কিটো ডায়েট স্বাস্থ্যের জন্য কি ক্ষতিকর

 ডা. রফিক আহমেদ 
০৫ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মানবদেহ ৬২ শতাংশ পানি, ১৬ শতাংশ আমিষ, ১৬ শতাংশ চর্বি, ৬ শতাংশ মিনারেল ও ১ শতাংশ থেকেও কম শর্করা আর সামান্য কিছু ভিটামিন এবং অন্যান্য উপাদান দ্বারা গঠিত।

কিটো ডায়েট অর্থ- ডায়েট তবে শর্করা ছাড়া। ইদানীং অনেকেই কিটো ডায়েটের প্রতি আগ্রহী হচ্ছেন। ওজন কমানোর ক্ষেত্রে এ ডায়েট কার্যকর হলেও না জেনে-বুঝে এর প্রতি আকৃষ্ট না হওয়াই ভালো। কিটো গ্রিক শব্দ, ‘কিটোল’ থেকে এসেছে। এপিলেপসি বা মৃগীরোগীদের চিকিৎসায় কিটোজনিক ডায়েট ব্যবহার করা হয়।

এতে থাকে কম শর্করা, উচ্চমাত্রার প্রোটিন ও উচ্চমাত্রার চর্বি। ডায়েট বা খাদ্য বলতে আমরা বুঝি, যা গ্রহণ করার পরে অন্ত্রতন্ত্রে (মূল পাকস্থলী) পরিপাক হয়ে ক্যালরি তৈরি হবে, সেই ক্যালরির কল্যাণে আমরা স্বাভাবিক কাজকর্ম ও সুস্থ জীবনযাপন করতে পারব, তাহলেই সেটি খাদ্য।

বিজ্ঞানীরা কেউ কেউ খাদ্যকে ৬ ভাগে ভাগ করেছেন; আবার কেউ কেউ ৫ ভাগে ভাগ করেছেন। সংজ্ঞানুযায়ী, পানির ক্যালরি ভ্যালু শূন্য, তারপরও খাদ্য পরিপাকের জন্য পানি অপরিহার্য বিধায় অনেকেই পানিকে খাদ্য হিসেবে গণ্য করেছেন। খাদ্যকে ৬ ভাগে ভাগ করা হয়েছে, যথা- আমিষ বা প্রোটিন, চর্বি বা ফ্যাট, কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা। প্রকৃত খাদ্য এ ৩টিই, আরও ৩টি- ভিটামিন, মিনারেল ও পানি। ওজন কমানোর ক্ষেত্রে অনেক ধরনের ডায়েট দেখা যায়।

যেমন- এটকিন ডায়েট, জোন ডায়েট, লিকুইড ডায়েট, সাউথ বিচ ডায়েট, কুকি ডায়েট, ভেজিটেবল ও ফ্রুটস ডায়েট প্রভৃতি। কোনো ডায়েট-ই স্বাস্থ্যসম্মত নয়, কারণ এগুলোয় ফুড সাইড পিরামিড অনুসরণ করা হয় না।

কিটো ডায়েটে চর্বি থাকে ৭৫ শতাংশ, যেখানে স্বাভাবিকভাবে থাকা উচিত ২০-২৫ শতাংশ। শর্করা থাকে ৫-১৫ শতাংশ। সারা বিশ্বে শর্করার পরিমাণ নির্ধারণ করা আছে মোট ক্যালরির ৫৫-৬০ শতাংশ। চর্বির মতো প্রোটিনও এখানে বেশি থাকে। প্রোটিন বা আমিষের উৎস- মাছ, মাংস, দুধ, ডিম ও মসুরের ডাল ইত্যাদি।

এক গ্রাম প্রোটিনে ক্যালরি থাকে ৪ কিলোক্যালরি, চর্বি বা ফ্যাট পশুর চর্বি, তেল ১ গ্রামে ক্যালরি থাকে ৯.১ কিলোক্যালরি। কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা- চাল, আটা, ময়দা, যব, গম, ভুট্টা, চিনি ও মধু ইত্যাদি। ১ গ্রামে ক্যালরি থাকে ৪ কিলোক্যালরি।

উপরের প্রধান ৩ প্রকার খাদ্যের কার কী কাজ এবং শরীরের জন্য কার কতটুকু প্রয়োজন তা জানা দরকার।

প্রোটিন : শারীরিক গঠনের জন্য প্রোটিন অপরিহার্য। কখনও কখনও শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে। এছাড়া দেহের বৃদ্ধি সাধন, কোষ গঠন ও ক্ষয় পূরণ করা হল আমিষের প্রধান কাজ। প্রতিদিন প্রয়োজন মোট খাদ্যের ১০-১৫ ভাগ।

ফ্যাট : মানবদেহে ৬ ধরনের চর্বি আছে। চর্বি দৈহিক গঠন ও বৃদ্ধি সাধনে সহায়তা করে। চর্বি দেহে ভিটামিন সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। চর্বি হার্ট, অন্ত্রতন্ত্রকে সঠিক স্থানে থাকতে সহায়তা করে। ফ্যাট বা চর্বি খাদ্যকে সুস্বাদু করে। ত্বকের নিচে যে চর্বি থাকে তা শীত প্রতিরোধ করে। প্রতিদিন প্রয়োজন ২৫-৩০ ভাগ।

কার্বোহাইড্রেট : শক্তির জোগান দানকারী খাদ্য। প্রতিদিন খেতে হবে ৪০০-৬০০ গ্রাম (৫০-৬০ ভাগ)।

কাজ : আমাদের দৈনন্দিন কাজকর্মের জন্য যে শক্তির প্রয়োজন, তার প্রধান উৎস এ কার্বোহাইড্রেট। প্রোটিন ও ফ্যাটকে কর্মক্ষম করে তোলে এ কার্বোহাইড্রেট। শর্করা বিশেষ করে আঁশযুক্ত খাবারগুলো পরিপাকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শর্করা বিশেষ প্রয়োজনে চর্বিতে রূপান্তরিত হতে পারে। প্রাপ্তবয়স্ক মানবদেহে ৫০০ গ্রাম শর্করা গ্লাইকোজেন হিসেবে জমা থাকে। শাক-সবজি, ফলমূল ও আঁশযুক্ত খাবারগুলো রক্তের ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমায়। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, পিত্ত পাথর না হতে ভূমিকা রাখে। ক্যান্সার প্রতিরোধে এ খাবারের ভূমিকা অপরিসীম। আঁশযুক্ত খাবার, শাক-সবজি, ফলমূল ও শস্যদানা পানি শোষণ করে স্টুল তৈরি করে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। এ খাদ্যগুলোকে প্রতিরক্ষাকারী খাদ্য বলা হয়।

শর্করা ছাড়া যে খাদ্য তালিকা তৈরি করা হয়, সেটিকে বলা হয় কিটো ডায়েট। কিটো ডায়েট অনুসরণ করা বেশ কঠিন ও ব্যয়বহুল। সবার পক্ষে সব কিছু জোগার করা সম্ভব হয় না। এ খাবারে থাকে মূলতঃ সমুদ্রের উদ্ভিদ ও মাছ, পনির, এভোকাডো, মাংস, মুরগির মাংস, ডিম, নারিকেল তেল, মাখন, জলপাই তেল ও সরিষার তেল। যেসব গরু শুধু ঘাস খায়, সেসব গরুর মাংস- যাতে উচ্চমাত্রায় চর্বি থাকে। সয়াবিন তেল একেবারেই নিষেধ।

এছাড়া থাকবে বিভিন্ন ধরনের বাদাম ও বীজ। যেমন- সূর্যমুখী বীজ, তিল, তিসি, কুমড়ার বীজ ও সয়াবীজ প্রভৃতি। নারিকেল তেলে আছে মিডিয়াম চেইন ট্রাইগ্লিসারাইড। এতে মস্তিষ্ক ভালো থাকে, খাবার তেল হিসেবে ব্যবহার ও বিক্রি আমাদের দেশে নেই বললেই চলে। নিত্যদিনের প্রতিটি রান্নায় আমরা মাখন ব্যবহার করি না। এক হিসেবে কিটো ডায়েট উচ্চবিত্তদের জন্যই সহজসাধ্য। কারণ প্রতিটি খাবারের দাম বেশি, যা পরিবারের খরচ বাড়িয়ে দেবে এবং যা আসলেই অপ্রয়োজনীয়।

কিটো ডায়েটে কী খাওয়া যাবে না

ভাত, রুটি, আলু, চিনি, মিষ্টি, দুধ, ডাল, চাষের মাছ, ফার্মের মুরগি, মিষ্টি কুমড়া, মুলা তথা মাটির নিচের সবজি।

১৫-১৮ ঘণ্টা অনাহারে থাকতে হবে, খালি পেটে ব্যায়াম করতে হবে।

কী খাওয়া যাবে

সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে দেশি মুরগি/মাছ, বাটার দিয়ে ভাজা ডিম, বাদাম, শাক-সবজি। পিপাসা লাগলে পানি খাওয়া যাবে।

আমাদের ব্রেইনের কোষ এবং অন্যান্য কোষগুলো শুধু তাদের বেঁচে থাকার জন্য কর্মক্ষম থাকার জন্য গ্লুকোজ গ্রহণ করতে পারে এবং তার উৎস শর্করা।

সুষম খাদ্য বলতে আমরা বুঝি, প্রতিদিন আমাদের দেহের জন্য যে ক্যালরির প্রয়োজন তা হতে হবে- শর্করা ৫০-৩০ ভাগ, আমিষ ১০-১৫ ভাগ, চর্বি ২০-২৫ ভাগ।

সম্প্রতি ৩০ বছরের একজন উচ্চশিক্ষিতা ভদ্রমহিলা (২ সন্তানের জননী) আমার চেম্বারে এসেছিলেন শ্বাসকষ্ট নিয়ে। তার পরিবারে শ্বাসকষ্টের কোনো রোগী নেই। তিনি গত ৫ মাস ওজন কমানোর লক্ষ্যে কিটো ডায়েটে আকৃষ্ট হয়ে কিটো ডায়েট খাচ্ছেন। তার উচ্চতা ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি, ওজন ছিল ৭২ কেজি। ৫ মাসে ৮ কেজি ওজন কমিয়ে ৬৪ কেজি হয়েছেন সত্য, তার শরীরে আরও নানাবিধ সমস্যা শুরু হয়েছে। বুকের ভেতর অস্থির লাগা, মাথা ঘোরা, শরীর দুর্বল লাগা ও কোষ্ঠকাঠিন্য তাকে খুবই যন্ত্রণা দিচ্ছে।

কিটো ডায়েটের অসুবিধা

কিটো ডায়েটের কয়েকটি খারাপ দিক হল, অধিক চর্বি ও প্রোটিনের জন্য একদিকে ডায়রিয়া; অন্যদিকে কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দেয়। কিডনিতে পাথর ও কিডনির অন্যান্য সমস্যা, হৃদরোগ, পিত্তথলিতে পাথর (গলব্লাডার স্টোন) প্যানক্রিয়াসের অসুস্থতা, থাইরয়েডের সমস্যা, হজমশক্তি কমে যাওয়া, চুল পড়ে যাওয়া প্রভৃতি দেখা দিতে পারে। বেশি প্রোটিন ও চর্বির জন্য ত্বকে ফুসকুড়ি (Rash) ওঠা, ত্বকের উজ্জ্বলতা নষ্ট হওয়া প্রভৃতিও উল্লেখযোগ্য। ডায়রিয়ার কারণে শরীর দুর্বল হয়ে কর্মক্ষমতা কমে যায়।

কিটো ডায়েট ৭-১০ দিন এমনকি ১৫ দিন পর্যন্ত চালান যাবে, বছরের পর বছর নয়।

যারা ওজনাধিক্যে ভুগছেন, তারা প্রতি ৩ মাস অন্তর পুষ্টিবিদের কাছে যাবেন। তিনি রোগীর ওজন, উচ্চতা, বয়স, শারীরিক পরিশ্রমের হার, রক্তের সুগার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় প্যারামিটারের ওপর ভিত্তি করে খাদ্য তালিকা নির্ণয় করে দিবেন।

আপনি রোগগ্রস্ত মোটা। নিজের শরীরের ভার নিজে বহন করতে পারছেন না। আপনি স্লিম হতে চান? চিকিৎসা শাস্ত্রে অনেক রোগ আছে, যার কারণে আপনি মুটিয়ে যেতে পারেন। আপনি ওজন কমানের পরিকল্পনা করছেন। আপনি একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞের কাছে যাবেন। তিনি বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে যদি কোনো রোগ নির্ণয় করতে না পারেন, তখন তিনিই আপনাকে একজন পুষ্টিবিদের কাছে পাঠাবেন। পুষ্টিবিদ আপনার সব কিছু পর্যালোচনা করে একটি খাদ্য তালিকা তৈরি করে দিবেন- সেই তালিকা অনুসরণ করলে তবেই আপনি উপকৃত হবেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, যে ৭টি বদঅভ্যাস মস্তিষ্কের জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর-

* সকালের নাস্তা না খাওয়া।

* অনেক রাতে ঘুমাতে যাওয়া।

* বেশি বেশি চিনি ও মিষ্টি খাওয়া।

* অনেক দেরি করে ঘুম থেকে উঠা।

* আহারের পাশাপাশি টিভি দেখা বা কম্পিউটার চালানো।

* ঘুমানোর সময় মাথায় টুপি, স্কার্ফ পড়া বা অন্য কিছু দিয়ে মাথা ঢেকে রাখা।

* প্রস্রাবের বেগ আছে কিন্তু প্রস্রাব না করা।

নিয়মিত হাঁটাচলা, কায়িক পরিশ্রম করা, ব্যায়াম করা- এসবই পারে আপনার ক্যালরি পুড়িয়ে ফেলতে। পুষ্টিবিদরাই কিটো ডায়েটের ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করছেন।

সুস্থ জীবনযাপনের জন্য সব ধরনের খাবারই শরীরের জন্য প্রয়োজন। শরীর আপনার; সিদ্ধান্তও আপনার। সহজলভ্য সুষম খাবার পরিমিত পরিমাণে খান, কম খরচে ওজন কমান।

লেখক : বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ, সহকারী অধ্যাপক, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন