মাদ্রাসায় পড়ানো হোক মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস

 তোফায়েল গাজালি 
২৫ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পুরান ঢাকার প্রচীন মাদ্রাসা লালবাগ। আসরের নামাজের পর মসজিদের সিঁড়িতে বসে কথা বলছিলাম এ মাদ্রাসার ছাত্র হাসিবের সঙ্গে (ছদ্মনাম)। কথার ফাঁকে জিজ্ঞেস করলাম- আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তোমার কাছ থেকে কিছু শুনতে চাই। আক্কেলগুড়ুম হাসিব হকচকিয়ে বলল, ‘আপনিই বলেন আমি শুনি।’

জিজ্ঞেস করলাম, তোমাদের পাঠ্যবইয়ে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কি পড়ানো হয়? ‘না- মানে এরকম কিছু আমাদের বইয়ে নেই।’ মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠান, সভা-সেমিনার, বিশেষ ক্লাস এরকম কিছু? ‘না! আমরা তো কোরআন হাদিসের বিশেষজ্ঞ হই তাই এসব আমাদের পড়ার সুযোগ কম থাকে।’

হাসিবকে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে একটি ধারণা দিয়ে সেদিন বাসায় চলে গেলাম। কওমি ঘরানার বেশ কয়েকজন আলেমের সঙ্গে এ বিষয়ে দীর্ঘ কথা হয়। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি আলেম ও কওমি পড়ুয়াদের ব্যাপক আগ্রহ থাকলেও কোনো এক অজানা কারণে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পড়ানো হয় না কওমি মাদ্রাসায়। সেই রহস্যের জট খোলার চেষ্টা করিছি পুরো সাক্ষাৎকারে।

কথা বলেছি ইসলামী ফিকাহ একাডেমি বাংলাদেশের সেক্রেটারি জেনারেল ও সেন্ট্রাল শরিয়া বোর্ডের সদস্য মুফতি মাওলানা মুহাম্মদ আমিমুল ইহসানের সঙ্গে। মাওলানা ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের পরতে পরতে ওলামায়ে কেরামের আত্মত্যাগ ও আত্মদানের দীর্ঘ ইতিহাস আওড়িয়ে বলেন, দেশ মাতৃকার যে কোনো প্রয়োজনে আলেম-ওলামারা সব সময় সোচ্চার ছিলেন।

তিনি প্রসঙ্গক্রমে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, মাওলানা আব্দুর রহিম তর্কবাগিশের কথা উল্লেখ করে বলেন, বাংলাদেশের অস্তিত্ব, সার্বভৌমত্ব, উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে এ দুই আলেম যে অবদান রেখে গেছেন তা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। মাওলানা আফসোস করে বলেছেন, শিক্ষার্থীদের বিশেষ কোনো কল্যাণের কথা ভেবে এ পর্যন্ত মাদ্রাসার পাঠ্য সিলেবাসে পরিপূর্ণভাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি তবে এতে ক্ষতি হয়েছে।

তিনি মাদ্রাসায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সিলেবাস প্রণেতার সংকটের কথা অকপটে স্বীকার করে অতিশিগগিরই কওমি সিলেবাসে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে আশা ব্যক্ত করেন।

সৈয়দপুর সৈয়দীয়া শামছিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসা, সুনামগঞ্জের অধ্যক্ষ ড. সৈয়দ রেজওয়ান আহমদ বলেন, দেশপ্রেম ইমানের অঙ্গ। হজরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ দেশপ্রেমিক। স্বদেশ ও স্বজাতি প্রেমের যে অনন্য আদর্শ তিনি আমাদের সামনে উপস্থাপন করে গেছেন তা অনুসরণ করা প্রতিটি মুমিনের দায়িত্ব ও কর্তব্য। রাসূল (সা.)-এর শিক্ষা ও আদর্শে উদ্বুদ্ধ এ দেশের ওলামায়ে কেরাম দেশ জাতির প্রতিটি ক্রান্তিকালে কাণ্ডারির ভূমিকা পালন করে গেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় বহু মাদ্রাসায় মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প ছিল।

অসংখ্য ইমাম-খতিব, পীর-মাশায়েখ মানুষকে মুক্তিযুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করেছেন। হ্যাঁ! জামায়াতে ইসলামীর মতো ছদ্মবেশী কিছু লোক আমাদের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে। জামায়াত সুকৌশলে তাদের গায়ের দুর্গন্ধ এ দেশের সহজ-সরল আলেমদের গায়ে লাগিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছে। মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস জানার পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীর মতো ছদ্মবেশী ইসলাম বিনাশী মতবাদের ব্যাপারেও সচেতন থাকতে হবে।

বিশিষ্ট আলেম জামিয়া মক্কীনগর কেরানীগঞ্জের মুহাদ্দিস মাওলানা আবু আম্মার আবদুল্লাহ বলেন, একসাগর রক্ত ও ত্রিশ লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময় অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা। খোদাতায়ালার বিশেষ এ নিয়ামত অর্জনের জন্য ধর্মবর্ণ, শ্রেণি-পেশা নির্বিশেষে এ দেশের মানুষ একাধারে দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করে অর্জন করেছেন লাল-সবুজের পতাকা সবুজ শ্যামল এ বাংলাদেশ। এ যুদ্ধে অসংখ্য আলেম-ওলামা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কওমি মাদ্রাসার সিলেবাসে না থাকার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, আজ থেকে এক দশক আগেও আমাদের মাদ্রাসায় খুব একটা মাতৃভাষার চর্চা হতো না। তাই সিলেবাসের উপযোগী কোনো বই হয়তো ছিল না। তাই শিক্ষার্থীরা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানার সুযোগ পায়নি।

আলহামদুলিল্লাহ! এখন মাদ্রাসা শিক্ষিতরা আরবি উর্দুর পাশাপাশি বাংলাভাষায়ও পারদর্শী হয়ে উঠছেন। তারা একাডেমিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস না পড়লেও মাদ্রাসায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শের চর্চা হয়। আমরা আশা করছি খুব অল্প দিনের মধ্যেই মাদ্রাসার সিলেবাসে মুক্তিযুদ্ধের পরিপূর্ণ ইতিহাস সংযোজন করা হবে।

মারকাযুল হুফফাজ ইন্টারন্যাশালের প্রিন্সিপাল হাফেজ মাওলানা সালামাতুল্লাহ বলেন, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল জালেমের বিরুদ্ধে মজলুমের সংগ্রাম। আলেমরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। আজকের মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা এসব আলেমের নামও জানে না। এটি একই সঙ্গে দুঃখ ও লজ্জার।

নিজের আত্মপরিচয় না জানা কোনো জাতি পৃথিবীতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে সেই নজির ইতিহাসে নেই। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ইসলামবিরোধী ছিল না। একটি স্বাধীন সর্বভৌম বাংলাদেশে দ্বীন-ধর্ম ও ইমান ইসলাম নিয়ে সুন্দরভাবে বসবাসের জন্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ ও লালন অপরিহার্য। সে জন্য মাদ্রাসায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পাঠদান করা অত্যন্ত জরুরি।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন