এক পাখিপ্রেমিকের গল্প

 যুগান্তর ডেস্ক 
২৪ ডিসেম্বর ২০২০, ০১:৩৩ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

আমার শৈশবে ছিল পাখিপ্রেম। ছিল অনন্য ভালোবাসা। এখনও সেটি বিদ্যমান। ছিল পাখির ছানা লালন-পালনের আকাঙ্ক্ষায় দুরন্ত ছুটে চলা এগাছ থেকে ওগাছ; এডাল থেকে ওডালে। নিরন্তর ভালোবাসা এ খুঁজে ফেরা শারস পাখির ছানা আমার মনকে উদ্বেলিত করে তোলে। হৃদয়ে নাড়া দেয় আনন্দ-উন্মাদনা। 

আজ নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয় সেদিনের পথচলা– শারস পাখির ছানা ঘরে এনে সযত্বে লালন-পালন করে বড় করে তোলা। নিজেকে মানিয়ে একসময় গড়ে তোলা হয় শারস পাখির সঙ্গে সেতুবন্ধ। পাখির সেই ভালোবাসা এই যান্ত্রিক নগরীতে এসেও ভুলে না গেলেও অটুট ও বিদ্যমান। ডিজিটাল যুগে যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে চোখ পড়ে এক পাখিপ্রেমিককে নিয়ে আরেক পাখিপ্রেমিকের সচিত্র কিছু বক্তব্য। 

নেটিজেন পাখিপ্রেমিক এসএম সাফায়েত তার ফেসবুকে পাখিপ্রেমিক পুলিশ সার্জেন্ট মৃত্যুঞ্জয় বিশ্বাসকে নিয়ে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন– ‘এবার পাখিদের ঘর গড়ে দিচ্ছেন সার্জেন্ট মৃত্যুঞ্জয় বিশ্বাস’।  তিনি মৃত্যুঞ্জয়ের পাখির প্রতি মমতার একটি ভিডিও দিয়েছেন তার ফেসবুকে। 

পাখিপ্রেমিকের কথা–

জনারণ্যে যেন পাখির অভয়ারণ্য। কথাটা অবাস্তব হলেও সত্যি! সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পাখির কিচিরমিচির কলতানে মুগ্ধ প্রকৃতি। বাতাসে ভাসে শালিক, ঘুঘু আর চড়ুই রাজ্যের সব কথামালায়। কোনো বন বা পার্ক নয়; এমনকি চিড়িয়াখানাও নয়; তবু দেখা মেলে শত শত পাখির। চুয়াডাঙ্গার শহীদ হাসান চত্বর ও রেলবাজার এলাকার আশপাশের গাছ ও বৈদ্যুতিক তারে সারি সারি বসে থাকার এ দৃশ্য দেখতে প্রতিদিন ভিড় জমান দূরদূরান্ত থেকে আসা পাখিপ্রেমীরা। 

পাখিগুলোর খাবার-দাবার থেকে শুরু করে রক্ষণাবেক্ষণ করছেন সার্জেন্ট মৃত্যুঞ্জয় বিশ্বাস। তবে কোনো বিশেষ চাহিদা বা কারও সহযোগিতায় নয়। করোনাভাইরাস মহামারীর শুরুর দিকে যখন নিস্তব্ধ চারদিক, অভুক্ত পাখিরা দিগ্বিদিক, ঠিক সেই সময় তাদের ক্ষুধা নিবারণে খাবার হাতে রাস্তায় বের হন চুয়াডাঙ্গা জেলা পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের সার্জেন্ট মৃত্যুঞ্জয় বিশ্বাস। একান্তই নিজস্ব উদ্যোগে দীর্ঘ ৯ মাসেরও বেশি সময় ধরে এ ধারা অব্যাহত রেখেছেন তিনি। 

প্রকৃতির অলঙ্কার এসব পাখিকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং তাদের নিরাপদ আবাস নিশ্চিত করতে এবার এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন এই পুলিশ কর্মকর্তা। এ নিয়ে একটি স্লোগানও দিয়েছেন– ‘পুলিশের বিচরণ যেখানে, পাখিদের অভয়ারণ্য সেখানে’।

পুলিশ সুপার জাহিদুল ইসলামের সার্বিক নির্দেশনায় চুয়াডাঙ্গা জেলাজুড়ে পুলিশের পাঁচটি থানা, একটি ফাঁড়ি ও ৩০টি ক্যাম্পসহ ৩৯টি স্থাপনায় পাখিদের বিচরণ ক্ষেত্রে বসানো হচ্ছে পাখির বাসা। পাখির বাসা তৈরিতেও সৃজনশীলতা দেখিয়েছেন সার্জেন্ট মৃত্যুঞ্জয় বিশ্বাস। মাটির হাঁড়ি, কলসের সঙ্গে গাছে গাছে বাঁধছেন হাতে তৈরি বাঁশের খুপড়ি। সব মিলিয়ে তৈরি করা হচ্ছে পাঁচ হাজার পাখির বাসা। যেখানে নিরাপদ আবাসের সুযোগ পাবে ২০-২৫ হাজার পাখি। 

 

এ মুহুর্তে এমন উদ্যোগের সঙ্গে বিশেষভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে পরিযায়ী পাখিদের কথা। প্রতি বছর আমাদের দেশে প্রচুর পরিযায়ী পাখি আসে এবং শীত শেষে ফিরে যায়। শীত চলে গেলেও দেশের বিভিন্ন হাওর-বাঁওড় ও জলাশয়ে কিছু পরিযায়ী পাখি থেকে যায়। দেশীয় পাখিদের পাশাপাশি তাদেরও বসবাসের সুব্যবস্থা করা হবে।

এসএম সাফায়েতের পাখিপ্রেমিকের পাখিপ্রেম ফেসবুকে প্রকাশ হওয়ায় নেটিজেনদের মাঝে মিশ্রপ্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকেই নেতিবাচক-ইতিবাচক, কটূক্তিমূলক মন্তব্য করলেও বেশিরভাগ পাখিপ্রেমীই সাধুবাদ জানিয়েছেন। এই যেমন– 

মধু পূর্ণিমা লিখেছেন– অত্যন্ত ভালো ও মানবিক উদ্যোগ অবশ্যই। কিন্তু আরেকটি দিক সবার অলক্ষ্যে এড়িয়ে যাচ্ছে, সেটি হলো– পাখির নীড় বাঁধতে যে জিআই তার ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটি একসময় ওই গাছগুলোর মরণফাঁদ হয়ে যাবে, তখন একটি ভালো কাজ করতে আরেকটি খারাপ দিক হয়ে যাবে। গাছগুলোর যাতে ফাঁসি না হয়, সেদিকটি খেয়াল করার জন্য অনুরোধ রইল।

ইলিয়াস হোসাইন লিখেছেন– উনি এটি অনেক ভালো কাজ করেছেন; কিন্তু তার পাশাপাশি অসহায় মানুষের পাশে যদি এভাবে দাঁড়াতেন, তা হলে আরও ভালো হতো– অনেক মানুষ না খেয়ে রাস্তায় পড়ে আছে।

বকুল মিয়া লিখেছেন– ধন্যবাদ পুলিশ ভাই আপনাকে; তবে আপনি ভালো ভূমিকা নিয়েছেন বলেই আপনার গুণ গাচ্ছি।  আবার কিছু কিছু পুলিশ আছে, মানুষের কাতারে থাকে না।

গ্রন্থনা: রেজাউল করিম রাডার
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন