ঢাকায় ঢাকা

 সত্যজিৎ বিশ্বাস 
২৭ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

‘অবাসযোগ্য শহরের তালিকায় ঢাকা অপ্রতিদ্বন্দ্বী’! মোখলেস সাহেব খবরটা পড়ে প্রচণ্ড বিরক্ত হলেন। এটা কীভাবে লিখল পেপারওয়ালারা? যারা লিখল তারা কি ঢাকা শহরে বাস করেন না?

গত দুই মাস থেকে সুইসাইড করার জন্য এ শহরে কম চেষ্টা করেননি মোখলেস সাহেব। এত এত যানবাহন দেখে এক দৌড়ে রাজপথের মাঝ বরাবর ছুটে গেলেন। ঘণ্টাখানেক অপেক্ষার পর অবাক হয়ে খেয়াল করলেন, বিশাল জ্যামে সব যানবাহন আটকে আছে। কখন ছুটবে, কে জানে?

ব্যর্থ মনে ফিরে এসে ঠিক করলেন বিষ খেয়ে মরবেন! বাজার থেকে পঞ্চাশ টাকার বিষ কিনে বাড়ি ফিরলেন। তারপর অতি যত্নসহকারে গোটা গোটা হরফে সুইসাইড নোট লিখতে বসলেন। ছাত্রজীবন থেকে শুরু করে চাকরি জীবন পর্যন্ত খারাপ হাতের লেখার জন্য অনেক কথা শুনেছেন। একবার সারা রাত জেগে আবেগ জমিয়ে গুটি গুটি করে সুদীর্ঘ প্রেমপত্র লিখেছিলেন। সেই চিঠি ছোটবোন লিপির হাতে তুলে দিয়ে বলেছিলেন, তার সুন্দরী বান্ধবী রিমঝিমকে দিতে। তার লেখা প্রেমপত্র দেখে রিমঝিম বলেছিল, ‘হাতের লেখা তো বোঝাই যায় না, পড়ব কী?’ এটুকু হলেও হতো। রিমঝিম লিপিকে বলেছে, যার হাতের লেখা এমন জঘন্য, তার মনটা না জানি কেমন জঘন্য!

মনে শেষ আশা, জীবিত থাকতে তো তার হাতের লেখার মূল্যায়ন হল না, মরণে যেন তার হাতের লেখার মূল্যায়ন হয়! মৃত্যুর পর এ লেখা দেখে অনেকে আফসোস করবে নিশ্চয়ই। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ কথা, সুইসাইড নোট বোঝা না গেলে যে কেউ আবার ফেঁসে যেতে পারে সে আশঙ্কায় মুক্তার হরফে লিখলেন, ‘আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়’। তারপর লেখাটা বুক পকেটে রেখে বিষ খেয়ে চোখ বুজে শুয়ে পড়লেন।

সকালে ঘুম ভাঙল বউয়ের ঝাড়িতে, ‘পড়ে পড়ে আর কত ঘুমাবে? অফিস নেই নাকি অকর্মার ঢেঁকি দেখে ছাঁটাই করে দিয়েছে?’ মোখলেছ সাহেব ধড়মড় করে উঠে বসে বুক পকেটে হাত দিলেন। নাহ্, কাগজ জায়গা মতই আছে। ভাগ্যিস বউয়ের হাতে পড়েনি। না হলে লজ্জার সীমা থাকত না। শালার বিষেও ভেজাল!

অফিস কলিগ কাম প্রিয় বন্ধু শরীফকে পুরো ঘটনা খুলে বলতেই সে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেতে লাগল। কোনোমতে হাসি থামিয়ে বলল, ‘মরার আর উপায় পেলি না? শেষ পর্যন্ত বিষ খেয়ে মরতে গেলি? আরে গাধা, প্রতিদিন আমরা খাবারে যে পরিমাণ ভেজাল বিষ খাই, তাতেই যদি কিছু না হয়, এই বিষে কী হবে? মশা মারার ওষুধে কোনো মশা মরতে দেখেছিস?’

প্রচণ্ড মন খারাপ নিয়ে বাসায় ফিরতে ফিরতে ঠিক করলেন, আগুনে পুড়ে মরবেন। বাসায় এসে রান্নাঘরের জানালা ভালো করে বন্ধ করে গ্যাস বার্নারের সুইচ ঘুরিয়ে দিলেন ফুল স্পিডে। নতুন ম্যাচের সবগুলো কাঠি বার্নারে চেপে ধরেও একটু আগুনের দেখা পাওয়া গেল না। থাকবে কী করে, গ্যাস থাকলে তো?

মাথা ঠাণ্ডা করতে ড্রইংরুমের সোফায় গিয়ে বসলেন। হঠাৎ মনে পড়ল, সাঁতার তো জানেন না, পানিতে ডুবে মরলে কেমন হয়? খুশিতে লাফ দিয়ে উঠতে গিয়েও আবার সোফায় বসে পড়লেন। এ শহরে পুকুর কই? অনেক ভাবার পর মাথায় উপায় এলো। আরে তাই তো, বাথরুমে তো একটা বড় ড্রাম আছে পানি জমিয়ে রাখার জন্য। সেটায় ডুবে বসে থাকলেও তো হয়। মনে মনে নিজের পিঠ চাপড়ে সাবাস ব্যাটা বলে ছুটলেন বাথরুমে। কিন্তু হায়, অভাগা যেদিকে চায়, ড্রামও শুকিয়ে যায়। ড্রামে এক ফোঁটা পানিও নেই। ট্যাপ ছাড়তেই পানি না বের হয়ে বাতাস বের হয়ে এলো। মোখলেস সাহেব নিজ কানে শুনলেন, কলের পানির শেষ নিঃশ্বাস বের হওয়ার সেই শব্দ।

একের পর এক ব্যর্থতায় মধ্যরাতে হতাশ হয়ে বিছানার কিনারে এলিয়ে পড়লেন। শুলেই কি আর ঘুম আসে? বউয়ের নাক ডাকার ভলিয়ম কমাতে কানে তুলো দিয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালালেন নিদ্রা যাপনের। সেই মুহূর্তে চলে গেল বিদ্যুৎ। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার গুপ্ত খবর পেয়ে ছুটে এলো আরেক গেরিলা বাহিনী। বউ ঘুমিয়ে পড়ার পরেই এরা চুপি চুপি আসে। মাথা থেকে পা পর্যন্ত চারপাশে ঘুরে ঘুরে গান গাওয়া থেকে শুরু করে চুমু খাওয়া পর্যন্ত সর্বোচ্চ পরকীয়ার চেষ্টা চালিয়ে যায় ওরা। কোনোভাবেই ঘুমিয়ে পড়তে দেয় না লাভ বাইটে সিদ্ধহস্ত মশক বাহিনী।

ঢাকা শহরকে জীবন্ত, প্রাণবন্ত, বাসযোগ্য করার সে কী আপ্রাণ চেষ্টা সবার! মোখলেস সাহেবও কম না। তিনিও পণ করেছেন এ নচ্ছার সমস্যা জর্জরিত ঢাকা শহর ছেড়ে চলে যাবেন খোলা আকাশে।

ভোরের দিকে মন শক্ত করে ফ্যানে ঝুলে পড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। আস্তে আস্তে বিছানা থেকে নেমে আলনা থেকে বউয়ের একটা শাড়ি পাকিয়ে ফাঁসির দড়ি তৈরি করে ফেললেন। তারপর একটা চেয়ারের ওপর টুল নিয়ে উঠে শাড়িটা ফ্যানের সঙ্গে বেঁধে যেই ঝুলে পড়তে যাবেন অমনি চলে এলো বিদ্যুৎ। ফ্যানের ব্লেড বোঁ বোঁ করে ঘুরতে শুরু করতেই শাড়ি ছিঁড়ে চেয়ার, টুল উল্টে পড়লেন বউয়ের ওপর। আকস্মিক এ রোমান্টিক সিনের জন্য তৈরি না থাকার কারণে বউয়ের কাছে শক্ত গালি খেয়ে হতভম্ব হয়ে পড়লেন মোখলেস সাহেব। বিদ্যুৎ অফিসের টাইমিং এত নিখুঁত?

পরিস্থিতি কোনোমতে সামলে নিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন বেচারা। আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, কী সুন্দর ভোর হচ্ছে। এ ভোর দিয়ে ঢাকা শহরের সব দোষই ঢেকে ফেলা যায়। মোখলেস সাহেবের কেন যেন মনে হয়, এ জাদুর শহর তাকে মরতে দিতে রাজি না। কোনোভাবেই না।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন