‘একজন দরিদ্র মা-ই একের ভেতর সতেরটা লক্ষ্য পূরণ করতে পারেন’

 অনলাইন ডেস্ক 
১৭ জুলাই ২০২০, ১০:৩৮ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

এএইচএম নোমান বেসরকারি সংস্থা ডর্‌প-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং নির্বাহী প্রধান। তিনি দরিদ্র নারী ও শিশুর পুষ্টির চাহিদা পূরণে মাতৃত্বকালীন ভাতা প্রদান কার্যক্রমের প্রবর্তক।

দারিদ্র্য বিমোচন ও মানবহিতৈষী কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন অনেক পুরস্কার। এর মধ্যে রয়েছে ২০০৬ সালে ‘সাউথ অস্ট্রেলিয়ান ইউনিভাসির্টি’ থেকে ‘চ্যান্সেলর অ্যাওয়ার্ড’, ২০১৩ সালে ফিলিপাইনভিত্তিক ‘গুসি আন্তর্জাতিক শান্তি পুরস্কার’ এবং ‘স্বাস্থ্যগ্রাম’ কার্যক্রমের উদ্ভাবনীমূলক দিক ও ফলপ্রসূ বাস্তবায়নের জন্য ডর্‌প ‘জাতিসংঘের পানি বিষয়ক পুরস্কার’। ভূষিত হয়েছেন ‘মাতৃবন্ধু’ উপাধিতে ।

এছাড়া তিনি দেশে নারীর ক্ষমতায়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনের মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখায় ২০১৭ সালে পেয়েছেন জুনিয়র চেম্বার ইন্টারন্যাশনাল (জেসিআই)- বাংলাদেশ কর্তৃক ‘জেসিআই বাংলাদেশ শান্তি সম্ভব এওয়ার্ড- ২০১৭’। সমাজকল্যাণে বিশেষ অবদানের জন্য ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদার আকাশ পত্রিকা ও প্রকাশন থেকে চলতি বছরের ২ জানুয়ারি ‘প্রচারহীন বীরত্ব’ সম্মাননা লাভ করেন।

তার কর্মকাণ্ড ও সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সম্প্রতি তিনি কথা বলেছেন যুগান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রীতা ভৌমিক-

যুগান্তর: কেমন আছেন?

এএইচএম নোমান: আমি ভালো আছি। কোভিড-১৯ এর মহামারীর এই সময়টাকে আমি আমার কাজের ক্ষেত্র হিসেবে দেখছি। কারণ ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর জলোচ্ছাসে অনেক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন। ক্ষতিগ্রস্ত সেই মানুষের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ থেকেই আমার কাজের ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়েছিল। 

এর পরের বছরই দেশের স্বাধীনতার জন্য একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। নতুন দেশ গড়ার লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উৎপাদন ও অধিকার নিয়ে কাজ করি। প্রাকৃতিক হোক বা স্বাস্থ্যগতই হোক এই ধ্বংস থেকে আমি সৃষ্টির প্রেরণা পাই।

কোভিড-১৯ এর যুদ্ধেও আমি মনে করি, ‘বিধি মেনে করোনা ঠেকাই/ গেরিলা যুদ্ধে উৎপাদন বাড়াই।’

যুগান্তর: আপনি দরিদ্র মা’দের জন্য ‘মাতৃত্বকালীন ভাতা’ প্রদান কার্যক্রমের উদ্ভাবক। এ সম্পর্কে যদি কিছু বলেন?

এএইচএম নোমান: ‘মা’ শব্দ থেকেই মাতৃত্বকালীন কথাটি আসে। ‘মা’ হলো সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত বিশাল দান। ত্রাণ, পুণর্বাসন, উন্নয়ন, মানবাধিকার বিষয়ক কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে প্রায় পাঁচ দশকের অনুশীলনকৃত অভিজ্ঞতায় আমি পর্যবেক্ষণ করি, উন্নয়নের বটম লাইন কোথায়?

এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে ২০০৫ সালে ‘বিশ্ব মা দিবসে’ এক জাতীয় কর্মশালায় দরিদ্র মায়েদের জন্য ‘মাতৃত্বকালীন ভাতা’ প্রদানের ঘোষণা দিই। সূত্রটি ছিল সরকারি-বেসরকারি যারা চাকরি করেন তারা সবেতনে চার মাসের স্থলে ছয় মাস মাতৃত্বকালীন ছুটি পাবেন। এমনকি ১৫ দিনের পিতৃত্ব ছুটিও বাবারা পাবেন।

কিন্তু যারা ভূমিহীন, ক্ষেতমজুর, নদী ভাঙ্গন, বেরি বাঁধের উপর থাকেন, বস্তিতে বসবাস করেন সেইসব অসহায় মায়েদের ‘মাতৃত্বকালীন’ ছুটির কোনো ব্যবস্থা নেই। এই লক্ষ্যে সরকার থেকে তাদের জন্য ‘মাতৃত্বকালীন ভাতা’ প্রদানের উদ্যোগ নেয়া হয়। তবে ‘মাতৃত্বকালীন ভাতা’ প্রদানে শর্ত জুড়ে দেয়া হয়। দুই সন্তানের অধিক হলে, বাল্যবিয়ে হলে, প্রথম সন্তান ২০ বছরের আগে জš§ নিলে কোনো দরিদ্র মা ওই ভাতা পাবেন না। সেই সঙ্গে মায়ের জন্ম নিবন্ধন এবং বিবাহ নিবন্ধনও থাকতে হবে।

যুগান্তর: ‘২০ বছর এক প্রজন্ম মেয়াদী’ দারিদ্র্য বিমোচনে ‘মাতৃত্বকালীন ভাতা’ কেন্দ্রিক ‘স্বপ্ন প্যাকেজ’ কার্যক্রমেরও উদ্যোক্তা আপনি? এ সম্পর্কে যদি কিছু বলেন?

এএইচএম নোমান : মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় স্থানীয় সরকার ও মহিলা অধিদফতরের মাধ্যমে তিন বছর মেয়াদে প্রতি মাসে ৮০০ টাকা করে প্রতি ইউনিয়নে গড়ে ১০০ দরিদ্র মাকে ( সারা দেশে ৭ লক্ষ ৭০ হাজার) ‘মাতৃত্বকালীন ভাতা’ প্রদান করা হচ্ছে।
এজন্য সকল দরিদ্র মায়েদের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকা্েরর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

তিন বছরের প্রদেয় ‘মাতৃত্বকালীন ভাতা’ প্রদান সম্পন্ন হলে এর পরে শিশু সন্তানকে নিয়ে মা-বাবা যাতে সুন্দর, সুস্থ পরিবেশে বসবাস করতে পারেন এই লক্ষ্যে ‘২০ বছর এক প্রজন্ম মেয়াদী’ ও ‘স্বপ্ন প্যাকেজ’ আওতায় আনার পরিকল্পনা নেয়া হয়। এই ‘স্বপ্ন প্যাকেজে’র আওতায় সামষ্টিক উন্নয়নের লক্ষ্যে একজন দরিদ্র মা একটি স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জন্ম নিয়ন্ত্রণ কার্ড, একটি শিক্ষা ও বিনোদন কার্ড, বাসস্থানের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিনসহ একটি টিনের ঘর, জীবিকায়নের জন্য কেউ গাভী, কেউ সেলাই মেশিন বা দোকান বা তারা যে কাজে ইচ্ছুক তাই তাকে দেয়া হবে। এতে এক মা-কে এক লাখ টাকা রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ করা হয়।

এই সম্পদ পাবলিক (ইউনিয়ন পরিষদ), প্রাইভেট পুওর (মা) পার্টনারশীপ আওতায় প্রাপ্ত হন মায়েরাই।

যুগান্তর: এ ধরনের কার্যক্রম বাস্তবায়ন করায় ‘মাতৃবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন? এ সম্পর্কে আপনার অনুভূতি শেয়ার করবেন কি?

এএইচএম নোমান : দরিদ্র মায়েদের বিষয়ে সৃষ্টিকর্তার দান হিসেবে কাজের প্রেক্ষিতে ২০১৩ সালে সাংবাদিকমহল আমাকে ‘মাতৃবন্ধু’ উপাধিতে অভিহিত করেছেন।

যুগান্তর: দারিদ্র্য বিমোচন ও মানবহিতৈষী কাজে অবদানের জন্য ২০১৩ সালে ফিলিপাইনের ‘গুসি আন্তর্জাতিক শান্তি’ পুরস্কার পেয়েছেন? যদি কিছু বলেন?

এএইচএম নোমান : প্রতি বছর অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, মানবাধিকার, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ইত্যাদি ক্ষেত্রে অবদানের জন্য বিভিন্ন দেশের গুণীজনদের ২০০৬ সাল থেকে আন্তজার্তিক সার্চ কমিটির মাধ্যমে ফিলিপাইন ভিত্তিক ‘গুসি আন্তর্জাতিক শান্তি’ পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করা হয়।
২০১৩ সালে বাংলাদেশ থেকে এই পুরস্কারের জন্য আমি নির্বাচিত হই। পুরস্কার কমিটির চেয়ারম্যান অ্যাম্বাসেডার বেরী গুসি ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় ‘গুসি আন্তর্জাতিক শান্তি’ পুরস্কার আমার হাতে তুলে দেন।

যুগান্তর: সাহিত্য সংগঠন ‘বৃহস্পতি আড্ডা’র একজন পৃষ্ঠপোষকও আপনি। বাংলাদেশের লেখকদের সাহিত্যচর্চার কোন দিকটি আপনাকে অনুপ্রাণিত করে?

এএইচএম নোমান : সাহিত্য সংগঠন ‘বৃহস্পতি আড্ডা’র সঙ্গে যুক্ত হওয়ার অনুপ্রেরণার মূল কারণ হলো বাংলাদেশের কবি-সাহিত্যিকরা নিজ দেশের সমাজ-সংস্কৃতি, পরিবেশ, সামগ্রিক দিকগুলো তাদের সাহিত্যে তুলে ধরেন। এই বিষয়গুলো প্রায়োগিকভাবে শেকড় পর্যায়ের।
সাধারণ মানুষের কল্যাণে কাজ করার জন্য এটা কতটুকু কার্যকর হবে এটাই আমার কাজের মূল লক্ষ্য। সাহিত্য আড্ডার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার এটাই ছিল আমার অন্তনির্হিত লক্ষ্য।

যুগান্তর: দেশের নারীর ক্ষমতায়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনে আপনার অভিমত কি?

এএইচএম নোমান : এসডিজি দারিদ্র্য বিমোচনের এক নম্বর এজেন্ডা। এসডিজি লক্ষ্যমাত্রাকে পূরণ করতে বটমলাইনিং দরিদ্র মাকে কেন্দ্র করে ‘মাতৃত্বকালীন ভাতা’ কেন্দ্রিক ‘স্বপ্ন প্যকেজ’( সোশ্যাল এসিসট্যান্স প্রোগাম ফর নন এসেটারস) বাস্তবায়ন করতে হবে। তাহলেই নারীর ক্ষমতায়ন ও দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব হবে। কেননা, দারিদ্র্য ও শান্তি একসঙ্গে হাঁটতে পারে না।

যুগান্তর: কোভিড-১৯ এর কারণে স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোয় মায়েদের স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে বাধা পেতে হচ্ছে। এই বাধা দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যকে পিছিয়ে দিতে পারে । এ সম্পর্কে আপনার অভিমত কি?

এএইচএম নোমান : কোভিড-১৯ এর কারণে বা কখনো কখনো মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে সর্বদাই বাধাগ্রস্থ হয়। দরিদ্র মায়েদের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার থেকে পিছিয়ে রাখা হচ্ছে। এই বাধা থেকেই আমাদেরকে উপলব্ধি করতে এবং শিখতে হবে দরিদ্র মায়েদের নিয়েই এসডিজির ১৭টা লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। একজন দরিদ্র মা-ই একের ভেতর সতেরটা লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেন। কারণ এসডিজির ১৭টা লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে প্রথম লক্ষ্যমাত্রাই হলো দারিদ্র্য বিমোচন।

যুগান্তর: মূল্যবান সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

এএইচএম নোমান : আপনাকেও ধন্যবাদ।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন