বরিশালে ন্যায্যমূল্যের চাল-আটায় উৎকোচের থাবা

 বরিশাল ব্যুরো  
২১ ডিসেম্বর ২০২০, ০৭:০৮ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

বরিশালে হতদরিদ্র পরিবারের মাঝে স্বল্পমূল্যে বিশেষ খাদ্য কর্মসূচি বাস্তবায়নে হয়রানি ও জুলুমের শিকার হচ্ছেন ডিলাররা। কর্মসূচির অংশ হিসেবে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় চাল ও আটা বরাদ্দের বিনিময়ে খাদ্য অধিদফতরের কতিপয় কর্মকর্তা ডিলারদের কাছে উৎকোচ দাবি করছেন।

অন্যথায় এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় স্থানান্তর করে হয়রানি করা হচ্ছে ডিলারদের। উৎকোচ না দিলে পণ্য সরবরাহও বন্ধ করে দিচ্ছে। ফলে নগরীতে ন্যায্যমূল্যে চাল আটা বিক্রি কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে। এসব অভিযোগে ডিলাররা গত রোববার বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার ড. অমিতাব সরকার বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। একই অভিযোগে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ও অধিদফতরটির মহাপরিচালক বরাবর চিঠি দিয়েছেন।

লিখিত অভিযোগে ডিলাররা উল্লেখ করেছেন, তারা আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের হয়রানি, জুলুম ও অনিয়মের শিকার। খাদ্য পরিদর্শক মৌসুমি আক্তার আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক ফারুক হোসেনের প্রধান দালাল। তিনি আঞ্চলিক কর্মকর্তার নামে ডিলারদের কাছে ৫০ হাজার টাকা করে ঘুষ দাবি করেন। কিন্তু এই টাকা দিতে হলে পণ্য চুরি করে জনগণকে বঞ্চিত করতে হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বরিশাল নগরীর কালুশাহ সড়কে রয়েছে ২ জন ডিলার। কিন্তু পার্শ্ববর্তী নিউ সার্কুলার রোডের দুটি বৃহৎ এলাকায় কোনো ডিলার স্বল্পমূল্যে চাল-আটা কিনতে পারছেন না। নগরীর ১০নং ওয়ার্ডে কয়েক হাজার হতদরিদ্র পরিবার বাস করেন। খাদ্য অধিদফতরের চাল-আটা বিক্রি করতে এ ওয়ার্ডে ২ জন ডিলার আছেন। খাদ্য অধিদফতর ২ জনেরই সরবরাহ বন্ধ করে দেয়ায় কয়েক হাজার পরিবার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ১২নং ওয়ার্ডে সচ্ছলদের বসবাসের সংখ্যা বেশি থাকলেও সেখানে ২ জন ডিলার। হতদরিদ্রদের বড় আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত রসুলপুর ও হাটখোলা বস্তি। ৯নং ওয়ার্ডভুক্ত এলাকায় চাল-আটা বিক্রি বন্ধ প্রায় দুই মাস।

এসবের কারণ জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট ডিলাররা বলেন, তারা বরিশাল আঞ্চলিক খাদ্য কর্মকর্তা ফারুক হোসেনের ঘুষ বাণিজ্যের শিকার। তার চাহিদামতো ঘুষ দিতে না পারায় নানা অজুহাত দেখিয়ে তাদেরসহ নগরীর বেশিরভাগ ডিলারের চাল-আটা বন্ধ করে দিয়েছেন।

ডিলাররা বলেন, খাদ্য কর্মকর্তার খামখেয়ালিতে তারা যেমন ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অপরদিকে স্বল্প আয়ের মানুষেরা বঞ্চিত হচ্ছেন ন্যায্যমূল্যে চাল-আটা ক্রয়ের সুবিধা থেকে। এর প্রতিকার চেয়ে ডিলাররা খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব, মহাপরিচালক এবং বরিশাল বিভাগীয় কমিশনারকে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

জানতে চাইলে আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক ফারুক হোসেন বলেন, বরিশাল নগরীতে ৩০টি ওয়ার্ডের জন্য ডিলার আছেন ১৯ জন। প্রতিদিন বরাদ্দ পান ৭ জন করে। নগরীর সব এলাকার মানুষকে যেন এ সুবিধার আওতায় আনা যায়, সেজন্য বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বাধীন একটি কমিটি ডিলারদের এলাকা বণ্টন করে দিয়েছেন। অনেক ডিলার দোকানঘর না পাওয়ার অজুহাত দেখিয়ে অন্য এলাকায় যেতে চাচ্ছেন না। আবার অনেকের বিরুদ্ধে কালোবাজারে পণ্য বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। এসব কারণে কয়েকজন ডিলারের সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।

খাদ্য কর্মকর্তা বলেন, ডিলাররা তাদের অনিয়ম ধামাচাপা দিতেই ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ করছেন।

তবে ১০নং ওয়ার্ডের ডিলার মিজানুর রহমান বলেন, তাকে ১০নং ওয়ার্ড ছেড়ে ১নং ওয়ার্ডে যেতে বলেছেন আঞ্চলিক কর্মকর্তা। রাজি না হওয়ায় তার সরবরাহ বন্ধ রয়েছে তিন মাস।

ওই ওয়ার্ডের আরেক ডিলার আলমগীর হোসেন বলেন, তার ডিলার ঘর ভাটাখালে। তাকে চাঁদমারী এলাকায় গিয়ে বড় ঘর নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। তারও দুই মাস আগে সরবরাহ বন্ধ করে দেয়া হয়।

নগরীর ৯নং ওয়ার্ডের ডিলার শেখ মাসুদ রানা বলেন, তার দোকানঘর হচ্ছে বরিশাল নগরীর প্রধান চালের মোকাম ফরিয়াপট্টিতে। তাকে পোর্ট রোডে ঘর নেয়ার নির্দেশ দিয়ে সরবরাহ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

১৯নং ওয়ার্ডের ডিলার সায়েম বলেন, আঞ্চলিক কর্মকর্তার নতুন নিয়ম সরবরাহ কমিয়ে দেয়া হয়েছে। আবার তাদের চাপ দেয়া হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক এলাকায় দোকানঘর নেয়ার জন্য। লোকসানের মুখে থাকায় তাদের পক্ষে এ সিদ্ধান্ত মানা সম্ভব না।

এসব বিষয়ে বরিশাল আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক ফারুক হোসেন বলেন, বরিশাল বিভাগীয় শহর হলেও কেন্দ্র থেকে সরবরাহ চাল-আটার বরাদ্দ অনেক কম। এজন্য ডিলারদের চাহিদামতো সরবরাহ দিতে পারছেন না। বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য কেন্দ্রে চিঠি চালাচালি চলছে।

তিনি বলেন, কালোবাজারে মাল বিক্রির অভিযোগে ডিলার আলমগীরকে ৮ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। ডিলার রানা যে স্থানে পণ্য বিক্রি করছেন সেখানে ক্রেতা যায় না। তাই তাকে অন্য স্থানে দোকান বসাতে বলা হয়েছে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন