ফিরে দেখা ২০২০

‘মানবিক কর্মসূচি’ ও দল গোছাতে ব্যস্ত আ’লীগ

 হাসিবুল হাসান 
২৯ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের ব্যাপক পরিকল্পনা নিয়ে আওয়ামী লীগ ২০২০ সাল চলা শুরু করে। তবে করোনা ভাইরাসের কারণে বছরজুড়ে মানবিক বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হয় দলটিকে। এর সঙ্গে বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের কারণে নানা কর্মসূচি নিয়ে অসহায় মানুষের পাশে ছিলেন এই দল ও তার সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

মহামারীর এ বছরে কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতা, মন্ত্রিপরিষদ ও দলীয় সংসদ সদস্যসহ সারা দেশের পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মীকে হারিয়েছে ক্ষমতাসীনরা। করোনার কারণে দীর্ঘদিন বন্ধ রাখতে হয় দলটির সাংগঠনিক (দল গোছানো) কার্যক্রম। সেপ্টেম্বরের পর থেকে ফের এই কাজ শুরু করে দলটি।

এর মধ্যে ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ আওয়ামী লীগসহ গত বছরের শেষ দিকে সম্মেলন হওয়া সহযোগী সংগঠনগুলোর পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া বিদায়ী বছরে বেশ কয়েকটি সংসদীয় আসনের উপনির্বাচনে জয়লাভ করেছে আওয়ামী লীগ। বছরের শেষ দিকে এসে দলটি ব্যস্ত হয়ে পড়ে পৌরসভা নির্বাচন নিয়ে। চলছে ওয়ার্ড ইউনিয়ন থেকে শুরু করে মেয়াদোত্তীর্ণ জেলা সম্মেলনের কাজও। কেন্দ্রীয় উপ-কমিটিগুলো পূর্ণাঙ্গ করার কাজও এখনও চলমান রয়েছে।

অন্যদিকে রাজপথে বিরোধী দলকে খুব একটা মোকাবেলা করতে হয়নি আওয়ামী লীগকে। তবে বছরজুড়ে অনলাইনে দিবসভিত্তিক কর্মসূচিগুলো পালন করেছে দলটি। বছরের শেষ সময়ে এসে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ভাংচুরের প্রতিবাদে মাঠের কর্মসূচিতে সক্রিয় হতে দেখা গেছে আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনগুলোকে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত- বিরোধী দলের সঙ্গে রাজনৈতিক সহিংসতায় তেমন একটা না জড়ালেও ৫৯টি অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে ২০ জন নিহত ও ৭৩১ জন আহত হয়েছেন।

বিদায়ী বছরের মার্চ মাসে করোনভাইরাসের মতো কঠিন এক চ্যালেঞ্জ এসে দাঁড়ায় আওয়ামী লীগের সামনে। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য শুরু থেকেই আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লড়াইটা ভালোই করছেন। এক দিকে সফলভাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন সরকারের। জীবন এবং জীবিকাকে পাশাপাশি রেখে মানুষ যেন অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে না পড়ে সেটা দেখাই ছিল তার কৌশলের প্রধান দিক। কঠিন সময়ে তার যোগ্য নেতৃত্ব ও সমপোযোগী সিদ্ধান্ত বিশ্বের অনেক দেশের চেয়ে সফলভাবে এই সংকট মোকাবেলা করেছে বাংলাদেশ। দেশের মানুষের পাশাপাশি প্রশংসা পেয়েছেন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও।

লকডাউনের সময়ে কর্মহীন হয়ে পড়া মানুষগুলো যেন খাবার সংকটে না পড়ে সে জন্য তাদের পাশে দাঁড়াতে সরকারের কর্মসূচির পাশাপাশি দলীয় এমপি-মন্ত্রী ও নেতাকর্মীদের একাধিকবার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। তার নির্দেশনায় কর্মহীন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ায় আওয়ামী লীগ। শুরু থেকেই দল ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা করোনা প্রতিরোধ সামগ্রী বিতরণ, অসহায় ও কর্মহীন মানুষদের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করে দলটি। চালায় সচেনতামূলক কর্মসূচি। সরকারের দলীয়ভাবে প্রশাসনকে সহযোগিতার মাধ্যমে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশনাও দেয়া হয়েছিল কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে। এই সময়ে ধান কাটার মৌসুমে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, কৃষক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা কৃষকের ধান কেটে দিয়ে প্রশংসা কুড়িয়েছে।

এছাড়া করোনা মহামারীর মধ্যেই আঘাত হানে বন্যা ও ভয়াল ঘূর্ণিঝড় আম্ফান। এই সময়েও সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে সাধারণ মানুষের পাশে ছিলেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

করোনা মহামারীর মধ্যে সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগ এক অন্যরকম সংকটের মধ্যে পড়ে। দলটির অনেক নেতা-কর্মী করোনা আক্রান্ত হয়েছেন, মারাও গেছেন অনেকে। এছাড়া এ বছরে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে আওয়ামী লীগের ৫৭ সাংগঠনিক জেলায় ৫২২ নেতার মৃত্যু হয়েছে (১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত)। এর মধ্যে দলের কেন্দ্রীয় কমিটির চারজন সদস্যও রয়েছেন। আছেন মন্ত্রিপরিষদ এবং দলীয় সংসদ সদস্যও।

এ বছরে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও কেন্দ্রীয় ১৪ দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শেখ মো. আবদুল্লাহ, সিলেট সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য বদর উদ্দিন আহমদ কামরান, আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য হাজী মকবুল হোসেন, নওগাঁ জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও নওগাঁ-৬ (আত্রাই-রানীনগর) আসনের এমপি ইসরাফিল আলমকে করোনায় হারিয়েছে আওয়ামী লীগ।

এছাড়া এই বছরে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন, ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমান মোল্লাসহ আরও বেশ কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান সংসদ সদস্য মারা গেছেন।

করোনা মহামারী কালে রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক সাহেদের ভয়াবহ দুর্নীতি আওয়ামী লীগকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে। শুরু হয় হাইব্রিড-অনুপ্রবেশ বিতর্ক। দলের ভেতর থেকে প্রশ্ন ওঠে সাহেদরা আওয়ামী লীগে জায়গা পায় কীভাবে? এরই মধ্যে আওয়ামী লীগ তার উপ-কমিটিগুলো গঠনে সতর্ক ছিল।

২০২০ সালে অভ্যন্তরীণ কোন্দল মিটিয়ে শৃঙ্খলা ফেরাতে জোর দেয় আওয়ামী লীগ। দলীয় কোন্দলের কারণে ১৯ নভেম্বর নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল মতিন ভূঁইয়াকে দলীয় পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। একই কারণে ২২ নভেম্বর সিরাজগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল লতিফ বিশ্বাস এবং ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ডা. মো. হাবিবে মিল্লাতকে তাদের পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়।

সাংগঠনিক শৃঙ্খলার পাশাপাশি বিভিন্ন নির্বাচনে দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিষয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নেয় আওয়ামী লীগ। স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচনে অতীতে যারা বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন তাদের আর কখনও নৌকা প্রতীক না দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ২৮ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়। এর আলোকে চলমান পৌর নির্বাচনে চুয়াডাঙ্গা সদর, নেত্রকোনার মদন ও কুষ্টিয়ার খোকসা পৌরসভায় আগের বিদ্রোহী প্রার্থীদের হাতে নৌকা প্রতীক তুলে দেয়ার পরও তাদের কাছ থেকে প্রার্থিতা কেড়ে নেয়া হয়।

দলের নিয়মিত কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে বছরের শেষদিকে ৭ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের কেন্দ ীয় কমিটিতে নতুন দু’জন সদস্য নির্বাচিত করা হয়। তারা হলেন- বাংলাদেশের প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদের ছেলে আজিজুস সামাদ আজাদ ডন ও ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সৈয়দ আবদুল আউয়াল শামীম।

এর আগে ১১ সেপ্টেম্বর পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি সিদ্দিকুর রহমানকে দলের শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক এবং ২৫ নভেম্বর সিরাজুল মোস্তফাকে ধর্ম সম্পাদক করা হয়।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : ফিরে দেখা ২০২০

২৯ ডিসেম্বর, ২০২০
২৯ ডিসেম্বর, ২০২০