নির্বাচন কমিশন কি কাঠগড়ায় দাঁড়াবে?
jugantor
দেশপ্রেমের চশমা
নির্বাচন কমিশন কি কাঠগড়ায় দাঁড়াবে?

  মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার  

২৯ ডিসেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মাসাধিককাল পত্রিকায় লিখিনি। কয়েকজন পাঠক জানতে চেয়েছেন কেন তারা আমার লেখা পাচ্ছেন না। একজন এমনও জিজ্ঞেস করেছেন, আপনাকে কি থ্রেট করা হয়েছে? সে কারণেই কি কলাম লেখা বন্ধ করে দিলেন? আমি তাকে সবিনয়ে বলি, আমাকে কেউ থ্রেট করেনি। সময় পেলে লিখব। সাধারণ পাঠকরা তো জানেন না, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের কেবল কলাম লিখলে হয় না, তাদের কিছু গবেষণাধর্মী লেখাও লিখতে হয়। কিছু বইয়ের কাজও করতে হয়।

এ সরকারের আমলে পত্রিকায় প্রকাশিত আমার লেখাগুলোর একটি বড় অংশই নির্বাচন এবং নির্বাচন কমিশন সম্পর্কে। এর অন্যতম কারণ হল, সরকার একটি বিতর্কিত নির্বাচনে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতাসীন হয়েছে এবং ওই নির্বাচনে ইসির ভূমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। এ কারণে আমি নির্বাচন, নির্বাচন কমিশন, ইভিএম, ইত্যাদি বিষয় নিয়ে অনেক প্রবন্ধ লিখেছি।

ইলেকট্রনিক মিডিয়ার টকশোতেও এসব বিষয়ে বলেছি। বলেছি, গণতন্ত্রের প্রাণভোমরা হল নির্বাচন। আর এ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব। নির্বাচন কমিশন যে সে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে সে কথা বারবার বলেছি। এ কমিশন ভোটকে অসুস্থ ও মুমূর্ষু করেছে। কাজেই গণতন্ত্রপ্রিয় নাগরিক হিসেবে নির্বাচন এবং নির্বাচন কমিশনের সমালোচনা করে প্রবন্ধ লিখে আমি আমার দায়বদ্ধতার দায়িত্ব পালন করেছি।

তবে এমন কাজ করাকালীন আমার মাঝেমধ্যে মনে হয়েছে, নির্বাচন ও ইসির সমালোচনা করা কি কেবল আমার একার কাজ? অন্য দেশপ্রেমিক গণ্যমান্যরা এ ব্যাপারে নীরব কেন? তবে সম্প্রতি ১৪ ডিসেম্বর ৪২ জন বিশিষ্ট নাগরিক অনেক দেরিতে হলেও সিইসি ও ইসি কমিশনারদের দুর্নীতির বিচার চেয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে চিঠি দিয়ে জনগণকে বুঝিয়ে দিয়েছেন, দেশে অন্যায়ের প্রতিবাদকারী লোকের সংখ্যা হ্রাস পেলেও এখনও শেষ হয়ে যায়নি।

যারা এ চিঠি দিয়েছেন তারা নাগরিক সমাজের কাছে সুপরিচিত ও গ্রহণীয় ব্যক্তিত্ব। আমি তাদের সম্মান করলেও এ কাজটিকে আমার কাছে মনে হয়েছে রোগীকে আইসিইউতে ঢোকানোর পরে তার চিকিৎসা শুরু করার মতো। তারা যদি একাদশ সংসদ নির্বাচনের পরে ২০১৯ সালের প্রথমদিকে এ কাজটি করতেন, তাহলে আমি এমন করে বলতাম না। তবে আমি তাদের এ কাজকে অনেক দেরি করে করা হয়েছে বললেও সমালোচনা করছি না।

অনেকে বলছেন, রাষ্ট্রপতির কাছে প্রদত্ত অভিযোগের কোনো প্রত্যাশিত ফল তারা পাবেন না। হ্যাঁ, প্রত্যাশিত ফল আবেদনকারীরা পাবেন কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে। তবে অন্য অনেক দিক দিয়ে সমাজ, সরকার ও রাজনীতির ওপর এ কাজটির ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। আর কিছু না হলেও ইসির গুরুতর আর্থিক অনিয়মগুলো তুলে ধরে সাধারণ মানুষকে বিষয়গুলো নতুন করে তারা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। এর গুরুত্বও তো কম নয়।

অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উত্থাপনেরও তো একটা উপযোগিতা আছে। এ প্রতিবাদ ফল না দিলেও অন্যদের নির্বাচন কমিশনের দুষ্কর্মের বিরুদ্ধে ভয়েস রেইজ করতে উৎসাহিত করবে।

গণতান্ত্রিক সরকারে রাষ্ট্রপতির পদটি আলংকারিক। মাত্র দুটি কাজ বাদে রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে কাজ করতে হয়। এ ক্ষেত্রেও নিশ্চয়ই এর ব্যত্যয় হবে না। রাষ্ট্রপতি যদি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এ বিষয়ে পরামর্শ চান, তাহলে প্রধানমন্ত্রী কী পরামর্শ দেবেন আমরা জানি না। তবে সাধারণত কোনো সুস্থ মানুষ যে নিজের বসা ডালের গোড়া কাটতে পরামর্শ দেয় না, তা অনুমান করা যায়। কারণ, এ নির্বাচন কমিশনকে তো এ সরকারই পছন্দ করে ক্ষমতায় বসিয়েছে।

সিইসি ও অন্য কমিশনারদের কীভাবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে তা তো মনে থাকার কথা। সার্চ কমিটি রাষ্ট্রপতির কাছে যে ১০টি নাম দিয়েছিল সে নামগুলো পর্যন্ত জনগণকে জানানো হয়নি। এভাবে নিজের মনপছন্দ লোকদের কমিশনে বসিয়ে সরকার তাদের কাছ থেকে নির্বাচনে বেনিফিট নিয়েছে। এখন তাদের দুর্নীতির বিচার করে অপসারণ করলে কি সরকারের সম্মান থাকবে?

তবে এ সরকারের কার্যভঙ্গিমা বিশ্লেষণ করে বলা যায়, এ বিষয়টিকে সরকার রাজনৈতিক মুনাফালাভের ঘুঁটি হিসেবেও ব্যবহার করতে পারে। প্রাথমিকভাবে ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল অ্যাকটিভ নেই’ অজুহাত দিয়ে এ আবেদনকে প্রধান বিচারপতির কাছে না পাঠিয়ে সরকার বিষয়টি ধামাচাপা দিতে পারে।

আবার হঠাৎ কোনো জোরালো সরকারবিরোধী আন্দোলন হলে সে আন্দোলন স্তিমিত করার লক্ষ্যে সরকারপ্রধানের পরামর্শে রাষ্ট্রপতি এ ৪২ বিশিষ্টজনকে বঙ্গভবনে দাওয়াত দিয়ে তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করতে পারেন। কাজেই রাষ্ট্রপতির কোর্টে নয়, বলটি এখন সরকারের কোর্টে। বাধ্য না হলে হয়তো এ সরকার নির্বাচন কমিশনের দুর্নীতির বিচার করে নিজের ক্ষতি করবে না।

সরকারের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল বলে দিয়েছেন, এখন সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল নেই। ষোড়শ সংশোধনীর চূড়ান্ত রায়ের পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে। অন্যদিকে ৪২ জন বিচারপ্রার্থী আবেদনকারীর পক্ষে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন। তিনি বলেছেন, ‘ষোড়শ সংশোধনী রায় অনুযায়ী পূর্বের সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল এখনও বহাল আছে। ওই রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ ফাইল করা হয়েছে।

কিন্তু কোনো স্থগিতাদেশ হয়নি।’ অন্য কতিপয় আইনজ্ঞও বলেছেন, ওই রায়ে ‘আপিল বিভাগ কেবল রাষ্ট্রপক্ষের আপিলই খারিজ করে দেননি, একইসঙ্গে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ব্যবস্থাও পুনর্বহাল করে দেন। আপিল বিভাগ পরিষ্কার করে ৯৬ অনুচ্ছেদের ২, ৩, ৪, ৫, ৬ এবং ৭ ধারা পুনর্বহাল করেছেন।’ তারা মনে করেন, একটি রিভিউয়ের উল্লেখ করে বলা যাবে না যে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল নেই।

এ প্রসঙ্গে তারা অষ্টম সংশোধনীর উল্লেখ করে বলেন, ওই রায়ের পর সাংবিধানিক সংশোধনীর আগেই ঢাকার বাইরের হাইকোর্ট বেঞ্চগুলো বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কাজেই সাধারণ বিবেচনায় নাগরিক সমাজের কাছে মনে হয়, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বহাল আছে। তবে তারা এটাও জানেন, সরকার চাইবে না যে এ ইসির দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হয়ে তাদের অপসারণ হোক।

সরকারের মন্ত্রীদের কথাবার্তায় এখনই সে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। যেমন, তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ উত্থাপিত অভিযোগের শরীরে রাজনৈতিক রং লাগিয়ে ২০ ডিসেম্বর বলেন, নির্বাচন কমিশন নিয়ে ৪২ জন বিশিষ্ট নাগরিকের দেয়া বিবৃতির খসড়া বিএনপির অফিস থেকে তৈরি।

মন্ত্রী আলোচ্য বিবৃতিদাতাদের সবাইকে বিএনপি ঘরানার উল্লেখ করে বলেন, এরা প্রতিনিয়ত সরকারের বিরুদ্ধে বলে আসছেন। মন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী ড. মইনুল ইসলাম, অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, অধ্যাপক রেহনুমা আহমেদ, অধ্যাপক স্বপন আদনান, খুশী কবির, ড. ইফতেখারুজ্জামানসহ সবাই বিএনপি ঘরানার লোক। কোন ঘরানার লোক কমিশনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ করছেন, মন্ত্রী মহোদয় সে বিষয়টিকে বড় করে না দেখে অভিযোগের কনটেন্টের ওপর বক্তব্য দিলে তা অধিকতর জনমনোযোগ পেত।

বিএনপি নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল নয়। অভিযোগ যদি বিএনপিরও কেউ করেন, তাতে অসুবিধা কোথায়? ইসির দুর্নীতির অভিযোগগুলো সত্য না মিথ্যা, মন্ত্রী সে বিষয়টি সুকৌশলে তার বক্তব্যে উল্লেখ করেননি। তার বক্তব্য শুনে মনে হয়, বিএনপির কোনো লোক যদি বলে, সূর্য পূর্ব দিক থেকে উঠেছে, তাহলে তা বিশ্বাস করা যাবে না। উটপাখির বালিতে মুখ গুঁজে কিছুই না দেখার ভঙ্গিমায় প্রদত্ত মন্ত্রীর এমন বক্তব্য সরকারের জনপ্রিয়তা কমাবে বলে মনে করা যায়।

যে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে এত বড় আর্থিক দুর্নীতি ও অভিসংশনযোগ্য অপরাধের অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে, সে কমিশনের এ ব্যাপারে নীরবতা পালন রহস্যজনক। একজন ইসি কমিশনার অবশ্য বলেছেন, এ ব্যাপারে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। আর্থিক দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করা হয়েছে ইসির বিরুদ্ধে।

সে ক্ষেত্রে তারা যদি সৎ হন, প্রেস কনফারেন্স করে তাদের সততার প্রমাণ দিতে অসুবিধা কোথায়? তা না হলে তো জনগণ তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত দুর্নীতির অভিযোগ সত্য ভাববেন। অভিযোগ উঠানো হয়েছে ইসির বিরুদ্ধে। সে অভিযোগের জবাব তো পিএসসি দেবে না। ইসিকেই দিতে হবে। সিইসি এ বিষয়ে নীরব কেন?

৪২ জন অভিযোগকারীর পক্ষে ১৯ ডিসেম্বর ড. শাহদীন মালিক এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে জাতি গভীর সংকটে পড়েছে বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেছেন, ‘গভীর সংকটে পড়ায় জাতি মহামান্য রাষ্ট্রপতির দিকে তাকিয়ে আছে। তার একটি নৈতিক ক্ষমতা রয়েছে। আমরা নিঃসন্দেহে আশাবাদী। আমরা আশাবাদী রাষ্ট্রপতি এ অভিযোগের ইতিবাচক সাড়া দেবেন।’ তবে এ সংবাদ সম্মেলনে ইসি কমিশনারদের অপসারণের আশা প্রকাশ বাস্তবসম্মত কিনা- এমন প্রশ্নের ড. মালিকের জবাবে নাগরিক সমাজ অত্যন্ত হতাশ হয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘অতীতেও কিছু খারাপ নির্বাচন হয়েছে।

’৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সম্ভবত সবচেয়ে খারাপ নির্বাচন। এখন যেগুলো হচ্ছে সেগুলোও একইরকম। এ ধরনের নির্বাচন কোনো ব্যক্তির কাছে কাম্য নয়।’ নির্বাচন সম্পর্কে তার এ মূল্যায়ন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। হ্যাঁ, ’৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন একটি খারাপ নির্বাচন ছিল। কিন্তু ওই নির্বাচন কিছুতেই সবচেয়ে খারাপ নির্বাচন নয়। ওই নির্বাচনের সঙ্গে দশম ও একাদশ সংসদ নির্বাচনের কোনো তুলনা হয় না। কারণ, ওই নির্বাচন খারাপ নির্বাচন হয়েও ইতিবাচক ফল দিয়েছিল, যে কারণে তৎকালীন বিরোধী দলও ওই নির্বাচনকে প্রত্যাখ্যান করেনি।

কারণ, ওই নির্বাচনের পর সংসদে ত্রয়োদশ সংশোধনী পাস করে বিরোধী দলের দাবি তত্ত্বাবধায়ক সরকার আইন পাস করে সপ্তম সংসদ নির্বাচন দেয়া হয়। ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনে দশম সংসদ নির্বাচনের মতো ভোটগ্রহণের আগেই ১৫৩ আসন জিতে কোনো দল সরকার গঠনের যোগ্যতা অর্জন করেনি। অথবা, একাদশ সংসদ নির্বাচনের মতো দিনের ভোট রাতে হওয়ার অভিযোগ ওঠেনি। ’৯৬ সালের খারাপ নির্বাচনে নিয়মানুযায়ী সকাল ৮টার আগে ব্যালট বাক্সকে নাস্তা করানো হয়নি।

কিন্তু একাদশ সংসদ নির্বাচনে তো ব্যালট বাক্সকে ভোটের আগের রাত ৩টা বা ৪টায় সেহেরি খাওয়ানো হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। এজন্যই সতর্ক নির্বাচন গবেষকদের কেউ কেউ সংসদ নির্বাচনগুলোর ওপর পৃথকভাবে গবেষণা কাজ করেছেন, যাতে ভবিষ্যতে ঢালাওভাবে ষষ্ঠ, দশম, একাদশ ইত্যাদি নির্বাচনকে ‘খারাপ নির্বাচন’ নামে একই কাতারভুক্ত করে জাতিকে বোকা বানানো না হয়।

ড. মালিকের ষষ্ঠ নির্বাচনকে সবচেয়ে খারাপ নির্বাচন বলার আগে শেষ দুটি নির্বাচনের ওপর প্রকাশিত একাডেমিক লেখালেখিগুলো পড়ে দেখা উচিত ছিল।

ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার : অধ্যাপক, রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

akhtermy@gmail.com

দেশপ্রেমের চশমা

নির্বাচন কমিশন কি কাঠগড়ায় দাঁড়াবে?

 মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার 
২৯ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মাসাধিককাল পত্রিকায় লিখিনি। কয়েকজন পাঠক জানতে চেয়েছেন কেন তারা আমার লেখা পাচ্ছেন না। একজন এমনও জিজ্ঞেস করেছেন, আপনাকে কি থ্রেট করা হয়েছে? সে কারণেই কি কলাম লেখা বন্ধ করে দিলেন? আমি তাকে সবিনয়ে বলি, আমাকে কেউ থ্রেট করেনি। সময় পেলে লিখব। সাধারণ পাঠকরা তো জানেন না, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের কেবল কলাম লিখলে হয় না, তাদের কিছু গবেষণাধর্মী লেখাও লিখতে হয়। কিছু বইয়ের কাজও করতে হয়।

এ সরকারের আমলে পত্রিকায় প্রকাশিত আমার লেখাগুলোর একটি বড় অংশই নির্বাচন এবং নির্বাচন কমিশন সম্পর্কে। এর অন্যতম কারণ হল, সরকার একটি বিতর্কিত নির্বাচনে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতাসীন হয়েছে এবং ওই নির্বাচনে ইসির ভূমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। এ কারণে আমি নির্বাচন, নির্বাচন কমিশন, ইভিএম, ইত্যাদি বিষয় নিয়ে অনেক প্রবন্ধ লিখেছি।

ইলেকট্রনিক মিডিয়ার টকশোতেও এসব বিষয়ে বলেছি। বলেছি, গণতন্ত্রের প্রাণভোমরা হল নির্বাচন। আর এ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব। নির্বাচন কমিশন যে সে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে সে কথা বারবার বলেছি। এ কমিশন ভোটকে অসুস্থ ও মুমূর্ষু করেছে। কাজেই গণতন্ত্রপ্রিয় নাগরিক হিসেবে নির্বাচন এবং নির্বাচন কমিশনের সমালোচনা করে প্রবন্ধ লিখে আমি আমার দায়বদ্ধতার দায়িত্ব পালন করেছি।

তবে এমন কাজ করাকালীন আমার মাঝেমধ্যে মনে হয়েছে, নির্বাচন ও ইসির সমালোচনা করা কি কেবল আমার একার কাজ? অন্য দেশপ্রেমিক গণ্যমান্যরা এ ব্যাপারে নীরব কেন? তবে সম্প্রতি ১৪ ডিসেম্বর ৪২ জন বিশিষ্ট নাগরিক অনেক দেরিতে হলেও সিইসি ও ইসি কমিশনারদের দুর্নীতির বিচার চেয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে চিঠি দিয়ে জনগণকে বুঝিয়ে দিয়েছেন, দেশে অন্যায়ের প্রতিবাদকারী লোকের সংখ্যা হ্রাস পেলেও এখনও শেষ হয়ে যায়নি।

যারা এ চিঠি দিয়েছেন তারা নাগরিক সমাজের কাছে সুপরিচিত ও গ্রহণীয় ব্যক্তিত্ব। আমি তাদের সম্মান করলেও এ কাজটিকে আমার কাছে মনে হয়েছে রোগীকে আইসিইউতে ঢোকানোর পরে তার চিকিৎসা শুরু করার মতো। তারা যদি একাদশ সংসদ নির্বাচনের পরে ২০১৯ সালের প্রথমদিকে এ কাজটি করতেন, তাহলে আমি এমন করে বলতাম না। তবে আমি তাদের এ কাজকে অনেক দেরি করে করা হয়েছে বললেও সমালোচনা করছি না।

অনেকে বলছেন, রাষ্ট্রপতির কাছে প্রদত্ত অভিযোগের কোনো প্রত্যাশিত ফল তারা পাবেন না। হ্যাঁ, প্রত্যাশিত ফল আবেদনকারীরা পাবেন কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে। তবে অন্য অনেক দিক দিয়ে সমাজ, সরকার ও রাজনীতির ওপর এ কাজটির ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। আর কিছু না হলেও ইসির গুরুতর আর্থিক অনিয়মগুলো তুলে ধরে সাধারণ মানুষকে বিষয়গুলো নতুন করে তারা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। এর গুরুত্বও তো কম নয়।

অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উত্থাপনেরও তো একটা উপযোগিতা আছে। এ প্রতিবাদ ফল না দিলেও অন্যদের নির্বাচন কমিশনের দুষ্কর্মের বিরুদ্ধে ভয়েস রেইজ করতে উৎসাহিত করবে।

গণতান্ত্রিক সরকারে রাষ্ট্রপতির পদটি আলংকারিক। মাত্র দুটি কাজ বাদে রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে কাজ করতে হয়। এ ক্ষেত্রেও নিশ্চয়ই এর ব্যত্যয় হবে না। রাষ্ট্রপতি যদি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এ বিষয়ে পরামর্শ চান, তাহলে প্রধানমন্ত্রী কী পরামর্শ দেবেন আমরা জানি না। তবে সাধারণত কোনো সুস্থ মানুষ যে নিজের বসা ডালের গোড়া কাটতে পরামর্শ দেয় না, তা অনুমান করা যায়। কারণ, এ নির্বাচন কমিশনকে তো এ সরকারই পছন্দ করে ক্ষমতায় বসিয়েছে।

সিইসি ও অন্য কমিশনারদের কীভাবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে তা তো মনে থাকার কথা। সার্চ কমিটি রাষ্ট্রপতির কাছে যে ১০টি নাম দিয়েছিল সে নামগুলো পর্যন্ত জনগণকে জানানো হয়নি। এভাবে নিজের মনপছন্দ লোকদের কমিশনে বসিয়ে সরকার তাদের কাছ থেকে নির্বাচনে বেনিফিট নিয়েছে। এখন তাদের দুর্নীতির বিচার করে অপসারণ করলে কি সরকারের সম্মান থাকবে?

তবে এ সরকারের কার্যভঙ্গিমা বিশ্লেষণ করে বলা যায়, এ বিষয়টিকে সরকার রাজনৈতিক মুনাফালাভের ঘুঁটি হিসেবেও ব্যবহার করতে পারে। প্রাথমিকভাবে ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল অ্যাকটিভ নেই’ অজুহাত দিয়ে এ আবেদনকে প্রধান বিচারপতির কাছে না পাঠিয়ে সরকার বিষয়টি ধামাচাপা দিতে পারে।

আবার হঠাৎ কোনো জোরালো সরকারবিরোধী আন্দোলন হলে সে আন্দোলন স্তিমিত করার লক্ষ্যে সরকারপ্রধানের পরামর্শে রাষ্ট্রপতি এ ৪২ বিশিষ্টজনকে বঙ্গভবনে দাওয়াত দিয়ে তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করতে পারেন। কাজেই রাষ্ট্রপতির কোর্টে নয়, বলটি এখন সরকারের কোর্টে। বাধ্য না হলে হয়তো এ সরকার নির্বাচন কমিশনের দুর্নীতির বিচার করে নিজের ক্ষতি করবে না।

সরকারের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল বলে দিয়েছেন, এখন সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল নেই। ষোড়শ সংশোধনীর চূড়ান্ত রায়ের পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে। অন্যদিকে ৪২ জন বিচারপ্রার্থী আবেদনকারীর পক্ষে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন। তিনি বলেছেন, ‘ষোড়শ সংশোধনী রায় অনুযায়ী পূর্বের সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল এখনও বহাল আছে। ওই রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ ফাইল করা হয়েছে।

কিন্তু কোনো স্থগিতাদেশ হয়নি।’ অন্য কতিপয় আইনজ্ঞও বলেছেন, ওই রায়ে ‘আপিল বিভাগ কেবল রাষ্ট্রপক্ষের আপিলই খারিজ করে দেননি, একইসঙ্গে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ব্যবস্থাও পুনর্বহাল করে দেন। আপিল বিভাগ পরিষ্কার করে ৯৬ অনুচ্ছেদের ২, ৩, ৪, ৫, ৬ এবং ৭ ধারা পুনর্বহাল করেছেন।’ তারা মনে করেন, একটি রিভিউয়ের উল্লেখ করে বলা যাবে না যে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল নেই।

এ প্রসঙ্গে তারা অষ্টম সংশোধনীর উল্লেখ করে বলেন, ওই রায়ের পর সাংবিধানিক সংশোধনীর আগেই ঢাকার বাইরের হাইকোর্ট বেঞ্চগুলো বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কাজেই সাধারণ বিবেচনায় নাগরিক সমাজের কাছে মনে হয়, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বহাল আছে। তবে তারা এটাও জানেন, সরকার চাইবে না যে এ ইসির দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হয়ে তাদের অপসারণ হোক।

সরকারের মন্ত্রীদের কথাবার্তায় এখনই সে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। যেমন, তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ উত্থাপিত অভিযোগের শরীরে রাজনৈতিক রং লাগিয়ে ২০ ডিসেম্বর বলেন, নির্বাচন কমিশন নিয়ে ৪২ জন বিশিষ্ট নাগরিকের দেয়া বিবৃতির খসড়া বিএনপির অফিস থেকে তৈরি।

মন্ত্রী আলোচ্য বিবৃতিদাতাদের সবাইকে বিএনপি ঘরানার উল্লেখ করে বলেন, এরা প্রতিনিয়ত সরকারের বিরুদ্ধে বলে আসছেন। মন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী ড. মইনুল ইসলাম, অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, অধ্যাপক রেহনুমা আহমেদ, অধ্যাপক স্বপন আদনান, খুশী কবির, ড. ইফতেখারুজ্জামানসহ সবাই বিএনপি ঘরানার লোক। কোন ঘরানার লোক কমিশনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ করছেন, মন্ত্রী মহোদয় সে বিষয়টিকে বড় করে না দেখে অভিযোগের কনটেন্টের ওপর বক্তব্য দিলে তা অধিকতর জনমনোযোগ পেত।

বিএনপি নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল নয়। অভিযোগ যদি বিএনপিরও কেউ করেন, তাতে অসুবিধা কোথায়? ইসির দুর্নীতির অভিযোগগুলো সত্য না মিথ্যা, মন্ত্রী সে বিষয়টি সুকৌশলে তার বক্তব্যে উল্লেখ করেননি। তার বক্তব্য শুনে মনে হয়, বিএনপির কোনো লোক যদি বলে, সূর্য পূর্ব দিক থেকে উঠেছে, তাহলে তা বিশ্বাস করা যাবে না। উটপাখির বালিতে মুখ গুঁজে কিছুই না দেখার ভঙ্গিমায় প্রদত্ত মন্ত্রীর এমন বক্তব্য সরকারের জনপ্রিয়তা কমাবে বলে মনে করা যায়।

যে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে এত বড় আর্থিক দুর্নীতি ও অভিসংশনযোগ্য অপরাধের অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে, সে কমিশনের এ ব্যাপারে নীরবতা পালন রহস্যজনক। একজন ইসি কমিশনার অবশ্য বলেছেন, এ ব্যাপারে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। আর্থিক দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করা হয়েছে ইসির বিরুদ্ধে।

সে ক্ষেত্রে তারা যদি সৎ হন, প্রেস কনফারেন্স করে তাদের সততার প্রমাণ দিতে অসুবিধা কোথায়? তা না হলে তো জনগণ তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত দুর্নীতির অভিযোগ সত্য ভাববেন। অভিযোগ উঠানো হয়েছে ইসির বিরুদ্ধে। সে অভিযোগের জবাব তো পিএসসি দেবে না। ইসিকেই দিতে হবে। সিইসি এ বিষয়ে নীরব কেন?

৪২ জন অভিযোগকারীর পক্ষে ১৯ ডিসেম্বর ড. শাহদীন মালিক এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে জাতি গভীর সংকটে পড়েছে বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেছেন, ‘গভীর সংকটে পড়ায় জাতি মহামান্য রাষ্ট্রপতির দিকে তাকিয়ে আছে। তার একটি নৈতিক ক্ষমতা রয়েছে। আমরা নিঃসন্দেহে আশাবাদী। আমরা আশাবাদী রাষ্ট্রপতি এ অভিযোগের ইতিবাচক সাড়া দেবেন।’ তবে এ সংবাদ সম্মেলনে ইসি কমিশনারদের অপসারণের আশা প্রকাশ বাস্তবসম্মত কিনা- এমন প্রশ্নের ড. মালিকের জবাবে নাগরিক সমাজ অত্যন্ত হতাশ হয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘অতীতেও কিছু খারাপ নির্বাচন হয়েছে।

’৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সম্ভবত সবচেয়ে খারাপ নির্বাচন। এখন যেগুলো হচ্ছে সেগুলোও একইরকম। এ ধরনের নির্বাচন কোনো ব্যক্তির কাছে কাম্য নয়।’ নির্বাচন সম্পর্কে তার এ মূল্যায়ন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। হ্যাঁ, ’৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন একটি খারাপ নির্বাচন ছিল। কিন্তু ওই নির্বাচন কিছুতেই সবচেয়ে খারাপ নির্বাচন নয়। ওই নির্বাচনের সঙ্গে দশম ও একাদশ সংসদ নির্বাচনের কোনো তুলনা হয় না। কারণ, ওই নির্বাচন খারাপ নির্বাচন হয়েও ইতিবাচক ফল দিয়েছিল, যে কারণে তৎকালীন বিরোধী দলও ওই নির্বাচনকে প্রত্যাখ্যান করেনি।

কারণ, ওই নির্বাচনের পর সংসদে ত্রয়োদশ সংশোধনী পাস করে বিরোধী দলের দাবি তত্ত্বাবধায়ক সরকার আইন পাস করে সপ্তম সংসদ নির্বাচন দেয়া হয়। ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনে দশম সংসদ নির্বাচনের মতো ভোটগ্রহণের আগেই ১৫৩ আসন জিতে কোনো দল সরকার গঠনের যোগ্যতা অর্জন করেনি। অথবা, একাদশ সংসদ নির্বাচনের মতো দিনের ভোট রাতে হওয়ার অভিযোগ ওঠেনি। ’৯৬ সালের খারাপ নির্বাচনে নিয়মানুযায়ী সকাল ৮টার আগে ব্যালট বাক্সকে নাস্তা করানো হয়নি।

কিন্তু একাদশ সংসদ নির্বাচনে তো ব্যালট বাক্সকে ভোটের আগের রাত ৩টা বা ৪টায় সেহেরি খাওয়ানো হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। এজন্যই সতর্ক নির্বাচন গবেষকদের কেউ কেউ সংসদ নির্বাচনগুলোর ওপর পৃথকভাবে গবেষণা কাজ করেছেন, যাতে ভবিষ্যতে ঢালাওভাবে ষষ্ঠ, দশম, একাদশ ইত্যাদি নির্বাচনকে ‘খারাপ নির্বাচন’ নামে একই কাতারভুক্ত করে জাতিকে বোকা বানানো না হয়।

ড. মালিকের ষষ্ঠ নির্বাচনকে সবচেয়ে খারাপ নির্বাচন বলার আগে শেষ দুটি নির্বাচনের ওপর প্রকাশিত একাডেমিক লেখালেখিগুলো পড়ে দেখা উচিত ছিল।

ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার : অধ্যাপক, রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

akhtermy@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন