ফিরে দেখা ২০২০

ফ্যাশন শিল্পে করোনার প্রভাব

 কেয়া আমান 
২৯ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সারা বিশ্ব এখন মারাত্মক ছোঁয়াচে করোনাভাইরাস বা কভিড-১৯-এর মহামারীতে আক্রান্ত। এক বছর হতে চললেও করোনার প্রভাব এখনও ঠেকান সম্ভব হয়নি। দীর্ঘমেয়াদি করোনাভাইরাসের প্রভাব পড়েছে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি রাষ্ট্রের প্রতিটি মানুষের জীবনে, বিশ্ব অর্থনীতিতে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিল্প-কারখানা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ স্বাভাবিক জীবন এবং জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় সব কিছু এখনও অনেকটাই নিস্তেজ। আমাদের দেশে লকডাউন শিথিল থাকলেও বিশ্বের অনেক দেশে নতুন করে লকডাউন দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশসহ যেসব দেশে লকডাউন নেই সেসব দেশেও চলাফেরা বা ব্যবসা-বাণিজ্য এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক নয়। নাইকি, জারা, পুমার মতো নামিদামি ফ্যাশন ব্র্যান্ড করোনায় তাদের উৎপাদন এবং বিপণন স্থগিত রেখেছিল দীর্ঘদিন।

কে জানত, একটি ক্ষুদ্র ভাইরাস পুরো বিশ্বের স্বাভাবিক অবস্থা পাল্টে দেবে। লকডাউন, হোম কোয়ারেন্টিন, সেলফ-আইসোলেশন- এমন নানা শব্দ আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে মানুষকে। বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাসের প্রভাব পড়েছে সর্বত্র। যদি না টেকে জীবন, শিল্প কি টেকে? তাই জীবন বাঁচাতেই ওই শব্দগুলো। জীবন বাঁচাতেই সামাজিক-শারীরিক দূরত্ব।

গ্লোবাল ফ্যাশনের কথা যদি বিবেচনা করা হয় তাহলে দেখা যাবে, অনেক প্রতিষ্ঠানই করোনা মহামারীর পর প্রচুর আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে অনেক কোম্পানিই টিকতে না পেরে হারিয়ে গেছে। অর্থাৎ যেসব কোম্পানি করোনা মহামারীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারবে, সেসব টিকে থাকবে, বাকিরা হারিয়ে যেতে পারেন।

করোনার কারণে দেশে দেশে কোয়ারেন্টিন কিংবা লকডাউনের কারণে কম-বেশি সবাই গৃহবন্দি ছিল অনেক দিন এবং এখনও অনেক দেশেই লকডাউন চলছে। করোনাভাইরাসের কারণে সব অঙ্গনে লেগেছে চরম ব্যবসায়িক মন্দা। বিশেষ করে ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির জন্য এখন মহাবিপদ সংকেত! অন্তত এমনটাই মনে করছেন ফ্যাশন বিশেষজ্ঞরা।

করোনার কারণে প্রায় প্রতিটি ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিই ব্যাপক লোকসান গুনেছে এবং এখনও গুনতে হচ্ছে। সাধারণত পহেলা বৈশাখ ও পবিত্র ঈদুল ফিতর এ দুই উৎসবকে কেন্দ্র করে ফ্যাশন হাউসগুলো পোশাক তৈরি করে বেশি। কারণ এ সময় পোশাক বিক্রি হয় সারা বছরের বিক্রির ৪০ শতাংশ। বাকিটা অন্যান্য উৎসবকে কেন্দ্র করে। তাই করোনা হানায় বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে অনেক।

পোশাকশিল্পসহ অন্যান্য খাতের মতো করোনার প্রভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছে দেশের সৌন্দর্য সেবা খাত বা বিউটি ইন্ডাস্ট্রি। সম্প্রতি এক গবেষণায় জানা গেছে, এ খাত থেকে দেশে বার্ষিক আয় ৫০০ কোটি ডলার। দেশের ১৮ শতাংশ নারী এ পেশায় জড়িত। ৩ লাখেরও বেশি বিউটি পার্লারে উদ্যোক্তা ও কর্মী আছে ১০ লাখেরও বেশি। করোনা পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হওয়ায় এ খাতের বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীকে কর্মহীন হয়ে থাকতে হচ্ছে দীর্ঘসময় ধরে। এখন কিছু কিছু পার্লার চালু হলেও সেবাগ্রহীতার সংখ্যা হাতেগোনা।

তবে ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির ক্ষেত্রে একটি কথা সত্য। সেটি হল, যতই মহামারী হোক বা যেটিই হোক, ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি কখনও হারিয়ে যাবে না। কোনো না কোনোভাবে ফ্যাশন টিকে থাকবে। সেটি ফ্যাশনের গতিপথ পাল্টে হোক কিংবা হোক নতুন কোনো ফ্যাশনের আবির্ভাব হয়ে। ইতিহাস ঘাঁটলে এর প্রচুর উদাহরণ পাওয়া যায়।

যেমন- একটি সময় জিন্স ছিল খনি শ্রমিকদের পরিধেয়। এরপর সেটি হয়ে গেল দ্রোহী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ, যা কতিপয় অভিনেতা পরতেন। পরে সেই জিন্সই হল আভিজাত্যের প্রতীক। জিন্স এখন সর্বসাধারণের প্রায় অপরিহার্য পরিধেয় হয়ে গেছে। মানে ও ডিজাইনে পরিবর্তন এলেও জিন্স এখনও একই আছে, কিন্তু ফ্যাশনের পরিবর্তন হয়েছে অনেকবার। এভাবেই ফ্যাশন টিকে থাকে কোনো না কোনো পথে।

করোনার কারণে দেশের অর্থনীতিতে এক ধরনের ধস নেমেছে, ছোট বড় সব ধরনের ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কিন্তু অন্যদিকে এ সময়ে বাজারে নতুন তৈরি হওয়া চাহিদাকে মাথায় রেখে কিছু ক্ষুদ্র উদ্যোগ ভালো ব্যবসা করেছে। সবজি ও ফল, নাশতা, সুরক্ষা সামগ্রী, পোশাক- কী নেই সেই তালিকায়! এসব উদ্যোগের প্রায় শতভাগই অনলাইনভিত্তিক। বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে ব্যবসা করছেন। প্রযুক্তিবিষয়ক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট মানুষ বলছেন, সামাজিক মাধ্যমে এ মুহূর্তে প্রায় দুই হাজারের মতো নতুন প্রতিষ্ঠান পণ্য বিক্রি করছে। আর এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশের ২০০’র বেশি কুরিয়ার সার্ভিসের ব্যস্ততাও এ সময়ে বহুগুণ বেড়েছে। মহামারী করোনার কারণে আমাদের জীবনযাত্রায় নতুন করে যোগ হয়েছে বেশ কিছু জিনিস। যেগুলো আগেও ছিল, তবে গুরুত্ব ছিল না তেমন। এখন প্রায় সব ব্র্যান্ডেরই রয়েছে অনলাইনে পোশাক বিক্রির ব্যবস্থা। এসব প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ওয়েবসাইটের পাশাপাশি আছে ফেসবুক পেজ। এখানে মেসেজ করে যে কেউ পোশাক অর্ডার করতে পারবেন। অফলাইনে প্রতিষ্ঠিত ফ্যাশন হাউসগুলোতে অনলাইনে আগে সেল কম থাকলেও এখন তা বেড়েছে।

করোনা সংকটের মতো চ্যালেঞ্জ সামনে রেখে ধীরে ধীরে সচল হচ্ছে সব ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। তবে সীমিত পরিসরে দোকানপাট, শপিংমল খুলে দিলেও করোনার ভয়ে ক্রেতার সংখ্যা নগণ্যই।

বিশ্বরঙের স্বত্বাধিকারী ও ফ্যাশন ডিজাইনার বিপ্লব সাহা বলেন, ‘জীবন তো আর থেমে থাকে না। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারীসহ নানা কারণে জীবনে মাঝেমধ্যে স্থবিরতা দেখা দেয়। সেরকম একটি সময় এখন পার করছি আমরা। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য চেষ্টাও করছি সবাই মিলে। পোশাক জীবনের মৌলিক চাহিদার একটি। সেই চাহিদাকে প্রাধান্য দিয়ে করোনাকালেও নিজেদের উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছি। লকডাউনের সময় অনলাইনে ক্রেতাদের কাছে কাপড় পৌঁছে দিতে উদ্যোগ নিয়েছি। এখন আবার সব স্বাভাবিক হতে শুরু করায় অনলাইন, অফলাইন- দু’ভাবেই পোশাক বিক্রি করছি। তবে খুব ভালো বেচাকেনা হচ্ছে যে তা নয়। কারণ মানুষের তো আর এখন ততটা ইনকাম নেই, পকেটে টাকা নেই। তবে আমরা আশাবাদী ধীরে ধীরে এ অবস্থার উন্নতি ঘটবে।’

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন