ঘৃণামুক্ত হৃদয়ই বিশ্বময় ছড়াবে শান্তির সুবাতাস   

 মাহমুদ আহমদ  
১৯ ডিসেম্বর ২০২০, ০৮:১৪ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
ঘৃণামুক্ত হৃদয়ই বিশ্বময় ছড়াবে শান্তির সুবাতাস   
ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ যেন এক অশান্তি আর অস্থিরতার মাঝে অতিক্রম করছে। বিশ্বের অধিকাংশ দেশ উপর্যুপরি দুঃখ-কষ্টের সীমাহীন আজাব ও বিপদাপদের সম্মুখীন এবং অনবরত এর লক্ষ্যে পরিণত হচ্ছে। 

একে সামাল দেয়ার সম্ভাব্য সকল প্রকার চেষ্টা করা হয়, কিন্তু যত চেষ্টাই করা হোক না কেন ব্যাধি কেবল বাড়ছেই। প্রত্যেকটি নতুন বিপদ ও সমস্যা পূর্বের তুলনায় অনেক বেশি কষ্টদায়ক ও উৎকন্ঠা বৃদ্ধির কারণ হয়ে থাকে। 

এক সমস্যার সমাধান সহস্র অস্থিরতা সৃষ্টির কারণ হচ্ছে। আর এমনটি শেষ জামানায় হওয়ারই কথা ছিল। কেননা এসব অস্থিরতা ও উৎকন্ঠার কারণ পার্থিব নয় বরং ঐশী কোনো নিয়তি এর পেছনে কার্যকর। 

ঐশী আজাব এবং শাস্তি যা বৃষ্টির ফোটার মত বর্ষিত হচ্ছে। আর ব্যাধি যখন ঐশী হয় তখন চিকিৎসকও ঐশীই হওয়া প্রয়োজন, যিনি এসব দুঃখ-কষ্টের চিকিৎসা করতে পারেন। 

আজ উৎকন্ঠিত বিশ্ববাসী এবং প্রাণ ওষ্ঠাগত আর্তমানবতার জন্য প্রয়োজন পবিত্র কোরআন ও বিশ্বনবীর শিক্ষার ওপর আমল করা। 

ব্যক্তিগত ও জাতীয় পর্যায়ে প্রত্যেক দেশের সরকার শান্তির সন্ধানে রত আর তা অর্জনের জন্য সম্ভাব্য সকল প্রকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু নামকাওয়াস্তে যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা হয় তার ভিত্তি সুবিবেচনা হয় না। 
আন্তরিকতার সঙ্গে কৃত সুবিবেচনাই মূলত শান্তির ভিত্তি হতে পারে। পারষ্পরিক ভালোবাসা ও প্রেম-প্রীতির পরিবেশ সৃষ্টির জন্য সুবিবেচনা প্রদর্শন আবশ্যক। 

আর সুবিবেচনা হচ্ছে, মানুষের কথা ও কাজের মধ্যে যেন কোন ভিন্নতা না থাকে আর মানুষ যেন কখনো মিথ্যার আশ্রয় না নেয়। কিন্তু সাধারণভাবে আমরা সত্যের এরূপ উন্নত মান দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলের কোথাও দেখতে পাই না। 

আজ যদি বিশ্বের অবস্থা পর্যালোচনা করা হয় তাহলে দেখা যাবে, একটি বিশাল শ্রেণি দারিদ্রতা ও অন্যায়-অবিচারের শিকার। পরিশেষে এসব অবিচারই ঘৃণা ও ক্ষোভে রূপান্তরিত হয়। 

প্রশ্ন হচ্ছে, বিশ্বের শক্তিশালী জাতিসমূহের বিশ্বের সীমাহীন দারিদ্রতা ও অন্যায়-অবিচারের কোনো সমাধান খুঁজে বের না করার কারণ কী? 

জাতিসংঘের উচ্চকক্ষের সভা ডেকে অন্যায় ও অন্যায্য কার্যকলাপের বিরুদ্ধে শুধুমাত্র দুঃখ ও ক্ষোভ প্রকাশ করা কোনো সমাধান নয়। 

মহানবী (সা.) এক্ষেত্রে একটি নীতিগত নির্দেশনা প্রদান করেছেন, তাহলো ‘শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য তোমাদের হৃদয়গুলোকে ঘৃণা থেকে পুরোপুরি মুক্ত করো।’ 

তাই আমরা যদি পরস্পরকে ভালবাসতে শিখি তাহলে সারা বিশ্ব হতে পারে শান্তিময়।

সমাজ ও রাষ্ট্রকে অশান্তি, জুলুম ও বিশৃঙ্খলামুক্ত করার নির্দেশ ইসলামে রয়েছে বলেই ইসলাম শান্তির ধর্ম। 
মানুষ যদি শান্তি পেতে চায়, তাহলে তার নিজের ইচ্ছেমতো জীবন যাপন না করে আল্লাহর দেয়া বিধান মেনে চলতে হবে। তাই আল্লাহ তার প্রেরিত বিধানের নাম রেখেছেন ইসলাম। 

কম্পিউটার চালিত অত্যাধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতার এ যুগে মানুষ আজ কঠিনতম বাস্তবতার শিকার। সবাই চায় সচ্ছলতা, চায় শান্তি। বস্তুত মানুষ আত্মিক শান্তির পিয়াসী আর বেঁচে থাকার জন্য এটি অপরিহার্য। 

মহান আল্লাহর মনোনীত ধর্ম ইসলাম সেই অনন্ত শান্তির বাণীই প্রচার করছে। তাই তো শাশ্বত ধর্ম ইসলামের অনিন্দ্যসুন্দর আদর্শে মানুষ যুগ যুগ ধরে ইসলাম গ্রহণ করে আসছে। 

বিশ্বের অধিকাংশ মানুষই শান্তির প্রত্যাশা রাখে আর নিরাপত্তাও চায়, কিন্তু বিশ্লেষণ করলে মনে হয়, প্রকৃতপক্ষে বিশ্বের অধিকাংশই এই শান্তি লাভ করতে চায় না, তারা সেসব পথ অবলম্বন করতে সম্মত নয় যেপথে চললে শান্তি অর্জন সম্ভব। 

কেননা এই পথ যতটা সহজ ততটাই বন্ধুর। এই নীতি ও সমাধানের কথা পবিত্র কোরআনেও আল্লাহ ইরশাদ করেছেন। 

আল্লাহপাক ইরশাদ করেন, ‘যারা ঈমান আনে এবং যাদের হৃদয় আল্লাহকে স্মরণ করে প্রশান্তি লাভ করে। শোন আল্লাহর স্মরণেই হৃদয় প্রশান্তি লাভ করে’ (সুরা আর রাদ, আয়াত: ২৮)। 

বাস্তবতা এটাই যে, আজ মানবতা আল্লাহপাকের স্মরণ হতে দূরে চলে গেছে এবং আল্লাহতায়ালাকে ভুলে বসেছে। 
অনেকে তো আল্লাহপাকের অস্তিত্বই অস্বীকার করে আর এ কারণেই তারা এ বিষয়ের প্রতি মনোযোগ দিতে চায় না এবং যারা এতে বিশ্বাস রাখে তারাও ধর্মের নামে ধর্ম প্রবর্তকদের আনীত সত্যিকার শিক্ষামালা বিকৃত করে এমনসব মনগড়া ব্যাখ্যা করছে যা সমাজের শান্তি ও নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করে আলো-বাতাসকে পর্যন্ত বিষাক্ত করে ফেলেছে। 

অথচ প্রত্যেক জাতিতে নবী এসেছে আর সমাজের শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্যই তারা আবির্ভূত হয়েছেন। সবশেষে বিশ্বের জন্য আশীর্বাদ হিসাবে আবির্ভূত হন সর্বশ্রেষ্ঠ ও মানবদরদী রসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.)। 

তিনি বিশ্ববাসীকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য এসেছেন, যাতে তারা এক জাতিতে পরিণত হয় এবং ধরাপৃষ্ঠে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য চাই সকল ধর্মের প্রতি ভালবাসা প্রদর্শন। 

হজরত মুহাম্মদ (সা.) তার জীবন দ্বারা একথা প্রমাণ করে গিয়েছেন যে, ধর্মের নামে কোনো অন্যায়-অবিচার নেই। সকল ধর্মের সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ ও তাদের ধর্মীয় উপাসনালয়গুলো শ্রদ্ধার বস্তু। 

মহানবীর (সা.) শিক্ষাগুলোকে আজ আমাদের জীবনে বাস্তবায়ন করার সময় এসেছে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.) সমাজের সর্বক্ষেত্রে এবং সকল জাতির মাঝে শান্তি, শৃংখলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন। 

আজ বিশ্ববাসী শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করতে চাইলে পরষ্পরের ভেতর প্রেম-প্রীতি, আন্তরিকতা এবং বিশ্বস্ততার সম্পর্ক গড়ে তুলুক এবং এই সম্পর্ক ততক্ষণ পর্যন্ত সুদৃঢ় হতে পারে না যতক্ষণ পর্যন্ত বিশ্ব জগতের প্রভু-প্রতিপালকের সঙ্গে সম্পর্ক গড়া না হবে। 

আল্লাহর সঙ্গে দূরত্ব বৃদ্ধিই এসব অস্থিরতা ও অশান্তির মূল কারণ। 

তাই আমরা সবাই যদি উঠতে বসতে সব সময় আল্লাহপাককে স্মরণ করে তাকওয়া অবলম্বন করি তাহলে হয়তো আল্লাহতায়ালা আমাদের ব্যাকুল হৃদয়ের প্রার্থনা কবুল করে পরিবার, দেশ এবং বিশ্বে শান্তির শীতল সুবাতাস প্রবাহিত করতে পারেন। 

বিশ্বময় শান্তির জন্য আল্লাহর দিকে ঝুকা ছাড়া দ্বিতীয় আর কোনো রাস্তা খোলা নেই।

লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন