বধ্যভূমি-গণকবরগুলো সংরক্ষণ করুন

 আর কে চৌধুরী 
২৩ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মহান মুক্তিযুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা বাঙালিদের গণহত্যার পর এর চিহ্ন মুছে ফেলতে অসংখ্য লাশ গুম করেছে। তারা বাঙালিদের নির্যাতন ও হত্যার জন্য বিশেষ বিশেষ স্থান বেছে নিয়েছিল।

পাকিস্তানিরা বাঙালি হত্যায় সব সময় বুলেটও ব্যয় করেনি। তারা কখনও বেয়োনেট দিয়ে, কখনও ধারালো ছুরি দিয়ে নির্মমভাবে মানুষ জবাই করেছে। ময়লার ডিপোতে স্থান পেয়েছে মানবসন্তানের লাশ। হত্যার পর হতভাগা মানুষের মৃতদেহ ফেলে দেয়া হয়েছে খাল-বিল-নদীতে।

যেখানে নদী ছিল না সেখানে তারা মৃতদেহগুলো মাটিচাপা দিয়েছে। ফলে হত্যার চিহ্ন মুছে ফেলার জন্য নদী বা খালে লাশ ফেলে দেয়া ঘাতকদের কাছে সহজ উপায় হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল।

একাত্তরের নয় মাস দেশের বিভিন্ন স্থানে হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের দোসররা এভাবে গণহত্যার চিহ্ন অনেকটাই মুছে ফেলতে সক্ষম হয়েছিল। ইতোমধ্যেই বহু গণকবরের ওপর দালানকোঠা তোলা হয়েছে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লতাগুল্ম-বনজঙ্গলে ঢাকা পড়ে অযত্ন-অবহেলায় অনেক গণকবর আজ লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে গেছে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা বাঙালিদের হত্যা করে যেসব স্থানে তাদের মৃতদেহ মাটিচাপা দিয়েছিল, ঐতিহাসিক প্রয়োজনেই সেসব বধ্যভূমি ও গণকবর শনাক্ত করা জরুরি। জেলাভিত্তিক এসব বধ্যভূমি ও গণকবর শনাক্ত করার মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের নির্মমতার বহুমাত্রিকতা সম্পর্কে কিছুটা হলেও ধারণা লাভ সম্ভব হবে বলে মনে করি।

১৯৭১ সালে নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে জাতিকে মেধাশূন্য করার চক্রান্ত করা হয়। রাজাকার, আলবদর ও শান্তিবাহিনীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় পাকিস্তানি বাহিনী হত্যা করে সূর্যসন্তান বুদ্ধিজীবীদের। এ ছাড়া অগণিত বাঙালিকে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে গুলি চালায় নরপশুরা। রচিত হয় বধ্যভূমি, গণকবর। এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত সব বধ্যভূমি ও গণকবরে স্মৃতিস্তম্ভও স্থাপন করা হয়নি।

শ্রদ্ধা জানানো হয়নি সেখানে প্রাণ উৎসর্গ করা দেশের কৃতী সন্তানদের প্রতি, যা আমাদের জাতির জন্য বড়ই দুর্ভাগ্যজনক। এর পাশাপাশি অযত্ন, অবহেলা ও সংরক্ষণের অভাবে অনেক বধ্যভূমি বেদখল হয়ে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও স্মৃতিস্তম্ভ করা হলেও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচর্যার অভাবে সেগুলোর বেহাল দশা।

মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের দেশে যে গণহত্যার ঘটনা ঘটেছিল, তার প্রমাণ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের গণকবর ও বধ্যভূমিগুলো। এগুলো মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। পরের প্রজন্মের যারা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লিখতে উদ্যোগী হবেন, তাদের জন্য এসব গণকবর ও বধ্যভূমি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠবে, এতে সন্দেহ নেই।

সর্বোপরি দেশের জন্য যারা সেদিন প্রাণ দিয়েছিলেন, তাদের আত্মত্যাগের স্মৃতি চিরজাগরূক রাখা জাতি হিসেবে আমাদের অবশ্য কর্তব্য। বড়ই পরিতাপের বিষয়, এই কর্তব্যটি আমরা যথাযথভাবে সম্পন্ন করতে পারিনি। বধ্যভূমিগুলো চিহ্নিতকরণ ও সংস্কারের মাধ্যমে এগুলো সংরক্ষণ করতে হবে।

আর কে চৌধুরী : সাবেক চেয়ারম্যান, রাজউক; মুক্তিযুদ্ধে ২ ও ৩নং সেক্টরের রাজনৈতিক উপদেষ্টা

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন