রেল দুর্ঘটনায় কমিটির সুপারিশ: বাস্তবায়ন না করা হলে তদন্ত কমিটি করে লাভ কী?

 সম্পাদকীয় 
২২ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রতিটি রেল দুর্ঘটনার পর এক বা একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত শেষে কমিটি তার রিপোর্ট জমা দেয়। কিন্তু রিপোর্টের সুপারিশ অনুযায়ী নেয়া হয় না কোনো কার্যকর পদক্ষেপ। গতকাল যুগান্তরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে রেলওয়ের সূত্রে বলা হয়েছে, গত এক যুগে ছোট-বড় প্রায় সাড়ে আট হাজার দুর্ঘটনা ঘটেছে।

এসব দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি হয়েছে নয় হাজার। সব কমিটিই প্রতিবেদন জনা দিয়েছে। কিন্তু শতকরা ৯০ ভাগ প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী নেয়া হয়নি কার্যকর পদক্ষেপ। সুপারিশগুলোয় দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়াসহ রেলের উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ দায়ীদের মধ্যে সামান্য কয়েকজনকে সাময়িক বরখাস্ত করে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে। শুধু তাই নয়, ঘটনার কয়েক মাস পর ওই সাময়িক বরখাস্তের আদেশও প্রত্যাহার করে নেয়া হয়।

প্রশ্ন হল, রিপোর্টের সুপারিশ যদি বাস্তবায়নই না হয়, তাহলে তদন্ত কমিটি গঠনের উদ্দেশ্য কী? অভিযোগ আছে, এ নিয়েও চলে অবৈধ বাণিজ্য। কমিটি যাদের দায়ী করে তাদের অনেকে ঊর্ধ্বতন অসাধু কর্মকর্তার কাছে ছুটে গিয়ে মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়ে শাস্তি কমিয়ে আনেন। আরও অভিযোগ আছে, রেলের নিজস্ব লোকজন দিয়েই অধিকাংশ সময় গঠন করা হয় কমিটি, যাতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বাদ দিয়ে অন্যদের কাঁধে দায় চাপানো যায়।

তদন্তের ক্ষেত্রে এ ধরনের কর্মকাণ্ড অত্যন্ত উদ্বেগজনক প্রধানত দুই কারণে। প্রথমত, দায়ী ব্যক্তির সাজা না হলে রেল দুর্ঘটনা কমবে না। দ্বিতীয়ত, এর ফলে রেলে দুর্নীতি উৎসাহিত হচ্ছে। এমনকি দুর্নীতি হচ্ছে রেল দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারের জন্য বরাদ্দ ক্ষতিপূরণের অর্থ নিয়েও।

জানা যায়, রেল দুর্ঘটনায় একজন নিহতের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেয়া হয় মাত্র ১০ হাজার টাকা। এ টাকা পেতে দৌড়ঝাঁপেই খরচ হয়ে যায় ৬-৭ হাজার টাকা। ভোগান্তি তো আছেই। ফলে অনেকেই এ টাকা নিতে আর আগ্রহী হন না। না নেয়া এই টাকাও নাকি রেলের অসাধু কর্মকর্তারা অনেক সময় ভাগবাটোয়ারা করে নেন। অর্থাৎ বলা যায়, দুর্নীতি রেলকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে।

উদ্বেগের আরও কারণ রয়েছে। রেলকে তুলনামূলক নিরাপদ বাহন হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু ঘন ঘন দুর্ঘটনা ঘটতে থাকলে রেল ভ্রমণে মানুষের সেই নিরাপত্তাবোধে চিড় ধরবে। কাজেই দুর্ঘটনার কারণগুলো সঠিকভাবে চিহ্নিত করে প্রতিকারের ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। যতদূর জানা যায়, অধিকাংশ সময়ে দুর্ঘটনা ঘটে চালক, গার্ড, লেভেলক্রসিংয়ের গেটম্যান, স্টেশন মাস্টারসহ সংশ্লিষ্টদের গাফিলতি বা ভুলের কারণে। মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন দিয়ে রেল চালানোর কারণেও দুর্ঘটনা ঘটে।

লাইনে পাথর না থাকা, সিগন্যাল ব্যবস্থার ত্রুটি, লাইন ক্ষয়, স্লিপার নষ্ট, লাইন ও স্লিপার সংযোগস্থলে লোহার হুক না থাকা ইত্যাদি কারণে দুর্ঘটনা বেড়েছে। জানা গেছে, এ পরিস্থিতির জন্যও অনেক ক্ষেত্রে দুর্নীতি দায়ী। কারণ নামমাত্র যন্ত্রাংশ লাগিয়ে অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে অসৎ কর্র্মীরা।

আর এদের কারণে ঝুঁকিতে পড়ছে মানুষের জীবন। কাজেই রেলের দুর্ঘটনা রোধে এবং উন্নয়নে সবার আগে দরকার কঠোরভাবে এ প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতির মূলোৎপাটন করা।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন