বিজয়ের মাসে নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশা
jugantor
বিজয়ের মাসে নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশা

  ড. মো. কামরুজ্জামান  

২৬ ডিসেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

২০২১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাপকভাবে উদযাপন করবে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। এর পূর্বক্ষণে ৪৯তম বিজয়ের মাসে ১৯৭১-এর পর জন্ম নেয়া অসংখ্য তরুণের মনে কিছু প্রশ্ন, কিছু ভাবনা ও কিছু প্রত্যাশা রয়ে গেছে। যে তরুণরা তাদের মায়ের কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনেছে, শুনেছে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসিকতা, মানবিকতা, ত্যাগ-তিতিক্ষা ও দেশপ্রেমে আত্মোৎসর্গের কথা। শুনেছে তাদের শৌর্য-বীর্যগাথা গৌরবের গল্প। তারা শুনেছে পাকিস্তানিদের অবর্ণনীয় ও অমানবিক নিষ্ঠুরতা, পাশবিকতা আর নির্যাতনের লোমহর্ষক ঘটনাবলি। তরুণরা ইতিহাসের পাতা থেকেও বিভিন্ন আঙ্গিকে পড়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথার গল্প-কাহিনী। আর এতে তাদের মনে সৃষ্টি হয়েছে কিছু প্রশ্ন, ভাবনা আর প্রত্যাশা। যে প্রশ্ন আর ভাবনাগুলোর জবাব আজও তাদের অজানা। আগামী ১৫-২০ বছরের ব্যবধানে হয়তো দেশে কোনো মুক্তিযোদ্ধা আর বেঁচে থাকবেন না। রণাঙ্গনে সরাসরি নেতৃত্বে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের আর হয়তো দেখা যাবে না দেশে। তখন এ প্রশ্নগুলো আগামীর প্রজন্মকে আরও বেশি নাড়া দেবে।

১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে জাতি যেভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল, স্বাধীনতা অর্জনের পর সেই ঐক্য কেন ও কীভাবে বিনষ্ট হল? উজ্জীবিত এ ঐক্য কারা ছিন্নভিন্ন করল? আর সুদীর্ঘ ৫ দশকেও সেই ঐক্য কেন আর ফিরে এলো না? স্বাধীনতার ৪৯তম বিজয়ের মাসে সেটা আরও প্রকট হয়ে দেখা দিল বিজয় দিবসের প্রত্যুষে দেশের বিভিন্ন স্থানে স্মৃতিসৌধ ও বেদিতে ফুল দিতে আসা নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধার দৃশ্যে। স্মৃতিসৌধে ও বেদিতে দিতে আসা ফুলগুলো অসম্মানজনকভাবে দর্শক পদদলিত হল। এখানে জাতীয় ঐক্য তো দূরের কথা, দলীয় ঐক্যও একাধিক ধারায় বিভক্ত বলে প্রমাণিত হল। অথচ এ মানুষগুলোর মুখেই উচ্চারিত হয় মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান ও চেতনার জয়গান। এসব লোকই সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে ও সমাজ উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করে। নতুন প্রজন্মের কাছে এটি একেবারেই অপ্রত্যাশিত। তাদের কাছে এটি চেতনার নামে স্বার্থপরতা, বিজয়ের দিনের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা আর প্রহসন ছাড়া অন্য কিছুই নয়। বর্তমান প্রজন্ম কোনোভাবেই বিষয়টি মেনে নিতে পারে না। আর এসব ব্যক্তির দেয়া বক্তব্য, বিবৃতি ও ভাষণ তাদের কাছে অগ্রহণযোগ্য। মুক্তিযুদ্ধের সূর্যসৈনিকরা দেশে বেঁচে থাকা অবস্থায় যদি হারিয়ে যাওয়া সেই জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠিত না হয় এবং ফিরে না আসে, তাহলে বাংলাদেশের আগামী দিনগুলোর দশা কী হবে? জাতীয় ঐক্য ব্যতিরেকে দেশের আগামী দিনের উন্নতি, অগ্রগতি ও উন্নত রাষ্ট্রের লক্ষ্যপানে পৌঁছানো কি সুদূরপরাহত ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে না?

বিজয়ের মাসে যদি আমরা পেছনে ফিরে তাকাই, তাহলে মনে হবে আমরা অনেক দূর এগিয়ে এসেছি। আর যদি সামনে তাকাই, তাহলে মনে হবে আমরা অনেক পিছিয়ে রয়েছি। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ৬৭১ টাকা। আর বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। এটি অনেক ভালো খবর। কিন্তু গবেষকরা বাংলাদেশের আয়বৈষম্যের চিত্র দেখে রীতিমতো হতাশা প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশ সবেমাত্র স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে উন্নয়নশীল দেশের প্রবেশদ্বারে পা দিয়েছে। কিন্তু ইতোমধ্যেই এ দেশে ধনী ব্যক্তির সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা সংস্থা ‘ওয়েলথএক্স’ এক গবেষণায় বলেছে, গত এক দশকে ধনী ব্যক্তির সংখ্যা বৃদ্ধির হারে শীর্ষে থাকা ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ এক নম্বরে অবস্থান করছে। অর্থাৎ পৃথিবীতে ধনী ব্যক্তির সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে এমন দেশ দশটি। তন্মধ্যে শীর্ষে অবস্থান করছে বাংলাদেশ।

ধনী হওয়ার এ সংখ্যাটা মুষ্টিমেয়। রাজনৈতিক মদদপুষ্টে কতিপয় অসাধু ব্যক্তির কাছে সম্পদ পুঞ্জীভূত ও কুক্ষিগত হচ্ছে। সিংহভাগ মানুষ সামগ্রিক উন্নয়নের সুফল ভোগ করা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ধনীরা ক্রমান্বয়ে সম্পদের পাহাড় গড়ছে এবং সম্পদ গড়ার এ ধারাবাহিকতা অতীতে শুরু হয়ে বর্তমানেও চলমান আছে। অন্যদিকে গরিবরা দিন দিন আরও বেশি গরিব ও অসহায় হচ্ছে এবং গরিব হওয়ার ধারাবাহিকতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশের কৃষি-ভূমি-জলা সংস্কারের রাজনৈতিক অর্থনীতিবিষয়ক এক গবেষণায় দেখানো হয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশের ১৬ কোটি ৪৬ লাখ মানুষের মধ্যে ১০ কোটি ৫৫ লাখ মানুষই দরিদ্র। নব্বইয়ের দশকে যে সংখ্যা ছিল ৬ কোটি। তার মানে গত ৩০ বছরে বাংলাদেশের দরিদ্র জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ৪ কোটি ৫৫ লাখ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবমতে, বাংলাদেশে ২০০৮ সালে ভূমিহীন মানুষের সংখ্যা ছিল ৪৫ লাখ। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭০ থেকে ৮০ লাখ। আর ২০২১ সালে সেই সংখ্যা গিয়ে দাঁড়াবে ৮৫ লাখে। নদীভাঙনের কবলে পড়ে বাংলাদেশে গৃহহীন হয়েছে প্রায় ৬৮ লাখ মানুষ। আর প্রতিবছর ঘূর্ণিঝড়ে গৃহহীন হয়ে থাকে অগণিত মানুষ। এক গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু ঘূর্ণিঝড় আইলাতেই গৃহহীন হয়েছে প্রায় ১৩ লাখ মানুষ। এ মানুষগুলোর নিজস্ব কোনো জমি নেই। রাস্তার পাশে, বেড়িবাঁধের উপর খড়, নাড়া, বাঁশ ইত্যাদি দিয়ে ঝুপড়ি বেঁধে কোনোরকমে জীবন অতিবাহিত করে। আবার এর মাঝেও সর্বক্ষণ উচ্ছেদ আতঙ্কে দিন কাটাতে হয় তাদের।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী নিয়ে কাজ করেন এমন গবেষকদের মতে, বাংলাদেশের প্রায় ৪ কোটি পরিবার আছে। এর মধ্যে প্রায় ৩ কোটি পরিবার বাস করে গ্রামে। আর ১ কোটির বেশি পরিবার বসবাস করে শহরে। গ্রামে বসবাসরত মানুষের মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশ মানুষ কাঁচাঘরে বসবাস করে। এদের একটি বড় অংশ স্বাস্থ্য, স্যানিটেশন ও বৈদ্যুতিক সেবা থেকে বঞ্চিত। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশই শিশু। তন্মধ্যে ১২ লাখ শিশু আছে, যাদের টোকাই বা পথশিশু বলা হয়। সমাজসেবা অধিদফতরের তথ্যমতে, ১৩ লাখ শিশুর শীতের কাপড় নেই। প্রায় ৬ লাখ শিশু অসুস্থ হয়ে রাস্তায় পড়ে থাকলেও তাদের দেখার কেউ নেই। ৫ লক্ষাধিক শিশুর ঘর ও বিছানা নেই। প্রায় পাঁচ লাখ শিশুর গোসলের ব্যবস্থা নেই এবং তারা গোসল করতে পারে না। এ আলোচনার বাইরে থাকা অসংখ্য বনি আদমের খবর কেউ রাখেই না।

এসব হতদরিদ্র মানুষের কাছে শহীদ দিবস, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, তোপধ্বনি, জাঁকজমকপূর্ণ কুচকাওয়াজ ইত্যাদি কতটা অর্থবহ হতে পারে, সেটা ক্ষমতাবান রাজনীতিক আর চেতনার কারবারিরা কখনও বুঝতে পারবেন না। বিজয় উৎসব শেষে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোয় আয়োজিত রাজকীয় ভোজসভায় যখন চলে রসনাবিলাসের প্রতিযোগিতা, ঠিক তখন তাদের উচ্ছিষ্ট খাবারগুলো ডাস্টবিন থেকে কুড়িয়ে খায় অনেক অনাহারী মানুষ। পশুর সঙ্গে তারা ভাগাভাগি করে নেয় এসব ফেলে দেয়া খাবার। তরুণ প্রজন্ম এ অসঙ্গতিপূর্ণ কর্মকাণ্ডকে উন্নত রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্তরায় বলে মনে করে।

বাংলাদেশের বর্তমান লক্ষ্য মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা এবং ধাপে ধাপে সেটাকে উন্নত রাষ্ট্রে উন্নীত করা। আর এটি করতে রাষ্ট্রের প্রয়োজন দারিদ্র্য দূর করা, আয় ও ব্যয়ের বৈষম্য দূর করে স্বাধীনতার সনদে উল্লিখিত সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও রাষ্ট্রের সর্বত্র ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু বাস্তব অবস্থা এর বিপরীত। পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত দেশের কোটি কোটি নাগরিক যখন দিশেহারা, ঠিক তখনই কিছু ধনী মানুষের উত্থানের গল্প রীতিমতো অবাক করে দেয় তরুণ প্রজন্মকে।

স্বাধীনতার এত বছরেও দেশে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা, মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের তালিকা ও নারী মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা জাতির সামনে প্রকাশ বা চূড়ান্ত হল না; বরং উল্টো অসংখ্য ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা ভুয়া সনদ নিয়ে রাষ্ট্রের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ভোগ করল। অথচ বাংলার আনাচে-কানাচে পড়ে আছে অসংখ্য প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা, যাদের মুখে দিনে একবার অন্ন জোটে না। তারামন ও কাঁকন বিবির মতো অসংখ্য নারী মুক্তিযোদ্ধা জীবন পার করছে এ বিলাসী জীবনযাপনকারী ব্যক্তিদের উচ্ছিষ্ট খাবার খেয়ে, যাদের খবর কেউ রাখে না। একটি স্বাধীন দেশে এটি কখনই কাম্য হতে পারে না বলে মনে করে তরুণ প্রজন্ম।

তরুণ প্রজন্ম ৪৯তম বিজয়ের শেষ প্রহরে আশা করে, জাতীয় সব ইস্যুতে বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ হোক। স্বাধীনতার সুফল জাতিধর্মনির্বিশেষে সবাই সমানভাবে ভোগ করুক। কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী ও ব্যক্তির মাঝে তা কুক্ষিগত না থাকুক। সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় স্বাধীনতা পরিপূর্ণভাবে সুরক্ষিত থাকুক। ক্ষয়িষ্ণু লক্ষ্য আর নিশ্চল গণতন্ত্রে ফিরে আসুক গতিশীলতা। সুরুচি আর শালীনতা ফিরে আসুক রাজনৈতিক শব্দচয়নে। দূর হোক অশালীন আর কুরুচিপূর্ণ বাক্যবিনিময়। সাম্য, মানবিক মর্যাদা আর ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাঙালি জাতির জীবনে ফিরে আসুক হারানো আত্মবিশ্বাস, আত্মনির্ভরশীলতা, মর্যাদাবোধ, জাতীয়তাবোধ, বলিষ্ঠ জীবন আর মানবতাবোধ।

ড. মো. কামরুজ্জামান : অধ্যাপক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

dr.knzaman@gmail.com

 

বিজয়ের মাসে নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশা

 ড. মো. কামরুজ্জামান 
২৬ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

২০২১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাপকভাবে উদযাপন করবে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। এর পূর্বক্ষণে ৪৯তম বিজয়ের মাসে ১৯৭১-এর পর জন্ম নেয়া অসংখ্য তরুণের মনে কিছু প্রশ্ন, কিছু ভাবনা ও কিছু প্রত্যাশা রয়ে গেছে। যে তরুণরা তাদের মায়ের কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনেছে, শুনেছে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসিকতা, মানবিকতা, ত্যাগ-তিতিক্ষা ও দেশপ্রেমে আত্মোৎসর্গের কথা। শুনেছে তাদের শৌর্য-বীর্যগাথা গৌরবের গল্প। তারা শুনেছে পাকিস্তানিদের অবর্ণনীয় ও অমানবিক নিষ্ঠুরতা, পাশবিকতা আর নির্যাতনের লোমহর্ষক ঘটনাবলি। তরুণরা ইতিহাসের পাতা থেকেও বিভিন্ন আঙ্গিকে পড়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথার গল্প-কাহিনী। আর এতে তাদের মনে সৃষ্টি হয়েছে কিছু প্রশ্ন, ভাবনা আর প্রত্যাশা। যে প্রশ্ন আর ভাবনাগুলোর জবাব আজও তাদের অজানা। আগামী ১৫-২০ বছরের ব্যবধানে হয়তো দেশে কোনো মুক্তিযোদ্ধা আর বেঁচে থাকবেন না। রণাঙ্গনে সরাসরি নেতৃত্বে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের আর হয়তো দেখা যাবে না দেশে। তখন এ প্রশ্নগুলো আগামীর প্রজন্মকে আরও বেশি নাড়া দেবে।

১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে জাতি যেভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল, স্বাধীনতা অর্জনের পর সেই ঐক্য কেন ও কীভাবে বিনষ্ট হল? উজ্জীবিত এ ঐক্য কারা ছিন্নভিন্ন করল? আর সুদীর্ঘ ৫ দশকেও সেই ঐক্য কেন আর ফিরে এলো না? স্বাধীনতার ৪৯তম বিজয়ের মাসে সেটা আরও প্রকট হয়ে দেখা দিল বিজয় দিবসের প্রত্যুষে দেশের বিভিন্ন স্থানে স্মৃতিসৌধ ও বেদিতে ফুল দিতে আসা নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধার দৃশ্যে। স্মৃতিসৌধে ও বেদিতে দিতে আসা ফুলগুলো অসম্মানজনকভাবে দর্শক পদদলিত হল। এখানে জাতীয় ঐক্য তো দূরের কথা, দলীয় ঐক্যও একাধিক ধারায় বিভক্ত বলে প্রমাণিত হল। অথচ এ মানুষগুলোর মুখেই উচ্চারিত হয় মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান ও চেতনার জয়গান। এসব লোকই সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে ও সমাজ উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করে। নতুন প্রজন্মের কাছে এটি একেবারেই অপ্রত্যাশিত। তাদের কাছে এটি চেতনার নামে স্বার্থপরতা, বিজয়ের দিনের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা আর প্রহসন ছাড়া অন্য কিছুই নয়। বর্তমান প্রজন্ম কোনোভাবেই বিষয়টি মেনে নিতে পারে না। আর এসব ব্যক্তির দেয়া বক্তব্য, বিবৃতি ও ভাষণ তাদের কাছে অগ্রহণযোগ্য। মুক্তিযুদ্ধের সূর্যসৈনিকরা দেশে বেঁচে থাকা অবস্থায় যদি হারিয়ে যাওয়া সেই জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠিত না হয় এবং ফিরে না আসে, তাহলে বাংলাদেশের আগামী দিনগুলোর দশা কী হবে? জাতীয় ঐক্য ব্যতিরেকে দেশের আগামী দিনের উন্নতি, অগ্রগতি ও উন্নত রাষ্ট্রের লক্ষ্যপানে পৌঁছানো কি সুদূরপরাহত ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে না?

বিজয়ের মাসে যদি আমরা পেছনে ফিরে তাকাই, তাহলে মনে হবে আমরা অনেক দূর এগিয়ে এসেছি। আর যদি সামনে তাকাই, তাহলে মনে হবে আমরা অনেক পিছিয়ে রয়েছি। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ৬৭১ টাকা। আর বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। এটি অনেক ভালো খবর। কিন্তু গবেষকরা বাংলাদেশের আয়বৈষম্যের চিত্র দেখে রীতিমতো হতাশা প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশ সবেমাত্র স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে উন্নয়নশীল দেশের প্রবেশদ্বারে পা দিয়েছে। কিন্তু ইতোমধ্যেই এ দেশে ধনী ব্যক্তির সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা সংস্থা ‘ওয়েলথএক্স’ এক গবেষণায় বলেছে, গত এক দশকে ধনী ব্যক্তির সংখ্যা বৃদ্ধির হারে শীর্ষে থাকা ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ এক নম্বরে অবস্থান করছে। অর্থাৎ পৃথিবীতে ধনী ব্যক্তির সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে এমন দেশ দশটি। তন্মধ্যে শীর্ষে অবস্থান করছে বাংলাদেশ।

ধনী হওয়ার এ সংখ্যাটা মুষ্টিমেয়। রাজনৈতিক মদদপুষ্টে কতিপয় অসাধু ব্যক্তির কাছে সম্পদ পুঞ্জীভূত ও কুক্ষিগত হচ্ছে। সিংহভাগ মানুষ সামগ্রিক উন্নয়নের সুফল ভোগ করা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ধনীরা ক্রমান্বয়ে সম্পদের পাহাড় গড়ছে এবং সম্পদ গড়ার এ ধারাবাহিকতা অতীতে শুরু হয়ে বর্তমানেও চলমান আছে। অন্যদিকে গরিবরা দিন দিন আরও বেশি গরিব ও অসহায় হচ্ছে এবং গরিব হওয়ার ধারাবাহিকতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশের কৃষি-ভূমি-জলা সংস্কারের রাজনৈতিক অর্থনীতিবিষয়ক এক গবেষণায় দেখানো হয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশের ১৬ কোটি ৪৬ লাখ মানুষের মধ্যে ১০ কোটি ৫৫ লাখ মানুষই দরিদ্র। নব্বইয়ের দশকে যে সংখ্যা ছিল ৬ কোটি। তার মানে গত ৩০ বছরে বাংলাদেশের দরিদ্র জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ৪ কোটি ৫৫ লাখ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবমতে, বাংলাদেশে ২০০৮ সালে ভূমিহীন মানুষের সংখ্যা ছিল ৪৫ লাখ। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭০ থেকে ৮০ লাখ। আর ২০২১ সালে সেই সংখ্যা গিয়ে দাঁড়াবে ৮৫ লাখে। নদীভাঙনের কবলে পড়ে বাংলাদেশে গৃহহীন হয়েছে প্রায় ৬৮ লাখ মানুষ। আর প্রতিবছর ঘূর্ণিঝড়ে গৃহহীন হয়ে থাকে অগণিত মানুষ। এক গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু ঘূর্ণিঝড় আইলাতেই গৃহহীন হয়েছে প্রায় ১৩ লাখ মানুষ। এ মানুষগুলোর নিজস্ব কোনো জমি নেই। রাস্তার পাশে, বেড়িবাঁধের উপর খড়, নাড়া, বাঁশ ইত্যাদি দিয়ে ঝুপড়ি বেঁধে কোনোরকমে জীবন অতিবাহিত করে। আবার এর মাঝেও সর্বক্ষণ উচ্ছেদ আতঙ্কে দিন কাটাতে হয় তাদের।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী নিয়ে কাজ করেন এমন গবেষকদের মতে, বাংলাদেশের প্রায় ৪ কোটি পরিবার আছে। এর মধ্যে প্রায় ৩ কোটি পরিবার বাস করে গ্রামে। আর ১ কোটির বেশি পরিবার বসবাস করে শহরে। গ্রামে বসবাসরত মানুষের মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশ মানুষ কাঁচাঘরে বসবাস করে। এদের একটি বড় অংশ স্বাস্থ্য, স্যানিটেশন ও বৈদ্যুতিক সেবা থেকে বঞ্চিত। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশই শিশু। তন্মধ্যে ১২ লাখ শিশু আছে, যাদের টোকাই বা পথশিশু বলা হয়। সমাজসেবা অধিদফতরের তথ্যমতে, ১৩ লাখ শিশুর শীতের কাপড় নেই। প্রায় ৬ লাখ শিশু অসুস্থ হয়ে রাস্তায় পড়ে থাকলেও তাদের দেখার কেউ নেই। ৫ লক্ষাধিক শিশুর ঘর ও বিছানা নেই। প্রায় পাঁচ লাখ শিশুর গোসলের ব্যবস্থা নেই এবং তারা গোসল করতে পারে না। এ আলোচনার বাইরে থাকা অসংখ্য বনি আদমের খবর কেউ রাখেই না।

এসব হতদরিদ্র মানুষের কাছে শহীদ দিবস, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, তোপধ্বনি, জাঁকজমকপূর্ণ কুচকাওয়াজ ইত্যাদি কতটা অর্থবহ হতে পারে, সেটা ক্ষমতাবান রাজনীতিক আর চেতনার কারবারিরা কখনও বুঝতে পারবেন না। বিজয় উৎসব শেষে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোয় আয়োজিত রাজকীয় ভোজসভায় যখন চলে রসনাবিলাসের প্রতিযোগিতা, ঠিক তখন তাদের উচ্ছিষ্ট খাবারগুলো ডাস্টবিন থেকে কুড়িয়ে খায় অনেক অনাহারী মানুষ। পশুর সঙ্গে তারা ভাগাভাগি করে নেয় এসব ফেলে দেয়া খাবার। তরুণ প্রজন্ম এ অসঙ্গতিপূর্ণ কর্মকাণ্ডকে উন্নত রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্তরায় বলে মনে করে।

বাংলাদেশের বর্তমান লক্ষ্য মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা এবং ধাপে ধাপে সেটাকে উন্নত রাষ্ট্রে উন্নীত করা। আর এটি করতে রাষ্ট্রের প্রয়োজন দারিদ্র্য দূর করা, আয় ও ব্যয়ের বৈষম্য দূর করে স্বাধীনতার সনদে উল্লিখিত সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও রাষ্ট্রের সর্বত্র ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু বাস্তব অবস্থা এর বিপরীত। পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত দেশের কোটি কোটি নাগরিক যখন দিশেহারা, ঠিক তখনই কিছু ধনী মানুষের উত্থানের গল্প রীতিমতো অবাক করে দেয় তরুণ প্রজন্মকে।

স্বাধীনতার এত বছরেও দেশে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা, মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের তালিকা ও নারী মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা জাতির সামনে প্রকাশ বা চূড়ান্ত হল না; বরং উল্টো অসংখ্য ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা ভুয়া সনদ নিয়ে রাষ্ট্রের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ভোগ করল। অথচ বাংলার আনাচে-কানাচে পড়ে আছে অসংখ্য প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা, যাদের মুখে দিনে একবার অন্ন জোটে না। তারামন ও কাঁকন বিবির মতো অসংখ্য নারী মুক্তিযোদ্ধা জীবন পার করছে এ বিলাসী জীবনযাপনকারী ব্যক্তিদের উচ্ছিষ্ট খাবার খেয়ে, যাদের খবর কেউ রাখে না। একটি স্বাধীন দেশে এটি কখনই কাম্য হতে পারে না বলে মনে করে তরুণ প্রজন্ম।

তরুণ প্রজন্ম ৪৯তম বিজয়ের শেষ প্রহরে আশা করে, জাতীয় সব ইস্যুতে বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ হোক। স্বাধীনতার সুফল জাতিধর্মনির্বিশেষে সবাই সমানভাবে ভোগ করুক। কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী ও ব্যক্তির মাঝে তা কুক্ষিগত না থাকুক। সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় স্বাধীনতা পরিপূর্ণভাবে সুরক্ষিত থাকুক। ক্ষয়িষ্ণু লক্ষ্য আর নিশ্চল গণতন্ত্রে ফিরে আসুক গতিশীলতা। সুরুচি আর শালীনতা ফিরে আসুক রাজনৈতিক শব্দচয়নে। দূর হোক অশালীন আর কুরুচিপূর্ণ বাক্যবিনিময়। সাম্য, মানবিক মর্যাদা আর ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাঙালি জাতির জীবনে ফিরে আসুক হারানো আত্মবিশ্বাস, আত্মনির্ভরশীলতা, মর্যাদাবোধ, জাতীয়তাবোধ, বলিষ্ঠ জীবন আর মানবতাবোধ।

ড. মো. কামরুজ্জামান : অধ্যাপক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

dr.knzaman@gmail.com

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন