ইউরোপে বাংলাদেশিদের অ্যাসাইলাম আবেদন কঠিন হচ্ছে

 ফরিদ আহমেদ পাটোয়ারী, পর্তুগাল থেকে 
২৬ ডিসেম্বর ২০২০, ০৩:১৫ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

করোনা মহামারীতে থেমে গেছে পৃথিবী। কিন্তু থেমে নেই ইউরোপ অভিমুখী অভিবাসীদের ঢল। বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে এসেও অ্যাসাইলামের (রাজনৈতিক আশ্রয়) আবেদন বেড়েছে ১৩২ শতাংশ। নতুন করে ১ লাখ ১১ হাজার ৬৯৫ আবেদন জমা পড়েছে। এদের বেশিরভাগই ৯টি দেশের। এর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান অষ্টম। অ্যাসাইলাম আবেদন বৃদ্ধি পেলেও বৈধতা প্রাপ্তির পরিমাণ কমেছে। 

ইউরোপে গত কয়েক মাস যাবত আংশিক লকডাউন এবং বর্ডারের আরোপিত প্রতিবন্ধকতা তুলে দেওয়ার কারণে এই আবেদন বৃদ্ধি পেয়েছে। এই তৃতীয় প্রান্তিকে ৩ হাজার ৫৫ জন বাংলাদেশি ইউরোপে নতুন আশ্রয় আবেদন করেছেন। তবে এ বছরে অক্টোবর পর্যন্ত সর্বমোট ৮ হাজার ২৮৬ জন আশ্রয় আবেদন করেছেন। যা গত বছর একই সময়ে ছিল ১০ হাজার ৯৯৩ জন।

চলতি বছরের এযাবৎ কালে সর্বমোট ২৬৩ জন বাংলাদেশির আবেদন অনুমোদন দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ শরণার্থী হিসেবে বৈধভাবে বসবাসের সুযোগ দেয়া হয়েছে। যা গত ২০১৯ সালে একই সময়ে ছিল ৬০০ জন। এ বছরের তৃতীয় কোয়ার্টারে সবচেয়ে কম আবেদন বৈধতা দেয়া হয়েছে যার সংখ্যা মাত্র ৬৮ জন।

গত কয়েক বছর যাবত বাংলাদেশীদের আশ্রয় আবেদনের অনুমোদনের হার প্রতিনিয়তই হ্রাস পাচ্ছে। পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ আশ্রয় আবেদনের দিক থেকে প্রায় কাছাকাছি অবস্থানে থাকলেও পাকিস্তানের আশ্রয়ে আবেদন বাংলাদেশ থেকে দ্বিগুণ বৈধতা দেয়া হচ্ছে। তাছাড়া আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ কমসংখ্যক আবেদন করার পরেও বাংলাদেশের থেকে অনেক বেশি আশ্রয় আবেদনের প্রেক্ষিতে বৈধতা দেয়া হচ্ছে।

তৃতীয় প্রান্তিকে বাংলাদেশীদের আশ্রয় আবেদন বাতিল করা হয়েছে ২ হাজার ২১৮টি। তবে এই বছর সর্বমোট ৭ হাজার ২১৩টি আশ্রয়ের আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন। ২০১৯ সালে একই সময়ে ১১ হাজার ৮৫৯টি আবেদন খারিজ করে দেওয়া হয়েছিল। যদিও গত বছর আবেদনকারীর সংখ্যা বেশি ছিল এবং তার সাথে কিছু পেন্ডিং আবেদন যুক্ত হয়েছিল।

বাংলাদেশি নাগরিকরা ইউরোপের প্রধানত ফ্রান্স, গ্রীস, ইতালি এবং সাইপ্রাসে সবচেয়ে বেশি আশ্রয় আবেদন করেছেন। বাংলাদেশীদের পছন্দের তালিকায় সবচেয়ে এগিয়ে আছে ফ্রান্স। এরপর গ্রিস এবং ইতালি। কেননা বাংলাদেশি মোট আশ্রয় আবেদনকারীর প্রায় ৪৬ শতাংশই ফ্রান্সে আবেদন করেছেন।

অপরদিকে বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে ইউরোপের তিনটির দেশে সবচেয়ে বেশি শরণার্থী আশ্রয় আবেদন করা হয়- জার্মানি, ফ্রান্স স্পেন, গ্রিসে এবং ইতালি। বলতে গেলে ৭০% শরণার্থী এ কয়টি দেশে আবেদন করেন। সাধারণত ইউরোপের শরণার্থী রুট হিসেবে এই দেশগুলো সন্নিকটে হওয়ায় এবং আইওএম কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে থাকার জন্য আরেকটি কারণ। 

২০২০ সালের অক্টোবর পর্যন্ত নতুন ৩ লাখ ৮১ হাজার ১৫ জন শরণার্থী ইউরোপে আশ্রয় আবেদন করেছেন এবং সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে সর্বমোট ৮ লাখ ৮২ হাজারটি আবেদন প্রসেসিং পর্যায়ে অপেক্ষমাণ রয়েছে।

তুলনামূলকভাবে অন্যান্য দেশের চেয়ে বাংলাদেশি নাগরিকদের আবেদনের পরিমাণ খুবই কম। বাংলাদেশের সাবকন্টিনেন্টের পাকিস্তান আয়তনের দিক থেকে বাংলাদেশের উপরে রয়েছে, সবচেয়ে বেশি শরণার্থী আশ্রয় আবেদনের শীর্ষে রয়েছে সিরিয়া, আফগানিস্তান, ভেনিজুয়েলা, কলম্বিয়া এবং পাকিস্তান এই দেশগুলো থেকে শরণার্থী আশ্রয় আবেদনের সংখ্যা ইউরোপের আবেদনকারী সর্বমোট আবেদনের পাঁচ ভাগের দুই ভাগ। দ্বিতীয় ক্যাটাগরিতে ইরাক, তুর্কি, সোমালিয়া, বাংলাদেশ, নাইজেরিয়া রয়েছে। 

গত কিছুদিন আগে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে একটি বিষয় দেখা যাচ্ছে, বসনিয়াতে ক্রোয়েশিয়া সীমান্তে বিভিন্ন ক্যাম্পে এবং জঙ্গলে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি ক্রোয়েশিয়ার বর্ডার অতিক্রম করে ইউরোপে প্রবেশ করার জন্য অপেক্ষমাণ আছেন। তবে সংখ্যাটা নিশ্চিতভাবে কেউই বলতে পারছেন না। বলা যেতে পারে প্রায় দুই থেকে তিন হাজার বাংলাদেশি বসনিয়াতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে অপেক্ষায় আছেন ইউরোপ যাত্রার জন্য। 

যে সকল বাংলাদেশি আর্থিকভাবে স্বচ্ছল তারা বসনিয়ার বিভিন্ন শহরে বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস করছেন এবং গেম (বিভিন্ন দালাল চক্রের মাধ্যমে বর্ডার অতিক্রম) এর অপেক্ষায় আছেন। যখনই খবর আসবে তখন রওনা হবেন স্বপ্নযাত্রায়।

উপরোক্ত পরিস্থিতি এবং ২০১৯ এবং ২০২০ সালের চিত্র পর্যালোচনা করলে একটা বিষয় পরিলক্ষিত হয় যে, ২০১৯ সালের সাথে তুলনামূলক ২০২০ সালে বাংলাদেশিদের আশ্রয়ের আবেদনের প্রেক্ষিতে খুব কম সংখ্যক মানুষকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। এজন্য অবশ্য কিছু কারণ রয়েছে ইউরোপের নতুন মাইগ্রেশন পরিকল্পনা, ব্রেক্সিট এবং সর্বোপরি করোনা মহামারীকালে সৃষ্ট প্রতিবন্ধকতা। 

বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদন তুলনামূলকভাবে কম বৈধতা পাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে বেশিরভাগ আবেদনকারী অর্থনৈতিক কারণে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিচ্ছেন। আশ্রয় আবেদনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রকার ভুল তথ্য উপস্থাপন করছেন যেগুলো সরেজমিন তদন্তে উপস্থাপিত বিষয়গুলো ভুল প্রমাণিত হচ্ছে। 

বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ বিপ্লবের কারণ খুব সহজেই বিষয়গুলো নিরূপণ করা সম্ভব হচ্ছে এবং বর্তমান বাংলাদেশে অবস্থিত রোহিঙ্গাদের কার্যক্রমের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিষয় সহজে উঠে আসছে এবং তার ইউরোপে অবস্থিত বাংলাদেশি সঠিক ক্ষতিগ্রস্ত শরণার্থী নিরূপণ করা সম্ভব হচ্ছে।

সার্বিক দিক থেকে একটি বিষয় পরিলক্ষিত করা যাচ্ছে যে ইউরোপের বর্ডার নিয়ে তাদের নতুন পরিকল্পনা এবং ইমিগ্রেশনের জন্য ইনোভেটিভ পরিকল্পনা। তাছাড়া অভ্যন্তরীণ সুরক্ষার ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়ন কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ অনুপ্রবেশের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের কঠোর আইন প্রয়োগ করতে যাচ্ছে।

এর আগে জার্মানিতে শরণার্থীদের আমন্ত্রণ জানিয়ে ইউরোপের শক্তিধর নেতা অ্যাঞ্জেলো মার্কেল নিজ দেশে রাজনৈতিক বিপর্যয়ে মধ্যে পড়েছিলেন এবং গত কয়েক মাসে ফ্রান্সের ঘটনার ফলে পূর্বের ন্যায় শরণার্থীদের আশ্রয় আবেদন আরও কঠিন হবে।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন jugantorporobash@gmail.com এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]
যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন