ম্যারাডোনাসহ যেসব কিংবদন্তিকে হারাল বিশ্ব

 আল-মামুন 
২৮ ডিসেম্বর ২০২০, ০৪:৫৪ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
দিয়াগো ম্যারাডোনা-কোবি ব্রায়ান্ট-নওশেরউজ্জামান-বাদল রায়
দিয়াগো ম্যারাডোনা-কোবি ব্রায়ান্ট-নওশেরউজ্জামান-বাদল রায়। ফাইল ছবি

মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে চলতি বছরের পুরোটা সময়ই কেটেছে আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠায়। ২০২০ সালটি বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের জন্য শোকাবহ এক বছর।

এ বছরই ফুটবল কিংবদন্তি দিয়াগো ম্যারাডোনা, বাস্কেটবল কিংবদন্তি কোবি ব্রায়ান্ট, উইন্ডিজ কিংবদন্তি ক্রিকেটার স্যার এভারটন উইকস, অস্ট্রেলিয়ার ডিন জোন্সসহ দেশীয় তারকা খেলোয়াড় বাদল রায়, নওশেরউজ্জামান, গোলাম রব্বানি হেলাল, এসএম সালাউদ্দিন ও নুরুল হক মানিকসহ অনেক ক্রীড়াবিদ চলে গেছেন না ফেরার দেশে।

কোবি ব্রায়ান্ট
বছরের শুরুতেই বাস্কেটবল কিংবদন্তি কোবি ব্রায়ান্ট চলে যান না ফেরার দেশে। ২৬ জানুয়ারি মর্মান্তিক হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় মারা যান ৪১ বছর বয়সী কোবি ব্রায়ান্ট ও তার ১৩ বছরের মেয়ে জিজি ব্রায়ান্ট। বাস্কেটবল ক্যারিয়ারে তিনি পাঁচবার জিতেছেন এনবিও চ্যাম্পিয়নশিপ। 

গোলাম রব্বানি হেলাল
৩০ মে সকালে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হলে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয় সাবেক তারকা ফুটবলার গোলাম রব্বানি হেলালকে। এদিন দুপুর সোয়া ১২টায় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে ৬৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। 

বরিশাল থেকে উঠে আসা গোলাম রব্বানি হেলাল ১৯৭৫-১৯৮৮ পর্যন্ত ঢাকা আবাহনীর পরিচিত মুখ ছিলেন। মাঝে আড়াই মাস বিজেএমসিতে কাটানো ছাড়া ক্যারিয়ারে পুরোটা সময়ই ছিলেন আবাহনীতে। খেলা ছেড়ে আবাহনীর পরিচালক হন। একই ক্লাবের ফুটবল দলের নানা দায়িত্ব পালন করেন। ছিলেন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সদস্যও। 

১৯৮২ সালে আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচে গোলমালের সূত্র ধরে কাজী সালাউদ্দিন, আশরাফ উদ্দিন চুন্নু, কাজী আনোয়ারের সঙ্গে জেল খাটেন গোলাম রব্বানি হেলাল। 

এসএম সালাউদ্দিন
করোনার উপর্সগ নিয়ে গত ৩০ মে মারা যান সাবেক ফুটবলার এসএম সালাউদ্দিন (৬০)। নারায়ণগঞ্জ থেকে উঠে এসে সালাউদ্দিন ঢাকার ফুটবলে নজর কাড়েন। ১৯৮২ সালে বিজেএমসি দিয়ে ফুটবল ক্যারিয়ার শুরু করা সালাউদ্দিন তিন বছর ফরাশগঞ্জে খেলেছেন, দলটির অধিনায়কও ছিলেন তিনি।

নুরুল হক মানিক
গত ১৪ জুন করোনা উপসর্গ নিয়ে ৫৫ বছর বয়সে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান সাবেক ফুটবলার নুরুল হক মানিক। মৃত্যুর পর জানা যায় মানিক করোনা পজিটিভ ছিলেন। ঢাকার ফুটবলে চারটি ক্লাব আরামবাগ, ইয়ংমেন্স, ব্রাদার্স ও মোহামেডানের অধিনায়কত্ব করেছেন তিনি। মানিক ছিলেন তার সময়ে দেশের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার। মৃত্যুর আগপর্যন্ত ছিলেন বাফুফের কোচ।

স্যার এভারটন উইকস
গত ১ জুলাই না ফেরার দেশে পাড়ি জমান ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাবেক তারকা ক্রিকেটার স্যার এভারটন উইকস। ১৯৪৮ সালে টেস্ট অভিষেকের বছর মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত টানা পাঁচটি সেঞ্চুরি করেছেন তিনি। ১৯৫১ সালে উইজডেনের বর্ষসেরা ক্রিকেটারের সম্মান এবং ১৯৯৫ সালে নাইটহুড উপাধি লাভ করেন তিনি।

চেতন চৌহান
জুলাই মাসে করোনা আক্রান্ত হওয়া ভারতীয় সাবেক তারকা ক্রিকেটার চেতন চৌহান ১৬ আগস্ট হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ৭৩ বছর বয়সে শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন। ১৯৬৯ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত জাতীয় দলের হয়ে ৪০টি টেস্ট ও সাতটি ওয়ানডে ম্যাচ খেলেছেন চেতন চৌহান।

ক্রিকেট থেকে অবসরে রাজনীতিতে জড়িয়ে যান চেতন চৌহান। নিজের এলাকা উত্তরপ্রদেশের অমরোহা থেকে ১৯৯১ ও ১৯৯৮ সালে লোকসভায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালের আগস্ট পর্যন্ত উত্তরপ্রদেশের যুব ও ক্রীড়ামন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন তিনি। ৭২ বছর বয়সে এসে করোনার সঙ্গে লড়াই করে হেরে যান তিনি।

নওশেরউজ্জামান
করোনার কাছে হেরে গেলেন স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সদস্য নওশেরউজ্জামান। গত ৭ সেপ্টেম্বর রাজধানীর গ্রিনলাইফ হাসপাতালে ভর্তি হন ৭০ দশকের এই তুখোড় স্ট্রাইকার। পরে ২১ সেপ্টেম্বর ইবনে সিনা হাসপাতালের আইসিইউতে করোনার সঙ্গে লড়াই করে ৭২ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। 

ঢাকা মোহামেডানের অন্যতম স্ট্রাইকার ছিলেন নওশেরউজ্জামান। ১৯৭৫ সালে ঢাকা লিগে ২১ গোল দিয়ে সর্বাধিক গোলদাতাও হয়েছিলেন তিনি। ফুটবলের পাশাপাশি ক্রিকেটও খেলেছেন সুনাম ও দক্ষতার সঙ্গে। ঢাকা মোহামেডান ও কলাবাগান ক্রীড়া চক্রের হয়ে প্রায় এক যুগ ঢাকা ক্রিকেট লিগে ওপেনিং পজিশনে খেলেছেন নওশের। 

ডিন জোন্স 
গত ২৪ সেপ্টেম্বর না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ান সাবেক তারকা ক্রিকেটার ডিন জোন্স। আগের দিন আইপিএলে ধারাভাষ্য দিয়ে পরদিন হার্টঅ্যাটাকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ৫২ টেস্ট ও ১৬৪ ওয়ানডেতে ১৮টি সেঞ্চুরির সাহায্যে ৯ হাজার ৬৯৯ রান সংগ্রহ করেছেন তিনি।

বাদল রায়
নওশেরউজ্জামানের পাশাপাশি চলতি বছর বাংলাদেশ হারিয়েছে দেশের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় বাদল রায়কে। লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে গত ২২ নভেম্বর বাংলাদেশ মেডিকেলে মারা যান তিনি।

১৯৮১ ও ১৯৮৬ সালে মোহামেডানের অধিনায়ক ছিলেন বাদল রায়। ১৯৮৬ সালে টানা তিন বছর পর মোহামেডানের লিগ জয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি। খেলা ছাড়ার পর মোহামেডানের ম্যানেজার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত সাবেক এই তারকা ফুটবলার।

বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সহ-সভাপতি হিসেবে তিন মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। অসুস্থ অবস্থাতেও ফুটবলের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছিলেন। সর্বশেষ বাফুফে নির্বাচনে কাজী সালাউদ্দিনের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে সভাপতি পদে লড়াই করেন বাদল রায়।

দিয়াগো ম্যারাডোনা 
গত ২৫ নভেম্বর বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনকে কাঁদিয়ে ৬০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন আর্জেন্টাইন ফুটবল কিংবদন্তি দিয়াগো ম্যারাডোনা। বুয়েন্স আয়ার্সের নিজ বাসভবনে হার্টঅ্যাটাকে মারা যান তিনি।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আর্জেন্টিনার হয়ে তিনি ৯১ খেলায় ৩৪ গোল করেন। ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ জয়ে আর্জেন্টিনার অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৯০ বিশ্বকাপেও আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলেছিলেন তিনি। সেবার জার্মানির কাছে হেরে শিরোপা হাতছাড়া করতে হয় তাকে। 

পাওলো রসি 
গত ৯ ডিসেম্বর দূরারোগ্য এক সমস্যায় ভুগে ৬৪ বছর বয়সে মারা যান ইতালিকে বিশ্বকাপ জেতানো নায়ক রসি। ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপে ইতালির শিরোপা জেতার নায়ক ছিলেন রসি।

জন অ্যাডরিচ
ইংল্যান্ডের ব্যাটিং লিজেন্ড জন অ্যাডরিচ ২৩ ডিসেম্বর ৮৩ বছর বয়মে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। ১৯৬৩ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত দেশের হয়ে খেলেন অ্যাডরিচ। দেশের হয়ে ৭৭ টেস্টে অংশ নিয়ে ১২টি সেঞ্চুরি আর ২৪টি ফিফটির সাহায্যে ৪৩.৫৪ গড়ে ৫ হাজার ৩৬১ রান সংগ্রহ করেন এই বাঁ-হাতি ওপেনার। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সারের হয়ে ২৩ মৌসুমে ১০৩টি সেঞ্চুরির সাহায্যে ২৯ হাজার ৭৯০ রান সংগ্রহ করেন তিনি।

রবিন জ্যাকম্যান
ইংল্যান্ডের সাবেক ক্রিকেটার রবিন জ্যাকম্যান ২৫ ডিসেম্বর ৭৫ বছর বয়সে কেপটাউনে মারা যান। ভারতে জন্মানো জ্যাকম্যানের বেড়ে ওঠা ইংল্যান্ডে, কিন্তু গভীর সংযোগ ও সম্পর্ক দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে। খেলোয়াড়ি জীবন শেষে জ্যাকম্যান থিতু হন দক্ষিণ আফ্রিকায়। সেখানেই ক্যারিয়ার গড়েন ধারাভাষ্যকার হিসেবে।

প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার হলেও ইংল্যান্ডের হয়ে মাত্র চারটি টেস্ট ও ১৫টি ওয়ানডে খেলতে পেরেছেন জ্যাকম্যান। প্রথম শ্রেণির ক্যারিয়ারে ৩৯৯ ম্যাচে শিকার করেন ১৪০২ উইকেট।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : ফিরে দেখা ২০২০

২৯ ডিসেম্বর, ২০২০
২৯ ডিসেম্বর, ২০২০