরডি সচিব, আমি নিজে এবং উভয় পক্ষের লোকেরা একত্রে বসব। আমরা জানুয়ারির শুরুতেই বসব। আমরা প্রকল্পে গতি আনব। আমরা এই প্রক্রিয়াটি আগামী বছর করব।

ভারতের সিএএ ও এনআরসি নিয়ে বাংলাদেশে অস্বস্তি সৃষ্টি হওয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা নিয়ে উদ্বেগ প্রত্যাশিত নয়। আমরা বারবার বলছি, এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এটা আমরা আমাদের দেশের ভেতরে করব।

এটা আমাদের বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশীর ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না। আমরা বারবার বলছি, এ সবকিছুই আমাদের সংবিধানের আলোকে হবে। আমাদের দেশে সক্রিয় এবং স্বাধীন বিচারব্যবস্থা রয়েছে।

আমাদের সক্রিয় ও সোচ্চার গণমাধ্যম রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের বন্ধুদের এ নিয়ে চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। আমরা বাংলাদেশের জন্য কোনো সমস্যা সৃষ্টি করব না।

যমুনা ফিউচার পার্কে ভারতের সর্ববৃহৎ ভিসা সেন্টার থাকার পরও ভিসার সুবিধা আরও বাড়ানো হবে কি না-জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা আরও বেশি কিছু করতে চাই।

আগে মহামারী বিদায় হোক। আমরা এখানে আমাদের ভিসা অপারেশন আরও ধাপে ধাপে উন্নীত করতে চাই। আমাদের ভিসা বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভিসা অপারেশন এখানে (যমুনা ফিউচার পার্ক) রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য কিংবা বিশ্বের যে কোনো দেশের তুলনায় বেশি। আমরা আরও অনেক বেশি কিছু করতে চাই। এভাবে আমাদের বন্ধুত্ব আরও দৃঢ় হবে।

প্রথমে প্রয়োজন মহামারীর অবসান।

তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে অগ্রগতি জানতে চাইলে তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় সরকারের পর্যায়ে কংগ্রেস কিংবা বিজেপি উভয় সরকার চুক্তিটি সই করার ব্যাপারে রাজি আছে। পানিবণ্টনের ইস্যুতে দু’দলের মধ্যে মতৈক্য আছে।

ইস্যু হল, নদীর পানি রাজ্যের অধীনস্থ বিষয়। তাই কেন্দ্রীয় সরকার একটি কাগজ পেলেই তা হয়ে গেল, সেটা বলতে পারে না। আমাদের সব অংশীদারকে সঙ্গে নিতে হয়। এর মধ্যে রাজ্য সরকারকে সঙ্গে নিতে হয়। এটা ১৯৯৬ সালের গঙ্গা চুক্তির সময়েও দেখা গেছে।

আমরা তিস্তার ব্যাপারেও একইভাবে করব। পাশাপাশি আমরা অপরাপর নদীর পানির ভাগাভাগিও করব। আরও অনেক নদী রয়েছে। একের পর এক নদীকে সঙ্গে নিতে হলে চিরকাল চলে যাবে। একটা একটা করে নদীর চুক্তি করতে হলে চিরদিন চলে যাবে।

সবচেয়ে ভালো হল, যে কটা একসঙ্গে করা যায়, তা একসঙ্গে করতে হবে। বাংলাদেশের মানুষকে এটা আশ্বস্ত করতে চাই, ভারত সত্যিকার অর্থে পানিবণ্টন করতে চায়।

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে ভারতের সহযোগিতার বিষয়ে জানতে চাইলে দোরাইস্বামী বলেন, আমাদের অ্যাপ্রোচ হল, রোহিঙ্গা ইস্যু অবশ্যই সমাধান হতে হবে। এই সমাধান হতে হবে নিরাপদ, দ্রুত, টেকসই।

ফলে রোহিঙ্গাদের সম্মানের সঙ্গে বিদায় জানাতে হবে। তারা যাতে রাখাইন স্টেটে গিয়ে থাকতে পারেন। কোনো কারণে যেন তাদের আবার ফিরে আসতে না হয়-এটা আমাদের লক্ষ্য। এই লক্ষ্য অর্জন করাটা আমাদের অভীষ্ট। আমরা এই লক্ষ্য সামনে রেখে অগ্রসর হব।

এটা বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সঙ্গে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। এটা করতে আমরা বদ্ধপরিকর। আমাদের ফোকাস হল, সমস্যার সমাধান করা। আমি মনে করি, নিরাপত্তা পরিষদে এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়।

ভারতে বাংলাদেশের পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে অশুল্ক বাণিজ্য বাধা সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের মধ্যে ট্রেড ইস্যু আছে। তবে এসব কিছু মোটেই অশুল্ক বাণিজ্য বাধা নয়।

আমাদের দেশে এমন কোনো নীতি নেই, যার ফলে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য আক্রান্ত হয়। আমি ব্যবসায়ীদের সুনির্দিষ্ট সমস্যা নিয়ে আলোচনা করার আহ্বান জানাই। উভয় দেশেই সমস্যা আছে। অনেক ভারতীয় ব্যবসায়ীর অনেক বড় ইস্যু রয়েছে।

রফতানি নিয়েও সমস্যা হয়। কিছু ইস্যু আছে যেগুলোয় সরকারের সহায়তা দরকার। এটা দ্রুতবেগে কিছু করতে হবে। নিয়মকানুন আধুনিক করতে হবে।

কানেকটিভিটি সম্পর্কে ভারতের হাইকমিশনার বলেন, বাংলাদেশে কিছু মানুষের মনে সন্দেহ আছে যে, ট্রানজিটে একতরফা ভারতের লাভ। এটা ঠিক নয়। সবচেয়ে বেশি লাভ বাংলাদেশের। আমি এটা বলব না যে, আমরা লাভবান হব না।

আমরা অবশ্যই লাভবান হব। কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য চলাচল করবে কোন দেশের ট্রাকে? ট্রানজিটে বাংলাদেশের ট্রাকে চলাচল করবে। পণ্যের ইস্যুরেন্স কোন দেশের ইন্সুরেন্স কোম্পানি পরিচালনা করবে। বাংলাদেশের ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি তা পরিচালনা করবে।

কার কনটেইনার টার্মিনাল ব্যবহার হবে? বাংলাদেশের কনটেইনার টার্মিনাল। কার সড়ক ব্যবস্থা টোল আদায় করবে? বাংলাদেশের সড়ক ব্যবস্থা। কার লজিস্টিক কোম্পানি টাকা উপার্জন করবে। বাংলাদেশের লজিস্টিক কোম্পানি।

এটার মাধ্যমে বাংলাদেশের অধিক লাভ হবে। এ ক্ষেত্রে সমতার কথা বলা উচিত নয়। সমতা মানে অতি সামান্য। আসলে বাংলাদেশ বেশি লাভবান হবে। সব বাণিজ্য সড়ক পূর্বের দিকে ছিল। এটাই ইতিহাস বলে। উত্তর-পূর্বাঞ্চল সবই বাংলাদেশ হয়ে যেত।

আগামী ২০২১ সাল নাগাদ আখাউড়া-আগরতলা লাইন চালু হবে। তারপর শাহবাজপুর-কুলাউড়া সম্পন্ন হবে। পেট্রাপোল-বেনাপোল, গেদে-দর্শনা, বিরল-রাধিকাপুর কানেকটিভিটি সামনে আসবে।

আমাদের কনটেইনার ডিপো সৃষ্টি করবে। অনেক কাজ করতে হবে। নীতি ইতোমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত। উভয় দেশের স্বার্থ এতে আছে। আমি বাংলাদেশের স্বার্থ বেশি হবে বলে বিশ্বাস করি।

নেপাল ও ভুটানে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করে তা বাংলাদেশে আমদানির ক্ষেত্রে ভারতের সহযোগিতা সম্পর্কে তিনি বলেন, এই অঞ্চলে বিদ্যুতের বাজার সবার জন্য লাভ এনে দেবে।

তিনভাবে এটা হবে। এক. অর্থনীতি মানে বিদ্যুতের দাম কমে আসবে। দুই. পরিবেশের স্বার্থ সুরক্ষা দেবে। তিন. কারিগরি কারণে লাভ হবে। এটাই ভবিষ্যৎ। এই ভবিষ্যতের জন্য কাজ করতে হবে।
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন