কুয়াশাঘেরা শীতের রূপ
jugantor
কুয়াশাঘেরা শীতের রূপ

  প্রদীপ সাহা  

২৯ ডিসেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রকৃতির চিরন্তন নিয়মে শীত আসে ঘন কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে। শীতের সময় কুয়াশা তৈরি হয়। কুয়াশার সৌন্দর্য ছাড়া শীতের কথা যেন ভাবাই যায় না। শীতে তাপমাত্রা কম থাকে এবং মাটিতে থাকা আর্দ্রতা উপরে উঠে গিয়ে কুয়াশা তৈরি করে। পৃথিবীর সর্বাধিক কুয়াশাচ্ছন্ন স্থান হল নিউফাউন্ডল্যান্ডের গ্র্যান্ড ব্যাংকস, যেখানে উত্তর দিক থেকে আসা শীতল লাব্রাডর প্রবাহ ও দক্ষিণ দিক থেকে আসা অপেক্ষাকৃত উষ্ণ গালফ প্রবাহ মিলিত হয়।

সর্বাধিক কুয়াশাচ্ছন্ন ভূমি অঞ্চলের মধ্যে আছে পয়েন্ট রেয়েস, ক্যালিফোর্নিয়া। আর্জেন্টিনা, নিউফাউন্ডল্যান্ড ও লাব্রাডর অঞ্চলে বছরের ২০০ দিনই কুয়াশায় ঢাকা থাকে। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকা এবং চীনেও কুয়াশা তৈরি হয়। মাটির তুলনায় বাতাসে উষ্ণতা ও আর্দ্রতা বেশি থাকার কারণে যে কুয়াশা তৈরি হয় এবং ভেসে বেড়ায়, তা ভারত থেকে বাতাসের তোড়ে বাংলাদেশে চলে আসে।

কুয়াশার কারণে সূর্যের কিরণ ঢুকতে পারে না। তাই তাপমাত্রা কম থাকে এবং শীত অনুভূত হয়। তাছাড়া সূর্যের কিরণ গাছপালায় পৌঁছতে না পারায় পাতায় সালোক-সংশ্লেষণের পরিমাণ কমে যায়। এতে গাছপালা পুষ্টি কম পায় এবং গাছের খাদ্য কম পরিমাণে তৈরি হয়। একই কারণে অক্সিজেনের উৎপাদনও কমে যায়। শীতে কুয়াশার কারণে রবি শস্যের উৎপাদন কমে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণ করে এবং শিল্প-কারখানা ও যানবাহনের ধোঁয়া বাতাসে মিশতে না দিয়ে কুয়াশার ঘনত্ব কমিয়ে আনা সম্ভব।

তবে যে যা-ই বলুক, কুয়াশার রয়েছে এক অন্যরকম সৌন্দর্য, এক ভিন্ন আমেজ। কষ্ট এবং রাস্তায় চলাচলে ঝুঁকি থাকলেও শীতের কুয়াশার অসাধারণ সৌন্দর্য যেন অজান্তেই সবার মনে নাড়া দেয়। শীতের সকাল একটি ভিন্ন রূপ ও সৌন্দর্যের ডালি নিয়ে আবির্ভূত হয়। মনে হয় দিগন্তজুড়ে সাদা শাড়ি পরে কে যেন প্রকৃতিকে কুয়াশার আড়ালে ঢেকে রেখেছে। সকালে ঘন কুয়াশায় পথঘাট ঢেকে যায়, পাতায় পাতায় এবং সবুজ ঘাসে শিশির পড়ে। বাড়ির উঠানে কিংবা একটু দূরে একত্রে জড়ো হয়ে শীতের প্রকোপ থেকে রেহাই পেতে আগুন পোহানোর চিত্র হরহামেশাই চোখে পড়ে গ্রামে-গঞ্জে।

অবশ্য শহর এলাকায় এ সৌন্দর্য এত নিবিড়ভাবে উপলব্ধি করা যায় না। কুয়াশা মাখানো কালো পিচের রাস্তায় হেডলাইট জ্বালিয়ে চলে গাড়ি। রিকশাও চলে ধীরে ধীরে। রাস্তার পাশে ফুটপাতের চায়ের দোকানগুলোতে জমে ওঠে ভিড়। শীতের তীব্রতা উপেক্ষা করে সামান্য শীতবস্ত্র গায়ে জড়িয়ে গ্রামের কৃষকরা খুব সকালে লাঙ্গল-জোয়াল কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে; ব্যস্ত হয়ে পড়ে ক্ষেত-খামারের কাজে। শহরের মানুষও কুয়াশাঘেরা সকালে কাজকর্মে বেরিয়ে পড়ে।

নতুন সবজি আর বিচিত্র সব মাছের ছড়াছড়ি শীতে। সবচেয়ে লোভনীয় ও মজাদার খাবার হল নতুন গুড়ের ক্ষির-পায়েস। পিঠা-পায়েসের আসর বেশি জমে গ্রামবাংলায়। তবে শুধু গ্রামবাংলায়ই নয়, শহর এলাকায়ও এখন শীতের পিঠা খাওয়ার রেওয়াজ রয়েছে। শীতের বিচিত্র সব পিঠার অপূর্ব স্বাদ আজও আমাদের নস্টালজিয়ায় ফিরিয়ে নিয়ে যায় দূর অতীতে ফেলে আসা গ্রামীণ জীবনে। আমাদের হাজারও সমস্যা সত্ত্বেও গ্রামবাংলায় এসব পিঠা-পার্বণের আনন্দ এখনও মুছে যায়নি।

একসময় শীতকালে নিজের চেনা পরিবেশকে পেছনে ফেলে গ্রামে কিংবা মফস্বলে ছুটে যেত মানুষ। এখন সেই সময়টুকু করে উঠতে পারে না অনেকে। তবে অন্যান্য সময়ের চেয়ে শীতের আমেজটাকে সবাই একটু ভিন্নভাবেই উপভোগ করতে চায় আজও।

প্রদীপ সাহা : কবি ও লেখক

 

কুয়াশাঘেরা শীতের রূপ

 প্রদীপ সাহা 
২৯ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রকৃতির চিরন্তন নিয়মে শীত আসে ঘন কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে। শীতের সময় কুয়াশা তৈরি হয়। কুয়াশার সৌন্দর্য ছাড়া শীতের কথা যেন ভাবাই যায় না। শীতে তাপমাত্রা কম থাকে এবং মাটিতে থাকা আর্দ্রতা উপরে উঠে গিয়ে কুয়াশা তৈরি করে। পৃথিবীর সর্বাধিক কুয়াশাচ্ছন্ন স্থান হল নিউফাউন্ডল্যান্ডের গ্র্যান্ড ব্যাংকস, যেখানে উত্তর দিক থেকে আসা শীতল লাব্রাডর প্রবাহ ও দক্ষিণ দিক থেকে আসা অপেক্ষাকৃত উষ্ণ গালফ প্রবাহ মিলিত হয়।

সর্বাধিক কুয়াশাচ্ছন্ন ভূমি অঞ্চলের মধ্যে আছে পয়েন্ট রেয়েস, ক্যালিফোর্নিয়া। আর্জেন্টিনা, নিউফাউন্ডল্যান্ড ও লাব্রাডর অঞ্চলে বছরের ২০০ দিনই কুয়াশায় ঢাকা থাকে। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকা এবং চীনেও কুয়াশা তৈরি হয়। মাটির তুলনায় বাতাসে উষ্ণতা ও আর্দ্রতা বেশি থাকার কারণে যে কুয়াশা তৈরি হয় এবং ভেসে বেড়ায়, তা ভারত থেকে বাতাসের তোড়ে বাংলাদেশে চলে আসে।

কুয়াশার কারণে সূর্যের কিরণ ঢুকতে পারে না। তাই তাপমাত্রা কম থাকে এবং শীত অনুভূত হয়। তাছাড়া সূর্যের কিরণ গাছপালায় পৌঁছতে না পারায় পাতায় সালোক-সংশ্লেষণের পরিমাণ কমে যায়। এতে গাছপালা পুষ্টি কম পায় এবং গাছের খাদ্য কম পরিমাণে তৈরি হয়। একই কারণে অক্সিজেনের উৎপাদনও কমে যায়। শীতে কুয়াশার কারণে রবি শস্যের উৎপাদন কমে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণ করে এবং শিল্প-কারখানা ও যানবাহনের ধোঁয়া বাতাসে মিশতে না দিয়ে কুয়াশার ঘনত্ব কমিয়ে আনা সম্ভব।

তবে যে যা-ই বলুক, কুয়াশার রয়েছে এক অন্যরকম সৌন্দর্য, এক ভিন্ন আমেজ। কষ্ট এবং রাস্তায় চলাচলে ঝুঁকি থাকলেও শীতের কুয়াশার অসাধারণ সৌন্দর্য যেন অজান্তেই সবার মনে নাড়া দেয়। শীতের সকাল একটি ভিন্ন রূপ ও সৌন্দর্যের ডালি নিয়ে আবির্ভূত হয়। মনে হয় দিগন্তজুড়ে সাদা শাড়ি পরে কে যেন প্রকৃতিকে কুয়াশার আড়ালে ঢেকে রেখেছে। সকালে ঘন কুয়াশায় পথঘাট ঢেকে যায়, পাতায় পাতায় এবং সবুজ ঘাসে শিশির পড়ে। বাড়ির উঠানে কিংবা একটু দূরে একত্রে জড়ো হয়ে শীতের প্রকোপ থেকে রেহাই পেতে আগুন পোহানোর চিত্র হরহামেশাই চোখে পড়ে গ্রামে-গঞ্জে।

অবশ্য শহর এলাকায় এ সৌন্দর্য এত নিবিড়ভাবে উপলব্ধি করা যায় না। কুয়াশা মাখানো কালো পিচের রাস্তায় হেডলাইট জ্বালিয়ে চলে গাড়ি। রিকশাও চলে ধীরে ধীরে। রাস্তার পাশে ফুটপাতের চায়ের দোকানগুলোতে জমে ওঠে ভিড়। শীতের তীব্রতা উপেক্ষা করে সামান্য শীতবস্ত্র গায়ে জড়িয়ে গ্রামের কৃষকরা খুব সকালে লাঙ্গল-জোয়াল কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে; ব্যস্ত হয়ে পড়ে ক্ষেত-খামারের কাজে। শহরের মানুষও কুয়াশাঘেরা সকালে কাজকর্মে বেরিয়ে পড়ে।

নতুন সবজি আর বিচিত্র সব মাছের ছড়াছড়ি শীতে। সবচেয়ে লোভনীয় ও মজাদার খাবার হল নতুন গুড়ের ক্ষির-পায়েস। পিঠা-পায়েসের আসর বেশি জমে গ্রামবাংলায়। তবে শুধু গ্রামবাংলায়ই নয়, শহর এলাকায়ও এখন শীতের পিঠা খাওয়ার রেওয়াজ রয়েছে। শীতের বিচিত্র সব পিঠার অপূর্ব স্বাদ আজও আমাদের নস্টালজিয়ায় ফিরিয়ে নিয়ে যায় দূর অতীতে ফেলে আসা গ্রামীণ জীবনে। আমাদের হাজারও সমস্যা সত্ত্বেও গ্রামবাংলায় এসব পিঠা-পার্বণের আনন্দ এখনও মুছে যায়নি।

একসময় শীতকালে নিজের চেনা পরিবেশকে পেছনে ফেলে গ্রামে কিংবা মফস্বলে ছুটে যেত মানুষ। এখন সেই সময়টুকু করে উঠতে পারে না অনেকে। তবে অন্যান্য সময়ের চেয়ে শীতের আমেজটাকে সবাই একটু ভিন্নভাবেই উপভোগ করতে চায় আজও।

প্রদীপ সাহা : কবি ও লেখক

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন