ফিরে দেখা ২০২০

খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়া সুখবর ছিল না বিএনপির

 হাবিবুর রহমান খান 
২৯ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়া গেল বছরে বিএনপির জন্য কোনো সুখবর ছিল না। রাজনীতির মাঠে বড় কোনো কর্মসূচি ছিল না দলটির। দিবসভিত্তিক কর্মসূচির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড। প্রত্যাশামতো হয়নি দল পুনর্গঠনের কাজও। দলটির নেতাদের দাবি, মহামারী করোনা ব্যাহত করেছে স্বাভাবিক ও দিবসভিত্তিক কর্মসূচি। ধাক্কা লেগেছে পুনর্গঠনেও। শুধু করোনা নয়, দলের নেতাদের অনৈক্যের কারণেও দলীয় কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

বছরের শেষ দিকে সরকারবিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে এ বিরোধ প্রকাশ্যে রূপ পায়। হাইকমান্ডকে না জানিয়ে দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ এনে দলের ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমেদ ও শওকত মাহমুদকে শোকজ করা হয়। শোকজের জবাবও দিয়েছেন তারা। জবাবে সন্তুষ্ট হওয়ায় আপাতত তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে না হাইকমান্ড।

তবে এসব কোন্দল মিটিয়ে করোনা পরিস্থিতি উন্নতি হলে নতুন বছরে নব উদ্যমে মাঠে নামার পরিকল্পনা রয়েছে দলটির। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ঘিরে ইতোমধ্যে বছরব্যাপী নানা কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি জোরালো করার কথাও ভাবছেন দায়িত্বশীল নেতারা।

গেল বছরের শুরুতেই সারা বিশ্বে আঘাত হানে করোনাভাইরাস। মার্চের শুরুতে আমাদের দেশে করোনা রোগী শনাক্ত হয়। করোনার ভয়াবহ থাবা আঘাত হানে দেশের অর্থনীতি, রাজনীতিসহ সব সেক্টরেই। ঘরমুখী হয়ে পড়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপির জন্য হঠাৎ সুখবর এনে দেয় সরকার। পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে খালেদা জিয়াকে নির্বাহী আদেশে মুক্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

২৫ মার্চ সরকারের নির্বাহী আদেশে মুক্তি পাওয়ার আগে ২৫ মাস কারান্তরীণ ছিলেন বিএনপি প্রধান। তার মুক্তির মধ্য দিয়ে স্বস্তি মেলে বিএনপি নেতাকর্মীদের। খালেদা জিয়াকে প্রথম দফায় ছয় মাসের জন্য মুক্তি দেয়া হয়। পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সেপ্টেম্বরে সময় আরও ছয় মাস বাড়ানো হয়েছে। তিনি এখন গুলশানের বাসায় রয়েছেন। মুক্তি পাওয়ার পর থেকে তাকে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেখা যায়নি। তারপরও চেয়ারপারসন মুক্ত রয়েছেন এমনটা ভেবে নেতাকর্মীদের মধ্যে চাঙ্গাভাব লক্ষ্য করা গেছে।

জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যুগান্তরকে বলেন, গেল বছরটি শুধু বিএনপি নয়, সারাবিশ্বের কাছেই খুব বেদনাময়। মহামারী করোনায় সব কিছু ওলটপালট করে দিয়েছে। রাজনীতিতেও এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। তারপরও স্বাস্থবিধি মেনে আমরা সীমিত পরিসরে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়েছি। প্রযুক্তির সহায়তায় আমরা নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছি। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি। তিনি বলেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে আমরা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ একটি নতুন জাতীয় নির্বাচনের দাবি বারবার তুলে ধরছি। নতুন বছরেও এই দাবি জোরালো করতে যেটুকু স্পেস আছে, সেটুকু কাজে লাগানোর চেষ্টা করা হবে।

মির্জা ফখরুল বলেন, আমাদের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি নেতাকর্মীদের জন্য সুখবর। কিন্তু আমরা পুরোপুরি আনন্দিত হতে পারিনি। কারণ, এখনও তিনি মুক্ত নন। তাকে পুরোপুরি মুক্ত করাই আমাদের অন্যতম লক্ষ্য।

করোনা মহামারীর প্রকোপ চলতে থাকায় বছরের প্রায় পুরো সময় দিবসভিত্তিক দলীয় কর্মসূচিতে সময় কাটিয়েছে বিএনপি। করোনার কারণে মাঠের রাজনীতি না থাকায় বেশ কিছু আলোচনা সভা হয়েছে ভার্চুয়ালি। দলটির স্থায়ী কমিটির নিয়মিত সাপ্তাহিক সভাও এখন হচ্ছে অনলাইনে। প্রতিটি সভায় সভাপতিত্ব করছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। শুধু স্থায়ী কমিটির বৈঠকই নয়, মা খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে পুরো দলকে সামাল দিচ্ছেন তিনি।

একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই নতুন করে সংগঠন গোছানোর কার্যক্রম শুরু করে বিএনপি। এই সময়ে ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলে নতুন নেতৃত্ব আসে। তৃণমূল পুনর্গঠনও চলে সমানতালে। সবকিছু ঠিক থাকলে গত বছর সীমিত পরিসরে জাতীয় কাউন্সিল করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু করোনার কারণে সব ভেস্তে যায়।

স্থবির হয়ে পড়ে পুনর্গঠন প্রক্রিয়া। ২৫ মার্চ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বন্ধ ছিল বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম। তারপরও করোনার মধ্যে সীমিত পরিসরে পুনর্গঠনের কাজ চালিয়ে যায় দলটি। গেল বছর যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কমিটির কলেবর বাড়ানো হলেও দুটি কমিটি এখনও আংশিক অবস্থায় রয়েছে। পাশাপাশি বেশ কিছু জেলা-উপজেলায় নতুন কমিটি করেছে দলটি। পুনর্গঠন প্রক্রিয়া পুনরায় চালু করার পর তিনটি জেলার আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে।

২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে ৫০২ সদস্যের কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তিন বছর পরপর জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু কমিটির মেয়াদ শেষ হলেও কাউন্সিল করার চিন্তাভাবনা নেই দলটির।

একদিকে করোনা মহামারী, অন্যদিকে খালেদা জিয়া গৃহ অন্তরীণ থাকায় এটি সম্ভব হচ্ছে না। দলটির স্থায়ী ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির প্রায় অর্ধশত পদ শূন্য হয়ে আছে। কয়েকটি পদে নিয়োগ দেয়া হলেও এখনও সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির তিনটিসহ একাধিক পদ ফাঁকা রয়েছে। তবে পরবর্তী কাউন্সিলের আগে কিছু কিছু শূন্য পদে নিয়োগ দিতে পারেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর এই সরকারের অধীনে আর কোনো নির্বাচনে অংশ না নেয়ার ঘোষণা দিয়েছিল বিএনপি। তবে পরে এই সিদ্ধান্তে তারা পরিবর্তন আনে। করোনা মহামারীর মধ্যে জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত বগুড়া-১ ও যশোর-৬ আসনের উপনির্বাচনে অংশ না নিলেও পরবর্তী সবক’টি উপনির্বাচনে অংশ নেয় দলটি। স্থানীয় সব নির্বাচনেও অংশ নেয় বিএনপি।

এদিকে নতুন বছরে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা ও অনাড়ম্বরপূর্ণভাবে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। ১ নভেম্বর বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে আহ্বায়ক করে ১১৫ সদস্যের জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়। সাত সদস্যের একটি স্টিয়ারিং কমিটিও করেছে দলটি।

জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাজাহান যুগান্তরকে বলেন, গেল বছরটি ভালো গেল এটা বলা যাবে না। কারণ, মহামারীর কারণে সবকিছু স্থবির হয়ে পড়ে। আমাদের দলীয় কর্মকাণ্ডেও এর প্রভাব পড়েছে। করোনার কারণে নির্দিষ্ট সময়ে দল পুনর্গঠন করা সম্ভব হয়নি।

তিনি বলেন, গেল বছরের ভুল-ত্রুটি থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন বছর নতুন উদ্যমে শুরু করতে চাই। খালেদা জিয়ার পুরোপুরি মুক্তি ও নতুন একটি নির্বাচনেই এখন আমাদের অন্যতম টার্গেট। সেই লক্ষ্যেই আমরা কাজ করছি।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : ফিরে দেখা ২০২০

২৯ ডিসেম্বর, ২০২০
২৯ ডিসেম্বর, ২০২০