আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস

বিশ্বায়নে অভিবাসীদের গুরুত্ব অনস্বীকার্য

 ফরিদ আহমেদ পাটোয়ারী, পর্তুগাল থেকে 
১৮ ডিসেম্বর ২০২০, ০৩:৩৯ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে অভিবাসন প্রক্রিয়া চলমান, তখনকার দিনে খাদ্য সহজলভ্যতার অথবা খাদ্য অপ্রতুলতার কারণে একই স্থান থেকে বিভিন্ন গোষ্ঠী অন্যস্থানে পাড়ি জমাত, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন গুলোর অবলোকন করলে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। এর পরবর্তীতে মধ্যযুগে ধর্ম, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বিভিন্ন কারণে এই অভিবাসন প্রক্রিয়া অব্যাহত ছিল এবং বর্তমান আধুনিক যুগেও তা উত্তরোত্তর দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। 

তাই অভিবাসী ও শরণার্থীদের স্বার্থ, অধিকার রক্ষা তথা তাদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য ১৯৯৭ সালে এশিয়ান অভিবাসী কর্তৃপক্ষ ১৮ ডিসেম্বর প্রথম এই দিনটিকে আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংহতি দিবস হিসেবে উপস্থাপন করে এবং প্রতিষ্ঠার জন্য প্রচারণা চালায় করে সেই থেকে প্রতিবছর ১৮ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস হিসেবে পালন করা হয়।

অন্য দেশের অর্থনৈতিক সুযোগের সন্ধানে অনেক মানুষ তার নিজ দেশ থেকে অন্য দেশে পাড়ি জমান। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সামাজিক এবং রাজনৈতিক সুষ্ঠু পরিবেশের সন্ধানে পরিবার নিয়ে পাড়ি জমান। তাছাড়া বিদেশে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা অন্যতম কারণ অভিবাসন। 

অন্যদিকে গত তিন দশক ধরে পৃথিবীতে যুদ্ধবিগ্রহ বেড়েই চলেছে। প্রতিদিনই মানুষ আবাসস্থল হারাচ্ছে এবং হারাচ্ছে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা, উপরন্তু দেশের অনিশ্চিত রাজনৈতিক পরিবেশের কারণে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ যুদ্ধ-বিধ্বস্ত নিজ দেশ ছেড়ে উন্নত দেশে অথবা পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন দেশে শরণার্থী হিসেবে পাড়ি জমাচ্ছেন।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার হিসাব অনুযায়ী গত ২০১৯ সালে বিশ্বে ২৭ কোটি ২০ লাখ অভিবাসী অবস্থান করছে যা পুরো বিশ্বের মোট জনসংখ্যার তিন দশমিক পাঁচ শতাংশ। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি অভিবাসীদের বসবাস ইউরোপ এবং এশিয়াতে যথাক্রমে ৮ কোটি ২০ লাখ ও ৮ কোটি ৪০ লাখ।

বর্তমানে বিশ্বব্যাপী প্রায় ৮ কোটি শরণার্থী রয়েছে। তবে সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে এদের মধ্য থেকে ৩-৩.৪ কোটি শরণার্থী বয়স ১৮ বছরের নিচে। সর্বমোট শরণার্থীদের প্রায় ৪০ শতাংশ। তুর্কিতে প্রায় ৩৬ লাখ শরণার্থী বর্তমানে আশ্রয় নিয়েছে এবং বাংলাদেশে রাষ্ট্রবিহীন সর্বোচ্চ ৯ লাখ ৬ হাজার শরণার্থী অবস্থান করছে।

বিশ্বায়নের যুগে সংক্ষিপ্ত আকারে বলতে গেলে অভিবাসনের মাধ্যমে যে শুধুমাত্র অভিবাসীরা লাভবান হচ্ছেন তা কিন্তু নয়; সে দেশের উন্নত জনশক্তি দেশের অর্থনীতিকে লক্ষ্যের দিকে সচল রাখে। তাছাড়া উচ্চশিক্ষা, গবেষণা দেশের জনসংখ্যার ভারসাম্য রক্ষা, কৃষ্টি কালচারের আদান প্রদানের মাধ্যমে ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি ক্ষেত্রে অভিবাসন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে কিছু নেতিবাচক দিক রয়েছে তা খুবই নগণ্য।

বিশ্ব পরিমণ্ডলে অভিবাসন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। খুবই চমকপ্রদ একটি উদাহরণ দিলেই বোধগম্য হবে। খুব বেশিদিন আগের কথা নয়। চৌদ্দশ শতকের গোড়ার দিকে কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করেন এবং আজকের এই যুক্তরাষ্ট্র ১৭৭৬ সালে প্রতিষ্ঠা পায় এবং বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে থেকে আধুনিক ও পরাক্রমশালী রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে শুধুমাত্র ইউরোপীয় অভিবাসীদের মাধ্যমে। 

তাছাড়া কানাডা অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডে এই দেশগুলোর ইউরোপিয়ান অভিবাসীদের মাধ্যমেই সৃষ্টি হয়েছে। তবে আমেরিকাতে আফ্রিকান অভিবাসীদের সংখ্যাও ছিল ব্যাপক হারে। 

যেমন বর্তমানে এশিয়ার অন্যতম ধনী দেশ কাতারের মোট জনসংখ্যার ৭৮ দশমিক ৭ শতাংশ হচ্ছেন অভিবাসী এবং সিঙ্গাপুরের ৩৭ দশমিক ১ শতাংশ অভিবাসী। ইউরোপের মধ্যে সুইডেনে তাদের মোট জনসংখ্যা ২০ শতাংশ অভিবাসী এবং কানাডার ২১ দশমিক ২ শতাংশ অভিবাসী রয়েছে। 

যাই হোক, যেখানে শুরু করেছিলাম অভিবাসী বিশ্বায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা উপলব্ধি করে জাতিসংঘ। তাই তাদের নতুন পরিবেশে খাপ খাইয়ে ওঠা এবং আর্থসামাজিক উন্নতির জন্য ১৯৯০ সালের ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সমস্ত অভিবাসী শ্রমিকের অধিকার এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের অধিকার সংরক্ষণ সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক কনভেনশন গ্রহণ করেছিল। আর সে কারণেই বিশ্ব অভিবাসী দিবস হিসেবে ১৮ ডিসেম্বরকে বেছে নেওয়া হয়েছে।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন jugantorporobash@gmail.com এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]
যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন