কোয়ালিটি লাইফে পেতে দরকার যোগ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

 রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে 
১০ নভেম্বর ২০২০, ১২:৪১ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

অতীতে লিখেছি মাল্টিকালচার এবং ভেজাল নিয়ে। লিখেছি ওষুধ তৈরি থেকে শুরু করে তার ব্যবহার নিয়ে। লিখেছি অর্গানিক খাবার নিয়ে, লিখেছি শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণের ধরণ নিয়ে। লিখেছি গ্লোবালাইজেশন নিয়ে। আজ চেষ্টা করবো এসবের সমন্বয় ঘটার কারণে কী হতে পারে এবং কেস স্টাডির মাধ্যমে শেষ করবো উপসংহার। তার আগে আসুন জানি একজন ফুটপাথের ফেরিওয়ালা, এক নতুন প্রজন্মের জীবন কাহিনী এবং তার স্বপ্নের কথা। 

ছেলেটি গ্রাজুয়েশন শেষ করেছে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ওপর। পরিবারের থেকে একটি চাপ ছিল সেটা হলো যেভাবেই হোক তাকে বিসিএস পাশ করতে হবে। কয়েকবার চেষ্টা করে বিফল হয়েছে সাধনা। গত দুই বছর আগে একটি প্রাইভেট জবে ঢুকেছিল দশ হাজার টাকার বেতনে। চাকরির ফাঁকে রিফ্লেক্ট করেছে কেন তার বিসিএসে সুযোগটা আসেনি এবং যারা সুযোগ পেয়েছে তারা কারা, কী ছিল তাদের শিক্ষা আর কী করছে এখন তারা? দেখা গেল যে বেসিক শিক্ষা তারা নিয়েছে যেমন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, পদার্থবিজ্ঞান ইত্যাদির ওপর অথচ বিসিএস পাশ করে চাকরি করছে সম্পূর্ণ উল্টো। 

হয়েছে পুলিশ অফিসার বা সিভিল প্রশাসনের কর্মকর্তা। তখন সে ভাবতে শুরু করে তাহলে আমরা যা পড়েছি সেটা যদি সঠিক পদ্ধতি হতো তাহলে ডাক্তারের তো ডাক্তারি করার কথা সে কেন পুলিশ অফিসার হলো ইত্যাদি। যাইহোক তার এসব চিন্তা তাকে নতুন পথ দেখায়। সে সিদ্ধান্ত নিলো দশ হাজার টাকার চাকরি এবং কেরানির কাজ না করে বরং ব্যবসা করি। ব্যবসা করতে টাকার দরকার তাও নেই কী করা! 

শেষে ঢাকা শহরে গ্রীন রোডের এক মোড়ে সে চায়ের একটি ছোট্ট দোকান দিয়েছে। চলছে তার দিন কাল মোটামুটি। ছেলেটির দুঃখ ছোটবেলা তার যে স্বপ্ন ছিল সেটা তাকে অনুপ্রেরণা দিয়েছে সত্ত্বেও সুযোগ এবং সাহায্যের অভাবে সেটা হয়ে উঠেনি। এখন চা বিক্রির ফাঁকে ফাঁকে ভাবছে ভেজালমুক্ত খাবার কীভাবে দেশের মানুষকে সে সাপ্লাই দিবে। অতীতে যা সম্ভব হয়নি পরিবারের কারণে তা সে এখন সম্ভব করতে চায়। 

বিসিএস পাশ করে মস্ত বড় অফিসার হতে হবে এটা এখন তার মাথা থেকে দূর হয়েছে। সে এখন তার ছোটবেলার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে উঠেপড়ে লেগেছে। তার ইচ্ছা অর্গানিক খাবারের সরবরাহ বাড়িয়ে দেশের মানুষকে ভেজালযুক্ত খাবার আর ভেজালযুক্ত ওষুধ থেকে দূরে রাখবে। আমরা তার স্বপ্ন পূরণ হোক সেটাই কামনা করি।

আসুন এবার মূল কথা নিয়ে কিছু আলোচনা করি। আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় নেই কোনো দিক নির্দেশনা। সে যদি ব্যবসাই করবে কেন ছোটবেলা থেকে তাকে সেভাবে গড়ে তোলার সুযোগ করে দেওয়া হলো না? যে কাজ সে বর্তমানে করছে এর জন্য কী অনার্স বা মাস্টার্স করার প্রয়োজন ছিল? দেশের শিক্ষার মান তাহলে কোন পর্যায়ে বর্তমানে? যে অর্থ ছেলেটি খরচ করেছে লেখাপড়ার পেছনে, সেটা দিয়ে প্রথম থেকেই যদি তার স্বপ্ন পূরণে সবাই সাহায্য করতো, হয়তো সে বিল গেটস হতো না, তবে সমাজের একজন সুযোগ্য নাগরিক হয়ে দশ জনকে চাকরি দিয়ে সাহায্য করতে পারতো। 

সেইসঙ্গে বাংলাদেশের শিক্ষার মান বহির্বিশ্বের সমমানের সেটা প্রমাণ করতে পারতো এবং শিক্ষা প্রশিক্ষণে কর্মরতদের কর্মের সার্থকতার সনদপত্র তুলে ধরতে পারতো। দুঃখের বিষয় এর কোনোটাই হয়নি শুধু ব্যর্থতা ছাড়া। ছোটবেলা পড়েছি “failure is the pillar of success এখন দেখছি failure is the further pillar of failure!”
এখন প্রশ্ন হতে পারে তাহলে অর্গানিক খাবার পেলে বা খেলেই কী বর্জন করতে পারবো ভেজাল খাবার? আদৌ কী তাহলে ওষুধের দরকার হবে না? 

আসুন এবার মাল্টিকালচার এবং গ্লোবালাইজেশন নিয়ে একটু আলোচনা করি। কী হচ্ছে সেখানে আর আমরা কী জানছি বা শিখছি সেখান থেকে। বর্তমানে বিশ্বের সর্বত্রই রেফ্রিজারেটর, ফ্রিজ, হিটার ব্যবহৃত হচ্ছে খাবারকে সতেজ এবং দুষণমুক্ত রাখতে। সেটা করতে যে সমস্ত যন্ত্রপাতি বা কেমিক্যাল ব্যবহৃত হচ্ছে সেসব কেমিক্যাল বাতাসে মিশে আমাদের শরীরে শ্বাস-প্রশ্বাসের মধ্যে ঢুকে নতুন নতুন রোগের সৃষ্টি করছে। এসব রোগ থেকে রেহাই পেতে ওষুধের দরকার হয়। 

বিক্রেতাদের কাছে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি না থাকার কারণে শাক-সবজি সতেজ রাখতে বিষাক্ত কেমিক্যাল তারা ব্যবহার করছে যা আমরা শরীরে ঢুকাচ্ছি এবং ভয়ংকরভাবে অসুস্থ হচ্ছি। অর্গানিক খাবার বেশিদিন সতেজ রাখা সম্ভব নয় এবং সব সময় ফ্রেশ খাবার সব জায়গায় পাওয়াও দুষ্কর। মাল্টিকালচারকে সঠিকভাবে পুঁথিগত বিদ্যার মধ্যে এনে প্রশিক্ষণকে মজবুত করতে হবে তবেই হবে সম্ভব ডেভিয়েশন থেকে মুক্তি পাওয়া। 

অনার্স বা মাস্টার্স ডিগ্রি পাশ করে চা বিক্রি করা, খাবারে কেমিক্যাল মিশানো, রেফ্রিজারেটর বা ফ্রিজে খাবার রেখে খাওয়া, এর সবই কিন্তু ডেভিয়েশন। সেক্ষেত্রে শুধু অর্গানিক খাবার খেলেই সমস্যার সমাধান হবে না। আমরা মাল্টিকালচার বা গ্লোবালাইজড হতে যদি হুবহু পাশ্চাত্যের সব কিছু অনুকরণ বা অনুসরণ করি তবে সেটাও ঠিক হবে না। যদি মনে করি সমস্ত ডেভিয়েশনকে একত্র করে গড় করলে যে ডেভিয়েশন আসবে সেটা হবে স্ট্যান্ডার্ড ডেভিয়েশন যা হয়ত তেমন ক্ষতিকর হবে না। সেটাও যেমন ঠিক না আবার সব কিছুই বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করাও সঠিক হবে না। কারণ বিশ্বের খুব কম দেশে দেখা যাবে অনার্স বা মাস্টার্স ডিগ্রি পাশ করে কেউ চা বিক্রি করছে। 

বিশ্বের স্ট্যান্ডার্ড ডেভিয়েশন হলো একটি জনসংখ্যার জন্য বিভিন্ন মানগুলোর গড় থেকে কতটা ডেভিয়েশন হয় তার একটি পরিসংখ্যানগত পরিমাপ করা। মনে রাখতে হবে শুধু পাশ্চাত্য থেকে শিখলে বা বিল্ডিং টিম, বিল্ডিং ট্রাস্ট, বিল্ডিং গ্রোথ এসব কথা বললে হবে না এবং বই পড়ে মাল্টিকালচার বা গ্লোবালাইজেশন শিখলে হবে না। বিশ্বের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে সমস্ত দিকগুলো কমবেশি সমমানের করে গড়ে তুলতে হবে। সেক্ষেত্রে আমি মনে করি যদি দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হয় এবং যথাযথভাবে কাজ করে সেইসঙ্গে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায়, কোন অশুভ শক্তিই সেখানে স্থায়ী হতে পারবে না। উপসংহারে এটাই বলব জাগো বাংলাদেশ জাগো, সুশিক্ষা, কোয়ালিটি লাইফ এবং দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়।

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন। rahman.mridha@gmail.com

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন jugantorporobash@gmail.com এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]
যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম