শজিমেকে ইন্টার্নদের হাতে মুক্তিযোদ্ধার হৃদরোগী স্ত্রীসহ সদস্যরা লাঞ্ছিত

 বগুড়া ব্যুরো 
১৯ জানুয়ারি ২০২০, ০৭:৪৪ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা হেলাল উদ্দিন
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা হেলাল উদ্দিন

বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগে মুক্তিযোদ্ধা, তার হৃদরোগী স্ত্রী, সন্তান ও স্বজনদের মারপিটকারী ইন্টার্নদের বিচার দাবি করা হয়েছে।

শহরের ফুলবাড়ি দক্ষিণপাড়ার বীর মুক্তিযোদ্ধা হেলাল উদ্দিন রোববার দুপুরে বগুড়া প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন থেকে এ দাবি করেন।

তিনি এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। হামলাকারী ইন্টার্নদের বিরুদ্ধে থানায় মামলার প্রস্তুতি চলছে বলেও তিনি জানান।

এ দিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ উপ-পরিচালক ডা. মুছা আল মানছুরের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। এ কমিটি তিন কর্মদিবসের মধ্যে পরিচালকের কাছে রিপোর্ট দিবেন।

মুক্তিযোদ্ধা হেলাল উদ্দিন লিখিত বক্তব্যে বলেন, তার স্ত্রী মাজেদা ইয়াসমিন জ্যোস্না (৫৫) বুকে ব্যথা অনুভব করলে ১৭ জানুয়ারি সকাল ৭টায় তাকে শজিমেক হাসপাতালে কার্ডিওলজি বিভাগে ভর্তি করা হয়। তাকে সিসিইউতে রাখা হয়েছিল।

শনিবার বিকাল ৩টার দিকে মেয়ে মাসুমা আক্তার ও শ্যালক জাহিদুর রহমান রোগীর সঙ্গে দেখা করতে হাসপাতালে যান। তখন দুই ইন্টার্ন চিকিৎসক রোগীকে বেড ছেড়ে ফ্লোরে যাওয়ার কথা বলেন। তখন মেয়ে ফোনে বিষয়টি তাকে অবহিত করেন। বিকাল ৪টার দিকে তিনি হাসপাতালের ওই বিভাগে গিয়ে নিজের মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় দেন। তিনি রোগী সুস্থ হলে নিয়ে যাওয়ার কথা জানান। এ ছাড়া তিনি সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসায় কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে সে সম্পর্কে ইন্টার্নদের অবগত করেন। তার শ্যালক জাহিদুর রহমান বেড ছেড়ে না দেয়ার কথা বলেন।

তিনি জানান, তখন একজন ইন্টার্ন চিকিৎসক ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে মারতে উদ্যত হন। মুক্তিযোদ্ধা এমন ব্যবহার না করতে ইন্টার্নদের অনুরোধ করলে উভয়পক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে ওই ইন্টার্ন চিকিৎসক গ্রিলের দরজার বন্ধ করে মোবাইল ফোনে ১০-১২ জনকে ডেকে আনেন।

ওই ইন্টার্ন নির্দেশ দিয়ে বলেন, বুড়াকে মার। তখন অন্য ইন্টার্ন চিকিৎসকরা মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় জানার পরও তার মাথা ও বুকে আঘাত করেন। রোগী মাজেদা ইয়াসমিন জ্যোস্না বেড থেকে নেমে এসে ইন্টার্নদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেন। এতে ইন্টার্নরা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে জ্যোস্না ও তার ভাই জাহিদুর রহমানকে মারপিট করতে থাকেন। জ্যোস্নার হাতে থাকা ক্যাথেটার ছিঁড়ে ফেলা হয়।

মুক্তিযোদ্ধার মেয়ে মাসুমা আক্তার তার ফোনে এ হামলার দৃশ্য ভিডিও করেন। ইন্টার্নরা টের পেয়ে মাসুমাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজের পর ফোনটি কেড়ে নেন ও ভিডিও ডিলিট করেন। পরে সিলিমপুর মেডিকেল ফাঁড়ির পুলিশের সহযোগিতায় ফোন ফেরত দেয়া যায়।

এ দিকে বাবা, অসুস্থ মা, বোন ও মামাকে মারপিটের খবর পেয়ে মুক্তিযোদ্ধার ছেলে মাজেদুর রহমান ও মোকসেদুর রহমান ঘটনাস্থলে আসেন। ইন্টার্নরা আবার সবাইকে মারপিট শুরু করেন।

মাজেদুর রহমান পুলিশের সহযোগিতা চাইলে পুলিশ তাদের নিজেদের বাঁচানোর চেষ্টা করতে বলে। ব্যর্থ হয়ে পুলিশ সেখান থেকে চলে যায়। ছেলেরা মাকে বাঁচাতে তাকে বেডে নেয়ার চেষ্টা করলে ইন্টার্নরা বাধা দেন। তখন দরজার গ্লাস ভেঙে রোগী জ্যোস্নার পায়ে পড়ে কেটে যায়। এতে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। এ সময় মুক্তিযোদ্ধার ছোট ছেলে মোকসেদুর রহমানকে ইন্টার্নরা বেধড়ক মারপিট করেন।

মুক্তিযোদ্ধা হেলাল উদ্দিন আরও  জানান, সদর থানা পুলিশকে অবহিত করার পর রোগী ও পরিবারের সবাইকে নিয়ে হাসপাতাল ত্যাগ করেন। পরে শহরের একটি ক্লিনিকে সবাই প্রাথমিক চিকিৎসা নেন।

মারপিটের শিকার হৃদরোগী জ্যোস্না জানান, ইন্টার্নরা তাদের দুই দফা মারপিট করেছেন। তাদের ছাড়পত্র দিয়ে হাসপাতাল ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। পুলিশ তাদের রক্ষার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। ইন্টার্নরা পুলিশের সঙ্গেও দুর্ব্যবহার করেছেন।

মুক্তিযোদ্ধা পরিবার এ ব্যাপারে তদন্তসাপেক্ষে ওই হামলার সঙ্গে জড়িত ইন্টার্নদের শনাক্ত ও তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের ব্যাপারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

বগুড়া ছিলিমপুর মেডিকেল ফাঁড়ির এএসআই  আবদুল কুদ্দুস জানান, মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী হৃদরোগীকে নিচে না নিতে অনুরোধ করায় হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসকরা রোগী ও তার সন্তানদের মারপিট করেন। ইন্টার্নরা নিজেরা রুমের কাচ ভেঙে রোগীর স্বজনদের দায়ী করেন। তাদের মারপিটে রোগী ও তার ৩-৪ জন স্বজন আহত হয়েছেন। এমন কি রোগীর ক্যাথেটারও ছিঁড়ে ফেলা হয়।

অভিযোগ প্রসঙ্গে বগুড়া শজিমেক হাসপাতালের কোনো ইন্টার্ন চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. আবদুল ওয়াদুদ জানান, সুস্থ রোগীকে কার্ডিওলোজি বিভাগ থেকে অবজারভেশন ওয়ার্ডে স্থানান্তর নিয়ে রোগীর স্বজনদের সঙ্গে ইন্টার্নদের বাকবিতণ্ডা ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে। তখন রোগীর একজন স্বজন মাস্তানি করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। রোগী ও তার লোকজনকে হাসপাতাল থেকে বের করে দেয়া হয়নি। রোগী সুস্থ থাকায় তারা স্বেচ্ছায় ছাড়পত্র নিয়ে চলে গেছেন।

তিনি আরও  জানান, এ ঘটনার প্রেক্ষিতে হাসপাতালের পরিচালক উপ-পরিচালক ডা. মুছা আল মানছুরের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। তিন কর্মদিবসের মধ্যে এ কমিটি পরিচালকের কাছে রিপোর্ট দিবেন।

এ ছাড়া হাসপাতালের পরিচালক এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ ঘটনার জন্য রোগীর পরিবারকে দায়ী করেছেন। তিনি সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন ও সাংবাদিকদের বিভ্রান্তিকর সংবাদ পরিবেশন না করতে বলেছেন।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন