মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়িয়েছে কাসেম সোলাইমানি ও ফাখরিজাদের হত্যা

 তানজিল আমির 
২৮ ডিসেম্বর ২০২০, ০৮:৩২ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়িয়েছে কাসেম সোলাইমানি ও ফাখরিজাদের হত্যা
কাসেম সোলাইমানি ও মোহসেন ফাখরিজাদেহ। ছবি: সংগৃহীত

ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কৌশলী কুদস বাহিনীর প্রধান জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার মধ্য দিয়ে বছরের শুরুতেই মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক অস্থিরতা সৃষ্টি করেছিল যুক্তরাষ্ট্র।

২০২০ সালের একবারে শুরুতে ৩ জানুয়ারি ইরাকের রাজধানী বাগদাদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে জেনারেল সোলাইমানিকে বহনকারী গাড়ির ওপর ড্রোন হামলা চালিয়ে হত্যা করে মার্কিন সেনারা।

হামলায় ইরাকের স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী হাশদ আশ-শাবির উপ প্রধান আবু মাহদি আল-মুহান্দিসসহ দুই দেশের আরও ৮ কমান্ডার শহীদ হন। এই হত্যাকাণ্ড বিশ্বব্যাপী তোলপাড় সৃষ্টি করে। নিন্দার ঝড় উঠে সর্বত্র।

কাসেম সোলাইমানি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? 

ইরানিদের কাছে হাজি কাসেম শুধু একটি নাম ছিল না, ছিল একটি নক্ষত্র। যিনি অনেকের কাছে ‘শত্রুদের দুঃস্বপ্ন’ আর ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খোমেনি যাকে ‘জীবন্ত শহীদ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন। 

১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পরে ঘটিত ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড বা আইআরজিসির প্রধানের দায়িত্বে ছিলেন নিহত এই কমান্ডার সোলাইমানি। 

যিনি ধীরে ধীরে আল কুদসের শাখাগুলোর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের সিরিয়া, ইয়েমেন, লেবানন, ইরাকে নিজের ভাবনার প্রতিফলন ঘটিয়ে সামরিক ভারসাম্যে পরিবর্তন ঘটাতে ভূমিকা রেখেছিলেন বললে ভুল হবে না। 

৬৩ বছর বয়সী জেনারেল সোলাইমানির চিন্তাশক্তি আর সামরিক কৌশলই মূলত মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সামরিক প্রভাবে ভূমিকা রেখেছিল।

লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের হামাস ও ইসলামিক জিহাদ, ইয়েমেনের হুতি ইত্যাদি সংগঠনের কাছেও যার ছিল গ্রহণযোগ্যতা, যা পশ্চিমা বিশ্বকে এবং ইসরাইলকে ভাবিয়েছিল। 

ইসরাইলের মোসাদ আর যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ এর হিট লিস্টে সোলাইমানি সর্বাগ্রেই ছিলেন। 

এর সূত্র ধরেই কয়েকবার হামলার চিন্তা করেও কোনো কারণে এতটা সময় নিতে চেয়েছিল তারা। 

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনান্ড ট্রাম্প সেই অপেক্ষার দিন শেষ করে নির্বাচনের আগেই জনগণের দৃষ্টি কাড়তে জেনারেল সোলাইমানিকে সরাসরি হত্যার নির্দেশ দেন। 

একজন প্রেসিডেন্ট যখন নিজ থেকে ঘোষণা দিয়ে অন্য একটি দেশের সামরিক প্রধানকে হত্যার নির্দেশ দেন তখন ভাবায় যায় জেনারেল কাসেমি শুধু একজন সামরিক প্রধান ছিলেন না, তিনি ছিলেন বিরোধীদের ঘুম হারাম করা শত্রুদের দুঃস্বপ্ন। 

ট্রাম্পের বর্ণনায় সোলাইমানি হত্যা

কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার বর্ণনা নিজেই দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। 

সোলাইমানির ওপর মার্কিন বাহিনীর ড্রোন হামলার সময় তিনি নিজে মনিটরিং করছিলেন বলেও জানিয়েছেন সদ্য পরাজিত এ মার্কিন প্রেসিডেন্ট। 

হামলার সাফাই দিতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, সোলাইমানি আমেরিকার বিরুদ্ধে বাজে কথা বলছিলেন। এজন্য তাকে হত্যা করা হয়েছে। 

ট্রাম্প জানান, ওই দিন হোয়াইট হাউসে বসে গোটা পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছিলেন। 

মার্কিন প্রেসিডেন্টের কথায়, ‘সেনা অফিসাররা আমাকে বললেন, ওরা একসঙ্গে আছে স্যর। ওদের হাতে আর ২ মিনিট ১১ সেকেন্ড সময় আছে। বাঁচার জন্য ২ মিনিট ১১ সেকেন্ড। ওরা সাঁজোয়া গাড়িতে আছে। বাঁচার জন্য আর এক মিনিট বাকি আছে, ৩০ সেকেন্ড, ১০, ৯, ৮...।’

হত্যার বর্ণনায় ট্রাম্প আরও বলেন, ‘তারপর হঠাৎ বুম...। ওরা শেষ স্যর। সংযোগ কাটছি। সেই লোকটা (সোলাইমানি) কোথায় গেল?’
 
কঠিন প্রতিশোধের ঘোষণা ইরানের

কুদস ফোর্সের কমান্ডার জেনারেল কাসেম সোলাইমানি হত্যায় কঠিন প্রতিশোধ নেয়ার ঘোষণা দেয় ইরান। এ ঘটনায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের মাথার দামও ঘোষণা করা হয়েছে ইরানের সংসদে। 

৮ জানুয়ারি ইরাকে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি আইন আল-আসাদসহ দু’টি ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান। ওই দু’টি ঘাঁটিতে এক হাজার পাঁচশ সেনা সদস্য অবস্থান করছিল।

ইরানের ওই হামলায় ১২০ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে বলে দাবি করেছিলেন ইরানের বিপ্লবী গার্ডের প্রধান উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলি বালালি।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খোমেনি বলেছিলেন, ‘মিসাইল হামলা ছিল আমেরিকার সৈন্যদের জন্য একটি চপেটাঘাত’।

তবে হামলায় মার্কিন সেনা নিহতের বিষয়টি বরাবরই অস্বীকার করে আসছে ট্রাম্প প্রশাসন।

জাতিসংঘের মত

জানুয়ারিতে সংঘঠিত এই হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ তদন্ত শেষে জাতিসংঘ বলছে, সোলাইমানি হত্যা আন্তর্জাতিক আইনের লংঘন। কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার কোনো কারণ দেখাতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। এই হামলার পক্ষে যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণও হাজির করতে পারেনি ট্রাম্প প্রশাসন।


এবার টার্গেট শীর্ষ পরমাণুবিজ্ঞানী

বছরের শুরুতে শীর্ষ কমান্ডার হারানোর পর বছরের শেষে শীর্ষ এক পরমাণুবিজ্ঞানীকে হারিয়েছে ইরান। 

২৭ নভেম্বর দেশটির শীর্ষ পরমাণুবিজ্ঞানী ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের গবেষণা ও উদ্ভাবনী সংস্থার চেয়ারম্যান মোহসেন ফাখরিজাদেহ তেহরানের অদূরে এক সন্ত্রাসী হামলায় প্রাণ হারান।

তাকে হত্যার জন্য ইসরাইলকে দায়ী করেছেনে ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি। একই সঙ্গে হত্যার বদলা নেয়ার হুমকি দিয়েছেন ইরানের ধর্মীয় নেতারা ও সেনাবাহিনী।

পশ্চিমাদের চোখে ইরানে ‘গোপনে পারমাণবিক বোমা কর্মসূচির’ মূল কারিগর ফাখরিজাদেহকে দীর্ঘদিন ধরে অনুসরণ করে আসছে মোসাদ। 

ফাখরিজাদেহ ছিলেন সর্বাধিক খ্যাতিমান ইরানি পরমাণু বিজ্ঞানী এবং অভিজাত ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কোরের সিনিয়র অফিসার।

তার ব্যাপারে পশ্চিমা সুরক্ষা সূত্রগুলো দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে যে, ফাখরিজাদেহ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির অত্যন্ত শক্তিশালী এবং সহায়ক একজন ব্যক্তি।

২০১৮ সালে ইসরাইলের থেকে পাওয়া গোপন নথি অনুসারে তিনি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির একটি কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

সে সময় ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন যে তিনি ফাখরিজাদেহ ইরানের পরমাণু কর্মসূচির প্রধান বিজ্ঞানী বলে মনে করেন এবং তার ‘এই নামটি মনে রাখার’ আহ্বান জানিয়েছিলেন। 

মৃত্যুর দেশটির শীর্ষ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি প্রয়াত এ বিজ্ঞানীকে ইরানের সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব ‘নাছর’ (বিজয়)-এ ভূষিত করেন।
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : ফিরে দেখা ২০২০

২৯ ডিসেম্বর, ২০২০
২৯ ডিসেম্বর, ২০২০