ভাঙনের শব্দ শুনি
jugantor
ভাঙনের শব্দ শুনি

  ড. হারুন রশীদ  

২৯ ডিসেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ভাঙনের শব্দ শুনি, আর যেন শব্দ নেই কোনও,

মাথার ভেতর যেন অবিরল ভেঙে পড়ে পাড়।

করাত কলের শব্দে জেগে উঠি স্নায়ুতে শিরায়

টের পাই বৃক্ষ হত্যা সারারাত রক্তের ভেতর।

কেন এত বৃক্ষহত্যা, এত ভাঙনের শব্দ কেন?

আর কোনও ধ্বনি নেই পৃথিবীতে, ব্রহ্মাণ্ডে, নিখিলে?

কোথায় ভাঙছে এত? কোনখানে? নাকি নিজেরই

গভীর মহলে আজ বিশ্বাসের গোপন ভাঙন!

- রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ

চারদিকে ভাঙনের শব্দ শোনা যাচ্ছে। এ করোনা মহামারীকালে ভাঙন যেন আরও ব্যাপক এবং সর্ববিস্তারি হয়েছে। প্রাণঘাতী ভাইরাস কেড়ে নিচ্ছে লাখ লাখ প্রাণ। আক্রান্ত হচ্ছে আরও বেশি। ভেঙে পড়ছে স্বাস্থ্যব্যবস্থা। অর্থনৈতিক বিপর্যয় গোটা বিশ্বে।

শীতের হিমেল হাওয়ায় জনজীবন এমনিতেই স্থবির। তার ওপর যেন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে এসেছে করোনা। শীতে দ্বিতীয় ঢেউয়ের কথা শোনা গেলেও এখন নতুন করে জানা যাচ্ছে ভয়ানক তথ্য। করোনা নতুন রূপ নিয়েছে। হয়েছে আরও শক্তিশালী, প্রাণঘাতী। যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের দেশগুলো তটস্থ। বিমান যোগাযোগ আবারও বন্ধ হওয়ার উপক্রম। ভ্যাকসিন আসি আসি করেও আসছে না। এলেও সেটা কতটা সবার জন্য উন্মুক্ত, সেটি নিয়ে সংশয় রয়েই যাচ্ছে।

করোনার প্রভাব পড়ছে আর্থসামাজিক সব ক্ষেত্রেই। ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির। পেশা হারিয়ে আয় রোজগার বন্ধ হয়ে গেছে অনেকের। চাকরির বাজারেও মন্দা। এখনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। এইচএসসির মতো বড় পাবলিক পরীক্ষাও নেয়া সম্ভব হয়নি। অটোপাস দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এমন অবস্থার কথা কেউ কখনও চিন্তাও করতে পারেনি।

হতাশা আর দ্বিধা নিয়ে মানুষজন টিকে আছে। সংসারে অশান্তি। ভাঙছে পরিবার। এমনিতেই পণ্য সভ্যতা আমাদের ভাঙন শেখায়। মধ্যবিত্তের একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে এখন একক পরিবার হচ্ছে। দু’জন মানুষ একটি পরিবার। আলাদা সংসার মানে আলাদা টিভি, ফ্রিজ, এসি, আসবাব। ফলে বিক্রি বেশি করপোরেটের।

ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবোধের কারণেও এখন একক পরিবারের সংখ্যা বাড়ছে। পিতা-মাতা যেন কাবাবের হাড্ডি। সংসারের সবচেয়ে অপ্রয়োজনীয় বস্তু। তাই তাদের আশ্রয় বৃদ্ধাশ্রমে। যে পিতা-মাতা একসময় সন্তানের ভরসাস্থল, সেই পিতা-মাতাকেই কিনা বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় নিতে হয়। একবিংশ শতাব্দীতে এসে এও এক নিষ্ঠুর অমানবিক বাস্তবতা। বিশেষ করে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ব্যবস্থায়; যেখানে পিতা-মাতা, ভাইবোন, সন্তানসন্ততি মিলে যৌথ পরিবারে সবাই মিলেমিশে বাস করে, সেখানে পিতা-মাতার বয়স হলেই বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেয়া হবে- এ কেমন কথা!

মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যে পিতা-মাতা সন্তানদের মানুষ করেন, তারাই কিনা বড় হয়ে পিতা-মাতাকে ছুড়ে ফেলেন নিরুপদ্রব এবং স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনযাপনের আশায়। তখন এসব পিতা-মাতার দুঃখের কোনো অন্ত থাকে না। প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে একদিন সবাই বৃদ্ধ হবেন। আজ যে টগবগে তরুণ, বয়সের ভারে সেও একসময় ন্যুব্জ হবে। কিন্তু নির্মম পরিহাস হচ্ছে, এ কথাটি কেউ মনে রাখে না। আজ বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে যে সন্তান বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দিচ্ছে, কাল সেও যে তার সন্তান দ্বারা একই আচরণের শিকার হবে না; তার কি কোনো নিশ্চয়তা আছে?

প্রবীণরা তাদের সমগ্র কর্মময় জীবন নিজ নিজ পরিবার গঠনে ও উন্নয়নে এবং সমাজ-জাতির সার্বিক কল্যাণে ব্যয় করে বার্ধক্যে উপনীত হন। কিন্তু এ সমাজ তাদের কথা মনে রাখে না। ফলে শেষ বয়সে তাদের আশ্রয় হয় বৃদ্ধাশ্রমে। স্বাভাবিক নিয়মেই সন্তানসন্ততিরা তাদের পিতা-মাতার ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করার কথা। বাঙালি একান্নবর্তী পরিবারের সংস্কৃতি এটাই। কিন্তু সময়ের অভিঘাতে পাল্টে যাচ্ছে সমাজব্যবস্থা। সেই সঙ্গে পাল্টে যাচ্ছে মূল্যবোধও।

নানা বাস্তবিক কারণে একান্নবর্তী পরিবারগুলো ভেঙে যাচ্ছে। তাই পিতা-মাতার স্থান হচ্ছে না সেখানে। অনেক পরিবারেই পিতা-মাতার ভরণপোষণকে কেন্দ্র করে স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়াবিবাদ লেগেই আছে। এ কারণেই ঝুট-ঝামেলা এড়াতে পিতা-মাতাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু সেখানে তাদের জীবন কীভাবে কাটে, সে ব্যাপারে খোঁজখবর নেয়াটাও অনেকে প্রয়োজন মনে করে না। এ নিষ্ঠুর অমানবিকতা মনুষ্যত্বের পরিচয় বহন করে না। এছাড়া আমাদের ধর্মীয় মূল্যবোধও তা সমর্থন করে না।

সবচেয়ে আশঙ্কার যে খবর সেটি হচ্ছে, করোনার এ সময়ে রাজধানীতে তালাক বা বিবাহবিচ্ছেদ বেড়ে গেছে। একটি দৈনিকের এ সংক্রান্ত রিপোর্ট বলছে, এ বছরের জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত পাঁচ মাসে ঢাকায় দৈনিক ৩৯টি তালাকের ঘটনা ঘটেছে; অর্থাৎ প্রতি ৩৭ মিনিটে একটি তালাক হয়েছে এবং এ বিবাহ বিচ্ছেদের ৭০ শতাংশই এসেছে স্ত্রীর দিক থেকে।

চলতি বছরের জুন থেকে অক্টোবরে তালাক হয়েছে ৫ হাজার ৯৭০টি। এর মধ্যে উত্তর সিটি করপোরেশনে ২ হাজার ৭০৬টি আর দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ৩ হাজার ২৬৪টি তালাক হয়েছে। এ সময়ে প্রতি মাসে গড়ে ১ হাজার ১৯৪টি তালাকের ঘটনা ঘটেছে। আর ২০১৯ সালে প্রতিমাসে গড়ে তালাক হয়েছিল ৯২০টি। চলতি বছরের ৫ মাসে তালাক বেড়েছে ২৯ দশমিক ৭৮ শতাংশ।

আবেদনগুলোতে তালাকের কারণ হিসেবে প্রায় সবই ছিল স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ‘বনিবনা’ না হওয়া। স্ত্রীর করা আবেদনে কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে ভরণপোষণ না দেয়া, যৌতুকের দাবিতে নির্যাতন, স্বামীর সন্দেহবাতিক মনোভাব, অন্য নারীর সঙ্গে সম্পর্ক, মাদকাসক্ত, পুরুষত্বহীনতা, ব্যক্তিত্বের সংঘাত। আর স্বামীদের আবেদনে স্ত্রীর বদমেজাজ, সংসারের প্রতি উদাসীনতা, সন্তান না হওয়া, অবাধ্য হওয়া, ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী না চলাসহ বিভিন্ন কারণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

বিবাহবিচ্ছেদ বেড়ে যাওয়ার পেছনে করোনার কারণের তৈরি হওয়া মানসিক, আর্থিকসহ নানামুখী চাপের পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন এবং যোগাযোগ কমে যাওয়াকে অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন সমাজবিজ্ঞানীরা। বাস্তবতা হচ্ছে, করোনার মতো মহামারী সাম্প্রতিক সময়ে আর আসেনি। এ প্রাণঘাতী ভাইরাস (কোভিড-১৯) মানুষের জীবন কেড়ে নিচ্ছে।

তৈরি করছে নানামুখী চাপ। একদিকে কর্মসংস্থান হারিয়ে মানুষের আয় কমছে, অন্যদিকে চিকিৎসাসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে। মাস্ক, হ্যান্ডওয়াশ, স্যানিটাইজার, সাবানসহ এমন সব জিনিসপত্র কিনতে হচ্ছে, যা অন্য সময়ে কিনতে হতো না। কিনলেও সংখ্যায় বা পরিমাণে কম কিনতে হতো। করোনার ওষুধের দামও অনেক। আর চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে ভর্তি হতে হলে তো কথাই নেই। আইসিইউতে ৮ লাখ টাকা বিল দিয়েও প্রাণ বাঁচানো যায়নি- এমন মর্মন্তুদ ঘটনাও আছে।

স্বাভাবিক কারণেই মানসিক চাপ বেড়েছে। জীবন এবং জীবিকার প্রশ্নে টিকে থাকার সংগ্রামে ব্যস্ত মানুষজন। অনেকেই শহর ছেড়ে দিয়েছেন। কবে ফিরতে পারবেন নেই সেই নিশ্চয়তা। গ্রামে গিয়েও স্বস্তি নেই। নেই রোজগারের উপায়। তাছাড়া করোনার থাবা তো সর্বত্রই। এ অবস্থায় পরিবারগুলো ভাঙনের মুখে পড়ছে। অর্থনৈতিক টানাপোড়েন অনেক সময় বড় অশান্তির কারণ হয়; করোনাকালে যা বেশি করে অনুভূত হচ্ছে।

শুধু কি সংসার ভাঙছে? ভাঙনের শব্দ যেন সর্বত্র। দল ভাঙছে। প্রযুক্তির আঘাত আসছে। প্রেম ভাঙছে। আস্থা-বিশ্বাস মূল্যবোধ হারাচ্ছে মানুষ। নীতি-নৈতিকতার বালাই নেই। মানবিক অবক্ষয় দেখা দিচ্ছে। মাদকের করাল গ্রাসে তারুণ্য। সাম্প্রদায়িকতার উত্থান। ভাস্কর্য-মূর্তি বিতর্কে উত্তপ্ত রাজনীতির মাঠ। ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার বিপজ্জনক পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে। বৈষম্য বাড়ছে। বাড়ছে দুর্নীতি। একজনের কানাডায় অট্টালিকা তো অন্যজনের মাথা গোজার ঠাঁই নেই। বেকারত্ব পাহাড়সমান। চাকরি প্রার্থীর হাহাকার বাড়ছে। বিপুল কর্মস্থানের সুযোগ করেও সামাল দেয়া যাচ্ছে না।

তবুও আশায় বুক বাঁধতে হবে। চলছে মহান বিজয়ের মাস ডিসেম্বর। এ মাসেই আমরা পেয়েছি লাখো প্রাণের বিনিময়ে আমাদের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের গড় আয়ু বেড়েছে। কমেছে মাতৃমৃত্যু এবং শিশু মৃত্যুর হার। বাড়ছে মাথাপিছু আয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ এখন ৪১ বিলিয়ন বা ৪ হাজার ১০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। এ মাসেরই আরেক অর্জন নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু। এ সেতু আমাদের সাহস বাড়িয়ে দিয়েছে। আমরাও পারি- বিশ্বের বুকে সেটি প্রমাণ করে দিয়েছে। নিখাদ দেশপ্রেম আর দৃঢ় সংকল্প নেতৃত্বের সাহসের প্রতীক যেন পদ্মা সেতু। এ ইতিবাচকতা ছড়িয়ে দিতে হবে সর্বত্র। আর তখনই এর প্রভাব পড়বে আর্থসামাজিক, পারিবারিক সব ক্ষেত্রে।

 

ড. হারুন রশীদ : সাংবাদিক

harun_press@yaqhoo.com

 

ভাঙনের শব্দ শুনি

 ড. হারুন রশীদ 
২৯ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ভাঙনের শব্দ শুনি, আর যেন শব্দ নেই কোনও,

মাথার ভেতর যেন অবিরল ভেঙে পড়ে পাড়।

করাত কলের শব্দে জেগে উঠি স্নায়ুতে শিরায়

টের পাই বৃক্ষ হত্যা সারারাত রক্তের ভেতর।

কেন এত বৃক্ষহত্যা, এত ভাঙনের শব্দ কেন?

আর কোনও ধ্বনি নেই পৃথিবীতে, ব্রহ্মাণ্ডে, নিখিলে?

কোথায় ভাঙছে এত? কোনখানে? নাকি নিজেরই

গভীর মহলে আজ বিশ্বাসের গোপন ভাঙন!

- রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ

চারদিকে ভাঙনের শব্দ শোনা যাচ্ছে। এ করোনা মহামারীকালে ভাঙন যেন আরও ব্যাপক এবং সর্ববিস্তারি হয়েছে। প্রাণঘাতী ভাইরাস কেড়ে নিচ্ছে লাখ লাখ প্রাণ। আক্রান্ত হচ্ছে আরও বেশি। ভেঙে পড়ছে স্বাস্থ্যব্যবস্থা। অর্থনৈতিক বিপর্যয় গোটা বিশ্বে।

শীতের হিমেল হাওয়ায় জনজীবন এমনিতেই স্থবির। তার ওপর যেন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে এসেছে করোনা। শীতে দ্বিতীয় ঢেউয়ের কথা শোনা গেলেও এখন নতুন করে জানা যাচ্ছে ভয়ানক তথ্য। করোনা নতুন রূপ নিয়েছে। হয়েছে আরও শক্তিশালী, প্রাণঘাতী। যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের দেশগুলো তটস্থ। বিমান যোগাযোগ আবারও বন্ধ হওয়ার উপক্রম। ভ্যাকসিন আসি আসি করেও আসছে না। এলেও সেটা কতটা সবার জন্য উন্মুক্ত, সেটি নিয়ে সংশয় রয়েই যাচ্ছে।

করোনার প্রভাব পড়ছে আর্থসামাজিক সব ক্ষেত্রেই। ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির। পেশা হারিয়ে আয় রোজগার বন্ধ হয়ে গেছে অনেকের। চাকরির বাজারেও মন্দা। এখনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। এইচএসসির মতো বড় পাবলিক পরীক্ষাও নেয়া সম্ভব হয়নি। অটোপাস দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এমন অবস্থার কথা কেউ কখনও চিন্তাও করতে পারেনি।

হতাশা আর দ্বিধা নিয়ে মানুষজন টিকে আছে। সংসারে অশান্তি। ভাঙছে পরিবার। এমনিতেই পণ্য সভ্যতা আমাদের ভাঙন শেখায়। মধ্যবিত্তের একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে এখন একক পরিবার হচ্ছে। দু’জন মানুষ একটি পরিবার। আলাদা সংসার মানে আলাদা টিভি, ফ্রিজ, এসি, আসবাব। ফলে বিক্রি বেশি করপোরেটের।

ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবোধের কারণেও এখন একক পরিবারের সংখ্যা বাড়ছে। পিতা-মাতা যেন কাবাবের হাড্ডি। সংসারের সবচেয়ে অপ্রয়োজনীয় বস্তু। তাই তাদের আশ্রয় বৃদ্ধাশ্রমে। যে পিতা-মাতা একসময় সন্তানের ভরসাস্থল, সেই পিতা-মাতাকেই কিনা বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় নিতে হয়। একবিংশ শতাব্দীতে এসে এও এক নিষ্ঠুর অমানবিক বাস্তবতা। বিশেষ করে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ব্যবস্থায়; যেখানে পিতা-মাতা, ভাইবোন, সন্তানসন্ততি মিলে যৌথ পরিবারে সবাই মিলেমিশে বাস করে, সেখানে পিতা-মাতার বয়স হলেই বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেয়া হবে- এ কেমন কথা!

মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যে পিতা-মাতা সন্তানদের মানুষ করেন, তারাই কিনা বড় হয়ে পিতা-মাতাকে ছুড়ে ফেলেন নিরুপদ্রব এবং স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনযাপনের আশায়। তখন এসব পিতা-মাতার দুঃখের কোনো অন্ত থাকে না। প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে একদিন সবাই বৃদ্ধ হবেন। আজ যে টগবগে তরুণ, বয়সের ভারে সেও একসময় ন্যুব্জ হবে। কিন্তু নির্মম পরিহাস হচ্ছে, এ কথাটি কেউ মনে রাখে না। আজ বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে যে সন্তান বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দিচ্ছে, কাল সেও যে তার সন্তান দ্বারা একই আচরণের শিকার হবে না; তার কি কোনো নিশ্চয়তা আছে?

প্রবীণরা তাদের সমগ্র কর্মময় জীবন নিজ নিজ পরিবার গঠনে ও উন্নয়নে এবং সমাজ-জাতির সার্বিক কল্যাণে ব্যয় করে বার্ধক্যে উপনীত হন। কিন্তু এ সমাজ তাদের কথা মনে রাখে না। ফলে শেষ বয়সে তাদের আশ্রয় হয় বৃদ্ধাশ্রমে। স্বাভাবিক নিয়মেই সন্তানসন্ততিরা তাদের পিতা-মাতার ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করার কথা। বাঙালি একান্নবর্তী পরিবারের সংস্কৃতি এটাই। কিন্তু সময়ের অভিঘাতে পাল্টে যাচ্ছে সমাজব্যবস্থা। সেই সঙ্গে পাল্টে যাচ্ছে মূল্যবোধও।

নানা বাস্তবিক কারণে একান্নবর্তী পরিবারগুলো ভেঙে যাচ্ছে। তাই পিতা-মাতার স্থান হচ্ছে না সেখানে। অনেক পরিবারেই পিতা-মাতার ভরণপোষণকে কেন্দ্র করে স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়াবিবাদ লেগেই আছে। এ কারণেই ঝুট-ঝামেলা এড়াতে পিতা-মাতাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু সেখানে তাদের জীবন কীভাবে কাটে, সে ব্যাপারে খোঁজখবর নেয়াটাও অনেকে প্রয়োজন মনে করে না। এ নিষ্ঠুর অমানবিকতা মনুষ্যত্বের পরিচয় বহন করে না। এছাড়া আমাদের ধর্মীয় মূল্যবোধও তা সমর্থন করে না।

সবচেয়ে আশঙ্কার যে খবর সেটি হচ্ছে, করোনার এ সময়ে রাজধানীতে তালাক বা বিবাহবিচ্ছেদ বেড়ে গেছে। একটি দৈনিকের এ সংক্রান্ত রিপোর্ট বলছে, এ বছরের জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত পাঁচ মাসে ঢাকায় দৈনিক ৩৯টি তালাকের ঘটনা ঘটেছে; অর্থাৎ প্রতি ৩৭ মিনিটে একটি তালাক হয়েছে এবং এ বিবাহ বিচ্ছেদের ৭০ শতাংশই এসেছে স্ত্রীর দিক থেকে।

চলতি বছরের জুন থেকে অক্টোবরে তালাক হয়েছে ৫ হাজার ৯৭০টি। এর মধ্যে উত্তর সিটি করপোরেশনে ২ হাজার ৭০৬টি আর দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ৩ হাজার ২৬৪টি তালাক হয়েছে। এ সময়ে প্রতি মাসে গড়ে ১ হাজার ১৯৪টি তালাকের ঘটনা ঘটেছে। আর ২০১৯ সালে প্রতিমাসে গড়ে তালাক হয়েছিল ৯২০টি। চলতি বছরের ৫ মাসে তালাক বেড়েছে ২৯ দশমিক ৭৮ শতাংশ।

আবেদনগুলোতে তালাকের কারণ হিসেবে প্রায় সবই ছিল স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ‘বনিবনা’ না হওয়া। স্ত্রীর করা আবেদনে কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে ভরণপোষণ না দেয়া, যৌতুকের দাবিতে নির্যাতন, স্বামীর সন্দেহবাতিক মনোভাব, অন্য নারীর সঙ্গে সম্পর্ক, মাদকাসক্ত, পুরুষত্বহীনতা, ব্যক্তিত্বের সংঘাত। আর স্বামীদের আবেদনে স্ত্রীর বদমেজাজ, সংসারের প্রতি উদাসীনতা, সন্তান না হওয়া, অবাধ্য হওয়া, ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী না চলাসহ বিভিন্ন কারণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

বিবাহবিচ্ছেদ বেড়ে যাওয়ার পেছনে করোনার কারণের তৈরি হওয়া মানসিক, আর্থিকসহ নানামুখী চাপের পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন এবং যোগাযোগ কমে যাওয়াকে অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন সমাজবিজ্ঞানীরা। বাস্তবতা হচ্ছে, করোনার মতো মহামারী সাম্প্রতিক সময়ে আর আসেনি। এ প্রাণঘাতী ভাইরাস (কোভিড-১৯) মানুষের জীবন কেড়ে নিচ্ছে।

তৈরি করছে নানামুখী চাপ। একদিকে কর্মসংস্থান হারিয়ে মানুষের আয় কমছে, অন্যদিকে চিকিৎসাসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে। মাস্ক, হ্যান্ডওয়াশ, স্যানিটাইজার, সাবানসহ এমন সব জিনিসপত্র কিনতে হচ্ছে, যা অন্য সময়ে কিনতে হতো না। কিনলেও সংখ্যায় বা পরিমাণে কম কিনতে হতো। করোনার ওষুধের দামও অনেক। আর চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে ভর্তি হতে হলে তো কথাই নেই। আইসিইউতে ৮ লাখ টাকা বিল দিয়েও প্রাণ বাঁচানো যায়নি- এমন মর্মন্তুদ ঘটনাও আছে।

স্বাভাবিক কারণেই মানসিক চাপ বেড়েছে। জীবন এবং জীবিকার প্রশ্নে টিকে থাকার সংগ্রামে ব্যস্ত মানুষজন। অনেকেই শহর ছেড়ে দিয়েছেন। কবে ফিরতে পারবেন নেই সেই নিশ্চয়তা। গ্রামে গিয়েও স্বস্তি নেই। নেই রোজগারের উপায়। তাছাড়া করোনার থাবা তো সর্বত্রই। এ অবস্থায় পরিবারগুলো ভাঙনের মুখে পড়ছে। অর্থনৈতিক টানাপোড়েন অনেক সময় বড় অশান্তির কারণ হয়; করোনাকালে যা বেশি করে অনুভূত হচ্ছে।

শুধু কি সংসার ভাঙছে? ভাঙনের শব্দ যেন সর্বত্র। দল ভাঙছে। প্রযুক্তির আঘাত আসছে। প্রেম ভাঙছে। আস্থা-বিশ্বাস মূল্যবোধ হারাচ্ছে মানুষ। নীতি-নৈতিকতার বালাই নেই। মানবিক অবক্ষয় দেখা দিচ্ছে। মাদকের করাল গ্রাসে তারুণ্য। সাম্প্রদায়িকতার উত্থান। ভাস্কর্য-মূর্তি বিতর্কে উত্তপ্ত রাজনীতির মাঠ। ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার বিপজ্জনক পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে। বৈষম্য বাড়ছে। বাড়ছে দুর্নীতি। একজনের কানাডায় অট্টালিকা তো অন্যজনের মাথা গোজার ঠাঁই নেই। বেকারত্ব পাহাড়সমান। চাকরি প্রার্থীর হাহাকার বাড়ছে। বিপুল কর্মস্থানের সুযোগ করেও সামাল দেয়া যাচ্ছে না।

তবুও আশায় বুক বাঁধতে হবে। চলছে মহান বিজয়ের মাস ডিসেম্বর। এ মাসেই আমরা পেয়েছি লাখো প্রাণের বিনিময়ে আমাদের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের গড় আয়ু বেড়েছে। কমেছে মাতৃমৃত্যু এবং শিশু মৃত্যুর হার। বাড়ছে মাথাপিছু আয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ এখন ৪১ বিলিয়ন বা ৪ হাজার ১০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। এ মাসেরই আরেক অর্জন নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু। এ সেতু আমাদের সাহস বাড়িয়ে দিয়েছে। আমরাও পারি- বিশ্বের বুকে সেটি প্রমাণ করে দিয়েছে। নিখাদ দেশপ্রেম আর দৃঢ় সংকল্প নেতৃত্বের সাহসের প্রতীক যেন পদ্মা সেতু। এ ইতিবাচকতা ছড়িয়ে দিতে হবে সর্বত্র। আর তখনই এর প্রভাব পড়বে আর্থসামাজিক, পারিবারিক সব ক্ষেত্রে।

 

ড. হারুন রশীদ : সাংবাদিক

harun_press@yaqhoo.com

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন