সুইডেনে কাদের ক্ষমতা বেশি?

 রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে 
১৬ নভেম্বর ২০২০, ০৩:২৪ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

ছোটবেলায় বন্ধুরা মিলে দল বেঁধে চলে যেতাম সিনেমা দেখতে। স্কুলে পড়ার সময় বাংলা চলচ্চিত্র দেখেছি অনেক। পড়াশোনা করতে যখন ইউরোপে এসেছি তখন আর বাংলা নয় ইংরেজি, সুইডিশ চলচ্চিত্র দেখতে শুরু করি। কোনো এক সময় একটি রুশ চলচ্চিত্র দেখেছিলাম। যুদ্ধে রুশ দেশের প্রচুর লোক মারা যায়। সে দেশের জেনারেলকে তলব করা হলো প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে। 

প্রতিরক্ষা মন্ত্রী জানতে চাইলেন কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে এবং কী পরিমাণ সাধারণ জনগণ মারা গেছে। জেনারেল জনগণের সঠিক মৃত্যুর সংখ্যা জানাতে ব্যর্থ হন তবে কতজন সৈনিক এবং তার মধ্যে কতজন অফিসার মারা গেছে সেটা বারবার তুলে ধরেন। 

তার এ রিপোর্টের প্রেক্ষিতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বেশ ক্ষুব্ধ হন এবং শেষে জেনারেলকে চাকরিচ্যূত করেন। যতটুকু মনে পড়ে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী তখন বলেছিলেন ”soldiers are paid to die and nations are paid for their security. Mr. General, you have failed to secure the nation’s lives so please hit the road with your hat and coat.”  

যদিও সোভিয়েত ইউনিয়নে তখন চলছে এক নায়কতন্ত্রের শাসন। তা সত্বেও জনগণের জীবনের মূল্য ছিল সবার উপরে। ইদানীং বাংলাদেশে কিছু আর্মি এবং পুলিশ অফিসার কিছু দুষ্টু লোকের কবলে পড়ে নাজেহাল হয়েছে এবং মৃত্যুবরণ করেছে যা দুঃখজনক। দেশের জনগণ প্রতিনিয়ত এমন জঘন্য এবং ঘৃণ্যতম ঘটনার নিন্দা করেছে। জনগণের এরূপ মন-মানসিকতা দেখে বেশ আপ্লুত হয়েছি।
  
তবে আমি অবাক হচ্ছি যখন দেখছি এটা নিয়ে ফেসবুক বা নিউজ পেপারে বড় করে তুলে ধরা হচ্ছে দেশে আর্মি বা পুলিশের জীবনের নিরাপত্তা নেই। যেখানে জনগণের জীবনের নিরাপত্তা নেই সেখানে কোনোকিছুরই নিরাপত্তা থাকার কথা না। অথচ সেভাবে কখনও কেউ লিখছে না। জনগণের নিরাপত্তার জন্যই কিন্তু পুলিশ এবং আর্মি, সেটা সবাই ভুলে গেছে। 

আমি দেশের বাইরে যতটুকু দেখি যেমন সুইডেনে জনগণের নিরাপত্তার গুরুত্ব দেয়া হয় সবকিছুর ওপরে এবং তার জন্য প্রশাসন তাদের জীবন দিতে দ্বিধাবোধ করে না। জননিরাপত্তা সবার ওপরে হবার কথা কিন্তু সেটা হচ্ছে না আমাদের দেশে। যার ফলে দুষ্ট লোকেরা সাহস পেয়ে প্রশাসনের ওপর হামলা করতে দ্বিধাবোধ করছে না। সময় কী এখনও হয়নি এসব বিষয় নিয়ে ভাববার!

আমি দেশের বাইরে থাকি। অনেক সময় তরুণ সমাজ ফোন করে। তাদের নানা বিষয়ের ওপর জানার বেশ কৌতূহল। কয়েকদিন আগের কথা, রাত দশটা সুইডিশ সময়, আমি এ সময়ই আমার টেলিফোনের সাউন্ড বন্ধ করে দেই। বসে লিখছি, হঠাৎ সেদিন রাতে একটি ছেলে ফোন দিয়েছে বাংলাদেশ থেকে। 

কী ব্যাপার এতরাতে তুমি ফোন দিয়েছ? তোমার তো এখন ঘুমিয়ে থাকার কথা। ছেলেটি বললো ঘুম আসছে না, তাই ভাবলাম আপনাকে ফোন করে একটি বিষয় জেনে নেই। কী বিষয়? সুইডেনে কাদের ক্ষমতা বেশি জিজ্ঞেস করল। বললাম মানে? সে তার মত করে বলার পর আমি বললাম যারা অন্যায় করে না, ন্যায়ের পথে চলে তাদের ক্ষমতা বেশি। 

ছেলেটির পরের প্রশ্ন তাহলে সেখানে রাজনীতিবিদ বা তাদের ছেলে-মেয়েদের কোনো ক্ষমতা নেই? আমি বললাম রাজনীতিবিদরা সংসদ, জেলা, উপজেলার পরিকাঠামোর উন্নয়নে কাজ করে নিয়ম অনুযায়ী। কোনো রকম বেআইনি কিছু করলে বা ধরা খেলে তারাও শাস্তি থেকে রেহাই পায় না। সেক্ষেত্রে ক্ষমতা তেমন বেশি না। 

তখন সে বলতে শুরু করলো কিছু ঘটনা যেগুলো আমি জানি। তা সত্ত্বেও তার কথা শুনলাম। বললো বাংলাদেশের মন্ত্রী এবং এমপিদের ছেলে-মেয়েদের ক্ষমতা, অর্থ এবং বিলাসবহুল গাড়িবাড়ি ইত্যাদি। তার শখ যদি সে কখনও ক্ষমতাবান হয় তবে সেও তাদের মতো জীবন যাপন করবে।  

আমি মনোবিজ্ঞানী নই তবুও একটু বুঝাতে চেষ্টা করলাম আমার মতো করে। যেমন বলেছিলাম, কী ধরণের ক্ষমতা অর্জনের পিছে সময় দিবে সেটা তোমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। তবে সততা বা জ্ঞান অর্জনে যদি সময় দাও তাহলে মানুষের ভালোবাসা পাবে। আর যদি দুর্নীতি, অনীতির ক্ষমতার ওপর চর্চা কর, তবে মানুষের ঘৃণা অর্জন করবে ইত্যাদি। হয়তো তাকে বোঝাতে পেরেছিলাম সেদিন।

এখন সমস্যা হচ্ছে বর্তমান তরুণ সমাজ দেখছে কী হচ্ছে তাদের চারপাশে। তারা যা দেখছে সেভাবেই নিজেদেরকে তৈরি করছে। কথায় বলে আম গাছের তলায় আমই পড়ে। তারা যেমন দেখছে পরিবারের মধ্যে কেউ ক্ষমতার অপব্যবহার করে অন্যের বিষয়সম্পত্তি লুটপাট করে দখলে নিয়ে দিব্বি জীবন যাপন করছে। 

সমাজের কাছে নিজেকে বাহাদুর সাজিয়ে বসবাস করছে। পরের সম্পদের ওপর স্কুল-কলেজ-মসজিদ নির্মাণ করে সমাজকর্মী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। তবে নিজের প্রাচুর্য থেকে কোনোকিছুই দান খয়রাত করছে না। বলতে গেলে “পরের ধনে পোদ্দারি মিয়া বড় সর্দারি।” এখন এ ধরণের মুখোশধারী দানবদের চেহারা সমাজে তুলে ধরার সময় এসেছে। 

দুর্নীতিবাজরা কিন্তু আমাদের নিজ নিজ ঘরেরই রয়েছে। এখনই কিন্তু উপযুক্ত সময় তাদের মুখোশ খুলে দেবার। এতে করে মুখোশধারী কালপ্রিটরা সমাজের চোখে হেও প্রতিপন্ন হবে এবং শেষে দানবের চরিত্র থেকে মানবের রূপ ধারণ করবে।

আরেকটি দিক আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। দান খয়রাত নেবার সময় সবার উচিত হবে খোঁজ খবর নেয়া। কারণ অন্যের ধন সম্পদ লুট করে ভোগ দখলকারীরা অনেক সময় দান খয়রাত দিয়ে আখেরাতের পথ সহজ করার একটি উপায় খোঁজে। তারা দান খয়রাত করে মানুষের কাছে ভালো হতে চেষ্টা করে। আমাদেরকে এসব ভণ্ডদের থেকে দূরে থাকার মন মানসিকতা গড়তে হবে।  

মনে রাখতে হবে যে অপরাধী তার মধ্যে সৎ সাহসের অভাব। কারণ সে তো ক্রিমিনাল, আর ক্রিমিনালের যেমন নেই কোন ধর্ম তেমন নেই কোন মোড়াল ভ্যালু। দুর্নীতি, অসৎ চরিত্রের দানবদের সনাক্ত করে মনের দেয়ালে তাদেরকে ঝুলিয়ে রাখুন, দেখবেন নিজেকে ক্ষমতাশীল মনে হচ্ছে। 

মনে রাখতে হবে, যে অন্যকে ঠকায় সে নিজে অন্য জায়গায় ঠকে। যে অন্যকে কাঁদায়, সে নিজে অন্য জায়গায় কাঁদে, শুধু অপেক্ষা সেই সঠিক সময়ের। ব্যক্তিস্বার্থে পরিবারের বৃহত্তর স্বার্থকে ক্ষুণ্ণ করার অধিকার কাউকে দেয়া হয়নি।

বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে পরিবারের এক সদস্যের সাফল্য-ব্যর্থতা, উন্নতি-অবনতি অন্য সদস্যের সাফল্য-ব্যর্থতা, উন্নতি-অবনতির ওপর নির্ভর করে। কারণ পরিবারের সব সদস্যের সার্বিক কল্যাণকে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া হয়। 

একটি পারিবারিক রূপরেখায় পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের যেমন কিছু অধিকার রয়েছে, তেমনি কিছু দায়িত্বও রয়েছে। দায়িত্ববোধ আমাদের মনকে উদ্বুদ্ধ করে কর্মের প্রতি, জন্ম দেয় নৈতিকতার; যা গড়তে সাহায্য করে একটি কাঙ্ক্ষিত সুখী পরিবার এবং সমাজ। তাই আমি মনে করি পরিবার থেকে শুরু করতে হবে পরিবর্তন যা হতে পারে সোনার বাংলা গড়ার মূল বার্তা। 

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে, rahman.mridha@gmail.com

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন jugantorporobash@gmail.com এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]
যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম