নীতি দুর্নীতি অর্থনীতি

করোনার বছর কেমন গেল দেশের অর্থনীতি

 ড. আর এম দেবনাথ 
২৬ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ

অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক-সামাজিকভাবে ২০২০ সালটি ছিল একটি অস্বাভাবিক বছর। বলতে গেলে পুরো বছরটাতেই করোনাভাইরাস নিয়ে মানুষ ছিল তটস্থ। শুধু আমাদের দেশে নয়, সারা বিশ্বেই। স্বাধীনতা দিবস গেল মার্চে, তারপর এপ্রিলে পহেলা বৈশাখ, আগস্টে গেল বঙ্গবন্ধুর শাহাদতবার্ষিকী-এর কোনোটাই আমরা যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে পালন করতে পারিনি। ২০২০ সালেই হল তিন-তিনবার বন্যা। হল ফসলের ক্ষতি। রক্ষা-সবচেয়ে বড় ফসল বোরোর কোনো ক্ষতি হয়নি। তবে সর্বশেষ ফসল আমন, যা প্রায় উঠে গেছে, তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সারা বছরই বন্ধ বা প্রায় বন্ধ ছিল অনেক কলকারখানা, অফিস-আদালত। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় এখনও বন্ধ। হয়েছে লকডাউন, পরিবহন সংকট। অস্বাভাবিকতার চূড়ান্ত। এরই মধ্যে সরকারি অর্থবছর ২০১৯-২০ শেষ হয়েছে জুনে। মনে হয়েছিল, অর্থনীতি নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির দিকে চলে যাবে। না, তা হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে সময়োচিত পদক্ষেপের ফলে আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি এই দুর্দিনের বছর ২০১৯-২০ সালেও হয়েছে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ, যেখানে প্রতিবেশী দেশসহ পৃথিবীর অনেক দেশেই নেমে এসেছে মন্দা।

সামনে আমাদের খ্রিস্টীয় নববর্ষ। পৌষ মেলা। মুজিব শতবর্ষ চলছে। অনেক বড় ঘটনা আসছে-আমাদের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি দিবস। ২০২১ সালের ২৬ মার্চ-সেই সোনালি দিবস। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এতসব আনন্দের উৎসব, দিনগুলোও আমরা যথারীতি পালন করতে পারছি না, পারব না, যেমন পারিনি পবিত্র দুটি ঈদ পালন করতে। হিন্দু সম্প্রদায়ের দুর্গাপূজা গেছে, তা-ও ভালো করে উদযাপন করা যায়নি। আশা ছিল এতদিনে অবস্থা কিছুটা ভালো হবে, টিকা পাওয়া যাবে, জনজীবন স্বাভাবিক হবে, মানুষ মানুষকে ছুঁতে পারবে। না, তা-ও হচ্ছে না। করোনাভাইরাস নামীয় অদৃশ্য এক দানব আমাদের সামনে দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ে হাজির হয়েছে। ইউরোপের দেশগুলোয় আবার তা নতুনভাবে আক্রমণ করছে। হতাশা চারদিকে। অস্বস্তি চারদিকে। মানুষের মধ্যে অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। কতদিন আর ঘরবন্দি-গৃহবন্দি থাকা যায়!

এসবের মধ্যেই ২০২০ সালটি শেষ হচ্ছে। শেষ হচ্ছে ব্যাংকারদের ব্যবসায়িক বছর। সরকারের আর্থিক বছর শুরু হয় জুলাইয়ে, যা শেষ হয় জুনে। কিন্তু বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর আর্থিক বছর, হিসাবের বছর হচ্ছে জানুয়ারি-ডিসেম্বর। বছরের শুরুর দিন তারা কাজ করে না। কোলাকুলি করে, আনন্দ করে। হিসাব করে কার কত মুনাফা হল। এবার তারা কোলাকুলি করতে পারবে না। তাদের বছরটি শেষ হচ্ছে দুটি বড় ঘটনা দিয়ে। প্রথমটি অবশ্যই সরকারি প্রণোদনা কর্মসূচি। সরকার লক্ষাধিক কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেছে শিল্প, বড়, মাঝারি ও ক্ষুদ্র ব্যবসা-শিল্প ও কৃষির জন্য। এর পুরোটাই ব্যাংক ঋণ। ব্যাংকগুলোকে ভর্তুকিতে ঋণ দিতে হবে গ্রাহকদের। এ নিয়ে দ্বিধা-সংশয় এখনও কাটছে না তাদের মধ্যে। এসব টাকা উদ্ধার হবে তো! এমনিতেই তাদের বোঝা হয়ে আছে শ্রেণিবিন্যাসিত ঋণ। তা আবার বেড়ে ব্যাংকগুলোকে ডোবাবে না তো? এ দুশ্চিন্তার মধ্যেই কেটেছে তাদের ২০২০ সাল। আরেক ঘটনা-তাদের সুদনীতির পরিবর্তন হয়েছে বড় রকমভাবে এ বছরেই। ‘নয়-ছয়’ সুদনীতি। ৬ শতাংশ সুদ আমানতের ওপর এবং ৯ শতাংশ সুদ ঋণের ওপর। এ ধাক্কা তাদের ২০২০ সালের গুরুতেই সামলাতে হয়েছে। ফলে এবার তাদের মুনাফায় ধাক্কা লাগবে। তাদের শেয়ারের দামে নিম্নগতি দেখা যাবে বা গেছে। নতুনভাবে উৎপাত আরেকটা-ব্যাংকিং খাত এখন তারল্যের উপর ভাসছে। শুধু টাকা আর টাকা। ফান্ডের কোনো অভাব নেই। সয়লাব হয়ে গেছে ব্যাংকিং খাত। ঋণগ্রহীতা নেই। দেশে ২০২০ সালে কোনো বিনিয়োগ ছিল না। অতএব, বেসরকারি খাতে নতুন কোনো বিনিয়োগ নেই। পুরনো ঋণের ওপরই চলছে পুনর্বাসন নীতির প্রয়োগ। ফলে ব্যাংকিং খাত এক নতুন সমস্যার সম্মুখীন। এত টাকা কোত্থেকে আসছে?

বোঝাই যাচ্ছে এ টাকার প্রধান উৎস হচ্ছে ‘রেমিটেন্স’। আমাদের গরিব কৃষক ভাইদের সন্তানরা পাই পাই করে সব ডলার বিদেশ থেকে দেশে পাঠাচ্ছে। সরকার তাদের জন্য বিশেষ বিনিময় হার মঞ্জুর করেছে। হুন্ডিওয়ালাদের কাজকর্ম কম। ফলে রেমিটেন্সে এক উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে। ২০২০ সালে রেমিটেন্স ২০১৯ সালের তুলনায় অনেক বাড়বে। ২০২০ সালের জুলাই থেকে নভেম্বরের মধ্যে রেমিটেন্সের পরিমাণ বেড়েছে ৪১ দশমিক ৩২ শতাংশ। ভীষণ আনন্দের ঘটনা। এই দুর্দিনে আমাদের রোমিটেন্স বাড়ছে। ফলে প্রায় এক কোটি গ্রামীণ পরিবার তাদের দৈনন্দিন জীবন অব্যাহত রেখেছে। গ্রামাঞ্চলে ক্যাশের অভাব সেভাবে দেখা যায়নি, বিশেষ করে ‘রেমিটেন্স অঞ্চলে’। করোনা শুরুর কালে মনে হয়েছিল রেমিটেন্সের বাজারে ধস নামবে। না, ঘটেছে ঠিক উল্টোটি। এটা ২০২০ সালে আমাদের সাহস জুগিয়েছে। এর ফলে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ একের পর এক রেকর্ড করে চলেছে। কয়েকদিন আগেই এর পরিমাণ ছিল ৪২ বিলিয়ন (এক বিলিয়ন সমান একশ কোটি) ডলার। আমাদের আমদানির জন্য দরকার ৩-৪ মাসের ডলার। আর এখন আছে ৮-৯ মাসের।

রফতানি মোটামুটি স্থিতিশীল, বেড়েছে গত পাঁচ মাসে এক শতাংশের মতো। কিন্তু আমদানি কমেছে বেশ। শিল্পপণ্য, মধ্যবর্তী পণ্য, ভোগ্যপণ্যের আমদানি অনেক কমেছে। এছাড়া বড় পণ্য তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে অনেক হ্রাস পেয়েছে। এসব কারণে ডলারের খরচ অনেক কম। ভ্রমণ ইচ্ছুকদের খরচ কম। তারা বিদেশে যেতে পারছে না। চিকিৎসার জন্যও না। ফলে আমাদের ডলারের রিজার্ভ স্ফীত হয়েছে এবং হচ্ছে। এটা দৃশ্যত ভালো খবর, আনন্দের খবর। এত রিজার্ভের ফলে আমাদের টাকার মান ডলারের বিপরীতে স্থিতিশীল। ৮৫-৮৬ টাকায় এক ডলার কেনা যায়, যেখানে পাকিস্তানিরা এক ডলার কেনে ১৬০-১৭০ রুপিতে। বিশাল সাফল্য বটে! কিন্তু সমস্যা অন্যত্র। ডলার খরচ হওয়া কিছুটা দরকার। কারণ বেশি বেশি ডলারের ফলে ব্যাংকিং খাতে ফান্ডের বন্যা বয়ে যাচ্ছে, যা বিনিয়োগ করা যাচ্ছে না। এত টাকা বাজারে থাকলে তা পরিণামে মূল্যস্ফীতির জন্ম দিতে পারে। অবশ্য এখন পর্যন্ত আমাদের মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের নিচে। বরং কমের দিকে। অক্টোবরে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ। নভেম্বরে তা হ্রাস পেয়ে হয়েছে ৫ দশমিক ৫২ শতাংশ। বড় সুখবর। কারণ ৬-৭-৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির বিপরীতেও মূল্যস্ফীতি কম। বরাবর আমরা শুনেছি, উচ্চ প্রবৃদ্ধি মানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, যা বাংলাদেশে ভুল প্রমাণিত।

নভেম্বর-ডিসেম্বরে আমাদের জন্য সুখবর আরেকটি। বাজার এখন শাকসবজিতে ভরপুর। কয়েক মাস আগে বন্যার কারণে শাকসবজি নষ্ট হয়েছিল। দাম উঠেছিল কেজিতে ৬০-৮০ টাকা। আশার খবর, ২০২০ সাল শেষ হচ্ছে সবজির দাম কমার মধ্য দিয়ে। মাছ, মাংস, ডিম, দুধের দাম দেখা যাচ্ছে স্থিতিশীল। এতে মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্তদের জীবনে কিছুটা হলেও স্বস্তি নেমে এসেছে। বিশেষ করে এমন দিনে, যখন লাখ লাখ মানুষের রোজগার কমে গেছে। অনেক লোক চাকরিচ্যুত, ব্যবসাচ্যুত। অনেকে বেকার হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে শাকসবজির দাম কমা আশার খবর। কিন্তু দুর্ভাবনার খবর আছে একটি। ২০২০ সাল শেষ হতে যাচ্ছে চালের মূল্যবৃদ্ধি দিয়ে। অথচ এটি ঘটার কথা ছিল না। সবেমাত্র নতুন ধান আমন কৃষকরা ঘরে তুলেছেন। তাহলে কেন চালের মূল্যবৃদ্ধি? সরকার বলছে, এটা মিলারদের ‘কারসাজি’। অথচ তারা বলছে, সরকারের গুদামে চাল কম এবং আমনের ফলন হয়েছে কম। এ সুযোগটাই তারা নিচ্ছে। অথচ সার্বিকভাবে চালের অভাব হওয়ার কোনো কারণ নেই।

এদিকে রফতানি কমার কথা ছিল। এখন ইউরোপে চলছে করোনার নতুন ঢেউ। অথচ এ মাসটা তাদের কাছে আনন্দ-উৎসবের মাস। বড়দিন ছিল এ মাসে। সামনে নববর্ষ। এ সময় তারা দুই হাতে খরচ করে। কিন্তু এবার তা হচ্ছে না। ফলে আমাদের পোশাক রফতানিতে একটি সংকট নয়, মন্দা দেখা দিয়েছে। কিন্তু এতৎসত্ত্বেও দেখা যাচ্ছে, জুলাই-নভেম্বর-এই ৫ মাসে আমাদের রফতানি বৃদ্ধি পেয়েছে এক শতাংশ। এটা খারাপ খবর কী? রফতানি খাত মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে। অবশ্য ২০২১ সালে কী দাঁড়াবে, তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

সরকারি রাজস্বের খবর কী? রাজস্ব বৃদ্ধি পায় জিডিপি বৃদ্ধি পেলে। জিডিপির এ মন্দাকালে কি রাজস্ব বাড়বে? অনেকের ধারণা ছিল রাজস্বে ধস নামবে। রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রামাফিক হচ্ছে না। এটা দেখে একজন নামকরা অর্থনীতিবিদ, যার কাছে মিডিয়ার লোকজন সবাই দৌড়ায়, তিনি বলেছিলেন, সরকারকে নোট ছাপিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দিতে হবে। আশঙ্কাজনক খবর ছিল এটি। আমি দেখতে চেয়েছিলাম তা কতটা সত্য হয়। দেখা যাচ্ছে, ডিসেম্বর চলে যাচ্ছে, কিন্তু রাজস্বে মন্দা থাকলেও তা গেল বছরের তুলনায় নভেম্বরে এক-দেড় শতাংশ বেশি ছিল। এর অর্থ রাজস্ব স্থিতিশীল। রাজস্ব স্থিতিশীল থাকলে নোট ছাপিয়ে খরচ নির্বাহ করার কোনো কারণ ঘটে কি? দেখা যাচ্ছে, ব্যাংক থেকে সরকার ঋণ নিচ্ছে না। বোঝাই যায় সরকার টাকাপয়সার সংকটে নেই। এ সম্পর্কে একটি দৈনিক পত্রিকা রিপোর্ট করেছে।

অতএব বলা যায়, ২০২০ সাল ভালো-মন্দে কেটে গেছে। সামনে ২০২১ সাল। এখন মানুষ আশায় বুক বেঁধে আছে করোনার টিকার জন্য। সরকার ভারতের সঙ্গে টিকার ব্যাপারে চুক্তি করেছে। বছরটা শুরু হবে টিকার সরবরাহ পেয়ে। টিকা দেয়া শুরু হলে জনজীবনে কিছুটা স্বস্তি নেমে আসতে পারে। মনে হয় ২০২১ সাল ২০২০ সালের তুলনায় কিছুটা হলেও ভালো কাটবে। তবে প্রাক-করোনায় যেতে অর্থনীতির আরও ২-৩ বছর সময় লাগতে পারে-এটাই দুশ্চিন্তার বিষয়।

ড. আর এম দেবনাথ : অর্থনীতি বিশ্লেষক; সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

rmdebnath@yahoo.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : ফিরে দেখা ২০২০

২৯ ডিসেম্বর, ২০২০
২৯ ডিসেম্বর, ২০২০