গুগলের কল্যাণে নাতি নিয়ে বাড়ি ফিরলেন ৬৫ সালে হারিয়ে যাওয়া মোস্তফা

 এটিএম নিজাম ও সাইদুর রহমান, কিশোরগঞ্জ ব্যুরো 
২৮ ডিসেম্বর ২০২০, ১০:৩৭ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

১৯৬৫ সালে ১০ বছর বয়সে বাবার সঙ্গে গিয়ে পার্শ্ববর্তী ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও রেলস্টেশন থেকে হারিয়ে গিয়েছিলেন গোলাম মোস্তফা। তথ্যপ্রযুক্তি ও সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে খুঁজে পেয়ে ৫৫ বছর পর স্ত্রী, সন্তান ও নাতি নিয়ে বাড়ির ঠিকানায় ফিরলেন কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার জাঙ্গালিয়া ইউনিয়নের দগদগা গ্রামের গোলাম মোস্তফা।

তাকে ফিরে পেয়ে উচ্ছ্বসিত পরিবারের স্বজনরা। শৈশবে হারিয়ে ফেলা বন্ধুকে এক নজর দেখতে ভিড় করছেন সহপাঠীরা।

জানা গেছে, ১০ বছর বয়সে বাবা আজিম উদ্দিনের হাত ধরে পার্শ্ববর্তী ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও রেলস্টেশনে গিয়ে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গিয়েছিলেন গোলাম মোস্তফা। ট্রেন ছাড়ার সময় অন্য যাত্রীদের মতো তিনিও ট্রেনে চেপে বসেন। পাবনা জেলার ঈশ্বরদী রেলস্টেশনে ট্রেনটি থামলে তিনি নেমে পড়েন। পরে পাশের একটি চায়ের দোকানের কাছে অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকেন। এ সময় সিরাজ উদ্দিন নামে এক রিকশা গ্যারেজের মালিক তাকে সেখান থেকে উদ্ধার করে নিজের বাড়িতে নিয়ে আশ্রয় দেন।

নিজ গ্রামের নাম দগদগা ছাড়া থানা, পোস্ট অফিস ও জেলার নাম বলতে না পারায় শিশু মোস্তফার স্থায়ী ঠিকানা হয়ে ওঠে ওই সিরাজ উদ্দিনের বাড়ি। সিরাজ উদ্দিন তাকে পুত্রস্নেহে লালন-পালন করতে থাকেন। এক সময় বয়স বাড়লে মোস্তফা সিরাজ উদ্দিনের রিকশা গ্যারেজের কর্মী হিসেবে যোগ দেন।

শৈশব-কৈশোর কাটিয়ে যৌবনে এসে একই এলাকার সোহাগী বেগম নামে এক মেয়ের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে সংসার জীবনে প্রবেশ করেন। ওই নতুন ঠিকানায় কেটে যাচ্ছিল গোলাম মোস্তফার দিন। এভাবেই কেটে গেছে দীর্ঘ ৫৫ বছর।

ইতোমধ্যে তার ঘর আলো করে জন্ম নেয় দুই পুত্র ও এক কন্যাসন্তান। তাদের লেখাপড়া করিয়ে উচ্চশিক্ষিত হিসেবে গড়ে তুলেন। সুখেই কাটছিল তার দিনকাল।

এদিকে প্রাণপ্রিয় বড় সন্তানকে হারিয়ে শোকে কাতর বাবা আজিম উদ্দিন ও মা চোখের জলে বুক ভাসাতে ভাসাতে ইতোমধ্যেই পাড়ি জমিয়েছেন না ফেরার দেশে। কিন্তু ষাটোর্ধ বয়সের মোস্তফা কোনোমতেই মা-বাবা, ভাই, প্রিয় জন্মভূমি দগদগা ও শৈশবের খেলার সাথীদের স্মৃতি ভুলতে পারছিলেন না।
মনের গহীনের সেই কষ্ট প্রতি মুহূর্ত তাকে যন্ত্রণা দিত। কয়েক বছর আগে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে প্যারালাইজড হয়ে পড়েন মোস্তফা। গত চার মাস আগে তিনি কিছুটা সুস্থ বোধ করলে স্ত্রী-সন্তানকে ডেকে শোনালেন শৈশবে হারিয়ে ঈশ্বরদীতে আসার কাহিনী। জানান প্রিয় জন্মভূমি দগদগা গ্রামের নাম।

আর এ ঘটনা জেনে মাস্টার্স পাস চাকরিজীবী বড় ছেলে সজীব আহমেদ গুগলে দগদগা গ্রাম লিখে সার্চ দিয়ে বের করলেন পিতার প্রিয় জন্মভূমি গ্রামের বাড়ি। তথ্যপ্রযুক্তি ও সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে ৫৫ বছর পর গত শুক্রবার স্ত্রী-সন্তান ও নাতি নিয়ে কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার জাঙ্গালিয়া ইউনিয়নের দগদগা গ্রামের নিজ বাড়ির ঠিকানায় ফিরে এলেন গোলাম মোস্তফা।

শৈশবের বন্ধু দগদগা গ্রামের আকবর আলী জানান, মুক্তিযুদ্ধের বেশ কয়েক বছর আগে গোলাম মোস্তফা বাবার সঙ্গে ব্রহ্মপুত্র নদী পার হয়ে পার্শ্ববর্তী ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও রেলস্টেশনে গিয়ে হারিয়ে গিয়েছিলেন। আমরা বন্ধুরা এ খবর শুনে খুব দুঃখ পেয়েছিলাম। আজ দীর্ঘ ৫৫ বছর পর আমাদের বন্ধু ফিরে আসায় আমরা খুবই খুশি হয়েছি।

দগদগা বাজারের ব্যবসায়ী এবং হোসেনপুর গার্লস হাইস্কুলের শিক্ষক মো. সফিকুল ইসলাম জানান, গোলাম মোস্তফার বড় ছেলে সজীব গুগলে সার্চ দিয়ে দগদগা বাজারের এবং আমাদের মোবাইল ফোন নাম্বার পেয়ে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সে ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারে ছবি পাঠালে গ্রামবাসীকে দেখিয়ে তার বাবা গোলাম মোস্তফার বাড়ি ও ছোটভাই মাওলানা আওয়ালের সন্ধান পাই।

মোস্তফার ছোটভাই আবদুল আওয়াল বললেন, আমার হারিয়ে যাওয়া বড়ভাইয়ের শোকে চোখের জলে বুক ভাসাতে ভাসাতে মা-বাবা দীর্ঘদিন আগে ইন্তেকাল করেছেন। আজ হারানো বড়ভাইকে পেয়ে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছি।

পাকুন্দিয়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলাম রেনু বলেন, এ যেন এক রূপকথার গল্প। তথ্যপ্রযুক্তি ও সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে ৫৫ বছর পর হারিয়ে যাওয়া মোস্তফা স্ত্রী-সন্তান ও নাতি নিয়ে বাড়ি ফিরে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন