মুভি পাগল আমি
jugantor
মুভি পাগল আমি

  জান্নাতুল ফেরদৌস লাবণ্য  

২০ ডিসেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আমি প্রচণ্ড মুভি পাগল। ছোটবেলায় ‘এইম ইন লাইফ’ রচনায় ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার বহু কিছু লিখলেও ফাইনালি মুভি দেখা আর গল্পের বই পড়ার বাইরে আমার জীবনের তেমন কোনো লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য নাই! প্রথমবার যখন বিয়ের কথা উঠল তখনও আমি আমার জীবনের এই মূল লক্ষ্যটা নিয়েই সবচেয়ে বেশি চিন্তিত ছিলাম। বিয়ের পর জীবন বদলে যাবে না তো! তখন কি একই রকমভাবে বই পড়তে পারব? রিলিজ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হলে গিয়ে নতুন মুভিটা দেখে নিয়ে আপডেট থাকতে পারব?

ঠিক করেছি পাত্রের সঙ্গে দেখা হলে সর্বপ্রথম এ বিষয়টা নিয়েই তার সঙ্গে আলাপ করব। টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশনসে সর্বপ্রথম যে বিষয়টা ফাইনাল করা হবে তা হচ্ছে, বই পড়া আর মুভি দেখা। আমার জীবনের এ দুটি মৌলিক চাহিদা থেকে আমাকে বঞ্চিত করা যাবে না।

দুপুর বেলায় ভাত না খেয়েই গল্পের বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে গেছি। আব্বু চিৎকার দিয়ে ঘুম ভাঙিয়ে দিল।

‘তোর আজ রেস্টুরেন্টে গিয়ে পাত্রের সঙ্গে দেখা করার কথা- যাসনাই কেন?’

আমি হাই তুললাম। তারপর ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম আব্বুর দিকে। পাত্রের সঙ্গে দেখা করা তো দূরের কথা, পাত্রের কথা আমার মনেই ছিল না! যাব ক্যামনে?

আব্বু আবার স্টার্ট করেছে, ‘নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে তোর কোনো মাথাব্যথা আছে? সারা দিন খালি খাওয়া, গল্পের বই পড়া, সিনেমা দেখা আর ঘুমানো! আমি চিন্তায় চিন্তায় অস্থির তোর বিয়ে নিয়ে, তোর ভবিষ্যৎ নিয়ে আর তুই...!’

আব্বু আরও কী কী সব বলে চলেছেন। আমি আরেকটা হাই তুললাম। ঘুমটা এখনও পুরো হয়নি, আরেক দফা ঘুমাব। আরেকবার ঘুমানোর উদ্দেশ্যে বালিশটা ঠিকঠাক করতে যেতেই আব্বু ধমকে উঠে বললেন, ‘এই ওঠ! খবরদার ঘুমাবি না বলে দিলাম, ওঠ!’

আব্বুর লালচোখের দিকে তাকিয়ে আমার আর ঘুমাতে যাওয়ার সাহস হল না। উঠে হাত-মুখ ধুয়ে কোলের ওপর হাত রেখে চুপচাপ বসে রইলাম। আব্বু ঘুমাতে তো

দিলই না, তাহলে এখন কী করব? সেটাও তো বলে গেল না।

গালে হাত দিয়ে সদ্য দেখা একটা সাউথ মুভির কাহিনী নিয়ে চিন্তা করতে শুরু করলাম।

আব্বু আবার ফেরত এসেছেন। ধমক দিয়ে বললেন, ‘বসে আছিস কী জন্য?’

আমি ভীতু গলায় বললাম, ‘তো কী করব?’

আব্বু রেগে গেলেন, ‘কী করব মানে? করার কিছু পাচ্ছো না! পড়তে বসো গিয়ে!’

আমি পড়তে বসে গেলাম। আগ্রহের সঙ্গে বইপত্র উল্টাচ্ছি, খুব সম্ভবত বই-খাতাও আমাকে আগ্রহ করে দেখছে!

ফোন এসেছে। রেস্টুরেন্টে দেখা করতে যাওয়ার কথা যার সঙ্গে সেই ছেলে ফোন করেছে।

‘হ্যালো।’

‘কী ব্যাপার, তুমি এলে না যে?’

‘ঘুমাচ্ছিলাম।’

‘ও আচ্ছা। কেমন আছো?’

আমি হতাশ গলায় বললাম, ‘ভালো নাইরে ভাই! ভালো নাই!’

ওপাশ থেকে কোনো সাড়াশব্দ এলো না। খানিকক্ষণ পর নিজেকে সামলে নিয়ে সে জবাব দিল, ‘কেন? কী হইছে?’

‘ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করতেছি।’

সে হালকা হেসে জবাব দিলো, ‘তোমার ভবিষ্যৎ তো আমার সঙ্গে, এত চিন্তার কী আছে?’

আমি বললাম, ‘সেটাই তো চিন্তা করতেছি। বিয়ের পর আমার কী হবে? আপনি কি আমাকে বই পড়তে দেবেন? মুভি দেখতে দেবেন? বিয়ে হয়ে গেলে কী আমি সেলিব্রেটিদের পোস্টে আই লাভ ইউ লিখে কমেন্ট করতে পারবো? বিয়ে হয়ে গেলে কি আমি ক্র্যাশকে নিয়ে গল্প লিখতে পারব? বিয়ে হয়ে গেলে কি আমি সারাদিন শুয়ে-বসে মুভি দেখতে পারব?’

‘হয়তো পারবা! আমি অনেক ওপেন মাইন্ডেড।’

আমি খুশি হলাম। খুবই ভালো সংবাদ। ছেলে মনমতো হলে ভবিষ্যৎ নিয়ে আর চিন্তা কী!

বিয়ের কথা মোটামুটি ঠিকঠাক হয়ে গেছে। ছেলে চাকরির কাজে শহরের বাইরে গেছে। ফিরে এলেই পাকা কথা হয়ে যাবে।

ছেলে একদিন ফোন দিয়ে রোমান্টিক গলায় বলল, ‘বৃষ্টি হচ্ছে! তুমি কী করছ?’

আমি গম্ভীর গলায় জবাব দিলাম, ‘বই পড়ি।’

‘সে কী! বৃষ্টিতে ভিজছ না?’

আমি অবাক হলাম। জ্ঞান দেয়ার ভঙ্গিতে বললাম, ‘বৃষ্টিতে ভিজবো কেন? বৃষ্টির পানি ঠাণ্ডা না? আমি তো হালকা গরম পানি ছাড়া গোসল করতে পারি না। এখন বৃষ্টির পানির সঙ্গে গরম পানি আমাকে কে মিশিয়ে দেবে? আপনি দেবেন?’

ছেলে হতভম্ব হয়ে খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে আবার বলল, ‘বৃষ্টির দিনে গান ভালো লাগে, একটা গান শোনাও!’

আমি ল্যাপটপে ‘ঝরঝর মুখর বাদল দিনে’ গানটা ছেয়ে দিয়ে ফোনটা তার পাশে রেখে দিয়ে বই পড়তে লাগলাম। শোন ব্যাটা! গান শোন!

ছেলে ফোন কেটে দিয়ে আবার ব্যাক করল।

‘কী আশ্চর্য! আমি তোমাকে গান শোনাতে বললাম, আর তুমি...!’

আমি রাগী গলায় বললাম, ‘আমি কি গায়িকা? গায়িকা হলে তো বিয়ের কথা হলেই জানতেন যে মেয়ে গায়িকা। আচ্ছা এসব বাদ দিন! এত সুন্দর বৃষ্টির দিন। আপনি কী করেন?’

ছেলে খুশি গলায় জবাব দিল, ‘এই তো! তোমার সঙ্গে কথা বলি!’

আমি হাসিমুখে বললাম, ‘আমার সঙ্গে আর কতক্ষণ কথা বলবেন বলেন! আমার কি সময় আছে! বই পড়তেছি না! আপনি বরং এক কাজ করেন, টিউবলাইট মুভিটা দেখেন, খুব সুন্দর! আগে দেখেছেন?’

‘হ্যাঁ!’

‘ও দেখেছেন! তাহলে... হ্যাঁ মনে পড়েছে, অরুন্ধতী দেখেছেন?’

‘না!’

‘ওইটা দেখেন, দেখে আমাকে জানাবেন কেমন লাগল!’

আমি ফোন কেটে দিলাম। বাইরে ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। এমন বৃষ্টির দিনে খিচুড়ি খাওয়া জরুরি। আমি খিচুড়ি বসালাম। ফ্রিজ থেকে ইলিশ মাছ বের করে বাইরে রেখে ছেলেকে আবার ফোন দিলাম।

আমার ফোন পেয়ে ছেলেটা খুশি হল। আনন্দিত গলায় বলল, ‘এই প্রথম তুমি আমাকে ফোন দিলে! কী করো?’

আমি বিরক্ত গলায় বললাম, ‘এক কথা বারবার বলতে হয় কেন? একটু আগে বলেছি বই পড়ি, এই আধা ঘণ্টায় কি বই শেষ হয়ে যায় নাকি? আপনি অরুন্ধতী দেখছেন?’

‘ইয়ে মানে, ডাউনলোড হচ্ছে।’

‘হ্যাঁ, ফোন দিয়েছি ওইটাই শোনার জন্য, অরুন্ধতী দেখে জানাবেন কেমন লাগলো।’

তারপর সারাদিনে আর সে ছেলের ফোন এলো না। পরদিন সকালে ফোন দিয়ে ক্লান্ত গলায় জানাল, অরুন্ধতী ভালো লেগেছে। কাহিনী কি সেটাও সংক্ষেপে বলে প্রমাণ দিলো যে সে অরুন্ধতী দেখেছে।

সারাদিন সে ব্যস্ত থাকে। দিনশেষে ফ্রি হয়ে আমাকে ফোন দিয়ে যখনই রোমান্টিক কথা বলার চেষ্টা করে আমি দুঃখী দুঃখী গলায় বলি, ‘আপনার খুব কাজের চাপ তাই না! এক কাজ করেন, জিরো মুভিটা দেখেন, ভালো লাগবে। আচ্ছা, ড্যাসিং ডিজালা দেখেছেন? বলেন তো ধ্রুব সিনেমার কাহিনী কী? আচ্ছা, বাহুবলী সিনেমাটা আপনার কেমন লেগেছে? হুমায়ূন আহমেদের কয়টা বই পড়েছেন? হুমায়ূন আহমেদের লীলাবতী বইটার কাহিনী বলেন তো! তার মধ্যাহ্ন না পড়লে আমি তো আপনাকে বিয়েই করব না!’

দশদিনের মাথায় ছেলে বিরক্ত গলায় ঘোষণা দিলো, ‘তুমি তো একটা পাগল!’

‘পাগল! পাগল হবো কেন? আমি তো কখনও ভায়োলেন্ট হয়ে কারোর ওপর হামলা করি না! কখনও কারোর সঙ্গে ঝগড়া করি না। অশান্তি করি না। নিজের মতো মুভি দেখি আর বই পড়ি।’

‘সেজন্যই তো তুমি পাগল। প্রথমে যখন শুনেছিলাম তুমি ঘর থেকেই বের হও না তখন ভেবেছিলাম ভালো মেয়ে। এখন বুঝতে পারছি তুমি বদ্ধ উন্মাদ! তোমাকে বিয়ে করলে আমিও পাগল হয়ে যাবো। এ কদিনে সিনেমা দেখিয়ে দেখিয়ে তুমি আমাকে আধা পাগল করে দিয়েছ!’

আমি মহাবিরক্ত হয়ে বললাম, ‘আচ্ছা! সুস্থ মানুষের ডেফিনেশন আপনার কাছে কী?’

ছেলে বলল, ‘দেখো, আমি একজন উন্মাদের সঙ্গে সুস্থতার ডেফিনেশন নিয়ে কথা বলতে চাই না। আই ওয়ান্ট টু টক টু ইয়োর ফাদার!’

‘তো বলেন! তার নাম্বারে ফোন দিয়ে কথা বলেন গিয়ে। আমাকে বলতেছেন কেন? এমনিতেও আমি এখন একটা ইম্পর্টেন্ট বই পড়তেছি, এর মধ্যে আমি ফোন নিয়ে আব্বুর ঘরে যেতে পারব না!’

ফোন কেটে গেল। এর আধাঘণ্টা পরেই ধুমধাম শব্দ করতে করতে আব্বু আমার ঘরে এলেন।

‘দিলি! এ বিয়েটাও ভেঙে দিলি! তোর কী হবে! তোরে নিয়ে আমি কী করব! তোর ভবিষ্যৎ অন্ধকার!’

আমি আব্বুকে একটা মোটিভেশনাল মুভি সাজেস্ট করে বললাম, ‘এইটা দেখো! তাহলেই বুঝবা, এই মুভির নায়ককেও তার বাপ বলেছিলো, ভবিষ্যৎ অন্ধকার। অতঃপর সে দেখিয়ে দেয় যে কিভাবে...!’

আব্বু হতাশ চোখে তাকিয়ে আছেন। আমি ফোনটা এগিয়ে দিয়ে বললাম, ‘মুভিটা দেখো, দেখে আমাকে বলবা কেমন লাগলো!’

একমাস পরের কথা। সেই ছেলেটার বিয়ে হয়েছে আমার চাচাতো বোনের সঙ্গেই। আব্বু আর চাচা তার কাছে ক্ষমাটমা চেয়ে নিয়ে বলেছেন, তোমার মতো ভালো ছেলেকে আমরা হারাতে চাই না! তুমি আমাদের এই মেয়েটাকে বিয়ে করো।’

আমি বিয়েত যাইনি। সেদিনই নতুন একটা সাউথ মুভি রিলিজ হইছে! আমার সময় হয়নি বিয়েতে যাওয়ার।

বোন আর দুলাভাই বিয়ের এক মাস পর আমাদের বাড়িতে বেড়াতে এসেছে। আমার ঘরে এসে দুলাভাই বলল, ‘যা হয়েছে সব ভুলে যাও! তোমার আপুর আর আমার নতুন জীবন শুরু হয়েছে, দোয়া রেখো!’

আমি জবাব না দিয়ে হাসলাম। খানিকক্ষণ ইউটিউবে ঘাঁটাঘাঁটি করে একটা সিনেমা বের করে আপুর দিকে ফোন এগিয়ে দিতে দিতে বললাম, ‘এ মুভিটাতেও সেম কাহিনী! এভাবেই এক বোনের সঙ্গে বিয়ের কথা হয়ে পরে অন্য বোনের সঙ্গে বিয়ে হয়ে যায়। তোমরা এখানে বসেই মুভিটা দেখো, দেখা শেষ হলে বলবা কেমন লাগল!’

মুভি পাগল আমি

 জান্নাতুল ফেরদৌস লাবণ্য 
২০ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আমি প্রচণ্ড মুভি পাগল। ছোটবেলায় ‘এইম ইন লাইফ’ রচনায় ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার বহু কিছু লিখলেও ফাইনালি মুভি দেখা আর গল্পের বই পড়ার বাইরে আমার জীবনের তেমন কোনো লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য নাই! প্রথমবার যখন বিয়ের কথা উঠল তখনও আমি আমার জীবনের এই মূল লক্ষ্যটা নিয়েই সবচেয়ে বেশি চিন্তিত ছিলাম। বিয়ের পর জীবন বদলে যাবে না তো! তখন কি একই রকমভাবে বই পড়তে পারব? রিলিজ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হলে গিয়ে নতুন মুভিটা দেখে নিয়ে আপডেট থাকতে পারব?

ঠিক করেছি পাত্রের সঙ্গে দেখা হলে সর্বপ্রথম এ বিষয়টা নিয়েই তার সঙ্গে আলাপ করব। টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশনসে সর্বপ্রথম যে বিষয়টা ফাইনাল করা হবে তা হচ্ছে, বই পড়া আর মুভি দেখা। আমার জীবনের এ দুটি মৌলিক চাহিদা থেকে আমাকে বঞ্চিত করা যাবে না।

দুপুর বেলায় ভাত না খেয়েই গল্পের বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে গেছি। আব্বু চিৎকার দিয়ে ঘুম ভাঙিয়ে দিল।

‘তোর আজ রেস্টুরেন্টে গিয়ে পাত্রের সঙ্গে দেখা করার কথা- যাসনাই কেন?’

আমি হাই তুললাম। তারপর ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম আব্বুর দিকে। পাত্রের সঙ্গে দেখা করা তো দূরের কথা, পাত্রের কথা আমার মনেই ছিল না! যাব ক্যামনে?

আব্বু আবার স্টার্ট করেছে, ‘নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে তোর কোনো মাথাব্যথা আছে? সারা দিন খালি খাওয়া, গল্পের বই পড়া, সিনেমা দেখা আর ঘুমানো! আমি চিন্তায় চিন্তায় অস্থির তোর বিয়ে নিয়ে, তোর ভবিষ্যৎ নিয়ে আর তুই...!’

আব্বু আরও কী কী সব বলে চলেছেন। আমি আরেকটা হাই তুললাম। ঘুমটা এখনও পুরো হয়নি, আরেক দফা ঘুমাব। আরেকবার ঘুমানোর উদ্দেশ্যে বালিশটা ঠিকঠাক করতে যেতেই আব্বু ধমকে উঠে বললেন, ‘এই ওঠ! খবরদার ঘুমাবি না বলে দিলাম, ওঠ!’

আব্বুর লালচোখের দিকে তাকিয়ে আমার আর ঘুমাতে যাওয়ার সাহস হল না। উঠে হাত-মুখ ধুয়ে কোলের ওপর হাত রেখে চুপচাপ বসে রইলাম। আব্বু ঘুমাতে তো

দিলই না, তাহলে এখন কী করব? সেটাও তো বলে গেল না।

গালে হাত দিয়ে সদ্য দেখা একটা সাউথ মুভির কাহিনী নিয়ে চিন্তা করতে শুরু করলাম।

আব্বু আবার ফেরত এসেছেন। ধমক দিয়ে বললেন, ‘বসে আছিস কী জন্য?’

আমি ভীতু গলায় বললাম, ‘তো কী করব?’

আব্বু রেগে গেলেন, ‘কী করব মানে? করার কিছু পাচ্ছো না! পড়তে বসো গিয়ে!’

আমি পড়তে বসে গেলাম। আগ্রহের সঙ্গে বইপত্র উল্টাচ্ছি, খুব সম্ভবত বই-খাতাও আমাকে আগ্রহ করে দেখছে!

ফোন এসেছে। রেস্টুরেন্টে দেখা করতে যাওয়ার কথা যার সঙ্গে সেই ছেলে ফোন করেছে।

‘হ্যালো।’

‘কী ব্যাপার, তুমি এলে না যে?’

‘ঘুমাচ্ছিলাম।’

‘ও আচ্ছা। কেমন আছো?’

আমি হতাশ গলায় বললাম, ‘ভালো নাইরে ভাই! ভালো নাই!’

ওপাশ থেকে কোনো সাড়াশব্দ এলো না। খানিকক্ষণ পর নিজেকে সামলে নিয়ে সে জবাব দিল, ‘কেন? কী হইছে?’

‘ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করতেছি।’

সে হালকা হেসে জবাব দিলো, ‘তোমার ভবিষ্যৎ তো আমার সঙ্গে, এত চিন্তার কী আছে?’

আমি বললাম, ‘সেটাই তো চিন্তা করতেছি। বিয়ের পর আমার কী হবে? আপনি কি আমাকে বই পড়তে দেবেন? মুভি দেখতে দেবেন? বিয়ে হয়ে গেলে কী আমি সেলিব্রেটিদের পোস্টে আই লাভ ইউ লিখে কমেন্ট করতে পারবো? বিয়ে হয়ে গেলে কি আমি ক্র্যাশকে নিয়ে গল্প লিখতে পারব? বিয়ে হয়ে গেলে কি আমি সারাদিন শুয়ে-বসে মুভি দেখতে পারব?’

‘হয়তো পারবা! আমি অনেক ওপেন মাইন্ডেড।’

আমি খুশি হলাম। খুবই ভালো সংবাদ। ছেলে মনমতো হলে ভবিষ্যৎ নিয়ে আর চিন্তা কী!

বিয়ের কথা মোটামুটি ঠিকঠাক হয়ে গেছে। ছেলে চাকরির কাজে শহরের বাইরে গেছে। ফিরে এলেই পাকা কথা হয়ে যাবে।

ছেলে একদিন ফোন দিয়ে রোমান্টিক গলায় বলল, ‘বৃষ্টি হচ্ছে! তুমি কী করছ?’

আমি গম্ভীর গলায় জবাব দিলাম, ‘বই পড়ি।’

‘সে কী! বৃষ্টিতে ভিজছ না?’

আমি অবাক হলাম। জ্ঞান দেয়ার ভঙ্গিতে বললাম, ‘বৃষ্টিতে ভিজবো কেন? বৃষ্টির পানি ঠাণ্ডা না? আমি তো হালকা গরম পানি ছাড়া গোসল করতে পারি না। এখন বৃষ্টির পানির সঙ্গে গরম পানি আমাকে কে মিশিয়ে দেবে? আপনি দেবেন?’

ছেলে হতভম্ব হয়ে খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে আবার বলল, ‘বৃষ্টির দিনে গান ভালো লাগে, একটা গান শোনাও!’

আমি ল্যাপটপে ‘ঝরঝর মুখর বাদল দিনে’ গানটা ছেয়ে দিয়ে ফোনটা তার পাশে রেখে দিয়ে বই পড়তে লাগলাম। শোন ব্যাটা! গান শোন!

ছেলে ফোন কেটে দিয়ে আবার ব্যাক করল।

‘কী আশ্চর্য! আমি তোমাকে গান শোনাতে বললাম, আর তুমি...!’

আমি রাগী গলায় বললাম, ‘আমি কি গায়িকা? গায়িকা হলে তো বিয়ের কথা হলেই জানতেন যে মেয়ে গায়িকা। আচ্ছা এসব বাদ দিন! এত সুন্দর বৃষ্টির দিন। আপনি কী করেন?’

ছেলে খুশি গলায় জবাব দিল, ‘এই তো! তোমার সঙ্গে কথা বলি!’

আমি হাসিমুখে বললাম, ‘আমার সঙ্গে আর কতক্ষণ কথা বলবেন বলেন! আমার কি সময় আছে! বই পড়তেছি না! আপনি বরং এক কাজ করেন, টিউবলাইট মুভিটা দেখেন, খুব সুন্দর! আগে দেখেছেন?’

‘হ্যাঁ!’

‘ও দেখেছেন! তাহলে... হ্যাঁ মনে পড়েছে, অরুন্ধতী দেখেছেন?’

‘না!’

‘ওইটা দেখেন, দেখে আমাকে জানাবেন কেমন লাগল!’

আমি ফোন কেটে দিলাম। বাইরে ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। এমন বৃষ্টির দিনে খিচুড়ি খাওয়া জরুরি। আমি খিচুড়ি বসালাম। ফ্রিজ থেকে ইলিশ মাছ বের করে বাইরে রেখে ছেলেকে আবার ফোন দিলাম।

আমার ফোন পেয়ে ছেলেটা খুশি হল। আনন্দিত গলায় বলল, ‘এই প্রথম তুমি আমাকে ফোন দিলে! কী করো?’

আমি বিরক্ত গলায় বললাম, ‘এক কথা বারবার বলতে হয় কেন? একটু আগে বলেছি বই পড়ি, এই আধা ঘণ্টায় কি বই শেষ হয়ে যায় নাকি? আপনি অরুন্ধতী দেখছেন?’

‘ইয়ে মানে, ডাউনলোড হচ্ছে।’

‘হ্যাঁ, ফোন দিয়েছি ওইটাই শোনার জন্য, অরুন্ধতী দেখে জানাবেন কেমন লাগলো।’

তারপর সারাদিনে আর সে ছেলের ফোন এলো না। পরদিন সকালে ফোন দিয়ে ক্লান্ত গলায় জানাল, অরুন্ধতী ভালো লেগেছে। কাহিনী কি সেটাও সংক্ষেপে বলে প্রমাণ দিলো যে সে অরুন্ধতী দেখেছে।

সারাদিন সে ব্যস্ত থাকে। দিনশেষে ফ্রি হয়ে আমাকে ফোন দিয়ে যখনই রোমান্টিক কথা বলার চেষ্টা করে আমি দুঃখী দুঃখী গলায় বলি, ‘আপনার খুব কাজের চাপ তাই না! এক কাজ করেন, জিরো মুভিটা দেখেন, ভালো লাগবে। আচ্ছা, ড্যাসিং ডিজালা দেখেছেন? বলেন তো ধ্রুব সিনেমার কাহিনী কী? আচ্ছা, বাহুবলী সিনেমাটা আপনার কেমন লেগেছে? হুমায়ূন আহমেদের কয়টা বই পড়েছেন? হুমায়ূন আহমেদের লীলাবতী বইটার কাহিনী বলেন তো! তার মধ্যাহ্ন না পড়লে আমি তো আপনাকে বিয়েই করব না!’

দশদিনের মাথায় ছেলে বিরক্ত গলায় ঘোষণা দিলো, ‘তুমি তো একটা পাগল!’

‘পাগল! পাগল হবো কেন? আমি তো কখনও ভায়োলেন্ট হয়ে কারোর ওপর হামলা করি না! কখনও কারোর সঙ্গে ঝগড়া করি না। অশান্তি করি না। নিজের মতো মুভি দেখি আর বই পড়ি।’

‘সেজন্যই তো তুমি পাগল। প্রথমে যখন শুনেছিলাম তুমি ঘর থেকেই বের হও না তখন ভেবেছিলাম ভালো মেয়ে। এখন বুঝতে পারছি তুমি বদ্ধ উন্মাদ! তোমাকে বিয়ে করলে আমিও পাগল হয়ে যাবো। এ কদিনে সিনেমা দেখিয়ে দেখিয়ে তুমি আমাকে আধা পাগল করে দিয়েছ!’

আমি মহাবিরক্ত হয়ে বললাম, ‘আচ্ছা! সুস্থ মানুষের ডেফিনেশন আপনার কাছে কী?’

ছেলে বলল, ‘দেখো, আমি একজন উন্মাদের সঙ্গে সুস্থতার ডেফিনেশন নিয়ে কথা বলতে চাই না। আই ওয়ান্ট টু টক টু ইয়োর ফাদার!’

‘তো বলেন! তার নাম্বারে ফোন দিয়ে কথা বলেন গিয়ে। আমাকে বলতেছেন কেন? এমনিতেও আমি এখন একটা ইম্পর্টেন্ট বই পড়তেছি, এর মধ্যে আমি ফোন নিয়ে আব্বুর ঘরে যেতে পারব না!’

ফোন কেটে গেল। এর আধাঘণ্টা পরেই ধুমধাম শব্দ করতে করতে আব্বু আমার ঘরে এলেন।

‘দিলি! এ বিয়েটাও ভেঙে দিলি! তোর কী হবে! তোরে নিয়ে আমি কী করব! তোর ভবিষ্যৎ অন্ধকার!’

আমি আব্বুকে একটা মোটিভেশনাল মুভি সাজেস্ট করে বললাম, ‘এইটা দেখো! তাহলেই বুঝবা, এই মুভির নায়ককেও তার বাপ বলেছিলো, ভবিষ্যৎ অন্ধকার। অতঃপর সে দেখিয়ে দেয় যে কিভাবে...!’

আব্বু হতাশ চোখে তাকিয়ে আছেন। আমি ফোনটা এগিয়ে দিয়ে বললাম, ‘মুভিটা দেখো, দেখে আমাকে বলবা কেমন লাগলো!’

একমাস পরের কথা। সেই ছেলেটার বিয়ে হয়েছে আমার চাচাতো বোনের সঙ্গেই। আব্বু আর চাচা তার কাছে ক্ষমাটমা চেয়ে নিয়ে বলেছেন, তোমার মতো ভালো ছেলেকে আমরা হারাতে চাই না! তুমি আমাদের এই মেয়েটাকে বিয়ে করো।’

আমি বিয়েত যাইনি। সেদিনই নতুন একটা সাউথ মুভি রিলিজ হইছে! আমার সময় হয়নি বিয়েতে যাওয়ার।

বোন আর দুলাভাই বিয়ের এক মাস পর আমাদের বাড়িতে বেড়াতে এসেছে। আমার ঘরে এসে দুলাভাই বলল, ‘যা হয়েছে সব ভুলে যাও! তোমার আপুর আর আমার নতুন জীবন শুরু হয়েছে, দোয়া রেখো!’

আমি জবাব না দিয়ে হাসলাম। খানিকক্ষণ ইউটিউবে ঘাঁটাঘাঁটি করে একটা সিনেমা বের করে আপুর দিকে ফোন এগিয়ে দিতে দিতে বললাম, ‘এ মুভিটাতেও সেম কাহিনী! এভাবেই এক বোনের সঙ্গে বিয়ের কথা হয়ে পরে অন্য বোনের সঙ্গে বিয়ে হয়ে যায়। তোমরা এখানে বসেই মুভিটা দেখো, দেখা শেষ হলে বলবা কেমন লাগল!’

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন