শুদ্ধ সময়ের স্বপ্ন দেখে নতুন প্রজন্ম
jugantor
শুদ্ধ সময়ের স্বপ্ন দেখে নতুন প্রজন্ম

  এ কে এম শাহনাওয়াজ  

২৯ ডিসেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

২০২০ সালটি সারা পৃথিবীর জন্যই দুর্যোগপূর্ণ বছর। কোভিড-১৯-এর থাবা থেকে আমরাও রেহাই পাইনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নানা সামাজিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অনাচার। ধর্ষণ, খুন ও সড়ক দুর্ঘটনা সংকটের চূড়ান্তে ফেলে দিয়েছে আমাদের। পাশাপাশি পালা দিয়ে দুর্নীতি আমাদের দেশের ক্যানভাসকে বিবর্ণ করে দিয়েছে।

এর মধ্যে সাফল্যের খবরও রয়েছে। কোভিডের ছোবলের পরও বাংলাদেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়েনি। দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। অবকাঠামোগত দিক দিয়ে যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। পদ্মা সেতুর স্বপ্ন বাস্তবায়নের চূড়ান্ত পর্বে এখন বাংলাদেশ। মেট্রো রেলের নির্মাণ অগ্রগতিও অনেকটা এগিয়ে গেছে। তবুও মানতে হবে অন্যায়-দুর্নীতি সার্বিক পরিস্থিতিকে বিপর্যস্ত করে তুলছে।

এমন এক বাস্তবতায় বর্তমান প্রজন্মের একটি ছোট্ট অংশের সুন্দরের প্রত্যাশা ও শুভচিন্তা আমাকে আশাবাদী করে তুলেছে। মনে হচ্ছিল অন্ধকার থেকে আলোতে দেশকে এগিয়ে নিতে এ প্রজন্মের একদল তরুণ দৃঢ়পায়ে এগিয়ে আসছে। এ সূত্রেই একটি সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা দিয়ে শুরু করতে চাই।

হঠাৎই একদিন ফোন করে ইতিহাস বিভাগের এক ছাত্রী। জানাল ওরা ‘মুক্ত ইতিহাস চর্চা’ বলে একটি সংগঠন দাঁড় করিয়েছে। এর মাধ্যমে ইতিহাস চর্চাকে এগিয়ে নিতে চায়। ওরা জুম মিটিংয়ে প্রথম একটি সেমিনার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিষয় নির্বাচন করেছে ‘মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা: প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের ভাবনা’। বিশেষত্ব হচ্ছে সেমিনারে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবে শিক্ষার্থীরাই। কেউ এখনও পড়ছে। কেউ পাস করে বেরিয়েছে। ওদের সংগঠনের প্রথম সেমিনারে ওরা আমাকে সভাপ্রধান হিসেবে পেতে চায়।

আমি একটু ব্যস্ত থাকায় সময় দিতে পারছিলাম না। কিন্তু ওরা নাছোড়বান্দা। বিলম্বে হলেও আমার উপস্থিতিতেই সেমিনার করবে। শেষ পর্যন্ত ২৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হল। প্রবন্ধ উপস্থাপন করল জাহাঙ্গীরনগর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ও সাবেক তিনজন শিক্ষার্থী। প্রশ্ন-উত্তরে অংশ নিয়েছিল আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী।

এরা মুক্তিযুদ্ধোত্তর দ্বিতীয় প্রজন্মের তরুণ। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ওদের গভীর কৌতূহল দেখে আমি অভিভূত হলাম। বুঝতে পারলাম মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ওদের ছুঁয়ে যাচ্ছে। ওরা এ চেতনা থেকে শক্তি সঞ্চয় করতে চায়। ওদের প্রশ্ন, পাকিস্তানি শাসকদের সৃষ্ট বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ছিল বাঙালির অধিকার আন্দোলনের একটি বড় অনুষঙ্গ।

তাহলে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত এদেশে এখন এত বৈষম্য কেন? এত হানাহানি, নৈরাজ্য আর দুর্নীতি কেন? এ স্বাধীন দেশের রাজনীতি জনকল্যাণমুখী হতে পারছে না কেন? ওদের এতসব যৌক্তিক কৌতূহল আমাকে আশাবাদী করে তুলছিল। মনে হচ্ছিল আমাদের সবকিছু নষ্ট হয়ে যায়নি। স্বাধীনতার পতাকা সঠিকভাবে দৃঢ়তার সঙ্গে ধরার জন্য নতুন প্রজন্ম প্রস্তুত হচ্ছে। ওদের ভাবনার পাশাপাশি ক্ষমতাপ্রত্যাশী রাজনৈতিক দলগুলোর নীতিহীন আদর্শের কথাও মনে হচ্ছিল।

এ প্রজন্ম এখন মুক্তিযুদ্ধের কথা জানতে চায়। বিস্মিত হয় ক্ষমতা পাওয়ার জন্য কখনও কখনও কোনো গোষ্ঠী পাকিস্তানি হানাদারদের মতো সাধারণ মানুষের প্রাণসংহার করছে কীভাবে তা ভেবে। তাদের এসব প্রশ্নের মুখে নিকট অতীতের কথা মনে হচ্ছিল। বিরোধী দলের তথাকথিত ‘শান্তিপূর্ণ’ অবরোধ-হরতালে পেট্রোল আর গান পাউডার ছড়িয়ে দেয়া আগুন দেখে এ ডিসেম্বরে সবুজ তারুণ্যের মাঝখানে বসে আমি বারবার ফিরে যাচ্ছিলাম একাত্তরে। ১৯৭১-এ বারো বছরের কিশোর আমি কি সত্যি অতটা অবুঝ ছিলাম? কারণ তখন পাকিস্তানি জান্তার অমন সব অমানবিকতা দেখে কষ্ট পেতাম। এখন কি অনুভূতি ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে? না সময়ের বিবর্তনে আমরা আমাদের মানবিক গুণগুলো ক্রমে হারিয়ে ফেলছি?

মুক্তিযুদ্ধের সময়ের স্মৃতিচারণ করি। এপ্রিলের শুরুর দিকে পাকবাহিনী নারায়ণগঞ্জ শহরে ঢুকেছিল। শীতলক্ষ্যার পূর্বপার বন্দরে আমাদের বাড়ি। নারায়ণগঞ্জ শহরের প্রবেশমুখ চাষাঢ়ায় রাস্তার ওপর শক্ত ব্যারিকেড দিয়েছিল মুক্তিকামী মানুষ। পাকবাহিনী ব্যারিকেড সরাতে শক্তি প্রয়োগ করছে। জনপদ প্রকম্পিত হচ্ছিল কামান, মর্টারশেল আর মেশিনগানের শব্দে। শহরের অনেকেই জীবন বাঁচাতে নদী পার হয়ে আসছে বন্দরে। যার যার পরিচিত বা আত্মীয়দের বাড়ি পালিয়ে আসা ভীত মানুষদের ভিড়। সবাই নিয়ে এসেছে ভয়ংকর সব অভিজ্ঞতা। চাষাঢ়ার দিকে দাউদাউ আগুন জ্বলছে। মানুষের আর্তচিৎকারে ভারি হয়ে উঠছে চারদিক।

আমরাও নদীর এপার থেকে শেল আর মেশিনগানের ভয়ংকর শব্দ শুনে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে উঠছি। সবাই বলাবলি করছে, যে কোনো সময় নদী পাড়ি দিয়ে বন্দরে ঢুকে পড়বে পাকবাহিনী। তাই জীবন বাঁচাতে হলে পালাতে হবে। শুরু হল বাঁধা-ছাদা। যতটুকু বহন করা যায় তেমন একান্ত দরকারি জিনিসপত্র নিয়ে ঘরগুলো তালাবদ্ধ করে সদর দরজায় খিল এঁটে খিরকি দরজা দিয়ে হাজার হাজার পলায়নপর মানুষের মিছিলে আমরাও শরিক হলাম। প্রায় পাঁচ কিলোমিটার হেঁটে চলে এলাম মদনগঞ্জে। সামনে শীতলক্ষ্যা গিয়ে পড়েছে ধলেশ্বরীতে। নৌকায় ধলেশ্বরী পাড়ি দিয়ে মুন্সীগঞ্জে।

মুন্সীগঞ্জের আশ্রয় ছাড়ার আগেই খবর এলো ২৪ এপ্রিল বন্দরে ঢুকেছে পাকিস্তানি হায়েনারা। স্থানীয় জামায়াত নেতাকর্মী আর বিহারিরা দেখিয়ে দিয়েছে কোন কোন বাড়িতে আঘাত হানতে হবে। মূল সড়কের পাশেই আমাদের দেয়ালঘেরা জনশূন্য বাড়ি। ভেতরে ঢুকে গান পাউডার ছিটিয়ে ভস্মীভূত করেছিল পুরো বাড়ি। আর আশপাশ থেকে ধরে এনেছিল চুয়ান্ন জন বাঙালি। তরুণ, প্রৌঢ়, বৃদ্ধ কেউ বাদ যায়নি। আমাদের বাড়ির সামনেই খেলার মাঠ। এ মাঠের এক প্রান্তে গুলি করে হত্যা করা হয় প্রত্যেককে। তারপর মৃতদেহগুলো আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হয়।

নভেম্বরে প্রথম বাড়িতে আসি। একটি বড় ধ্বংসস্তূপে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে আমাদের সাজানো বাড়ি। কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে ছিল পোড়া থামগুলো। সেই বারো বছরের কিশোর আমি ভাবছিলাম কী ভয়ংকর হতে পারে মানুষ। মাঠের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে চলে যেত দৃষ্টি। সবাইকে গুলি করে পুড়িয়ে মেরেছিল ওরা।

আমাদের খুব পরিচিত বাবুল ভাইও ছিলেন এ লাশের মিছিলে। তখন আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কল্পনা করতাম মেশিনগান তাক করা পাক সেনাদের মুখ। রূপকথার রাক্ষসের চেহারা শুধু ভাসত মনের ফটোপ্লেটে। পাকবাহিনীর বন্ধু রাজাকার-আলবদরদের কিম্ভূতকিমাকার মামদো ভূতের মতো মনে হতো। সুখের কথা, এ সময়ের মুক্তচিন্তার প্রজন্ম এখন এসব গল্প শুনতে চায়।

এখন ষাট পার হওয়া মানুষ আমি। বছর কয়েক আগে স্বাধীন দেশে মানবতার বক্ষ বিদীর্ণ করা আগুনে খেলায় মত্ত দানবদের দেখতে পেয়েছিলাম আমরা। রাজনীতির নামে একদল মানুষ অবলীলায় যাত্রীসহ বাস পেট্রোল ঢেলে জ্বালিয়ে দিয়েছিল। তাদের দেয়া আগুনে ট্রাক ড্রাইভার, অটোচালক পুড়ে মরেছে। পণ্যবাহী ট্রাক জ্বলেছে আগুনে।

ট্রেন লাইন উপড়ে ফেলে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটানো হচ্ছিল তখন। প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে এদেশের ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য দানবের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছিল পাকবাহিনী। সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পদ ধ্বংস করে সৃষ্টি করতে চেয়েছিল ভীতিকর পরিবেশ। এ দানবরা ছিল ভিনভাষী, ভিনদেশি আর ভিন সংস্কৃতির মানুষ।

এত বছর পর দেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার জন্য সেবার মরিয়া হয়ে উঠেছিল এদেশেরই কয়েকটি রাজনৈতিক দল। আর সে পথ পাড়ি দেয়ার জন্য একাত্তরের ঘাতক দালাল তাদের বর্তমান প্রজন্মের দানবদের মাঠে নামিয়েছিল। এদের দানবীয় আচরণে বিপর্যস্ত হয়েছিল মানুষ। আর এদের নির্দেশদাতা রূপকথার রাক্ষস-রাক্ষসীরা কর্মসূচির নামে সাধারণ মানুষের জীবন আর দেশের সম্পদ ধ্বংসের জন্য দানবদের লেলিয়ে দিয়েছিল। বিপন্ন মানুষদের জন্য সামান্যতম সহানুভূতির শব্দ ছিল না এদের কণ্ঠে।

স্বাধীন দেশে এমন সব নৈরাজ্য বর্তমান প্রজন্মের অনেক তরুণ-তরুণীর মনে আজ প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। ইতিহাসের সত্য এভাবেই বেরিয়ে আসে। এখন প্রয়োজন ওদের সামনে নির্মোহভাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস উন্মোচন করা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার যে প্রত্যয় ছিল, একে পূর্ণতা দেয়ার দায়িত্ব রাজনৈতিক দলের নেতা-নেত্রীদের। দলীয় স্বার্থে নিজেদের আটকে রাখলে এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। যদি আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো দলীয় স্বার্থের সংকীর্ণতা থেকে বেরোতে না পারে, দুর্নীতির অচলায়তন ভাঙতে না পারে, তবে এর ভিন্ন প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে।

মুক্তিযুদ্ধের গৌরবের শক্তিকে ধারণ করে এমন সুন্দরের স্বপ্নবোনা তরুণ প্রজন্ম যে জোয়ার তৈরি করবে তাতে অনেকেরই অন্যায্য উচ্চাভিলাষ ভেসে যাবে বলেই আমাদের বিশ্বাস। আমি শ্রদ্ধা জানাই এ প্রজন্মের তরুণ-তরুণীদের, যারা খুঁজে ফিরছে সত্য। মনে রাখতে হবে এরা শুদ্ধ সময় ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন দেখছে।

ওরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নিজেদের শানিত করতে চায়। শেষ পর্যন্ত ওদের বিজয় রথ রুদ্ধ করা কঠিন হবে। দেশের নষ্ট রাজনীতির পরিচালকরা এ সত্যটি যাতে মনে রাখেন আমাদের প্রত্যাশা থাকবে তেমনই।

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

shahnawaz7b@gmail.com

শুদ্ধ সময়ের স্বপ্ন দেখে নতুন প্রজন্ম

 এ কে এম শাহনাওয়াজ 
২৯ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

২০২০ সালটি সারা পৃথিবীর জন্যই দুর্যোগপূর্ণ বছর। কোভিড-১৯-এর থাবা থেকে আমরাও রেহাই পাইনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নানা সামাজিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অনাচার। ধর্ষণ, খুন ও সড়ক দুর্ঘটনা সংকটের চূড়ান্তে ফেলে দিয়েছে আমাদের। পাশাপাশি পালা দিয়ে দুর্নীতি আমাদের দেশের ক্যানভাসকে বিবর্ণ করে দিয়েছে।

এর মধ্যে সাফল্যের খবরও রয়েছে। কোভিডের ছোবলের পরও বাংলাদেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়েনি। দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। অবকাঠামোগত দিক দিয়ে যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। পদ্মা সেতুর স্বপ্ন বাস্তবায়নের চূড়ান্ত পর্বে এখন বাংলাদেশ। মেট্রো রেলের নির্মাণ অগ্রগতিও অনেকটা এগিয়ে গেছে। তবুও মানতে হবে অন্যায়-দুর্নীতি সার্বিক পরিস্থিতিকে বিপর্যস্ত করে তুলছে।

এমন এক বাস্তবতায় বর্তমান প্রজন্মের একটি ছোট্ট অংশের সুন্দরের প্রত্যাশা ও শুভচিন্তা আমাকে আশাবাদী করে তুলেছে। মনে হচ্ছিল অন্ধকার থেকে আলোতে দেশকে এগিয়ে নিতে এ প্রজন্মের একদল তরুণ দৃঢ়পায়ে এগিয়ে আসছে। এ সূত্রেই একটি সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা দিয়ে শুরু করতে চাই।

হঠাৎই একদিন ফোন করে ইতিহাস বিভাগের এক ছাত্রী। জানাল ওরা ‘মুক্ত ইতিহাস চর্চা’ বলে একটি সংগঠন দাঁড় করিয়েছে। এর মাধ্যমে ইতিহাস চর্চাকে এগিয়ে নিতে চায়। ওরা জুম মিটিংয়ে প্রথম একটি সেমিনার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিষয় নির্বাচন করেছে ‘মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা: প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের ভাবনা’। বিশেষত্ব হচ্ছে সেমিনারে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবে শিক্ষার্থীরাই। কেউ এখনও পড়ছে। কেউ পাস করে বেরিয়েছে। ওদের সংগঠনের প্রথম সেমিনারে ওরা আমাকে সভাপ্রধান হিসেবে পেতে চায়।

আমি একটু ব্যস্ত থাকায় সময় দিতে পারছিলাম না। কিন্তু ওরা নাছোড়বান্দা। বিলম্বে হলেও আমার উপস্থিতিতেই সেমিনার করবে। শেষ পর্যন্ত ২৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হল। প্রবন্ধ উপস্থাপন করল জাহাঙ্গীরনগর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ও সাবেক তিনজন শিক্ষার্থী। প্রশ্ন-উত্তরে অংশ নিয়েছিল আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী।

এরা মুক্তিযুদ্ধোত্তর দ্বিতীয় প্রজন্মের তরুণ। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ওদের গভীর কৌতূহল দেখে আমি অভিভূত হলাম। বুঝতে পারলাম মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ওদের ছুঁয়ে যাচ্ছে। ওরা এ চেতনা থেকে শক্তি সঞ্চয় করতে চায়। ওদের প্রশ্ন, পাকিস্তানি শাসকদের সৃষ্ট বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ছিল বাঙালির অধিকার আন্দোলনের একটি বড় অনুষঙ্গ।

তাহলে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত এদেশে এখন এত বৈষম্য কেন? এত হানাহানি, নৈরাজ্য আর দুর্নীতি কেন? এ স্বাধীন দেশের রাজনীতি জনকল্যাণমুখী হতে পারছে না কেন? ওদের এতসব যৌক্তিক কৌতূহল আমাকে আশাবাদী করে তুলছিল। মনে হচ্ছিল আমাদের সবকিছু নষ্ট হয়ে যায়নি। স্বাধীনতার পতাকা সঠিকভাবে দৃঢ়তার সঙ্গে ধরার জন্য নতুন প্রজন্ম প্রস্তুত হচ্ছে। ওদের ভাবনার পাশাপাশি ক্ষমতাপ্রত্যাশী রাজনৈতিক দলগুলোর নীতিহীন আদর্শের কথাও মনে হচ্ছিল।

এ প্রজন্ম এখন মুক্তিযুদ্ধের কথা জানতে চায়। বিস্মিত হয় ক্ষমতা পাওয়ার জন্য কখনও কখনও কোনো গোষ্ঠী পাকিস্তানি হানাদারদের মতো সাধারণ মানুষের প্রাণসংহার করছে কীভাবে তা ভেবে। তাদের এসব প্রশ্নের মুখে নিকট অতীতের কথা মনে হচ্ছিল। বিরোধী দলের তথাকথিত ‘শান্তিপূর্ণ’ অবরোধ-হরতালে পেট্রোল আর গান পাউডার ছড়িয়ে দেয়া আগুন দেখে এ ডিসেম্বরে সবুজ তারুণ্যের মাঝখানে বসে আমি বারবার ফিরে যাচ্ছিলাম একাত্তরে। ১৯৭১-এ বারো বছরের কিশোর আমি কি সত্যি অতটা অবুঝ ছিলাম? কারণ তখন পাকিস্তানি জান্তার অমন সব অমানবিকতা দেখে কষ্ট পেতাম। এখন কি অনুভূতি ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে? না সময়ের বিবর্তনে আমরা আমাদের মানবিক গুণগুলো ক্রমে হারিয়ে ফেলছি?

মুক্তিযুদ্ধের সময়ের স্মৃতিচারণ করি। এপ্রিলের শুরুর দিকে পাকবাহিনী নারায়ণগঞ্জ শহরে ঢুকেছিল। শীতলক্ষ্যার পূর্বপার বন্দরে আমাদের বাড়ি। নারায়ণগঞ্জ শহরের প্রবেশমুখ চাষাঢ়ায় রাস্তার ওপর শক্ত ব্যারিকেড দিয়েছিল মুক্তিকামী মানুষ। পাকবাহিনী ব্যারিকেড সরাতে শক্তি প্রয়োগ করছে। জনপদ প্রকম্পিত হচ্ছিল কামান, মর্টারশেল আর মেশিনগানের শব্দে। শহরের অনেকেই জীবন বাঁচাতে নদী পার হয়ে আসছে বন্দরে। যার যার পরিচিত বা আত্মীয়দের বাড়ি পালিয়ে আসা ভীত মানুষদের ভিড়। সবাই নিয়ে এসেছে ভয়ংকর সব অভিজ্ঞতা। চাষাঢ়ার দিকে দাউদাউ আগুন জ্বলছে। মানুষের আর্তচিৎকারে ভারি হয়ে উঠছে চারদিক।

আমরাও নদীর এপার থেকে শেল আর মেশিনগানের ভয়ংকর শব্দ শুনে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে উঠছি। সবাই বলাবলি করছে, যে কোনো সময় নদী পাড়ি দিয়ে বন্দরে ঢুকে পড়বে পাকবাহিনী। তাই জীবন বাঁচাতে হলে পালাতে হবে। শুরু হল বাঁধা-ছাদা। যতটুকু বহন করা যায় তেমন একান্ত দরকারি জিনিসপত্র নিয়ে ঘরগুলো তালাবদ্ধ করে সদর দরজায় খিল এঁটে খিরকি দরজা দিয়ে হাজার হাজার পলায়নপর মানুষের মিছিলে আমরাও শরিক হলাম। প্রায় পাঁচ কিলোমিটার হেঁটে চলে এলাম মদনগঞ্জে। সামনে শীতলক্ষ্যা গিয়ে পড়েছে ধলেশ্বরীতে। নৌকায় ধলেশ্বরী পাড়ি দিয়ে মুন্সীগঞ্জে।

মুন্সীগঞ্জের আশ্রয় ছাড়ার আগেই খবর এলো ২৪ এপ্রিল বন্দরে ঢুকেছে পাকিস্তানি হায়েনারা। স্থানীয় জামায়াত নেতাকর্মী আর বিহারিরা দেখিয়ে দিয়েছে কোন কোন বাড়িতে আঘাত হানতে হবে। মূল সড়কের পাশেই আমাদের দেয়ালঘেরা জনশূন্য বাড়ি। ভেতরে ঢুকে গান পাউডার ছিটিয়ে ভস্মীভূত করেছিল পুরো বাড়ি। আর আশপাশ থেকে ধরে এনেছিল চুয়ান্ন জন বাঙালি। তরুণ, প্রৌঢ়, বৃদ্ধ কেউ বাদ যায়নি। আমাদের বাড়ির সামনেই খেলার মাঠ। এ মাঠের এক প্রান্তে গুলি করে হত্যা করা হয় প্রত্যেককে। তারপর মৃতদেহগুলো আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হয়।

নভেম্বরে প্রথম বাড়িতে আসি। একটি বড় ধ্বংসস্তূপে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে আমাদের সাজানো বাড়ি। কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে ছিল পোড়া থামগুলো। সেই বারো বছরের কিশোর আমি ভাবছিলাম কী ভয়ংকর হতে পারে মানুষ। মাঠের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে চলে যেত দৃষ্টি। সবাইকে গুলি করে পুড়িয়ে মেরেছিল ওরা।

আমাদের খুব পরিচিত বাবুল ভাইও ছিলেন এ লাশের মিছিলে। তখন আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কল্পনা করতাম মেশিনগান তাক করা পাক সেনাদের মুখ। রূপকথার রাক্ষসের চেহারা শুধু ভাসত মনের ফটোপ্লেটে। পাকবাহিনীর বন্ধু রাজাকার-আলবদরদের কিম্ভূতকিমাকার মামদো ভূতের মতো মনে হতো। সুখের কথা, এ সময়ের মুক্তচিন্তার প্রজন্ম এখন এসব গল্প শুনতে চায়।

এখন ষাট পার হওয়া মানুষ আমি। বছর কয়েক আগে স্বাধীন দেশে মানবতার বক্ষ বিদীর্ণ করা আগুনে খেলায় মত্ত দানবদের দেখতে পেয়েছিলাম আমরা। রাজনীতির নামে একদল মানুষ অবলীলায় যাত্রীসহ বাস পেট্রোল ঢেলে জ্বালিয়ে দিয়েছিল। তাদের দেয়া আগুনে ট্রাক ড্রাইভার, অটোচালক পুড়ে মরেছে। পণ্যবাহী ট্রাক জ্বলেছে আগুনে।

ট্রেন লাইন উপড়ে ফেলে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটানো হচ্ছিল তখন। প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে এদেশের ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য দানবের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছিল পাকবাহিনী। সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পদ ধ্বংস করে সৃষ্টি করতে চেয়েছিল ভীতিকর পরিবেশ। এ দানবরা ছিল ভিনভাষী, ভিনদেশি আর ভিন সংস্কৃতির মানুষ।

এত বছর পর দেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার জন্য সেবার মরিয়া হয়ে উঠেছিল এদেশেরই কয়েকটি রাজনৈতিক দল। আর সে পথ পাড়ি দেয়ার জন্য একাত্তরের ঘাতক দালাল তাদের বর্তমান প্রজন্মের দানবদের মাঠে নামিয়েছিল। এদের দানবীয় আচরণে বিপর্যস্ত হয়েছিল মানুষ। আর এদের নির্দেশদাতা রূপকথার রাক্ষস-রাক্ষসীরা কর্মসূচির নামে সাধারণ মানুষের জীবন আর দেশের সম্পদ ধ্বংসের জন্য দানবদের লেলিয়ে দিয়েছিল। বিপন্ন মানুষদের জন্য সামান্যতম সহানুভূতির শব্দ ছিল না এদের কণ্ঠে।

স্বাধীন দেশে এমন সব নৈরাজ্য বর্তমান প্রজন্মের অনেক তরুণ-তরুণীর মনে আজ প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। ইতিহাসের সত্য এভাবেই বেরিয়ে আসে। এখন প্রয়োজন ওদের সামনে নির্মোহভাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস উন্মোচন করা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার যে প্রত্যয় ছিল, একে পূর্ণতা দেয়ার দায়িত্ব রাজনৈতিক দলের নেতা-নেত্রীদের। দলীয় স্বার্থে নিজেদের আটকে রাখলে এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। যদি আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো দলীয় স্বার্থের সংকীর্ণতা থেকে বেরোতে না পারে, দুর্নীতির অচলায়তন ভাঙতে না পারে, তবে এর ভিন্ন প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে।

মুক্তিযুদ্ধের গৌরবের শক্তিকে ধারণ করে এমন সুন্দরের স্বপ্নবোনা তরুণ প্রজন্ম যে জোয়ার তৈরি করবে তাতে অনেকেরই অন্যায্য উচ্চাভিলাষ ভেসে যাবে বলেই আমাদের বিশ্বাস। আমি শ্রদ্ধা জানাই এ প্রজন্মের তরুণ-তরুণীদের, যারা খুঁজে ফিরছে সত্য। মনে রাখতে হবে এরা শুদ্ধ সময় ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন দেখছে।

ওরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নিজেদের শানিত করতে চায়। শেষ পর্যন্ত ওদের বিজয় রথ রুদ্ধ করা কঠিন হবে। দেশের নষ্ট রাজনীতির পরিচালকরা এ সত্যটি যাতে মনে রাখেন আমাদের প্রত্যাশা থাকবে তেমনই।

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

shahnawaz7b@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন